ঠিকানা

0

ফাহমিদা খানম:

“তোমার মায়ের এতো স্মার্টনেস আমার ভালো লাগে না, বয়স হইছে এখনো বন্ধু-বান্ধব নিয়ে হৈ-হুল্লোড় করে বেড়ান”;
“আস্তে কথা বলো, মা শুনলে কষ্ট পাবেন সোনিয়া”;
“আমি সত্যি বলতে ভয় পাই না”;
“মায়ের খুঁত ধরা ভিন্ন অন্যকিছু কি তুমি পারো? বিয়ের আগে তো মাকে স্যালুট করতে”;

ডাইনিংয়ে পানি খেতে এসে ছেলে আর ছেলে বউয়ের কথোপকথন শুনে রুমে চলে গেলাম, তৃষা চলে গেছে। আমার ছেলের বউ বিয়ের আগে থেকেই আমায় চিনে। এই মেয়ে তখন স্যালুট দিয়েছিলো সিংগেল মাদার হয়ে দুই বাচ্চা নিয়ে ফাইট করেছি বলে, সময়ে সব বদলে গেছে। ঈর্ষার জন্ম নাকি অভাবে, আমার কিন্তু মনে হয় স্বভাবে। যে পরিবেশে মানুষ বড় হয় –সেই শিক্ষাই আসল শিক্ষা।

“সোনিয়া আমি বাইরে যাচ্ছি, ফিরতে দেরি হবে তোমরা খেয়ে নিও”;
“আপনার ছেলে ঘরে ঢুকেই আপনাকে খুঁজবে, আপনি না আসা পর্যন্ত না খেয়েই বসে থাকবে”;
“ওকে বলো বিয়ের পর মাকে খুঁজতে নেই, বউদের সময় দিতে হয়”;

ইচ্ছে করেই কথাটা বললাম। অফিস ফেরত ছেলে ঘরে ঢুকেই মাকে ডাকে, মায়ের রুমে আসে—সোনিয়ার পছন্দ হয় না। গাধা ছেলে বোঝে না, নাস্তা দিলে হাতে নাস্তা নিয়ে মায়ের সাথে খাওয়ার জন্য রুমে চলে আসে, বউকেও ডাকে। ব্যস্ততা দেখিয়ে বউ আসে না, রান্নাঘরের ঝনঝন শব্দে আমি সব বুঝি। বেকুব ছেলেই শুধু বউয়ের উষ্মা বোঝে না নাকি ইচ্ছে করেই এমন করে?

দুই ছেলেই মা ন্যাওটা, আমিই ওদের বাবা, আমিই মা, তাই আমার সাথেই ওদের যতো আবদার আর গল্প। সোনিয়া এসব পছন্দ করে না হয়তো, স্বামীকে চায় ষোল আনা, কিন্তু আরমান অবুঝ। কোথাও ঘুরতে বের হলেই বেকুবের মতো বলে বসে —“মা, একা বাসায় থেকে কী করবে? তুমিও চলো আমাদের সাথে”;
“নারে বাবা তোরা দুইজন যা, আমি এখন বের হবো না”;
“”প্লিজ মা তোমাকে বাসায় একা রেখে যেতে ইচ্ছে করে না”;
“”একটু পর জি-সিনেমায় আমার প্রিয় মুভি দেখাবে, তুই আর সোনিয়া যা”;
“উঁহু তোমাকে যেতেই হবে মা, প্লিজ মা প্লিজ”।

আগে বুঝতাম না, ছেলের আবদারে যেতাম। সোনিয়ার চোখের ভাষা বোঝার পর আর যেতে ইচ্ছে হয় না। আমিও আজকাল অজুহাত খুঁজে বেড়াই, আর আগে থেকে টের পেলে বন্ধুদের বাসায় চলে যাই। আমার জন্য ওদের রিলেশন খারাপ হোক আমি চাই না। ছেলে বিয়ের পরেও বেতনের টাকা মায়ের হাতেই দেয়। সোনিয়া মুখে কিছু না বললেও আমি বুঝি। মেয়ে হয়ে মেয়েদের চিনতে কারও ভূল হয় না।
“আরমান আমাকে ছুটি দে, সংসারের খরচ সোনিয়াকে দিবি। আমি আর সংসার দেখবো না”;
“ঠিক আছে সংসার আমরা দুইজনেই দেখবো, টাকা তোমার কাছেই থাকবে, যার যখন দরকার তোমার কাছ থেকেই নিবো”;
আমি বলি কী, আর আমার সারিন্দা বাজায় কী!

