যৌন কেলেংকারিতে পুঁজিবাদী মিডিয়ার দৌড়

0

আনসার উদ্দিন খান পাঠান:

মার্কিন মুলুকে বিখ্যাত লোকজনের আপত্তিকর যৌন আচরণের খবর বেশ মুখরোচক। গেল গেল বলে এমন রব উঠে, মনে হবে তাদের সমাজ বড্ড রক্ষণশীল। স্ক্যান্ডালের শুরুটা হয় একেবারে দশদিক কাঁপিয়ে, কাঠখড় পুড়িয়ে তার বিস্তার ঘটে, মিডিয়া সে আগুনে ঘি ঢালে। কিন্তু সমাপ্তিটা হয় একেবারে সাদামাটা, যেন এ আর এমন কী ভাই!

আমেরিকান এটর্নি এন্ড জুরিস্ট ব্রেট কাভানগের তার দেশের সুপ্রীম কোর্ট এসোসিয়েট জাস্টিস হওয়ার পথে নারীঘটিত ব্যাপারে মেইনস্ট্রিম সংবাদমাধ্যমে যে কাণ্ড-কারখানা করছে, তা রীতিমতো রুদ্ধশ্বাসে দেখা থ্রিলার ছবিকেও হার মানায়। গত কদিন ধরে সিএনএন, বিবিসিসহ পশ্চিমা জনপ্রিয় সব সংবাদমাধ্যমে এই ঘটনা ঘন্টার পর ঘন্টা লাইভ দেখানোসহ নানাবিধ বিশ্লেষণ তুলে ধরে কান ঝালাপালা করে ফেলছে। যেন পৃথিবীর সামনে এই মুহূর্তে দুজন নরনারীর প্রায় চার যুগ আগে সংঘটিত নীতিবিরোধী এক মিলনচেষ্টাই প্রধানতম সমস্যা!

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাকে এই পদে নমিনেট করেছেন, চূড়ান্ত নিয়োগে সিনেটের সমর্থন লাগবে। এই সময়েই আলোচিত ঘটনার শুরু। ক্রিস্টিন ব্লাসে ফোর্ড নাম্নী এক মনোবিজ্ঞান প্রফেসর কাভানগের প্রতি অসংযত যৌনাচারের অভিযোগ এনেছেন। ক্যালিফোর্নিয়া থেকে উড়ে এসে সিনেট জুডিসিয়ারী কমিটির সামনে হলফ করে অশ্রুসিক্ত নয়নে অভিযোগ করেছেন ৩৬ বছর আগে কাভানেগ ইচ্ছার বিরুদ্ধে মিলন চেষ্টায় তার শরীরে হাত লাগিয়েছেন, পুরো কর্মটি সম্পন্ন করতে পারেননি যদিও। ভদ্রমহিলার মনে হয়েছিল কাভানেগ তাকে ধর্ষণ এবং হত্যা করবেন। সেই দুঃস্বপ্নে তিনি এখনও তাড়িত। তখন মিসেস ফোর্ডের বয়স ছিল ১৫ আর মিঃ কাভানেগের ১৭।
অতঃপর মিসিসিপি দিয়ে অনেক পানি গড়িয়েছে। তিনি ইতোমধ্যে পালো আল্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞানের প্রফেসর হয়েছেন, দুইপুত্রের জননী হয়েছেন। অভিযুক্ত ব্যক্তিও রাষ্ট্রের নানান গুরুত্বপূর্ন দায়িত্বপালন শেষে এখন সুপ্রীম কোর্টের জাস্টিস হবার পথে, তিনিও দুই কন্যার জনক। তাকেও কমিটি তলব করে।
সস্ত্রীক উপস্থিত হয়ে বাকরুদ্ধ কন্ঠে জানিয়েছেন, তিনযুগ আগে এরকম অপকর্ম তিনি করেননি, এটা বিরোধী রাজনৈতিক শিবিরের ষড়যন্ত্র। সে কথারও যুক্তি আছে।
তিনি নিজে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নমিনি, আবার মিসেস ফোর্ড ডেমোক্রেটিক পার্টির সদস্য। ভদ্রমহিলা ডেমোক্রেটিক দলকে চাঁদা দিয়েছেন এবং ২০১৭ সনে লস এঞ্জেলসে ট্রাম্পবিরোধী সমাবেশে অংশ নিয়েছেন। কাভানেগ বলছেন, এই নারী এই মিথ্যে বলে তার পারিবারিক জীবন আর ক্যারিয়ার বিষিয়ে তুলেছেন।
মিসেস ফোর্ড বলছেন, তিনযুগ ধরে তিনি বিবেকের দংশনে পুড়েছেন, এবার তার মনে হয়েছে, অভিযোগটি দায়ের করার সময় এসেছে। মিডিয়া পেয়ে গেল তার কাংখিত খোরাক, আরে এই তো চাই। রাজনৈতিক দুই শিবিরে বিভক্ত মার্কিনীদের কাছে এখন এটাই লুফে নেবার মতো সন্দেশ!

