দুনিয়ার সবচেয়ে বড় উৎসব হোক প্রথম মাসিকের দিনটি

0

পান্না কণা ভক্ত:

নামকরণ, উপনয়ন, সুন্নতে খাৎনা, অবগাহন সব হয় ধুমধাম করে, আর যে শারীরবৃত্তীয় ঘটনাটা না ঘটলে এই সবকিছু থেমে যেত, সেটা নিয়ে ট্যাবুর শেষ নেই। বিয়ে নিয়ে প্রত্যেকটা সমাজে যে মাতামাতি, সব বন্ধ হয়ে যেত যে বিষয়টা না থাকলে, সেই বিষয়টাই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। যে ঘটনাটা না ঘটলে মানুষের জন্মই হতো না, সেই ঘটনাটা ঘটলেই তাকে তথাকথিত পবিত্র স্থানে ঢুকতে দেয়া হয় না।
মেয়েরা অপবিত্র হয়ে যায় বলে। চমৎকার! মেয়েরা অপবিত্র আর যে থলিটার কার্যকলাপের জন্য মেয়েরা অপবিত্র সেই থলিটার ভিতরে থেকে মায়ের রক্ত মাংস শুষে খেয়ে বেরিয়ে পুরুষ ঘোষণা করে দিল মেয়েরা অপবিত্র,পবিত্র স্থানে তাদের ঢোকা বারণ। তাহলে পুরুষ তো অপবিত্রেরও অপবিত্র। কত বড় বেঈমানি! এটা পুরুষের পক্ষেই সম্ভব।

পুরো ব্যাপারটাকে কি হাস্যকর মনে হয় না? অথচ ব্যাপারটা যদি এরকম হতো যে, এটাই হবে সবচেয়ে বড় উৎসব, সবচেয়ে বড় সম্মানের, সবচেয়ে বড় আনন্দের ঘটনা। হওয়া উচিত ছিলো তাইই। কিন্তু যা উচিত তার উল্টোটা ই বেশি ঘটে। যা উচিত তা ঘটলে অনেক দুর্ঘটনা ঘটতই না। এ তো বলে শেষ করা যাবেনা।ভাবছেন নিশ্চয়ই কিসের কথা বলছি?এবার আসি মূল কথায়। আমি বলতে চাইছি মেয়েদের প্রথম রজঃস্বলার দিনটির কথা, প্রথম ঋতু স্রাবের দিনটির কথা, প্রথম পিরিয়ডের দিনটির কথা, প্রথম মাসিকের দিনটির কথা সবচেয়ে বড় আনন্দের দিনটির কথা। যদি প্রত্যেক মা বাবা এদিন তাদের মেয়েকে প্রাণভরে আশীর্বাদ করতো, প্রত্যেক ভাই এদিন তার বোনকে সম্মান জানাতো!

একটা উৎসবের আয়োজন যদি করা যেত তাহলে কতই না ভাল হতো! কী জানি আমি ভালো বুঝতে পারিনা। যে ব্যাপারটা না ঘটলে দুনিয়ার সবকিছু বন্ধ হয়ে যেত সেই ব্যাপারটাকে সবচেয়ে অবহেলা করা হচ্ছে। কেন হচ্ছে? মানুষ যদি না থাকে কে নামাজ পড়বে, কে পড়াবে? কে পুজো করবে, কে পুজো করাবে? যে পুরুষ মানুষ মায়ের পেট থেকে বেরিয়ে মাকে অসম্মান করে সে আর যা ই হোক তাকে আমি মানুষ মনে করিনা। আর যে ঘটনাটা না ঘটলে মানব জন্মের ইতিহাস বিলুপ্ত হয়ে যেতো সেই ঘটনাকেই সবচেয়ে বেশী অপমান,অসম্মান, অবহেলা করা হয়, কিন্তু কেন? মেয়ে বলে তো? তার গায়ে শক্তি নেই বলেতো?তার শরীরে প্রবেশ করতে গায়ে শক্তি থাকলেই চলে বলে তো? আর তো তা চলতে দেয়া যায় না।

অনেক হয়েছে। জল অনেক গড়িয়েছে। মানব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় উৎসব তো এটা নিয়ে হওয়া উচিত। প্রত্যেকটা পরিবার এই জগতের একক। প্রত্যেকটা পরিবার যদি তাদের মেয়েদের সম্মান করতো তাহলে দুনিয়ার চেহারাটা মায়াময় সুন্দর হতো। দুনিয়ার সবচেয়ে বড় উৎসব মানে সার্বজনীন উৎসব হবে সেই পরিবারের কন্যাসন্তানটির প্রথম রজঃস্বলার দিন। কারণ সেই দিনটিতে প্রমাণিত হয় ভবিষ্যতে সে চাইলে মা হতে পারবে। এর চেয়ে বড় আনন্দের, এর চেয়ে বড় গৌরবের, এর চেয়ে বড় সম্মানের আর কী হতে পারে? আর সেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাটাকে সবচেয়ে অবহেলা করা হয়। যার ফলশ্রুতিতে ভবিষ্যতে অনেক ভবিষ্যত মায়ের নানাবিধ শারীরিক সমস্যাও হয় যা মেনে নেয়া সত্যিই কষ্টকর।

