পিঙ্গলাক্ষীর ফাঁসি হয়, সিমরান অপেক্ষায় থাকে আনসারের

0

অপর্ণা গাঙ্গুলী:

মেহেন্দী রাঙানো দুটি নরম হাত।
শেল্টার এর বিছানার খাঁজ থেকে বের করে নিয়ে আসে নীল খাতা। নীল খাতায় রোজ প্রেমিকের প্রতি যে পেহগাম সে লেখে তা কি কোনোদিন পৌঁছুবে আনসারের কাছে? পৃথিবীর মানুষের কাছে?
জানে না সিমরান, তবু লিখেই চলে।

‘বোনেরা ভাইদের গুণগান গায়,
বাপ্ ভাই দুজনে মিলে অভাগীর দাফন সাজায়’
ল্যান্ডাই- সে কবিতার নাম।
কোন বিদেশী মেমসাহাব সে কবিতা খুঁজে পেতে সেসব নিজেদের ভাষায় লিখে লিখে প্রচার করছেন আজকাল, শুনেছে সিমরান। সে অনুবাদের কবিতার ছত্রে ছত্রে এক কাবুলি মেয়ের রক্ত, কান্না, গভীর যন্ত্রণা অমনভাবে মিশে থাকবে কিনা তা অবশ্য জানা নেই।

তা সে এক জনপ্রিয় মহিলা কবির তো ইন্তেকাল হয়ে গেলো স্বামীর হাতেই। ল্যান্ডেই লিখতে থাকা সেই কবি স্বামীর হাতেই পড়লেন মারা কী না, স্বামী তাঁর জনপ্রিয়তা নিতে পারেননি, তা শাস্তি হলো বটে স্বামীর – মাত্র পাঁচ বছরের জেল। আদালত ঠিক করলেন, ওতেই সেই পাষণ্ডের যা শিক্ষা হবার হবে ‘খন’।

কী হয়েছিল তার?
চোখে অমোঘ সেই প্রশ্ন মৌসমের, সিমরান হাসে, কী আর হবে রে বোন … ইন্তেকাল!
সেই পিশাচের হাতেই, অথচ নিজের ধর্ষণকারীকে মেরে ফেলার অপরাধে ফাঁসি গেছেন কোন এক মেয়ে।
তার কথা বলে সিমরান মৌসম, রাবেয়া, আনোয়ারা বিলকিসকে। মৌসমদের নবীন রক্তে দোলা লাগে, চোখে আগুন ঠিকরোয়। কিন্তু কিচ্ছু করার থাকে না শেষমেশ। এই সব, এইসব নিয়েই তুমুল আলোড়ন হয় সিমরানের মনে। আর সে লিখে চলে একের পর এক কবিতা, মধ্যরাতের নির্জনে দিয়া জ্বলে সারাটা রাত, জিয়াও।

তা কী সে কবিতার রকম? সে কবিতা ছুরির ফলার মতো বিদ্ধ করে পাঠককে। দু লাইনের কবিতায় থাকে চরম হতাশা, কষ্ট, যন্ত্রণা, যা এই মুলুকের মেয়েরা উগরে দিতে চায়, ছুরির ফলকে হাতের উপর কাটাকুটি করে না মেয়েরা এখন, কবিতা তাদের হাতিয়ার।
প্রথম লাইনে নয়টা সিলেবেল, পরেরটাতে তেরোটা, দ্বিপদী এই কবিতা এক বিশেষ রকমের কবিতা, যা ইতিমধ্যে সাড়া ফেলে দিয়েছে পৃথিবীতে।
কিন্তু সিমরান তার কী জানে! সে শুধু জানে, বাপ্ ভাইয়ের নজর এড়িয়ে কিশোরীবেলা থেকে ওই নীল খাতা ভরিয়ে তুলেছিল আনসারকে লেখা ভালোবাসার তৌফা দিয়ে। তার হৃদয়ের হাহাকার আর কান্না দিয়ে। কেউ জানতো না কক্ষণও যদি না সেদিন ওদের ঘরের পেছনে ওর আর আনসারের মিলন দেখে ফেলতো ওর ফুফা।

আর সেই দেখাই কাল হলো।

আনসার কিচ্ছু বুঝতে পারেনি।
পারেনি সিমরানও। বুঝতে পারলে সচেতন হতে পারতো।
সেদিন সিমরানের কলেজ পাশের খবর পেয়েই আনসার এসেছিলো ওর বাড়ি।
আর সেই প্রথম বসন্তের স্মৃতি চিরকাল অমলিন করে রাখতেই হয়তো সেই প্রথম চুম্বন।
তা কালজয়ী হয়ে রইলো ওই মুহূর্ত বই কী!

