‘গার্মেন্টস এর মাইয়া’ যখন একটি গালি

0

মাহবুবুর রহমান:

(১)
“আমার দু বছর সিনিয়র বড় ভাই, উদীয়মান কবি। বাংলাদেশের প্রথম সারীর বেশকিছু পত্রিকায় তার কবিতা প্রকাশ পায়। পড়াশুনা শেষ করেছেন। বেকার বসে থাকেন, কাজ বলতে একটাই, ফেসবুকে লেখালেখি। তিনি ফেসবুকে লেখা পোস্ট করেছেন-
‘সাজেদুল মামার দোকানে বসিয়া চা পান করিতেছিলাম, হঠাৎ দেখিতে পাইলাম দূর হইতে অতি সুন্দরী এক রমণী তাহার বক্ষ দুলাইয়া, এলোকেশ উড়াইয়া আমার দিকেই আসিতেছে, মুখে মুচকি হাসি মাখিয়া এক পলক তাকাইয়া ফের হেলিয়া দুলিয়া আমাকে অতিক্রম করিয়া রমণী তাহার পথ ধরিলো। মুহূর্তের তরে যেন মনে হইলো আমিও প্রেমের সাগরে ডুব দিতে যাইতেছি, এই রমণীকে আমার পাইতেই হবে। সাজেদুল মামাকে জিজ্ঞেস করিলাম তাহাকে চিনে কিনা, সাজেদুল মামা উত্তর করিলো, হ চিনি তো, হ্যাঁয় তো ঐ পাশের গারমেন্টে চাহরী করে!’
পোস্ট হা হা রিয়েক্টে ভরপুর। পোস্টের নিচের কমেন্টগুলি তো আরও ভয়াবহ, ‘মামা করতেন প্রেম, ফাও খাইতে পারতেন’, ‘ভাই এই মালগুলা এমনে হাসি দিয়াই ফাঁসায়’, ‘দোস্ত, তোর ফাডা বাঁশের কপাল’।

মাহবুবুর রহমান

সাধারণ মানুষদের না হয় একটু পরেই রাখলাম, এই হচ্ছে প্রেক্ষাপট, একজন নারীর প্রতি একজন উদীয়মান কবির অবস্থান।
আমাদের দেশে শহর কিংবা গ্রাম, নারীদের মানুষ হিসেবে বিবেচনা তো বহুদূর, নারী হিসেবে বিবেচনা করতে যেয়েও কেমন যেন এই “নারী” শব্দটিকেই বিভক্ত করে ফেলা হয়েছে। এই যেমন পতিতালয়ে যেসব নারী কাজ করেন জীবিকার তাগিদে, তাদের নারী বলা হয় না, তাদের বলা হয় বেশ্যা, মাগী। পোশাক শিল্পে যারা কাজ করেন, তাদের নারী বলা বা মানা হয় না, তাদের বলা হয় গার্মেন্টস এর মাইয়া।
আমরা এমনই একটি ঘৃণ্য সমাজে বাস করি, যেখানে পোশাক শিল্পে কর্মরত নারী শ্রমিকদেরও অনেকখানি পতিতালয়ের নারীদের সঙ্গেই তুলনা করা হয়। এতে যদিও সেই নারী শ্রমিকের কিছু যায় আসে না, বা যাওয়া আসার দরকার বলে আমি মনে করি না, তারপরেও একটা কিন্তু থেকে যায়। সেই কিন্তুটি হলো আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। এগুলি কবে বদলাবে? কেন বদলাচ্ছে না?

(২)
একটি তৈরি পোশাক কারখানায় চাকরি করবার সূত্রে এবং পোশাক কারখানায় কাজ করেন এমন একটি পরিবারে সাবলেট থাকবার সূত্রে বেশকিছু ব্যাপার খুব কাছে থেকে দেখেছি। নিজের পরিবার থেকে শুরু করে কর্মস্থল এমনকি বিয়ের পরে স্বামীর বাড়িতেও যে এই পোশাক শিল্পের নারী শ্রমিকদের কী পরিমাণ কষ্ট সইতে হয়, তা লিখে শেষ করবার মত নয়।

একজন নারী শ্রমিককে ঘুম থেকে উঠতে হয় ভোর ৪ টায়, অফিস করে বাসায় ফিরতে হয় কমপক্ষে রাত ১০ টায়। এসে আবার রান্না করে খেয়ে ঘুমোতে যেতে যেতে রাত ১২ টা। বিশ্বাস করুন, আপনি যদি সরাসরি কারখানায় বসে না দেখে থাকেন, তাহলে আপনি এক চিলতেও বুঝবেন না যে এই নারীদের কী পরিমাণ কাজের মধ্যে ডুবে থাকতে হয়। এরা যখন কাজ করে তখন দুনিয়ার কথা মনে থাকে না, মন পড়ে থাকে সেলাইয়ে, আর চোখ স্থির থাকে সুঁইয়ে। চোখের পলক ফেলবার সুযোগটুকুও যেন নেই, একবার একটি সেলাই ভুল হলেই সুপারভাইজার এর মুখে শুনতে হবে নোংরা সব গালি, এমনকি ওভারটাইম এর টাকাও কেটে নেয়া হতে পারে।

