নারী যখন অপরাধী, পুরুষের শিশ্ন তখন বিচারদণ্ড

0

সাইফুল বাতেন টিটো:

ছোটবেলার একটা দৃশ্য আমার বার বার মনে পড়ে। আমাদের এলাকার এক মুরগি চোর ধরা পড়েছে তার ছেলেসহ। সেও চোর, তার ছেলেও চোর। বাবা ছেলে একসাথে চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়েছে। চেয়ারম্যান শাস্তি দিলেন ছেলে জুতা দিয়ে বাবার গালে ১০১টা বাড়ি দেবে। কিন্তু ছেলে দিতে চায় না। এক সময় ছেলেটা একপাটি জুতা হাতে তুলে নিতে বাধ্য হলো। সে তার চোর বাবার গালে একটা বাড়ি দিয়েই ভেউ ভেউ করে কেঁদে উঠলো।

গতকাল থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে এক মহিলার ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। ভিডিওটি প্রায় সবাই দেখে ফেলেছেন বলে আর দিলাম না। ভিডিওর মন্তব্যে অনেকের অনেক ক্ষোভ, রাগ প্রকাশ পেয়েছে। সেখানে নানাজন নানা বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। আমি খেয়াল করলাম সবাই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় খুব সযত্নে এড়িয়ে গেছেন। আর তা হলো মহিলার পাশে বসে থাকা শিশুটির কথা। ভিডিওতে খেয়াল করলে দেখতে পাবেন, শিশুটি কী অসহায়ভাবে সবার দিকে তাকাচ্ছিলো! কিছুই বুঝে উঠতে পারছিলো না।

কতোই বা বয়স হবে ওর? বড়জোর পাঁচ কী ছয়? এর মধ্যে সে কী দেখলো? তার মায়ের আইনের প্রতি অবজ্ঞা, অশ্রদ্ধা। মনে হয় এমন বিষয় ও দেখে দেখে অভ্যস্ত। এটা ওর মধ্যে কী প্রভাব ফেলছে? কী শিখছে ও? ও বিষয়টিকে কীভাবে নিচ্ছে? ও বড় হয়ে একজন দায়িত্বরত পুলিশের সাথে কেমন আচরণ করবে? পুলিশ বলতে ওর মাথায় কী ধারণা সঞ্চিত হলো?

এতো গেলো একদিক। ওর মায়ের ভিডিওটা এখন ভাইরাল। ফেইসবুক চালায় এমন সবার নিউজ ফিডে ভিডিওটা একবার হলেও গিয়েছে। আমিও সেভাবেই দেখেছি। পড়ে দেখেছি সেখানকার মন্তব্যগুলো। পুরুষের মধ্যে একটা পাশবিক প্রবণতা রয়েছে। সে মনে করে একজন নারীর সাথে যৌনকর্ম করা মানে তাকে হারিয়ে দেয়া। এই ধারণা অনেক প্রাচীন ও বর্বব। আর সেই কারণেই ‍যুদ্ধবন্দি নারীকে ধর্ষণসহ আরও নানাধরনের যৌন নির্যাতন করা হয়ে থাকে।

একজন মানুষ কোনো অপরাধ করলে আগে আমরা তার মাকে একদফা নানা কিছু করে ফেলি। যেন এটা ঐ মায়ের প্রাপ্য। গ্রামাঞ্চলে ঝগড়ার সময় পুরুষরা নারীদের সবার আগে এটা বলে। যেন এতে নারীর খুব ভয়াবহ পরাজয় হলো। কারণ চরিত্র নষ্ট হওয়ার যদি কিছু থাকে তা নারীর, কলঙ্কের কালি তাও নারীর। মানে অপরাধ করলেই তার শাস্তি দুটি – প্রথমত তাকে ধর্ষণ করা পরে কালি মেখে দেওয়া। অথচ আবাল পুরুষ এটা বোঝার ক্ষমতা রাখে না যে বিছানায় নারী তাকে নিয়ে ইঁদুরের মতো খেলে।

উল্লেখিত নারীর ভিডিওর নিচে কিছু মন্তব্য পড়লাম। তাকে কী কী শাস্তি দেয়া উচিৎ তার বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে সেখানে। বেশিরভাগ রায়দাতার বিচারিক উপকরণ তাদের শিশ্ন। আবার এক ‘অতি সৃষ্টিশীল’কে দেখলাম তার ছবিটি কুখ্যাত কিলার গেম মোমার সাথে মিলিয়ে সমানে ট্রল করছে। এইসব কি এই শিশুটির চোখে পড়বে না? এরপর থেকে সে তার মাকে কী ভাববে? কী প্রভাব ফেলবে ওর কচি মনে? যারা আমরা এসব করছি তারা কি এসব ভেবে দেখেছি একবারও?

সাইফুল বাতেন টিটো, গণমাধ্যম কর্মী

ঐ নারী অাইন অমান্য করে অপরাধ করেছে একথা খুবই সত্যি, সে আইন প্রয়োগকারীর সাথে ভুল আচরণ করেছে, একজন আইন প্রণয়নকারীর সন্তান হয়েও উনি সবগুলো আইনই অমান্য করেছে। পুলিশ মামলা করেছে, যা করার আদালত করবে। এখানে আমাদের কিছু বলা আইনত অপরাধ। কিন্তু আমরা যতোটা না স্বপেশায় পরদর্শী, তার চেয়ে বেশি পারদর্শী বিচারক আর ডাক্তার হিসেবে। কেউ কোনো অন্যায় করলেই আমরা তার কী কী শাস্তি হওয়া উচিৎ তার ফিরিস্তি দিতে থাকি। আর কেউ অসুস্থ হলেই আমরা বলি এটা খাও, ওটা করো।

একজন পুলিশের এসআই এমন একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছেড়ে কি আইন ভাঙেনি? তার কি বোঝা উচিৎ ছিলো না যে অপরাধী একজন নারী আর তার সাথে একটি নাবালক শিশু রয়েছে? আমার তো ভিডিওটি দেখে ওই মেয়েটিকে মানসিকভাবে ভারসম্যহীন মনে হয়েছে। এদেশে একজন বিশ্বসেরা অলরাউন্ডার ক্রিকেটারের ছয়মাসের শিশুকন্যাকে নিয়ে ফেইসবুকে প্রকাশ অযোগ্য ভাষায় ট্রল করতে পারে যা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয় সেদেশে এমন একটা ভিডিও একজন পুলিশের এসআই ফেইসবুকে ছাড়ে কোন আক্কেলে?

আর সবকিছু বাদ দিলাম। আপনি চোখ বন্ধ করে আপনার শিশুটির কথা একবার ভাবুন তো ঐ শিশুটির জায়গায়। ওর সরল চোখদুটোয় যে প্রশ্ন ছিলো তার জবাব কি আমরা কেউ দিতে পারবো? আর ভিডিও ভাইরাল হওয়ার পর ট্রল হওয়ার পরে কী হবে সেটা নাহয় বাদই দিলাম। জানি না ওনার সাথে থাকা শিশুটি ছাড়া তার চেয়ে বড় কোনো সন্তান আছে কিনা! থাকলে তাদের মনের অবস্থা কী?

সাইফুল বাতেন টিটো, লেখক ও গণমাধ্যম কর্মী

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 840
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    840
    Shares

লেখাটি ১০,২০৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.