এই মুহূর্তে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সিরিয়ায় অবরুদ্ধ ভুখা মানুষ তোপের মুখে দিন কাটাচ্ছে, ইয়েমেনে হাড্ডিসার দুর্ভাগা শিশুরা না খেয়ে মারা যাচ্ছে, দুনিয়ার অন্তত দশ জায়গায় লক্ষ লক্ষ মানুষ যুদ্ধ-দারিদ্র-অনাচারের শিকার হচ্ছে, ইউএন শান্তিরক্ষীরা তা মোকাবেলায় গলদঘর্ম হচ্ছে, ইন্দোনেশিয়ায় সুনামিতে শত শত মানুষ মারা গেছে, লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তু রোহিংগা বিশ্বের সর্ববৃহৎ রিফিউজি ক্যাম্পে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছে। এর কোনটাই মিডিয়াতে শীর্ষ খবর নয় এখন।

কাভানেগ-ফোর্ড অসংযত ঘটনাই এক নম্বরে।
তা এই যে এতো বড় একটা খবর, বিতর্ক, জনমতের প্রকাশ তার শেষটা কেমন হতে পারে? এরই মধ্যে সিনেট জুডিসিয়ারী কমিটি কাভানেগকে গ্রিনকার্ড দিয়ে দিয়েছে। অন্য আর নমিনির মতোই তার ব্যাপারটাও সিনেট যথারীতি অনুমোদন দিয়ে দিবে এটা অনেকটা নিশ্চিত। এফবিআই দিয়ে এর একটা তদন্ত করার সিদ্ধান্ত হয়েছে বটে, তবে তার ফলাফলও কাভানেগের পক্ষেই আসবে। ইতোমধ্যে দৃঢ়তার পরিচয় দিতে গিয়ে এক এফবিআই প্রধান ট্রাম্পের হাতে চাকরি খুইয়েছেন। সাহস নিয়ে তদন্ত ট্রাম্পের বিপক্ষে নিয়ে যাবেন সেরকম অবস্থায় হয়তো সংস্থাটি নেই। ৬৫ জন নারী যারা কাভানেগের সংগে লেখাপড়া বা কাজ করেছেন, তারা তাকে ভদ্রলোকের সার্টিফিকেট দিয়েছে। এমন আচরণ তিনি করতেই পারেন না।

২০১৬ সনে ট্রাম্পের নির্বাচনের সময় অন্তত ১৯ জন নারী তার বিরুদ্ধে যৌনহেনস্থা করার অভিযোগ তুলে। পক্ষে কিছু তথ্যপ্রমাণও তুলে ধরে। আমেরিকানরা বিষয়টা মুখরোচক হিসেবেই কেবল নিয়েছে, ভোট দেয়ার সময় তাকেই দিয়েছে।

