বডি শেমিং কেন? বাহ্যিক সৌন্দর্যই বা কেন গুরুত্বপূর্ণ?

ডা. সামারা তিন্নি:

বেশ কয়েকদিন আগের কথা, আমার এক বড়বোন তার ছোট বাচ্চার সাথে নিজের একটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেছেন। তার ফ্রেন্ডলিস্টের একজন এসে সর্বসম্মুখে একলাইনের কমেন্ট করলো, ‘ভাবী আপনি অনেক মোটা’। বোন অনেক সহনশীল বিধায় হাসিমুখেই মেনে নিলো, কিন্তু আমার রাগে পা থেকে মাথা পর্যন্ত জ্বলে গেলো। চুপ করে থাকলাম এই ভেবে যে হয়তো সে অনেক কাছের কোনো মানুষ হবে, পরে শুনলাম সে এক পরিচিত মাত্র।

ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে দেখলাম আবার সম্প্রতি। এক ছোটবোন সুন্দর এক ছবি পোস্ট করেছে, সবাই মোটামোটি একমত যে ছবিটি বেশ চমৎকার। বেরসিক একজন কমেন্ট করলো যে তার জিমে গমন করা অত্যন্ত প্রয়োজন, নচেৎ ছবি ভালো না আসার সম্ভাবনা। সাথে তাল মিলিয়ে এলো আরেকজন। এখন তাদের কাছে মনে হতেই পারে যে তারা সমাজ সেবা করছে, কিন্তু প্রকাশ্যে তারা যেটা করছে, সেটার একটা নাম আছে – Body Shaming বা শরীর নিয়ে অসম্মানজনক মন্তব্য।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে কী এই বডি শেমিং, বা তা করলেই বা সমস্যা কী? সংজ্ঞা অনুযায়ী আপনি যদি কারও শরীরের আকার, আয়তন বা ওজন নিয়ে প্রকাশ্যে এমন কোনো সমালোচনা বা মন্তব্য করেন যাতে সেই মানুষটি লজ্জাবোধ করে বা অপমানিত হয়, তবে তা বডি শেমিং। সবচেয়ে সাধারণ উদাহরণ হচ্ছে, মোটকা, শুঁটকা, বাটকু ইত্যাদি নামে মানুষকে ডাকা। তবে আরও ভয়াবহ উদাহরণ হচ্ছে, “এই দাঁতাল, তোর দিকে কোন মেয়ে তাকাবে রে?” বা “সুমো পালোয়ানও তো তোকে দেখে লজ্জা পায়, সারাজীবন তুই তোর বাপের কাঁধের বোঝা হয়ে থাকবি”। ভয়াবহ উদাহরণগুলিই কমন বেশি, মানুষজন এতো অবলীলায় বলে যে মনে হয় সামনের জন বুঝি রোবট – অনুভূতিশূন্য।

শুভানুধ্যায়ী কেউ কেউ হয়তো ভুরু কুঁচকাবে, “আরে আমি তো ওর ভালোর জন্যই বলি। বললেই তো সে শুকানোর জন্য চেষ্টা করবে”। ভুল, একেবারেই ভুল। ইউনিভার্সিটি কলেজ লন্ডনের ক্যানসার রিসার্চ টিম এই প্রশ্ন নিয়ে গবেষণা করে বের করেছে, ফ্যাট শেমিং কোনো উপকার তো করেই না, উল্টে ওজন বাড়িয়ে স্থুলতার (Obesity) দিকে ঠেলে দেয়। অপমানজনক কথা শোনার জন্য মানুষ অবসাদগ্রস্থ (Depression) হয়ে খাবারের মাঝে সান্ত্বনা খোঁজে (comfort food) এবং পরিণামে ওজন বেড়ে চলে।

বডি শেমিং এর আরেকটা ভয়াবহ ফলাফল হলো আত্মবিশ্বাসহীনতা। প্রতিনিয়ত নেগেটিভ মন্তব্য শুনতে শুনতে একপর্যায়ে মানুষ সেটাই বিশ্বাস করা শুরু করে এবং ফলাফল হচ্ছে ডিপ্রেশন, অ্যানোরেক্সিয়া, বুলেমিয়া নার্ভোসার মতো মানসিক ব্যাধি, যার সাথে আসে পুষ্টিহীনতা সংশ্লিষ্ট আরও অনেক অসুখ। কেউ কেউ ড্রাগস বা গাঁজা খাওয়া শুরু করে শুধুমাত্র শুকানোর জন্য, কিন্তু আর ফেরত না আসতে পেরে নিজের, পরিবারের তথা সমাজের জীবন ধ্বংস করে দেয়। যথাযথ নির্দেশনা (indication) না থাকার পরেও বেড়ে চলেছে লাইপোসাকশন, গ্যাস্ট্রিক ক্লিপিং (পাকস্থলিতে ক্লিপ দিয়ে তার আয়তন ছোট করা) এর মতো অপারেশন, যার বেশিরভাগই হয় রোগীদের চাপাচাপিতে।

