বেআব্রু হয়ে গেলো নারী!

0

সঙ্গীতা ইয়াসমিন:

হাজার বছর ধরে আমাদের সমাজে প্রচলিত কিছু শব্দ চরমভাবেই জেন্ডার বৈষম্যের মোড়কে আচ্ছাদিত! যা কেবল নারীকেই হেয় করেছে,করেছে কোণঠাসা।
বলা বাহুল্য, এসব শব্দের জন্মও হয়েছে পুরুষতন্ত্রের আঁতুড়ঘরে। যৌনকর্মের দ্বারা জীবিকা নির্বাহ করা নারীকে সমাজ ‘পতিতা’ নামে ডাকে। চিরকালই সমাজ তাঁকে অচ্ছুৎ মনে করে, ঘৃণা করে। বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্কের ক্ষেত্রেও সমাজ নারীকেই দায়ী করে তার নাম রেখেছে পরকীয়া। দুটো শব্দই স্ত্রীবাচক।

খুব সাদা চোখে দেখলেই আমরা বুঝতে পারি এই অচ্ছুৎ হওয়া নারীটির পক্ষে একা একা নষ্ট হওয়া সম্ভব নয় কোনোমতেই। এর সাথে আরেকজন পুরুষেরও সমান সমান ভূমিকা থাকে। অথচ কী অদ্ভুত বিস্ময়! আমাদের সমাজের প্রচলিত শব্দ ভাণ্ডারে এর বিপরীতে কোনো পুরুষবাচক শব্দ নেই! একইভাবে ইংরেজিতেও ভার্জিনিটি, চেস্টিটিরও কোনো পুরুষবাচক শব্দ নেই! অর্থাৎ যুগে যুগে ভিন্ন ভিন্ন সমাজ ও সংস্কৃতিতে পুরুষের এই লীলাখেলা সমাজ স্বীকৃতি দিয়েছে।অপরপক্ষে নারীর গায়ে লেপে দিয়েছে কলঙ্কের কালিমা! আমাদের সমাজের এসব শব্দভাণ্ডারও জেণ্ডার সাম্যের পথে অন্তরায় হিসেবে কাজ করেছে বলে আমার বিশ্বাস।

লিঙ্গ বৈষম্য জিইয়ে রাখতে আমাদের গণমাধ্যমেরও ভূমিকা নেহায়েত কম নয়! ভারতীয় উচ্চ আদালতের রায়কৃত ৪৯৭ ধারা বিলোপের সংবাদ পরিবেশনের দিকে নজর দিলেই সেকথা আরো স্পষ্ট করে বোঝা যায়।

“ভারতীয় সুপ্রীম কোর্ট বৈধতা দিল পরকীয়ার”–এমন শিরোনাম দুই দেশের প্রায় সবকটি পত্রিকার, যা দেখে আমাদের ধ্বজাভাঙ্গা পুরুষতন্ত্র ‘জাত গেলো জাত গেলো’ রবে দিশেহারা হয়ে উঠলো। উত্তাল হলো ফেসবুক! ঝরলো কুরুচিপূর্ণ হাজারো মন্তব্য!

সবই নারীর বিরুদ্ধে। বিকৃত, অসম্পূর্ণ কিংবা নেতিবাচক সংবাদ পরিবেশনের পেছনে ব্যবসায়িক স্বার্থ থাকলেও, সেটা কোনোভাবেই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা নয়। দেড়শ বছরেরও অধিক সময় পেরিয়ে ভারত যদি ১৮৬০ সালের ব্রিটিশ প্রণোদিত একটি কালা কানুনকে ছুঁড়ে ফেলতে পারে সাম্যের অধিকার প্রতিষ্ঠায়, সেক্ষেত্রে আমাদের সংবাদকর্মীগণ আরও একটু দায়িত্বশীল আচরণ করবেন বলেই প্রত্যাশা করেছিলাম।

বিষয়টা খুবই পরিস্কার! বিবাহবহির্ভূত নারী-পুরুষের যৌন সম্পর্ক! এটা অপরাধ কি অপরাধ নয়, সেটাই এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। আমি মনে করি এটা অবশ্যই অপরাধ, চুক্তিভঙ্গের, কিংবা বিশ্বাস ভঙ্গের, সামাজিক অপরাধ! সেই অপরাধে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ দুজনই সমানভাবে দায়ী। তবে এই দায়ে কারও জেল, জরিমানা হওয়াটা কোনও সভ্য-সংস্কৃতির অংশ হতে পারে না। মোদ্দা কথা কে কার সাথে বিছানায় যাবে, কিংবা কেনো যাবে, তার দায়িত্ব রাষ্ট্রের ওপর বর্তাতে পারে না।

এই পরকীয়ার কারণে যদি সংসার ভেঙে যায়, অশান্তি নেমে আসে সংসারে, কিংবা সন্তানদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে, তার দায় কি কেবলই নারীর? বিবাহের বন্ধন কেবল নারীর জন্যেই পবিত্র? পুরুষের জন্যে নয়? আমার মতে, ভারতীয় উচ্চ আদালত ৪৯৭ ধারা বিলোপের মাধ্যমে বরং একজন পুরুষকেই বাঁচালো অপরাধের দায় থেকে!

