রুপালী মেষরাম, একজন নারী, একটি ধর্ষণ

0

মাহবুবুর রহমান:

দৃশ্যকল্পটি যদি এমন হয় তবে কেমন হতো বলুন তো, ধরুন আপনারা ৫০০ জন লোক একটি মাঠে বসে কোন একটি অনুষ্ঠান উপভোগ করছেন, সেখানে আচমকা বাঘের আক্রমণ, ৫০০টি বাঘ না, মাত্র একটি বাঘের আক্রমণ। বাঘটি কিছুই করে নাই, শুধু এসেছে আর শান্তভাবে দাঁড়িয়ে একটা অশান্ত হুঙ্কার দিয়েছে। কী করতেন? বাঘটিকে ধরতে বা পিটাতে যেতেন…? আপনার মন কী বলছে আমি জানি না, তবে আমার মনে হয় বক্তাসহ পুরো ৫০০ জন লোকই নিজের আসন রেখে কে কোন দিকে দৌড় দিতেন হুঁশ থাকতো না।

সত্যি বলছি, আমি নিজেও দৌড় দিতাম। আমরা দৌড় দিতাম, কারণ আমরা একটি রাবারের তৈরি নকল সাপকে দেখে টাকা পয়সা রেখে একবার দৌড় দিয়েছিলাম, এখানে তো আসল বাঘ! এতো ভীতির ভেতরেও কিছু সাহসী মানুষ থাকেন যারা এরকম কোটি কোটি ভীতির তথাকথিত রীতিগুলিকে একদম চুরমার করে দেন।

তেমনই একটি সংবাদ পড়লাম ক’মাস আগে বিবিসি’র অনলাইন পত্রিকায়।
ভারতের একটি মেয়ের গল্প, একেবারেই রুপকথা বা সিনেমার মতো। অথচ সিনেমা বা রুপকথা নয়, একেবারেই খাঁটি সত্যি বাস্তব গল্প!

 

 

 

 

 

 

 

 

মেয়েটির নাম রুপালী মেষরাম, ঘটনার দিন তিনি তাঁর বাড়িতেই ছিলেন। বাড়ির পাশেই থাকা তার পোষা ছাগলটির হঠাৎ অস্বাভাবিক আওয়াজ শুনে ঘর থেকে দ্রুত একটি লাঠি নিয়ে বের হোন রুপালি। গিয়ে দেখেন, ছাগলটিকে আক্রমণ করে বসেছে একটি বাঘ। রুপালি এবার বাঘের হাত থেকে ছাগলকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। হাতের লাঠি দিয়ে একের পর এক আঘাত করতে থাকেন বাঘকে। একপর্যায়ে বাঘও তাঁর ওপর হামলে পড়ে। বাঘের সঙ্গে আক্রমণ-পাল্টা আক্রমণে রক্তাক্ত হোন এই তরুণী। তিনি কোমর, পায়ে ও দুই হাতে আঘাত পান। বিষয়টি টের পেয়ে রুপালির মা’ও গিয়ে সেই লড়াইয়ে যোগ দেন। বাঘের আক্রমণ থেকে মেয়ে ও ছাগলকে রক্ষা করতে গিয়ে মা চোখের কাছে আঘাত পান। পরে মা ও মেয়ে দুজনই স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসা নেন। কিন্তু যার জন্য এতো লড়াই, সেই ছাগলকে শেষ পর্যন্ত আর বাঁচানো যায়নি।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, রুপালিকে চিকিৎসা দিতে গিয়ে বিস্মিত হোন চিকিৎসক। বাঘের সঙ্গে তার লড়াইকে ‘সাহসিকতার উদাহরণ’ বলে উল্লেখ করেন ওই চিকিৎসক। এই মেয়ে শুধুমাত্র যুদ্ধ করেই ক্ষান্ত হোন নাই, নিজের ওরকম রক্তাক্ত আহত শরীর নিয়েও আহত মায়ের সঙ্গে তুলে রেখেছেন সেলফি…! ছবিটি দেখলেই মেয়েটির চোখের তীক্ষ্ণ ভাষা আঁচ করা যায়!