বডি শেমিং নিয়ে আরও কথায় যাবার আগে একটা জ্বলন্ত প্রশ্ন, যেটি মানবজন্মের শুরু থেকে জ্বলছে, সেটি নিয়ে কথা বলা যাক।

বাহ্যিক সৌন্দর্য আসলে কতোটা গুরুত্বপূর্ণ? এখনকার জমানায় অনেক প্রগতিশীল নর -নারী পাত্র বা পাত্রী দেখতে যাবার সময় বলে থাকেন বটে যে বাহ্যিক সৌন্দর্য আসলে কোনো বিষয়ই না, মনটাই আসল। তারপরে যাকে দেখতে যান, তাকে নাকচ করে দেন ‘মানসিকতায় মিলবে না’ এমন ওজর দেখিয়ে। তবে ঘনিষ্ঠ বন্ধুর কাছে এক সময়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্বীকার করে বসেন যে যাকে দেখতে গিয়েছেন, তার চেহারাটি ভালো লাগেনি।

কাউকে যদি ভালো না লাগে তবে এতে আমি কোনো অপরাধ দেখি না। মানুষ বৈচিত্রশীল, ব্যক্তিগত পছন্দের কোনো মাপকাঠি নেই। ধরুন যে চক্ষুযুগলকে আপনার কাছে ক্রোধান্বিত মনে হয়েছে, সে দুইটি চোখই অন্যের কাছে মনে হবে বিষাদগ্রস্থ। তবে সমস্যা তখনই শুরু হয় যখন আপনি আপনার পছন্দকে অন্যের উপরে চাপিয়ে দেবার চেষ্টা করেন। অর্থাৎ আপনি সেই পাত্র বা পাত্রীকে বিয়ে তো করলেন বটে পরিবারের মান রাখতে অথবা তার টাকা কিংবা মাস্টার্স ডিগ্রী দেখে, কিন্তু তাকে আপনার মনের মতো করে গড়ে তুলতে দিনরাতে তাকে খোঁটা দেয়া শুরু করলেন। বাহ্যিক সৌন্দর্য অবশ্যই হেলা ফেলার বিষয় না, কিন্তু সেটিকে পেতে যদি আপনার অন্তর কলুষিত করতে হয়, তবে সে সৌন্দর্য থেকে দূরে থাকাই উত্তম।

আপনি যদি ভেবে থকেন যে আপনার এরকম আচরণে আপনার জীবনসঙ্গী অথবা সঙ্গিনী ছাড়া আর কারো ওপর প্রভাব পড়ছে না, তবে আপনি চোখে ঠুলি বেঁধে চলাচল করছেন। প্রতিটি মানুষ সমাজের আরও অসংখ্য মানুষের সাথে জড়িত। আপনি একজনকে মানসিক আঘাতে জর্জরিত করা মানে আপনার পরবর্তী প্রজন্মকেও আত্মবিশ্বাসহীনতায় ঠেলে দেয়া, কারণ সে আপনার কাছ থেকেই জীবনের সংজ্ঞা শিখবে।

উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় প্লাস্টিক সার্জারির কথা। এই সার্জারির জনক ভারতীয় সার্জন শুশ্রুতা যখন ৬০০-১০০০ বিসি যুগে সর্বপ্রথম রাইনোপ্লাস্টি (নাকের পুনর্গঠন) শুরু করেন, তখন তার মূল উদ্দেশ্য ছিল সেইসব দুর্ভাগাদের উপকার করা যারা কোনো কারণে তাদের নাক হারিয়েছে ( সে যুগে সাধারণত চুরি বা ব্যভিচারের শাস্তি স্বরূপ নাক কেটে দেয়া হতো)। সে যদি ঘুণাক্ষরেও টের পেতো যে তার আবিষ্কৃত কৌশলের উন্নতি সাধন করে এখন হাজার হাজার সুস্থ সবল নাক সার্জনের টেবিলে স্বেচ্ছায় কাটাছেঁড়া হবার জন্য যাচ্ছে, আমার ধারণা সে তার ছাত্রদের এই স্কিল শেখানোর আগে দুইবার ভাবতো।