ধারাটিতে পরিস্কার বলা ছিল, কোনো স্বামীর অসম্মতিতে তাঁর স্ত্রীর সাথে অন্য পুরুষের যৌন সম্পর্ক গড়ে উঠলে সেই স্ত্রীর স্বামী অন্য পুরুষটির বিরুদ্ধে ফৌজদারী আইনের ৪৯৭ ধারায় মামলা করতে পারবেন, যার সাজা হবে জরিমানাসহ সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাবাস। সংশ্লিষ্ট ধারাটিতে স্ত্রীকে স্বামীর সম্পত্তি গণ্য করে স্ত্রীটির জন্য কোনও শাস্তির বিধান রাখা হয়নি। স্ত্রীর পক্ষে স্বামীই মামলা করবেন অপর পুরুষটির বিরুদ্ধে। রায়ের এই অংশ পর্যন্ত পুরুষেরই জয়! তবুও হাজার হাজার ভ্রাতা-বন্ধুর আহাজারীতে ফেসবুক বিদীর্ণ হয়ে যাচ্ছে! কারণ ভারতীয় আদালত মন্তব্য করেছেন, নারী পুরুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়! এই মালিকানা চলে যাওয়াটাই বিশাল বড় ক্ষতি!

অন্যদিকে সশ্লিষ্ট ধারায় স্ত্রীর অসম্মতিতে স্বামী অন্য নারীর সাথে প্রেমজ কিংবা যৌন সম্পর্কে জড়ালে স্ত্রী মামলা করতে পারবেন না, কারণ স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তি হলেও স্বামীটি স্ত্রীর সম্পত্তি নয়! ধারার এই অংশটুকু এমনই ছিল – “কৃষ্ণ করলে লীলা খেলা, আর আমি করলে বিলা।”

উল্লেখ্য, বিবাহ বিচ্ছেদের মামলায় পরকীয়া গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে বলেও উল্লেখ করেছেন উচ্চ আদালত। সুতরাং বিবাহ টিকিয়ে রাখার অস্ত্র এখনও রইলো পুরুষের হাতের মুঠোয়! চিলে কান নিয়েছে ভেবে যতটা সন্ত্রস্ত হয়ে পড়েছেন ভ্রাতা-বন্ধুগণ, আদতেই পরিস্থিতি ততটা আশঙ্কাজনক নয়! কান কানের জায়গায়ই রয়েছে, কেবল সামান্য একটা দমকা হাওয়া লেগেছে মালিকানা হারানোর ফলে!

মূলত পুরুষতন্ত্র নারীকে অবরূদ্ধ করার কৌশল হিসেবে কখনো ধর্ম, কখনো আইন, কখনো, অন্যায় সামাজিক আচারকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। যে হাতিয়ার এক অর্থে নারীর আব্রু হিসেবে কাজ করেছে। এই কালা কানুন বিলোপের মাধ্যমে নারী আরও একবার বেআব্রু(!) হয়ে পড়লো। চলে গেলো পুরুষের দখলদারিত্বের বাইরে! আর সেই ভয়েই কুঁকড়ে আছে আমাদের মেরুদণ্ডহীন পুরুষ সমাজ! যারা ভালোবাসতে পারে না, চায় পাশবিকতা দিয়ে দমন করতে। মায়ার বাঁধনে বাঁধতে জানে না, জানে শেকলে বাঁধতে। তাই শেকল ভাঙার গানে পুরুষেরা সামিল হয়নি কোনোদিন।

একবিংশ শতাব্দে দাঁড়িয়ে এক নারী বলছি, আসুন, আদিম লড়াই ভুলে, পৃথিবীর বয়সের মতন বর্ষীয়ান এই শত্রুতা ভুলে আজ দিই বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে। অর্ধেক অঙ্গ হয়ে নয়, বাঁচুক নারী পূর্ণাঙ্গ মানুষের মর্যদায়। মুক্ত হোক যত শৃঙ্খল চলার পথে তাঁর! আর এভাবেই এগিয়ে যাক আমাদের ভালোবাসার পৃথিবী। আর দ্বিধা নয়, নয় ভয়! আজকের পৃথিবীর এই যান্ত্রিক সভ্যতাকে করি জয় শুধুই ভালোবাসায়!

সঙ্গীতা ইয়াসমিন, টরন্টো, কানাডা

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 208
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    208
    Shares

লেখাটি ১,০৯৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.