সাজা বলে সাজা!
বাপ ভাই মিলে দারুণ মারধরের পর ওর নাক-কান কেটে ফেলে দিয়ে এলো সংশোধনাগারে, সেখানে দীর্ঘদিন চিকিৎসা, তারপর প্রাণ ফিরে পেয়ে এই শেল্টারে। এখন সবার হাসির পাত্রী হরিণ নয়না সিমরান। ওর মৃগনয়নী সৌন্দর্য্যকে এখন ভর্ৎসনা করে ওর নাকের ওই গহ্বর, ওর কাটা কান দুটো। শেল্টারে আরও এক সিমরান থাকার জন্যেই ওর নাম এখন নাক-কান-কাটা সিমরান। তবু ওর চোখের আগুন এখনও জ্বলে, দিপ দাপ করে।

শুনেছে আনসারের জেল হয়েছে। এখন অপেক্ষা, কবে সে জেল থেকে ছাড়া পাবে। নিশ্চয়ই আসবে সিমরানকে নিকাহ করতে। গান গায় সিমরান, ওর গলা ভারী সুন্দর, ল্যান্ডাই কবিতাতেই সুর বসিয়ে নিয়ে গায়, গলা মেলায় মৌসম, বিলকিস বেগমরা।
‘ব্রা কে দাফন দিয়েছি, যাক না …
আহা বোরখার আড়ালে লিপস্টিকটুকু থাক না!’

বলতে বলতে গাইতে গাইতে হেসে গড়িয়ে পড়ে মেয়েরা এ ওর গায়ে, বিদ্রুপের হাসি। ওদের খেদ, অভিমান, জেদ, কান্না সমস্ত কিছু উগড়ে দেয় ওরা, বমন করে দেয় যত কিছু ক্লেদাক্ত ধারণ করে আছে নিজেদের মধ্যে। শেল্টারের আর মেয়েরা শোনে। তখন কেউ কেউ ওর দুঃখে চোখের জল ফেলে। আপন দুঃখের সাথে একাত্ম করে নেয় ওকেও।

সিমরানরা কেউ কেউ তো তবু বেঁচে ফিরেছে, আর ওর বান্ধবী সারখুন্দা? কী হলো তার পরিণতি!! ওই তো সেদিন সকালেও ঝকঝকে সপ্রতিভ সারখুন্দা এসেছিলো মাদ্রাসাতে। ওরা একসাথে উচ্চারণ করেছিল পাঠ আর তারপর মাকে নতুন বছরের জন্য খাবার করতে সাহায্য করবে বলেই ছুটেছিল বাড়ির পথে। ফেরার পথে কোথায় যেন কার সাথে বিবাদ বাদে। আর অমনি সেই হায়না পুরুষের দল ওর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।

এদেশে সব শক্তি পুরুষের হাতে। সত্যি! পৃথিবীতে কি কেবল এই নচ্ছার পুরুষতন্ত্রের রাজ্ চলছে আজকাল! পুলিশও থ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে যখন এক গাদা মত্ত পুরুষ সারখুন্দাকে প্রবল মারে, মারতে মারতে মেরে ফেলে, গাড়ি চালিয়ে দেয় ওর সাতাশ বছরের শরীরটার উপর দিয়ে, তারপর মেরে মেরে এক্কেবারে মেরে ফেলে ওর দেহটাতে আগুন ধরিয়ে দেয় নদীর পারে।
আমাকে ছেড়ে দাও তোমরা, বিশ্বাস করো আমি সত্যি নির্দোষ l
বলেছিলো সারখুন্দা বারংবার। কিন্তু সেই পৈশাচিক খেলা সাঙ্গ করতে কারো মন ওঠেনি তখন।
ওদের মধ্যে একটিও মরদের বাচ্চা ছিল না যে ওকে টেনে বের করে আনে, বাঁচায় ওকে! রক্তের নদীতে ভেসে গিয়েছিলো ওর দেহটি। ওকে ছাদ থেকে টেনে নামিয়েছিল ওরা, চলন্ত গাড়ির নিচে পিষে ফেলতে চেয়েছিলো ওরা, শেষকালে ওর দেহটাতে আগুন দিয়েও ওদের এই বীভৎস আগ নেভেনি। দোকানের কাজকর্ম ছেড়ে দিয়ে ছোট বড় সব্বাই এই অমানবিক হত্যাকাণ্ডে সামিল হয়ে পড়েছিল।

