সমাজ ফোঁস করে উঠে নারী অপরাধীর বেলায়

সাদিয়া আরমান:

দুইদিন ধরে একটা ভিডিও ভাইরাল হচ্ছে ফেসবুকে। ভিডিও’র বিষয়বস্তু হলো এক নারী তার বাচ্চাকে স্কুল থেকে গাড়িতে করে নিতে এসে পার্কিং এর সমস্যায় পড়েছেন, খুব সম্ভবত তার ড্রাইভারকে কিছু আনতে পাঠয়েছেন। উনি কাউকে বলছেন, ‘এখনই চলে আসবে।’

ভিডিওতে আমরা জানতে পারছি না কী আনতে পাঠিয়েছেন, তবে এটা বোঝা যাচ্ছে যে, এটা ঢাকা শহরের rush hour এর স্বাভাবিক যানজট। ড্রাইভারহীন একটি গাড়ি থামিয়ে রাখার জন্য অন্যদের সমস্যা হচ্ছে, এবং সেই কারণে অন্য গাড়িগুলোকে অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সার্জেন্ট যখন তাকে গাড়ি এগুতে বলেছে তখন তাদের মধ্যে যে প্রাথমিক কথা আদান-প্রদান হয়েছে সেটার ভিডিও করা হয়নি, আমরা বুঝতে পারছি যে, সংঘর্ষের একটা বিশেষ পর্যায়ে ভিডিও করা হয়েছে, খুব সম্ভবত সার্জেন্টের সহকারি তা করেছেন। ওই নারী সার্জেন্টের উপর রেগেছেন এবং উগ্র ব্যবহার করে তাকে ‘চাকর’ বলছেন, আর তার উচ্চপদস্থ বাবার পরিচয় দিচ্ছেন। ‘চাকর’ শব্দটা সার্জেন্টকে মারাত্মক আঘাত করেছে বটে, কারণ এক পর্যায় সার্জেন্ট ভিডিও করার স্বার্থে তাকে যে উস্কানি দিচ্ছেন, সেটাও বোঝা যাচ্ছে। অর্থাৎ সার্জেন্ট আইনগত পদক্ষেপ না নিয়ে প্রতিশোধমূলকভাবে ফেসবুকে সেই ভিডিওটা ছাড়বেন, তারই প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

সাদিয়া আরমান

এই সামান্য ঘটনার ভিডিও ফেসবুকে গত দুই দিন যাবত এতো বেশি ভাইরাল হয়েছে যে, নিউজফিডে আধা ঘন্টায় কমপক্ষে পাঁচটা শেয়ার পাওয়া গেছে, এবং বেশিরভাগ পুরুষরাই বিদ্রুপাত্মক স্ট্যাটাস লিখেছেন। এর মাঝে মারাত্মক কিছু কমেন্টস এসেছে, যেগুলির একটা ছোট বিবরণ দিচ্ছি।

এই নারী যানজটে পার্কিং নিয়ে সমস্যায় পড়েছেন, এবং পুলিশ সারজেন্টের সাথে সংঘর্ষ সাপেক্ষে কিছু কড়া এবং উগ্র কথা বলেছেন যা ভিডিওতে এক-দুই মিনিট আছে। এই তো ব্যাপার! এখন দেখুন কমেন্টস।
একজন তার চেহারা যে পেত্নীর মতো, সেটা প্রকাশ করেছেন। একজন লিখেছেন মেক-আপ ছাড়া মহিলা কুৎসিত, সহ্য করা যাবে না। আরেকজন লিখেছেন, হাতে দস্তানা পরে তাকে সে থাপ্পড় দিতে চায়। আরেকজন বীর পুরুষ লিখেছেন, উনি ভাবেননি কোনদিন নারীর গায়ে হাত দেবেন, এই প্রথম তার এই কাজ করতে ইচ্ছে করছে। আরেক সজ্জন লিখেছেন, উনি জেন্ডার বৈষম্য কখনই করেন না, তবু এই মহিলাকে তার গালাগালি করতে ইচ্ছে করছে। এই শেষ ভদ্রলোক যুক্তরাষ্ট্রে থাকেন। ব্যক্তিগতভাবে না চিনলেও মনে করেছি উনি মার্জিত, সুশিক্ষিত, সুপুরুষ, তাই ফেবুতে এড করেছিলাম। এই ভদ্রলোক নারীটাকে animal বলেছেন। নারীর চোখের নিচে কালির দাগ আছে এ নিয়ে সেই ব্যক্তি ও তার বন্ধু মন্তব্য করেছেন। তার বন্ধু লিখছেন, সে মাদকাসক্ত। আরেকজন বীরপুরুষ তার স্ট্যাটাসে নারীর চরিত্র- হননের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করছেন, এটা কার গাড়ি? মানে এই নারী কোন পরপুরুষের কাছ থেকে গাড়ি পেয়েছেন, অর্থাৎ নারীর মৌলিক চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
আরও একজন দু:খ প্রকাশ করেছেন যে তার শিশুটা একটি ভালো মা পেল না।