মেয়েরা অনেক ক্ষেত্রে অনেক বড় বড় সাফল্য লাভ করেছে। কিন্তু এই ব্যাপারটা যেন অন্ধকারেই রয়ে গেছে। সেই অসম্মানের জায়গাটা থেকে উত্তরণের সময় এসে গেছে। ভারতের বিভিন্ন মন্দিরে রজঃস্বলা বয়সী মহিলাদের প্রবেশাধিকার ছিলোনা। যেটা সম্প্রতি কোর্টের রায় মহিলাদের প্রবেশাধিকারের পক্ষে গিয়েছে। এটা একটা বড় অর্জন বলে আমি মনে করি।

আসুন আমরা সবাই আমাদের যাদের ঘরে কন্যা সন্তান আছে তাদের প্রথম রজঃস্বলা হওয়ার দিনটিকে সবচেয়ে আনন্দময়, মেয়েটির জন্য সাহস অর্জনের দিন হিসেবে উদযাপন করি। আর উপহার হিসেবে তার হাতে তুলে দেই একখানা তরবারি, হ্যাঁ ঠিকই দেখেছেন, তরবারি। হোক সে আসল কিংবা প্রতীকী, সোনার অথবা লোহার, সাইজে বড় কিংবা ছোট। এই তরবারিই ভবিষ্যতে তাকে সাহস যোগাবে। অনেক বিপদ থেকে রক্ষা পেতে তাকে সাহায্য করবে।
এই দিনটি পিতামাতার কাছে সবচেয়ে বড় সাফল্যের, কারণ তারা একজন ভবিষ্যত মাতার গর্বিত পিতামাতা। ভাইয়ের কাছে গৌরবের, কারণ সে ভবিষ্যতের এক মাতার গর্বিত ভাই।

ভাইটিকেও জানাতে হবে এই বিষয়টি। তার জানা উচিত মায়েরও হতো বলেই তার জন্ম হয়েছে। অন্যথায় তার জন্মই হতো না। এটা জানার পরও কী সেই ছেলেটি এই বিষয়টাকে নিয়ে হাসাহাসি বা নোংরামি করবে? অবশ্যই না। মেয়েটিকে জানাতে ও শিখাতে হবে সে যেন এই বিষয়টাকে কখনও লজ্জার বা ঘৃণার বিষয় হিসেবে না দেখে।

কত আলতু ফালতু জিনিস নিয়ে আমরা উৎসবে মেতে উঠি, অথচ এরকম একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে আমরা সবচেয়ে অবহেলার বিষয়, গোপনীয় বিষয়, লজ্জার বিষয় করে রেখেছি। এখনই সময়- শুরু হোক উৎসব-দুনিয়ার সবচেয়ে বড় পূজা, সবচেয়ে বড় ঈদ, সবচেয়ে বড় বড় দিনের।

এদিনের আগের থেকেই মেয়েটিকে জানানো দরকার এই সময়ের শারীরিক কষ্টের কথা, পরিচ্ছন্নতার কথা, এই সময়ের পরবর্তীতে কিছু বুঝে ওঠার আগেই বিপদের কথা, সাবধানতার কথা। যারা নিজ কন্যা সন্তানের উৎসব উদযাপনের সুযোগ হারিয়েছেন, তারা ভাইয়ের মেয়ে, বোনের মেয়ে, আর না হলে প্রতিবেশীর মেয়ের উৎসবে সামিল হোন। তাদের সাহস দিন, সাহায্য করুন।

আরেকটা বিষয়, ইদানিং জানি না কী কারণে যদিও আমার শোনা কথা মেয়েদের পিরিয়ডের সময়টাও এগিয়ে এসেছে, তুলনামূলক কম বয়সী মেয়েদের পিরিয়ড হচ্ছে। তাই সহযোগিতা আরো বেশি দরকার।

সে সাথে সাথে আপনার ছেলে সন্তানটিকেও বিষয়টি বুঝিয়ে বলুন। আমি আমার টিনএজ ছেলেকে যখন তার শারীরিক পরিবর্তনগুলোর কথা বলেছি, সাথে সাথে মেয়েদের শারীরিক পরিবর্তনের কথাও বলেছি। আমাকে আমার ছেলে জিজ্ঞেস করেছে, আমারও এটা হয় কিনা?উ ত্তরে বলেছি “এই যত মা দেখছো সবার তো হয়ই, যত লোক দেখছো এদের সবার মায়ের হতো বলেই তাদের জন্ম হয়েছে।” আমার এই ছেলে হাসবে মেয়ে বন্ধুদের নিয়ে? কখখোনো না। আর যদি হাসে তাহলে বলবো আমার শিক্ষায় ভুল ছিলো।

আমার ছেলে এই সমাজেরই অংশ। আপনার ছেলেও। আমার ছেলে আপনার ছেলে, আমাদের ছেলেরা সঠিকভাবে জানলে কে আমাদের মেয়েদের নিয়ে হাসবে? আমাদের ছেলে সন্তান পুরুষ না হয়ে মানুষ হোক। মেয়েদেরকে তারা মানুষ ভাবতে শিখুক। তাই আসুন ট্যাবু ভাঙুন।

একটা মেয়ে একটা মা। সে যত যত্নের, যত আদরের, যত সম্মানের সাথে বড় হবে তার আত্মমর্যাদাবোধ তত উন্নত হবে। আর তার ফলশ্রুতিতে সমাজ হবে উন্নত।
আপনি বাবা কিংবা মা যেই হোন কন্যা সন্তানের সঙ্গে থাকুন সবসময়। দুনিয়ার কলুষতা কমবেই, চ্যালেঞ্জ!

শুরু হোক আজই।
“Happy First Menstrual cycle”

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 622
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    622
    Shares

লেখাটি ১,৭০৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.