দোষ একটা ছিল বটে সারখুন্দার, এই নরপিশাচের পৃথিবীটাতে মানবী হয়ে জন্মানোর দোষ, আর কিছুই না।

সারখুন্দা নির্দোষ প্রমাণিত হয় বেশ কিছুদিন পর। অর্থাৎ যে অভিযোগ ওর বিরুদ্ধে হেনে ওরা ওকে মেরে মেরে মেরে মেরে ফেললো, সেসব নাকি ও করেইনি, কিন্তু তখন সে পৃথিবীর বুক থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে, শহীদ হয়ে গেছে। তবু আশার কথা এই যে ওর দাফনের সময় ওর দেহটি কোনো পুরুষকে ছুঁতে দেয়নি ওর দেশের মেয়েরা। তারাই শেষ অবধি কাঁধে করে নিয়ে গিয়েছে সারখুন্দাকে। বীরাঙ্গনার জয়ধ্বনি দিতে দিতে।

ওকে নিয়েও লেখে সিমরান। কিন্তু সে লেখার একটি পংক্তি কেউ কোনোদিন পড়বে না জেনেও সিমরনের মতো বহু মেয়ে সংশোধনাগারে বসে হাত কামড়ায়, মাথার চুল ছেঁড়ে। ওদের সত্যিই কিছু করার নেই। মৌসম যেদিন প্রথম এলো এখানে, ওর চোখ দুটো দেখে ভারী মায়া হয়ে ছিল সিমরানের। নিজের ডানার তলায় আশ্রয় দিয়েছিলো সিমরান ওকে। ঠিক যেন ওর ছোট বোনটি। প্রথমে কিচ্ছু বলতে পারেনি মৌসম। অনেক পরে শুধু দু চোখ দিয়ে জল পড়েছিল ওর। ষোলো বছর বয়স ওর। অনেক জিজ্ঞাসা করাতে মুখ খুলেছিলো মৌসম।

‘সোহরাব, আমার খালাতো ভাই, জোর করে আমাকে পেছন থেকে আক্রমণ করলো।
আমাকে পেছন দিক দিয়ে ঘুষতে চাইলো, খুব খুব ব্যথা লাগছিলো আমার।
আমি চিৎকার করতে পারিনি ভয়েতে, মৌসুমকে সত্যি তখন এক চিতার মুখে পড়ে
যাওয়া শিশু হরিণের মতো লেগেছিলো সিমরানের।
তবে দোষ ওর বাড়ির লোকেরা দিয়েছিলো মৌসমকেই।
ওর নাকি যথেষ্ট গা ঢাকা জামাকাপড় ছিল না। আর এইসব আচরণ ধর্মবিরোধী তো বটেই, ঐরকম বেশরম মেয়েমানুষের এইরকমই হবার কথা, তাই হয়েছে! তাই জেল হয়েছিল মৌসমের। সেই খালাতো ভাইয়ের কী হয়েছে জানা যায়নি। সেখান থেকে এই ওমেন শেল্টারে ওই মেয়ে, সিমরান ওকে জড়িয়ে ধরে বাঁচে। ওকে আড়াল করে রাখে সব কষ্ট থেকে। এই শেল্টারে মেয়েরা যদি মেয়েদের হয়ে দাঁড়ায়, কথা বলে, তবে পৃথিবীটা মেয়েদের এমন হ্যাটা করতে পারবে না, ভাবে সিমরান।

তবে সেদিন একটা ভারী কাণ্ড হলো। হঠাৎ শেল্টারে এসে হাজির এক নারী, বয়স আন্দাজ ৩৫-৩৬। কোলে এক দেবশিশু। বোঝাই যায়, এই নারীও এককালে ডানাকাটা হুরপরী ছিল। ওর পান্না সবুজ চোখে বনানীর ছায়া ছিল এককালে। এখন শুধুই শান্ত, স্থির গোখরো সাপের ক্রুঢ়তা।
সব মেয়েরা হৈ হৈ করে উঠলো – এই কে তুমি গো মেয়ে? কী করেছো যে এখানে এলে? মহিলা নিরুত্তাপ! অনেক প্রশ্নের পর পিঙ্গলাক্ষী এইবার চোখ তুললো –