১৯৯৮ সনে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসেই শিক্ষানবিশ তরুণী কর্মকর্তা মনিকা লিওয়েনিস্কির সাথে শারীরিক কাণ্ডকীর্তি করে বসেন। তিনি যখন প্রায় ইম্পিচমেন্টের প্রক্রিয়ায় পড়ে গেলেন, তখন দোষ কিছুটা স্বীকার করলেন। বললেন, তিনি ক্যাজুয়াল সেক্সে যাননি, তবে মনিকার মুখগহবর আর তার স্পর্শকাতর অংগ সংযোগ ঘটেছে মাত্র, এটা কেবল অসংযত আচরণ বলা যায়। মনিকার স্মৃতি হিসেবে রেখে দেয়া ক্লিনটনের যৌনরস দাগাংকিত নীল জামা উদ্ধার করা হয়। এতোকিছুর পরও প্রেসিডেন্টের কিছু হয়নি।

শুধু তাই নয়, ২০০১ সনে যখন ক্লিনটন যথার্থ মেয়াদশেষে হোয়াট হাউস ছাড়েন, তখন জনমত জরিপে ক্লিনটন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সর্বাধিক জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট। ইতিহাসের সর্বাধিক জনপ্রিয় তিনজন প্রেসিডেন্টের তালিকায় তার নাম উঠে আসে।

প্রকৃত অবস্থা হচ্ছে, মার্কিন সমাজে বিবাহপূর্ব বা বিবাহ বহির্ভুত যৌনকর্ম নিয়ে মানুষের খুব একটা মাথাব্যথা নেই। আমাদের মতো রক্ষণশীল সমাজ থেকে যারা দেশান্তরি হয়ে সে মুলুকে গেছেন তাদের কথা ভিন্ন।
২০০০-২০০২ সময়কালে আমি বসনিয়ায় শান্তিরক্ষী হিসেবে কর্মরত ছিলাম। ৩৫ দেশের পুলিশ অফিসার কাজ করেছি। আমাদের সাথে ছিল প্রায় দুইশ আমেরিকান পুলিশ কর্তা। ইচ্ছুক অফিসারের অভাবে এদের সবাইকে চাকুরি থেকে রিটার্মেন্টের পর ঘর থেকে দাওয়াত দিয়ে এনে পাঠানো হয়েছিল। অধিকাংশের চুল দাড়ি পক্ক। তারা প্রায় সবাই সম্মতির ভিত্তিতেই স্থানীয় গার্লফ্রেন্ডের সাথেই দিনপাত করতো। এতে তাদের কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল না। যুদ্ধশেষে বসনিয়ান মেয়েরাও চাইতো কোনভাবে কারো ঘাড়ে চেপে চলে যাওয়া।
আমেরিকায় সংক্ষিপ্ত সফরকালেও যতটুকু চোখ মেলে দেখেছি তারা এই বিষয়ে রক্ষণশীলতার ধারে কাছেও নেই। এহেন দেশে যখন পরিচিত ব্যক্তিদের নিয়ে এই হই চই শুরু হয় তখন অবাক হই। আখেরে কিন্তু তারা মূল পয়েন্টেই চলে যায়। ভাবখানা তখন হয়, এ আর এমন কী করেছে বাছা, এসব বাদ দাও। এটা হতেই পারে, সব ভুলে তার পিছেই দাঁড়াও।

মিডিয়া ঠিক এই ভাবনাটাকেই মূল উপজীব্য করে তুলে। সব ফেলে তার পিছনেই দৌড়ায়। সংবাদের গুরুত্বক্রম ভুলে, তার তথ্য আর জ্ঞানের অংশ বাদ দিয়ে বিনোদনটাকেই প্রধান করে তুলে। সংবাদপিয়াসীদের আফিম খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখার অবস্থা। পুঁজিবাদী সমাজে ধন সঞ্চয়ের অসুস্থ প্রতিযোগিতায় সামনে যাবার দৌড়ে মিডিয়াই বা বসে থাকবে কেন?

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 63
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    63
    Shares

লেখাটি ৫১৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.