২০১৬ এর এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী (www.statista.com) সে বছর আমেরিকাতে প্রায় ৪২ লাখ মানুষ কসমেটিক সার্জারি করিয়েছে এবং এর মাঝে বেশ জনপ্রিয় হচ্ছে ব্রেস্ট এনহ্যান্সমেন্ট সার্জারি। কেউ যদি বলে এই বিপুলসংখ্যক মানুষ প্রত্যেকে শারীরিকভাবে অসুস্থ ছিল বলে ব্রেস্ট সার্জারি করিয়েছে, এমন কথা পাগলেও বিশ্বাস করবে না, পরিসংখ্যান তো নয়ই।

একটি ভিডিও দেখে জানলাম, ভিয়েতনামে মায়েরা তাদের মেয়েদের জন্মদিনে প্রায়শই প্লাস্টিক সার্জারি উপহার দেন, কল্পনা করতে পারেন? ২০১৩ সালের একটি রিপোর্ট অনুযায়ী ইউটিউবে সবচেয়ে বেশি যে ভিডিও আপলোড হয়, সেটি হচ্ছে “am I pretty or ugly” এবং এগুলো আপলোড করেছে ৯-১৮ বছর বয়সী বাচ্চারা। কেমন হবে যদি অন্যের সম্পর্কে করা আপনার কমেন্টগুলো আপনার আদরের সন্তানটি শুনে সে নিজেও দ্বিধাগ্রস্থ হয়ে অপরিচিত মানুষের কাছে নিজের চেহারার ভ্যালিডেশন চায়? এখনো কি বলবেন যে আপনার করা নেতিবাচক মন্তব্যে কারো কোন ক্ষতি হবে না?

আবার মূল প্রসঙ্গে ফিরি। এই বডি শেমিং কারা করে? আমার মনে হয় করে তিন ধরনের মানুষ।
১। অসম্ভব হীনমন্যতায় ভোগা মানুষ, যারা আরেকজনের মনে আঘাত দিয়ে শান্তি লাভ করে (সাধারণত বডি শেমিং এর ভিকটিম)
২। অবুঝ মানুষ, যারা একটা কথা বলার পরে তার কি ফলাফল হতে পারে তা বুঝতে অক্ষম অথবা অরাজি।
৩। সত্যিকারের খারাপ মানুষ, যারা কোন কারণ ছাড়া মানুষের মনে কষ্ট দিতে ভালোবাসে।

আমরা বেশিরভাগ মানুষ দুই নাম্বার গোত্রে পড়ি, একটা কথা বলার পরে সেটার পরিণতি নিয়ে কোন মাথাব্যথা নেই। কিন্তু কথার প্রভাবে কতদূর কী হতে পারে সে বিষয়ে নিক ভুজিসিকের একটা কথা আমি সবসময় বলি। সেটা বলার আগে নিক ভুজিসিকের সাথে একটু পরিচয় করিয়ে দেই। শারীরিক প্রতিবন্ধী নিক একজন মোটিভেশনাল স্পিকার এবং লেখক, যার জন্ম অস্ট্রেলিয়ায়। দুর্ভাগ্যবশত নিকের জন্ম হয় হাত এবং পা ছাড়াই, খুবই দুর্লভ একটি জন্মগত ত্রুটি, যার নাম Tetra-amelia syndrome। যেখানে হাত-পা সহ মানুষ প্রতিনিয়ত তীর্যক মন্তব্যের সম্মুখীন হয়, সেখানে বাল্যকাল থেকে নিকের কী অবস্থা হয়েছিল সেটা না বললেও চলে। মাত্র দশ বছর বয়সেই সে একবার আত্মহত্যার চেষ্টা চালায়।

যা হোক, সে বলেছিল, “কেউ যখন শারীরিক কোন বিষয় নিয়ে তীর্যক মন্তব্যের শিকার হয়, সে এক পা এক পা করে খাদের দিকে এগিয়ে যায়। খাদের এপারে জীবন, ওপারে আত্মহত্যা। তুমি হয়তো ভাবছো যে তোমার একটা টিটকারিতে কিইবা এসে যাবে! কিন্তু যাকে বলছো হয়তো সে অনেকের টিটকারি শুনতে শুনতে খাদের কিনারাতেই দাঁড়িয়ে ছিল, তোমার একটি তুচ্ছ মন্তব্যের জন্যেই সে হয়তো আজ রাতে খাদের ওপাশে লাফিয়ে পড়বে। তুমি জানলেও না যে পরোক্ষভাবে তুমি একটি জীবন শেষ হয়ে যাবার জন্য দায়ী হলে।”

ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা করলে কেমন শোনায় ব্যাপারটা?

