‘কথা দিন, শরীরে হাত দিবেন না’

0

সুমাইয়া তারিন:

আমরা সবাই জানি গণ পরিবহনে নারী, শিশু, বৃদ্ধ এবং প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত কয়েকটা আসন থাকে। যদিও এই ব্যাপারে আইন রয়েছে, কিন্তু নামমাত্র এসব আসন কাগজে কলমেই সীমাবদ্ধ। বাস্তবে এর প্রয়োগ খুব কমই দেখা যায়। বেশিরভাগ সময়ই এসব আসন এই চার শ্রেণির মানুষের বাইরে যারা থাকে তাদের দখলে থাকে। এমনকি কোন নারী, বৃদ্ধ, শিশু বা প্রতিবন্ধী দেখলে ভদ্রতা দেখিয়ে সিট ছেড়ে দেয় না অনেকেই।

যাইহোক এসবে আমার যতটা না আপত্তি তার চেয়ে বেশি আপত্তি অন্য আরেকটা জায়গায়, তারা প্রায়ই সংরক্ষিত নারী সিট নিয়ে প্রশ্ন তোলে। বৃদ্ধ, শিশু এবং প্রতিবন্ধীদের সিট নিয়ে কারো কোন আপত্তি নেই, তাদের সব আপত্তি ওই সংরক্ষিত নারী সিটে। তাদের ভাষ্যমতে, নারী পুরুষ সমান অধিকার হলে বাসে নারীদের জন্য আলাদা সিট কেন লাগবে? পুরুষ দাঁড়িয়ে যেতে পারলে নারী কেন পারবে না?
আমি আমার ছেলেবন্ধুদের কাছ থেকে প্রায়শই এমন প্রশ্ন শুনি। এমনকি অনেক উচ্চপদস্থ, উচ্চশিক্ষিত পুরুষের মুখেও এরকম প্রশ্ন শুনেছিলাম।
সবার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্যই মূলত এই বিষয়ে লিখতে বসলাম।

বঙ্গ পুরুষকুলের এই প্রশ্নের জবাবে আমি যদি পাল্টা প্রশ্ন করি- আপনারা গণ পরিবহনে যাতায়াতের সময় কোন মেয়ে বা বয়স্ক মহিলা আপনাদের পিঠে, বুকে, পেটে, পাছায় হাত বুলিয়েছে? তাদের লিঙ্গ আপনার শরীর স্পর্শ করেছে?
আপনারা কতবার এরকম ঘটনার মুখোমুখি হয়েছেন?
জানি আপনাদের কাছে এর কোন উত্তর নেই, কিন্তু আমরা মেয়েরা প্রতিনিয়ত এরকম ঘটনার সম্মূখীন হই। পাবলিক বাসে যাতায়াত করেছে অথচ এরকম ঘটনার সম্মূখীন হয়নি এমন একটা মেয়েও আপনি খুঁজে পাবেন না এদেশে। এরকম ঘটনা সব মেয়েকে ফেস করতে হয়। কেউ কেউ প্রতিবাদ করে, কেউ বা ভয়ে চুপ থাকে৷ এই ভয়টা সাধারণ কোন ভয় নয়, “মেয়ের পোশাক ঠিক ছিল না বলেই গায়ে হাত দিয়েছে” – এরকম মন্তব্যের ভয়।

ভয় পাবে না কেন? যে দেশে ধর্ষণের জন্য ভিক্টিমের পোশাক, চলাফেরাকে দায়ী করা করা হয়, ভয়ে কুকড়ে যাওয়া ধর্ষিতা মেয়েটাকেই অকথ্য ভাষায় গালি দেওয়া হয়, সেদেশে সামান্য পাবলিক বাসে সেক্সুয়াল হ্যারেজমেন্টতো কোন বিষয়ই না। এসবের বিরুদ্ধে মেয়েরা কিভাবে প্রতিবাদ করবে?

বছর তিনেক আগের কথা, আমি তখন ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্রী। বাসে করে কোথাও যাচ্ছিলাম। বলে রাখা ভালো, গ্রামের মেয়ে হওয়াতে আমার বাস যাতায়াতের অভিজ্ঞতার ঝুলি একদমই শূণ্য ছিল। তখন আমার পাশের সিটে ছিল একজন মাঝ বয়সী লোক, বয়সে আমার বাবার চেয়েও বড়। পর্যাপ্ত জায়গা থাকা সত্ত্বেও তিনি শুরু থেকেই আমার সাথে খুব ক্লোজ হয়ে বসেছিলেন। আমি অস্বস্তিবোধ করছিলাম। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছিলাম না কারন এর আগে কখনো এরকম অভিজ্ঞতা আমার হয়নি। উনি কথা বলার অজুহাতে আমার পিঠে হাত দিচ্ছিলেন, আমি কিছু না বলে ওখান থেকে উঠে অন্য সিটে চলে গিয়েছিলাম। ওই বয়সে এরকম পরিস্থিতি ফেস করার মত মানসিকতা আমার ছিল না। বয়স্ক একজন লোকের এহেন আচরণে আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। এই ঘটনার ট্রমা কাটিয়ে উঠতে আমার বেশ সময় লেগেছিলো।
একটা মেয়ে সিটে বসে যাতায়াত করলে যেখানে এরকম পরিস্থিতিতে পড়তে হয়, সেখানে দাঁড়িয়ে যাতায়াত করলে কিরকম পরিস্থিতিতে পড়তে হবে আশাকরি সেটা আর ব্যাখ্যা করতে হবে না।

তাই বলছিলাম সংরক্ষিত নারী আসন নিয়ে কথা বলার আগে নিজের মানসিকতা পরিবর্তন করুন।
আপনাদের পাশে বসে বা দাঁড়িয়ে যাতায়াত করলে আপনার হাত বা কনুই আমার শরীরের স্পর্শকাতর জায়গা স্পর্শ করবে না, আপনার লিঙ্গ আমার শরীর স্পর্শ করবে না-এমন নিশ্চয়তা আপনি আমাকে দিতে পারলে আমিও আপনাকে নিশ্চয়তা দিচ্ছি, গণপরিবহনে আমাদের কোন সংরক্ষিত আসন লাগবে না।

অনার্স ২য় বর্ষ
সমাজবিজ্ঞান বিভাগ
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 153
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    153
    Shares

লেখাটি ২,০৮৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.