সত্যিকারের ‘মা’

0

তাসলিমা শাম্মী:

“তোমার জানাশুনা কেউ যদি মা হতে চায় আমাদের গল্পটা বইলো। গর্ভধারিণী হতে চাইলে না, মা হতে চাইলে। বুঝছো? আমার নাম্বারটা রাখো। বাসায় আসো একদিন সময় করে, গল্প হবে অনেক। কর্ণফুলী নদীর ওপাড়ে যেখান থেকে সবুজের শুরু, কয়েক মিনিট গেলেই আমাদের বাড়িটা। একদম রাস্তার পাশেই, সড়ক থেকে দেখা যায়”।

একজন সত্যিকারের মায়ের সাথে কথা হচ্ছিল। “সত্যিকারের মা” আবার কী! সেই গল্পটাই শুনতে আমার ভীষণ ইচ্ছে করছিল উনার নিজের মুখে। তাই এক ছুটির দিনের বিকেলে আমি শহরের বিচ্ছিরি রকমের কোলাহল আর কালো ধোঁয়া পার হয়ে কর্ণফুলী ব্রিজটার ওপাশে সবুজে মোড়ানো ধান ক্ষেতের মাঝখানটায় দাঁড়িয়ে থাকা একতলা বাড়িটায় গিয়ে কড়া নাড়লাম।

“আমি তো শুধু মা হতে চেয়েছিলাম। খুব সাধারণ আর দশজন মেয়ের মতোই মাতৃত্বের অনুভূতির স্বাদ পেতে চেয়েছিলাম। বান্ধবী আর কলিগদের দেখে দেখে আমার খুব ইচ্ছে করতো “আমি মা হতে চলেছি” শব্দটি অনুভব করতে। তারপর থেকে প্রতিটা দিন, প্রতিটা সপ্তাহ গুনে গুনে নিজের ভিতরে আরেকটা প্রাণের অস্তিত্ব অনুভব করতে, সুখ সুখ সেই অসুখটাকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে নয় মাস ধরে উপভোগ করতে চেয়েছিলাম। নয় মাস পর একদিন মৃত্যু যন্ত্রণার খুব কাছাকাছি গিয়ে স্বর্গীয় সুখ নিয়ে তীব্র চিৎকারে আকাশ-বাতাস ফাটিয়ে জন্ম দিতে চেয়েছিলাম আমার ভিতরের ছোট্ট আরেকটা ‘আমি’কে। তারপর তো অবাক হবার পালা আমার, কীভাবে আমার রক্ত মাংস দিয়ে আমারই ভিতরে গড়ে উঠা সেই ‘আমিটা’ ভিন্ন এক নিজস্ব সত্ত্বা নিয়ে সম্পূর্ণ একজন মানুষ হয়ে উঠছে, আমি সেটা অবাক হয়ে হয়ে দেখবো!

কিন্তু না। সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছে ছিল অন্যরকম। দীর্ঘ দশ বছর ধরে ছোটাছুটি করার পর এই দেশের এবং পার্শ্ববর্তি দেশের নামকরা সব স্পেশালিস্টরা যখন আমাকে আর আমার স্বামী মাসুমকে গম্ভীর মুখে কনফার্ম করে দিল যে আমি আর কোনদিনই মা হতে পারবো না, তখন আমার মনে হয়েছিল এই পৃথিবীতে থেকেই বা আর লাভ কী, যদি নিজের নিজস্ব কিছু পৃথিবীটাকে দিয়ে যেতে না পারি!

সেদিন যখন আমি আমার মাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলাম, তখন মা আমাকে সান্ত্বনা দিতে দিতে বলেছিল, “গর্ভধারিণী হওয়া কিন্তু সহজ, মা হবার চেয়ে! গর্ভধারিণী অনেকে ইচ্ছে করলেই হতে পারে, কিন্তু মা সবাই হতে পারে না রে”।
আমি মায়ের কথার ইঙ্গিতটা ধরতে ঠিকই পেরেছিলাম সেদিন। খুব রাগ হয়েছিল মা’র উপর আমার। মাকে আমার হিংসা হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল, আমার মা তো অনুভব করতে ঠিকই পেরেছিল সেই স্বর্গীয় অনুভূতিটুকু, তাই আমার মনের ব্যথা কীভাবে বুঝবে?