কিন্তু তাই বলে কি আমরা দুষ্টুমি করবো না? বন্ধুকে তো আমরা কত কিছুই বলি, এসব কি আর কেউ মন থেকে বলে নাকি? না, আসলে সব কিছু আমরা মন থেকে বলি না। কিন্তু বাসা বা বাইরে বন্ধুদের আড্ডায় বলা এক জিনিস, আর ফেসবুকে বাজে ভাবে কমেন্ট করা আরেক। কেন? কারণ ফেসবুক পাবলিক। আপনি যে মন্তব্যটি করবেন সেটি আপনার বন্ধু যেমন দেখবে, বন্ধুর বড় ভাইবোন বা তার বাবা-মা পর্যন্ত দেখতে পারে। আপনার মন্তব্য যে বন্ধুসুলভ তা যদি পড়ে বোঝা না যায়, তবে আপনি তার পরিবারসহ সকলকেই কষ্ট দিলেন। আমার যে বড়বোনের ছবিতে আপনি রূঢ় মন্তব্য করে ভাবলেন কাহিনী শেষ – আমার জন্য কিন্তু শেষ হলো না। সে আমার বোন, আমি জানি তার ইতিহাস। আপনি জানেন না।

তবে কি কিছু বলতেই পারবো না? এমন যদি হয় যে সে আমার আপনজন, আর আমি তার ভুল না ধরলে কেউ ধরবে না? অথবা সে এমন ছবি দিয়েছে যা দেখতে দশজনের চোখে খারাপ লাগছে? সমাধান তো ফেসবুক দিয়েই রেখেছে, ইনবক্স করুন। ব্যক্তিগত মেসেজে তাকে জানান আপনার উপদেশ। সেও তার ভুল বুঝলো, দশজনের সামনে অপমানিতও হলো না, আর আপনিও আপনার কর্তব্য করলেন।

কিছু মানুষ প্রশ্ন রাখে যে, যদি আপনজন না হয়, তবে? সেক্ষেত্রে আমি আপনার কাছে প্রশ্ন রাখবো, আপনি যে অপরিচিত মানুষটির অদ্ভুত সাজপোশাকের ছবির সাথে আজে বাজে মন্তব্য জুড়ে সবাইকে দেখিয়ে বেড়াচ্ছেন, এতে কার কী উপকার হচ্ছে? আপনি শেয়ার দেয়ার আগে ছবিটি হয়তো দেখেছিল ১০জন ব্যক্তি, আপনার কারণে দেখলো আরও একশ জন। একজন অতি রূপবান ব্যক্তিরও অসতর্ক মুহূর্তে তোলা ছবিতে তাকে দৃষ্টিকটু দেখাতে পারে। অতি সাবধানে করা মেকআপও ক্যামেরার ফ্লাশের কারণে বহুগুণে উজ্জ্বলরূপে ধরা পড়তে পারে। অতএব কী দরকার আরেকজনকে মানসিকভাবে কষ্ট দেয়ার? এড়িয়ে যান ছবিটি, অথবা কোন ভাবে সেই ব্যক্তির সাথে যোগাযোগের উপায় থাকলে প্রাইভেট মেসেজ রাখুন, যাতে সে ছবিটি সরিয়ে ফেলতে পারে।

দেখুন, ঠিক কাজ করা পৃথিবীতে কোনদিনই সহজ ছিল না। কিন্তু তারপরেও যুগে যুগে অসংখ্য মানুষ স্বেচ্ছায় নিজের লোকসান করে হলেও সঠিক পথটি বেছে নিয়েছে বলেই আজকে আমি, আপনারা সবাই এতোদূরে এসেছি। এবারে আমাদের অন্যকে পথ দেখাবার পালা।

মানুষের মন ভালো করার কাজ যদি অনেক শ্রমসাপেক্ষ এবং কষ্টকর মনে হয়, তাহলে সহজ কাজটিই করুন — দয়া করে কারো মন খারাপ করিয়ে দেবেন না। Please Stop Body Shaming.

#bodyshaming

শেয়ার করুন:
  • 1.2K
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.2K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.