এতোখানি দৌড়ের মধ্যে যে নারী থাকেন, সে নারীর প্রতি আমাদের নোংরা দৃষ্টিভঙ্গি সত্যিই বড় লজ্জাজনক। আমরা নিজেদের মনে যে নোংরা চিন্তা পুষে তাদেরকেও নোংরা ভাবি, নোংরা বলি, নোংরা বলে বলে সামাজিক অবস্থান এর দিক থেকেও তাদের হেয় করি, সেইসব নোংরামি করা তো অনেক দূরের কথা, এরা কাজের চাপে বেশির ভাগ সময়ই বিকেলের নাশতাটুকুও করবার সময় পায় না।

(৩)
একটি মেয়ের বিয়ের সময় হয়েছে, পরিবার থেকে বিয়ে দেয়া হবে। মেয়ে গার্মেন্টসে চাকরি করে শুনলেই বরপক্ষ যেন দৌড় দেবার পথ খুঁজে পান না। ভাগ্যগুণেও যদি বর পাওয়া গেলো, ভাববেন না যে এমনি এমনি পাওয়া গেছে। মোটা অংকের যৌতুক তো বিয়ের সময় নিচ্ছেই, বিয়েটাই করতেছে বরং বউয়ের আয়ের টাকা পকেটে পুরবার জন্য।

এতোদিন মেয়েটির যুদ্ধ ছিল একার জন্য, হয়তোবা একটি পরিবারের জন্য। বিয়ের পর সেটি দাঁড়ায় আরও বিস্তৃত হয়ে, এখানে মেয়েটির নিজের বলে কিছুই থাকে না, তার জীবন হয়ে যায় একটি মেশিন এর মতো, ভোরবেলায় যা শুরু হয়ে গভীর রাতে শেষ। এরই ভেতর যে কত শত যুদ্ধ, ঝড়, স্বামী, শ্বশুর-শাশুড়ির নোংরা সন্দেহ, আরও কতো কী যে মেয়েটিকে পাড়ি দিয়ে সামনে পা ফেলতে হয়, তার হিসেবটা অনেক বড়।

এই নারীকে মেশিন এর মতো খাটাচ্ছি, তাকে দিয়েই রান্না করাচ্ছি, তাকে দিয়েই বাচ্চা সামলাচ্ছি, বিপদে পড়লে তার অলংকার বেঁচে বিপদ কেটে ফিরছি, কারখানায় আন্দোলন? এর নারীদেরই অগ্রভাগে রাখছি শ্লোগান দেবার জন্য, এই জন্য যে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যেন সহজে পুরুষদের দিকে আঘাত হানতে না পারেন। আন্দোলন সফল হয়ে যদি বেতন বৃদ্ধি পেলো তো সেটা চালান করে দিচ্ছি নিজেদের পকেটে।

এতোসবের পরেও ‘গার্মেন্টস এর মেয়ে’ বলে নিজেদের বোধ থেকে তাদের বর্জন করে চলেছি নির্লজ্জের মতোন। বেহায়ার মতো মুখ বেঁকিয়ে বলছি “ওহ, ঐ হালি তো গার্মেন্টস এর মাইয়া!”
গার্মেন্টস এর মেয়ে বলে তার প্রেমে পরা যাবে না, গার্মেন্টস এর মেয়ে বলে তাকে বিয়ে করা যাবে না, গার্মেন্টস এর মেয়ে বলে রাস্তাঘাটে তাকে ‘মাল’ বলে ডাকতে হবে, গার্মেন্টস এর মেয়ে বলে সে সৎ নয়।

একটি বারও কি আমাদের মনে এই বোধ জাগ্রত হয় না যে ‘গার্মেন্টস এর মাইয়ারাও’ মানুষ? একজন সংগ্রামী নারী, একটি পরিবারের জীবিকা নির্বাহের, বেঁচে থাকবার অন্যতম হাতিয়ার। একজন মা। একটি শক্তিশালী আন্দোলনের অগ্রভাগের অকুতোভয় অগ্রপথিক। একটি দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তভাবে বিনির্মাণের অংশীদার।

নাহ, তা কেন জাগ্রত হবে? মানুষ তো শুধু আমরাই, পুরুষরাই, নারীতো দুর্বল, তারা মানুষ হয় কী করে! মানুষ তো তাদের বলে যারা বেলজ্জা, বেহায়া, বেআদব, বেকুব আর নিষ্ঠুরের মতো আনায়াসে অন্যের ওপর নিজেদের কর্তৃত্ব খাটাতে পারে, নিজেদের সর্বেসর্বা বলে জাহির করতে পারে। লজ্জা!!!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 354
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    354
    Shares

লেখাটি ৭৬৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.