আমার সেই শূন্যতার দিনগুলোতে আমার স্বামী মাসুম ছিল নির্বিকার! সন্তান নাই বলে যে মানুষের একটা দুঃখ থাকতে পারে, সেই জিনিসটা মাসুমের জানা ছিল না! শুধু আমিই একা কেঁদে মরতাম। শুধু মাসুম না, ওর মা, ভাই, বোন কারোরই কোন মাথাব্যথা ছিল না আমার এসব ছোটাছুটি আর কান্নাকাটি নিয়ে।

আমি এর ওর কাছ থেকে তথ্য যোগাড় করে করে দেশ বিদেশের ডাক্তার খুঁজে বের করছি, এই টেস্ট সেই টেস্ট করছি, অলিগলি খুঁজে ঝাড়ফুঁক করা পানি এনে খাচ্ছি, কিন্তু আমার শ্বশুর বাড়ির একটা মানুষও আমাকে বাঁধা না দিলেও এসব ব্যাপারে কোন ধরনের আগ্রহ দেখায়নি।

আমার স্কুল টিচার শাশুড়ি বরং বিভিন্নভাবে আমাকে বুঝাতে চাইতেন, এটাকে তেমন সিরিয়াসভাবে নেবার কিছু নাই। কী আশ্চর্য! মা হতে না পারাটা সিরিয়াস কিছু না! আমার দেবর পিয়াল দেশি-বিদেশি প্রচুর পুরষ্কার পাওয়া একজন মেধাবী ফটোগ্রাফার, সে আমাকে এই ব্যাপারটা নিয়ে বিচ্ছিরি রকমের ক্ষ্যাপাতো! একমাত্র ননদ রিমি, যাকে আমি বোনের মতো আদর করি, সে আমার কান্না দেখে বলতো, আমি নাকি দুঃখ বিলাস করতে ভালবাসি। অসহ্য লাগতো আমার এই পুরা পরিবারটাকে।

এমনিতেই বিয়ের পর থেকে আমি অনেক ধরনের অস্বাভাবিক ব্যাপার লক্ষ্য করতাম এই বাড়িতে। ষোল বছর আগে আমার বিয়ের পরপর একদিন মা মানে আমার শাশুড়িকে চুপিচুপি বলেছিলাম, “মা, আমার পিয়ালকে কেমন জানি অন্যরকম লাগে”।
মা একদম স্বাভাবিকভাবেই জবাব দিল, ‘অন্যরকম কেন লাগবে বৌমা! সেও তোমার আমার মতো মানুষ’। আমি মাকে জোর দিয়ে বুঝাতে চাইলাম যে পিয়াল আমার উনার মতো বা মাসুমের মতো নরমাল নয়। মা আমার কথা পাত্তাই দিলেন না। খুব স্বাভাবিকভাবে আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বললেন, ‘তুমি নরমাল তো? আমারতো মনে হয় তোমারই মন নরমাল না’।
কী অপমান! সেদিনের পর থেকে আমি পিয়ালকে নিয়ে কোনধরনের কথা বলা বাদ দিয়েছিলাম। তারপর আসি রিমির কথায়। রিমি, আমার একমাত্র ননদ। খুব মেধাবী ছাত্রী। একদিন অবাক হয়ে লক্ষ্য করলাম, রিমির ডান কানের লতিতে একটা গভীর ক্ষত। আমি চুল বেঁধে দিতে দিতে রিমিকে জিজ্ঞেস করলাম, “রিমি, তোর কান কে খাইছে রে”? রিমি হাত নেড়ে গল্প বলার মতো করে আমাকে বলে, ‘ভাবী জানো! আমার জন্মের পর আমাকে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দেয়া হয়, তখন কাক এসে মাংসের টুকরা মনে করে ঠুকরে আমার কান খেয়ে ফেলে’!

কী অসভ্যরে বাবা! শাঁকচুন্নি একটা! আমি মনে মনে ভাবলাম। বেয়াদবের পরিবার। ধুর! আর কোনো আগ্রহ নাই এদের নিয়ে আমার, আমি মরছি আমার চিন্তায় তখন। একটা বাচ্চার জন্য আমার মনে-প্রাণে তখন মরুভূমির হাহাকার।
দীর্ঘ দশবছর ধরে চিকিৎসা করার পর যেদিন আমি আর মাসুম ভারতের বিখ্যাত এক ডাক্তারের কাছ থেকে নিরাশ হয়ে দেশে ফিরে আসলাম, ঘরের সবাই সেদিন আমাকে কাউন্সিলিং করা শুরু করলো। আমার তখন দুনিয়াদারি অসহ্য লাগছিল। চোখের সামনে আমাকে সহানুভূতি দেখানো মানুষগুলোকে অমানুষের মতোই লাগছিল। ততদিনে পিয়াল দেশের অনেক নামকরা একজন ফটোগ্রাফার, রিমি ইউনিভার্সিটিতে পড়ায়, মা রিটায়ার্ড করে একটা এনজিওতে সময় দিচ্ছিল।