পিঠাপিঠি দুই ছেলে আরমান আর অর্ণব। ওরা ছোট থাকতেই খবর পেলাম ওদের বাবা ফয়সাল আবারও বিবাহ করেছে, বিশ্বাস করিনি। আসলে ফয়সালকে আমি চিনতেই পারিনি। অফিসের এক বিধবা সহকর্মীর সাথে অবৈধ রিলেশনে জড়িয়ে পড়ে এই বিয়ে। তীব্র ঘৃণা আর অভিমানে দুই বাচ্চা নিয়ে এক বান্ধবীর বাসায় চলে গেলাম। ওরা এক কিন্ডারগার্টেনে চাকুরি জুটিয়ে দিলো, এক রুমের বাসা নিয়ে আমার নতুন জীবন শুরু করলাম। সবাই বলেছিল কেস করে ফয়সালকে জেলের ভাত খাওয়াও। ভয়াবহ দিন পার করেছি, তবুও ফয়সালের মুখ দেখিনি — দুই ছেলেই মায়ের যুদ্ধরূপ দেখেছে। তারপর একটা হাই স্কুলে চাকুরির ব্যবস্থাও বন্ধুরাই করেছিল। মাঝে-মধ্যে সবাই একত্রিত হই।

“মা কেন পর্দাপুষিদা করেন না?”
“মাকে সারাজীবন আমরা এভাবেই দেখে এসছি, উনি উনার মতো”;
“একেক বয়সের একেক ধর্ম, এই বয়সে মানুষ বদলায়”;
“প্রতিটি মানুষের চিন্তার জগত আলাদা”;
“আমার মা এমন নয়, উনার কাছে সংসার সবকিছু”;
“মা সারাজীবন খেটেছেন, এখন যা করে আনন্দ পাবেন তাই করবেন”;
“তুমি ছেলেমানুষ, অনেককিছু বোঝো না”;
“মা বিষয়ে আমি কিছুই শুনতে চাই না, তোমার মানসিকতা বুঝতে বাকি নেই আমার”।
পাশের রুম থেকে আমি সবই শুনলাম। হায় মেয়ে নেই বলে সোনিয়াকে মেয়েই ভাবছিলাম আর ও আমাকে এই চোখে দেখে!

মা হয়ে নিজের ছেলের অশান্তির কারণ হলাম! ছোট ছেলে অর্ণব মালয়েশিয়া পড়ে, ওকেও কিচ্ছুই বলতে পারছি না। গত এক বছরে আমি কতো কী দেখেছি আর শুনেছি!

“আপনি বড় ভাগ্যবতী বেয়াইন, ছেলেরা আপনাকে ছাড়া কিছুই বোঝে না, আমাদেরগুলা বউয়ের কথায় উঠে আর বসে”
খোঁচাটা আমি বুঝি। মেয়ে বাসায় গিয়ে বলে বলেই তো মা এসব শোনায়।

গত এক বছরে আমি অনেক পরিণত হয়েছি, কাউকে দোষ দেই না। সোনিয়া আরমানের মা প্রীতি পছন্দ করে না। সে চায় স্বামী তার কথামতো চলুক, আইনের দাবি তার।

সেদিন আরমান হঠাৎ বলে বসলো —“মা, মেহমানদারী কমাও, সোনিয়া একা সামলাতে পারে না”।
ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে খুব মায়া লাগলো, সত্যিটা জানলে আবারও অশান্তি শুরু হবে দুজনের মাঝে। খালাতো বোন ডাক্তার দেখাতে এসেছিলো, সোনিয়ার কষ্ট হবে বলে রান্নাবান্না নিজেই করেছি। আমি আবারও কঠিন হলাম। অনেকদিন আগে গ্রাম্য এক দাদী বলেছিলেন ——“নাতিন, মেয়েগো ভালবাসা সারাজীবন একই থাকে, ছেলেদের ভালবাসা টের পাবি ছেলেদের বিয়ার পর, ছেলে তখন আর মায়ের উপর নির্ভরশীল থাকে না”।

জীবনে অনেক ধাক্কা খেয়েছি, ঠেকে আর ঠকেই অনেককিছু শিখেছি। আগামী মাসে অর্ণব দেশে ফিরলেই আরমান আর সোনিয়াকে আলাদা হয়ে যেতে বলবো। দূরে থেকে যদি সম্পর্ক ভালো থাকে, সেটাই ভালো। হয়তো ছেলে মনে কষ্ট পাবে, তবে দিনের পর দিন তিক্ততা বাড়বেই। বোকা মেয়ে এটুকু বুঝলো না, একদিন সেও মা হবে। মায়ের কাছ থেকে সন্তান কেড়ে নেবার কষ্ট তাকেও পেতে হবে —সময়ের বিচার এটা।

আজকের দুনিয়াটাই হয়ে গেছে আমি, তুমিময়। মহীয়সীরা বিয়ে করেই স্বামীর উপরে একচ্ছত্র অধিকার চায় — আইনের দাবি তাদের!
আচ্ছা অর্ণবের বউও যদি আমায় সহ্য করতে না পারে! হয়তো আমাদের জন্যই নচিকেতা গেয়েছে —
“ছেলের আমার, আমার প্রতি অগাধ সম্ভ্রম
আমার ঠিকানা তাই বৃদ্ধাশ্রম ”
ঠিকানাহীনদের ঠিকানা।

২৮/৯/১৮

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 347
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    347
    Shares

লেখাটি ৩,২৭৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.