বললো, ‘কী আবার? স্বামীকে খুন করেছি আমি।
করেছি, বেশ করেছি, সোউ বার বলবো, হাজার বার বলবো, বেশ করেছি, বেশ করেছি।
এমন সব শয়তানদের শেষ করে দেওয়াই ভালো।
হাঁফাতে লাগে সে, ওর নাক থেকে ড্রাগনের আগুন বেরোয়, মুখ থেকে শ্বাপদের লালা ঝরতে থাকে।

বরফ পড়া স্তব্ধতা সেই শেল্টার ঘরে। বাপ রে, এই আওরাত স্বামীকে মেরেছে, এই মুল্লুকে সে যে ভারী শক্ত কাজ গা। দু একটা হয় না, এমন নয়। হয় বৈকি! তবে নাহ, এমন কমই শোনা যায়। স্বামী মারবে স্ত্রীকে – এ তো তার হক। কিন্তু তা বলে উল্টোটাই?

কেন মেরেছে, একটু সাহস করেই জিজ্ঞাসা করলো বয়স্ক ফাতেমা। বেশ কিছুক্ষণ পর পিঙ্গলচক্ষু আরও ক্রুঢ় হলো, ঠোঁটের কোন ঝুলে রইলো স্বাপদের হাসি l
কেন আবার ওর পছন্দের আওরাতকে সোজা ঘরে তুলে এনেছিল যে!
আমার ঘরে, আমার বিছানা নোংরা করেছিল ওরা।
আর শুধু কি তাই, পাশের বাড়ির আপার বাচ্চা মেয়েটাকে?
আমিও সহ্য করিনি … ওর চোখে আগ ঝলকায় আবারও।
স্বদন্ত বের করে হাসতে থাকে হুর জাহান।
যা করেছে বেশ করেছে ও, উচিত শিক্ষা দিয়েছে ওই নরাধমকে।
আর সিমরানসহ অন্যদের পিঠের রোম খাড়া হয়ে ওঠে।
শিরদাঁড়া শক্ত হয়, হাতের মুষ্টি শক্ত করে ওরা।
সময় হয়েছে অবশেষে।

এখানে এসে স্বীকার করেছে হুর জাহান সেসব। ওর জেল হবেই। শেল্টার থেকেই নিয়ে যাবে জেলে, কালই। কী ভয়ানক কথা! সেই মহিলাকে অন্য ঘরে নিয়ে গিয়ে আটকে দিলো ওরা। কিন্তু ওই দুটি পিঙ্গল সবুজ চোখ সিমরানের রাতের ঘুম কেড়ে নিলো।

এর পর সাত বছর কেটে গেছে। সিমরানকে নিয়ে গেছে এক আমেরিকায় থাকা দম্পতি, ওর অবস্থা দেখে, ওকে প্রতিপালন করার দায় নিয়েই মোট ১০ বার রিকন্সট্রাক্টিভ সার্জারি করে তবে সিমরান নতুন নাক-কান পেয়েছে এখন। ওর ল্যান্ডেই কবিতা গেয়ে শোনায় ও এখন আন্তর্জাতিক মঞ্চে। প্যাম আর জন ওর পালক পিতামাতা সেই ব্যবস্থা করে দিয়েছেন। দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে দিয়েছে কিছু অনাথ অসহায় নারীর আত্মগ্লানির কথা, বেদনার বিবমিষা। এখনও আনসারের অপেক্ষাতে থাকে সিমরান, এখনও সব গান আনসারকে ঘিরেই তার ভালোবাসায় প্রতীক্ষা লেগে থাকে। আনসার ওর কাছে আসবেই।

শেল্টারের কথা মনে আছে সব সিমরানের। সব। মৌসম ঘরে ফিরেছে, ওখানে ও পড়াশোনা শিখে এখন একটা স্কুলে পড়ায়, ইমেল লেখে সিমরানকে। আর ভুলতে পারেনি সেই পিঙ্গলাক্ষীকে। শুনেছে তার ফাঁসি হয়ে গেছে, বাচ্চাটাকে শেল্টার থেকে প্রতিপালন করা হয়েছে।
কিন্তু কিছুদিন আগে একটা ভারী অবাক জিনিস দেখেছে এখানে এসে। একটা বহুদিন আগের পত্রিকাতে ওই মেয়েটির ছবি, হুবহু ওই মেয়ে। অমন পান্নার মতো চোখ, বয়স তেরো কী চোদ্দ, কোনো খেয়ালী বিদেশি ফটোগ্রাফারের তোলা নথিবদ্ধ, এক ভিন মুলুকের কিশোরীর নিষ্পাপ মুখখানি।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 50
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    50
    Shares

লেখাটি ৪৯৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.