এই নারী ট্রাফিক রুলস ভেঙেছেন এবং অন্যায়ভাবে সার্জেন্টের সাথে চরম দুর্ব্যহার করেছেন। এই কাজগুলি চরম অন্যায়, তবে বিশ্লেষণের ঊর্ধ্বে কিছুই নয়। উনি যে তার এমপি বাবার পরিচয় দিচ্ছেন এবং কথা বলতে গিয়ে তোতলাচ্ছেন এবং উল্টোপাল্টো ব্যবহার করছেন, তাতে কেউ কেউ (নারী- কমেন্টকারীরা) প্রশ্ন তুলেছেন, এই নারী কি অপ্রকৃতস্থ? বোঝা যাচ্ছে এই নারী কিন্তু সার্জেন্টকে ভয় পেয়েছেন, তথাপি ফাইট দিয়ে যাচ্ছেন। নিতান্তই দাপট নয়, মুখের বাড়াবাড়ি।

কিন্তু এই ঘটনা যেভাবে ভাইরাল হয়েছে, তাতে আমরা বুঝতে পারি যে একজন নারী যদি এস্টাব্লিশমেন্টকে চ্যালেঞ্জ করে, তাহলে এই পুরুষশোষিত সমাজ একেবারেই তাকে ছিঁড়ে ফেলবে। ঘটনা হচ্ছে, ট্রাফিক- রুলস ভাঙার কিন্তু কমেন্টস আসছে নারীর চেহারা, মেক-আপ, চরিত্র, এমনকি মা হওয়ার যোগ্যতা নিয়ে। কমেন্টসগুলো নেহায়েত ব্যক্তিগত (personalized attacks), গালিগালাজ, লিঙ্গজনিত (sexist) এবং এই নারীকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার ইচ্ছেকে ঘিরে।

এই কমেন্টসগুলোতে আমরা আমাদের সমাজের বর্তমান চেহারা আয়নার মতো দেখতে পারি। কমেন্টসগুলোতে নারীকে নিয়ে সাধারণ বাঙালি পুরুষের চিন্তার স্তর প্রকাশ পাচ্ছে। প্রকাশ পাচ্ছে তাদের নারীবিদ্বেষ এবং নারীর ভুলত্রুটিতে অসহনশীলতা। গভীরভাবে চিন্তা করলে আমরা মিলাতে পারবো, কেন এই দেশে পদে পদে নারী লাঞ্ছিত হোন, ধর্ষণের শিকার হোন এবং হচ্ছেন, কেন এসিডদগ্ধ হচ্ছেন, বা হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন? কারণ মানুষ হিসেবে নারীর জায়গা বা শ্রেণিটা অনেক নিচে বলেই ধরে নেয়া হয়েছে।

যেই দেশে অহরহ ট্রাফিক- রুলস ভাঙা হচ্ছে, প্রতিদিন যেখানে সহস্র অবৈধ পার্কিং এবং পুলিশ যেখানে অর্থের বিনিময়ে সব করতে দিচ্ছে, সেখানে একজন নারী দু’দুটি স্পর্ধা দেখিয়ে ফেলেছেন। প্রথমত, উনি বা উনার ড্রাইভার অবৈধ পার্কিং করে রুলস ভেঙেছেন (এবং তাও একটি ধনিকদের এলাকায়, যেখানে পুলিশ রুলস বজায় রাখার জন্য বেশি মরিয়া হয়ে উঠে)। দ্বিতীয়ত, পুরুষ-পুলিশের উপর দাম্ভিকতা দেখাচ্ছেন। এটা খুবই বাড়াবাড়ি! অর্থাৎ এস্টাব্লিশমেন্টকে উনি চ্যালেঞ্জ করছেন পুরাটাই (এবং তাও অন্যায়ভাবে)।

এই সব অপরাধ একটি নারীবিদ্বেষি সমাজ কখনো সহ্য করতে পারে না। আমার পয়েন্ট এই নয়, যে এই নারী সঠিক কাজটি করেছেন! আমার পয়েন্ট, কমেন্টগুলো কুরুচিকর, অযাচিত এবং নোংরা। পুলিশ- অফিসার হয়ে নারীর সম্মতি না নিয়ে ভিডিও করেছেন, এবং সেটা প্রকাশ করেছেন পাবলিক স্ফিয়ারে। এটা যে Law of Defamation বা প্রযুক্তি আইনে অন্যায় করেছেন, সেটা কেউ কমেন্ট করছেন না (মনে রাখতে হবে, পুলিশ- সার্জেন্ট কী বলে নারীকে ক্ষেপিয়েছেন, সেটা আমরা জানি না, ভিডিওটি আংশিকভাবে করা হয়েছে). অর্থাৎ পুলিশ যে আইন ভাংছে, বা তার দায়িত্ব পালন করছে না, সেটা মাথাব্যথা না।

যদিও কয়েকজন জিজ্ঞেসা করেছেন, পুলিশ তার কাজ কী করেছে, তবু এধরনের কমেন্ট অল্প। মূল মাথাব্যথা নারীর দুঃসাহস আর দাম্ভিকতা নিয়ে। তবে কেউ কেউ সঠিক কমেন্ট করেছেন, এই নারী নিজেই পুরুষতন্ত্র দ্বারা প্রভাবিত। সে যে দাপট দেখাচ্ছেন, ওটা পুরুষতন্ত্র থেকে ধার করা, কারণ এমপি বাবারা এভাবেই চলেন, কথা বলেন, নির্দ্বিধায় আইন ভঙ্গ করেন। সমাজ এইসব নিয়ে মাঝে মাঝে বিরক্তিও প্রকাশ করে, তবে ফোঁস মেরে উঠে কেবল এক দাম্ভিক নারীর বেলায়।

শেয়ার করুন:
  • 424
  •  
  •  
  •  
  •  
    424
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.