রায়টা কী হয়েছে আগে তা বুঝুন

প্রবীর কুমার:

একটা রায় বোঝার জ্ঞান আমাদের নেই! অথচ আমরা টর্নেডোর গতিতে ট্রল করে ফেললাম! এক একজন ১-৭ টা পর্যন্ত স্ট্যাটাস লিখে ট্রল করলাম। আমার আসলেই ‘ট্রলার’ জাতি!

আমরা যদি কোনো বিষয়ে না বুঝি, কিংবা অস্পষ্ট ধারণা থাকে, তাহলে অপেক্ষা করতে পারি তা জানার জন্য। অন্তত একটি সিদ্ধান্তে আসার জন্য একাধিক নির্ভরযোগ্য সোর্সের দিকে তাকানো উচিত। মনে রাখতে হবে, দেশে এখন অজস্র ভুঁইফোড় পোর্টাল আর সংবাদ মাধ্যম। কোনো কিছু ভাইরাল বা ট্রল করাই এদের উদ্দেশ্য এবং প্রাপ্তি। আমাদের মতো হুজুগে মানুষগুলোকে এরা সহজেই নাচাতে পারে।

প্রবীর কুমার

পরকীয়ার যথেষ্ট কারণ থাকে, পরিবারে এর প্রভাব থাকে; এই বিষয় নিয়ে বা মানুষের জটিল মনস্তত্ত্ব নিয়ে যৌক্তিক আলোচনা-সমালোচনা হতে পারে, মতের মিল-অমিল থাকতে পারে। কিন্তু যা বলা হয়নি তা নিয়ে কী করে একটি জাতি এভাবে ট্রলে মেতে উঠতে পারে? এতে খুব স্পষ্ট করেই বোঝা যায়, আমাদের চিন্তা-মগজের সীমাবদ্ধতা কতখানি, আরও কতখানি তলিয়ে দেখার অভ্যাস করতে হবে আমাদের!

কী ছিলো ভারডিক্টে? এমন কোনো বাক্য ছিলো যাতে পরকীয়াকে বৈধতা দেওয়া হয়েছে?

না।

ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট পরকীয়ায় বৈধতা দেয়নি। একটা সেঁকেলে অনুপযোগী আইনকে সংস্কার করেছে মাত্র। ১৮৬০ সালে তৈরি ব্রিটিশদের তৈরি ৪৯৭ ধারা অনুযায়ী কোন ব্যক্তি যদি অন্য কোনো ব্যক্তির স্ত্রীর সঙ্গে তার অজ্ঞাতে বা অসম্মতিতে পরকীয়া করে, তবে তার পাঁচ বছর জেল এবং জরিমানা হতে পারে। এক্ষেত্রে মহিলাটির কোনো শাস্তি হবে না। এক্ষেত্রে একটি লিঙ্গ বৈষম্য দেখা যায়। এই আইনটিকে বন্ধ করা হয়েছে।

বিবিসির তথ্যমতে, পরকীয়া সম্পর্কে জড়ালে ১৫৮ বছরের পুরোনো ভারতীয় দণ্ডবিধির যে ধারায় একজন পুরুষ মানুষের জেল হওয়ার নিয়ম ছিল, তাকে অসাংবিধানিক বলে রায় দিয়েছে আদালত। বিচারপতিরা তাঁদের রায়ে বলেছেন, আইনের ওই ধারাটি পিতৃতান্ত্রিক সমাজের ফসল। নিজের শরীরের ওপরে একজন নারীর সম্পূর্ণ অধিকার রয়েছে – এবং এই প্রশ্নে কোনও আপোষ করা অনুচিত। আদালত জানিয়েছে, একজন স্বামী কখনই তাঁর স্ত্রীর মালিক বা প্রভু নন। নারী-পুরুষের সমানাধিকারের বিষয়টিকে আদালত অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে এই রায় দিতে গিয়ে।

আরও পরিস্কার করে বললে পরকীয়ায় সংসার জীবনে অশান্তি আসতে পারে। কিন্তু এটি কোনো অপরাধ নয়, যদি না এটি ৩০৬ ধারা অনুযায়ী আত্মহত্যায় প্ররোচনার প্রভাবক না হয়। এটি কোনো ফৌজদারি অপরাধ নয়। তাই ভারতীয় সংবিধানে যুক্ত ব্যভিচার ধারাটি অসাংবিধানিক বলে সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছে।

ছবিটা সংগৃহীত

এবার দেখুন-

* ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট বললো, ‘নারী পুরুষের অধীন নয়, নারীর শরীরের মালিক নারী নিজে’। অর্থাৎ এখানে নারীকে পূর্ণাঙ্গ মানুষের সম্মান দেওয়া হয়েছে।
আর আপনারা বললেন, ‘ভারত পরকীয়া বৈধ করে দিয়েছে’।

* ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট বললো, ‘পরকীয়ায় শাস্তি আগে শুধু পুরুষ পেতো, এটা গ্রহণযোগ্য নয়। এখানে একটা বৈষম্য থাকে’।
আপনারা বললেন, ‘ভারত পরকীয়া বৈধ করে দিয়েছে’।

* ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট বললো, ‘পরকীয়া রাষ্ট্রের সমস্যা নয়। এখানে রাষ্ট্র বা পুলিশের নাক গলানোর কিছু নেই। এটা ওই নারী ও পুরুষের ব্যক্তিগত বিষয়’।
আপনারা বললেন, ‘ভারত পরকীয়া বৈধ করে দিয়েছে’।

* ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট বললো, ‘শুধু পরকীয়ায় জড়িত নারীর স্বামীর অধিকার ছিলো আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার। কিন্তু জড়িত পুরুষের স্ত্রীর সেই অধিকার ছিলো না। এখন নিতে পারবে।
আপনারা বললেন, ‘ভারত পরকীয়া বৈধ করে দিয়েছে’।

* ভারতীয় সুপ্রিম কোর্ট বললো, ‘মানুষ কার সাথে সম্পর্ক বা যৌন সম্পর্ক করবে তা সমাজ ঠিক করে দিতে পারে না। এই ধারাটি স্বেচ্ছাচারিতার সমান’।
আপনারা বললেন,’ভারত পরকীয়া বৈধ করে দিয়েছে’।

আমরা সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে অনেক কিছু জানতে পারি, শিখতে পারি, দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন আনতে পারি। মানুষের ভাবনা আর তথ্য দিয়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করে চলেছি। তাই এমন গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যমে আমাদের আরো বেশি সচেতন হওয়া উচিত।

তাই আমাদের সকলেরই স্থির হয়ে এবং তলিয়ে ভাবার প্র্যাকটিস করা প্রয়োজন। সব বিষয় নিয়ে ফুটবল বিশ্বকাপের ‘আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল’ টাইপ ট্রল চলে না।

শেয়ার করুন:
  • 35.9K
  •  
  •  
  •  
  •  
    35.9K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.