সেদিন আমি শোবার ঘরের বাতি নিভিয়ে অন্ধকারে কাঁদছিলাম। মাসুমকে বলছিলাম, “মাসুম, আমি কি আল্লাহর কাছে বেশি কিছু চেয়েছিলাম? একটা বাচ্চাই তো চেয়েছিলাম! মা হতে চেয়েছিলাম”। আমি আঝোরে কাঁদছিলাম।

মাসুম আমাকে মাথায় হাত বুলিয়ে বলেছিল, ‘তোমাকে আজকে এমন একজনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিব, যাকে গর্ভবতী হতে না পারার অপরাধে বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু উনি আজকে একজন সত্যিকারের মা, তিন তিনজন সফল সন্তানের গর্বিত মা’। আমি অবাক হয়েছিলাম, মাসুম কি শোকে দু:খে পাগল হয়ে গেল নাকি! কী বলে এসব!
আমাকে হাত ধরে টেনে মাসুম বসার ঘরে আনলো। ঘরের সবাই তখন সেখানে বসে টিভি দেখছিল। আমি তখন অন্য কাউকে খুঁজছিলাম। মাসুম আমার শাশুড়ি মাকে দেখিয়ে দিয়ে বললো, দেখো, উনিই সেই মা।

মাসুম সবার সামনেই আমাকে বলা শুরু করলো,’খুব ছোটবেলায় আমার মা-বাবা এক্সিডেন্টে মারা যাবার পর আমি চাচা-চাচীর কাছে অযত্নে-অবহেলায় বড় হতে থাকি, আমার এই মাকে তখন উনার স্বামী ত্যাগ করেছেন। মা উনার বাবার দেয়া এই বাড়িটায় উনার বৃদ্ধ মাকে নিয়ে থাকেন, আর একটা স্কুলে চাকরি করেন। আমাকে মা দত্তক নিয়ে আমার মা হলেন। আমার বয়স যখন পাঁচ, একদিন মা খবর পেলেন এক পরিবার তাদের সদ্য জন্ম নেয়া একটা বাচ্চাকে হাসপাতালে ফেলে চলে গেছে, কারণ বাচ্চাটা তৃতীয় লিঙ্গের হয়ে জন্মেছে। আমার মা সেদিন সেই বাচ্চার মা হয়ে তাকে বাসায় নিয়ে আসলেন, বাচ্চাটার কী অপরাধ ছিল বলো? তারপর এক শীতের ভোরে বাসের জন্য অপেক্ষা করার সময়ে ডাস্টবিনের ময়লার ভিতরে একজন মানবশিশুর কান্না শুনতে পেয়ে মা তাকেও বুকে টেনে নেয়। সেদিন কাক ফেলে দেয়া রক্তমাখা নবজাতকটার কান ঠুকরে খাওয়া শুরু করে দিয়েছিল। তুমি নিশ্চয় সবই বুঝতে পারছো! পুরো গল্পটাই এখন তোমার চোখের সামনে’।

সেদিন থেকে আমার নতুন করে জন্ম হলো। আমি চোখ ভরা অপরাধবোধ নিয়ে ওদের দিকে তাকাতে পারছিলাম না। আমার চোখ থেকে টপটপ করে পানি পড়ছিল। রিমি শয়তানটা চিমটা দিয়ে বলছিল,” ইশ! কী ঢং! আমি কি মিথ্যে গল্প বলেছিলাম”? আমি মাকে জড়িয়ে ধরেছিলাম প্রচণ্ড অপরাধবোধ নিয়ে! এমন একজন মা কীভাবে আমার চোখে পড়লো না এতোগুলো বছর! আমি কাঁদতে কাঁদতে অপূর্ব সুন্দর এই পরিবারটাকে মাথা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছি। ফটোগ্রাফারটা তখন আমার বোকার মতোন কাঁদার ছবি তুলছিল একটার পর একটা।

আমি এখন দুই-দুইটা বাচ্চার মা। এতো ব্যস্ত থাকি ওদের নিয়ে আর বইলো না। তোমার চেনাজানা যদি কেউ আমার মতো মা হতে চায় তাদেরকে আমাদের গল্পটা বইলো। বলবা যে, “গর্ভধারণ অনেকেই করতে পারে, সত্যিকারের মা হতে সবাই পারে না। সন্তানহীন মানুষ যেমন আছে এই পৃথিবীতে, মা-বাবাহীন অসংখ্য সন্তানও রয়েছে আমাদের আশেপাশে। তাদের মা-বাবা হতে পারাটা আরও আনন্দের, আরও তৃপ্তির। সৃষ্টিকর্তা নিশ্চয় ব্যালেন্স করার জন্যই এই ব্যবস্থা করে রেখেছেন”!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.3K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.3K
    Shares

লেখাটি ৬,১০৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.