সাধারণ একটি ছাগল, হ্যাঁ একটি মাত্র ছাগলের প্রতি ঠিক কতখানি প্রেম থাকলে, মায়া থাকলে সেটিকে বাঁচানোর জন্য একজন মানুষ একটি জলজ্যান্ত বাঘের সাথে লড়াই করতে পারে? সেটিও কিনা একজন মেয়ে হয়ে…!! লড়াই শেষে আবার সেলফি! আমার অবাক হবার কথা ছিল না, আমি অবাক হতে চাইনি, আমি অবাক হতে চাই না, কিন্তু আমাকে অবাক হতে হচ্ছে এই জন্য যে “আমার বোনেরা, এই নারীরা, এই রুপালীরাই প্রতিদিন, প্রতিরাত, প্রতিটি ঘণ্টা কোথাও না কোথাও ধর্ষিত হচ্ছে, পত্রিকা খুললেই একটি বা তারও বেশি ধর্ষণের খবর যেন আজকে বাধ্যতামূলক হয়ে দাঁড়িয়েছে, ধর্ষণের খবর পড়ি, বোনের বিষম যন্ত্রণার খবর পড়ি, কোথায় কোথায় কীভাবে আঘাত করেছে, পড়ি; শিহরিত হই, ধর্ষক গ্রেপ্তার হবার খবর পড়ি; মনে আশার সঞ্চার হয়…।

সেই যে আশার সঞ্চার হয়, তারপর আর কোনো খবর পড়া হয় না, অপেক্ষা করি, কোনো খবর আসে না। আমার সেই খবরটি পড়া হয়ে উঠে না যে ধর্ষকের ফাঁসি কার্যকর হয়েছে, বা তাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হয়েছে! বরং ধর্ষণের শিকার বোনেদের মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়।

একটি ছাগলের প্রতি যে নারীর এতোখানি মায়া, সেই নারীর নিজের জীবনের প্রতি মায়ার পরিমাণ কি এর থেকেও ঠুনকো? এই যে নারী, যে বোন একটি ছাগলকে বাঁচাতে নিজের জীবনের মায়াকে তুচ্ছ করে কোন আধুনিক অস্ত্র ছাড়াই স্রেফ একটি লাঠি নিয়ে বাঘের মতো ভয়ানক পশুর সাথে লড়াই করতে পারে, সেই নারীই কী করে একটি পুরুষের কাছে হার মানেন? কেন হার মানেন? কেন পারেন না লড়াই করে বিজয়ী বেশে ক্ষত-বিক্ষত ধর্ষককে ব্যাকগ্রাউন্ডে রেখে ওরকম আগুন ঝরানো চোখে সেলফি নিতে…?

যে দেশের আইন ধর্ষকের শাস্তি তো বহুদুরের কথা, তনুদের মতো ধর্ষণের শিকার হওয়া মেয়েদের ধর্ষকদের, খুনিদের আজও গ্রেপ্তার দেখাতে পারে না, যে দেশের আইন গ্রেপ্তারকৃত আসামীদের একজনেরও উল্লেখ করার মতো শাস্তি দিতে পারে না, দেয় না, সে দেশে থেকে সেই দেশেরই আইনের ওপর ভরসা রাখাটা যে যাই বলুক, আমার মতে, নিছক বোকামি ছাড়া আর কিছুই না।

আপনি তাকেই শ্রদ্ধা করবেন, সেই আইনকে শ্রদ্ধা করবেন যে আইন আপনাকে শ্রদ্ধা করবে। যে আইনকে কোটি বার শ্রদ্ধা করবার পরও বিনিময়ে শ্রদ্ধা পাওয়া তো দূরের কথা, শ্রদ্ধাবনত হয়ে আইনের পায়ে মাথা ঠুকে ঠুকে কপাল ফেটে রক্ত বেরুবার পরও যে আইনের ঘুম ভাঙ্গে না, সেই আইনের বুকে অদৃশ্য পদচ্ছাপ রেখে বরং নিজেই সাহসী হোন, সচেতন হোন, দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করুন, এমন দৃষ্টান্ত দেখিয়ে দিন যা আপনার দেশের আইন কখনো ঘুমের ভেতর স্বপ্নেও দেখে নাই।

আমাদের সামাজিক অবস্থা, আমাদের মনোভাব, আমাদের আইন, এসবের অপেক্ষায় থেকে থেকে নিজের সম্ভাবনা, স্বপ্ন, ভবিষ্যৎ এমনকি নিজের জীবন অবধি বিলীন করে দেবার কোনো মানে হয় হয় না, আপনাকে সচেতন হতে হবে, হতে হবে দারুণ রকম সাহসী, প্রতিবাদী এবং বিশেষ করে আত্মরক্ষা করার সকল কৌশল থাকতে হবে আয়ত্বে, এসব কৌশল মেনে চলতে, নিজেকে রক্ষা করতে এবং পশুরুপি ধর্ষককে নাস্তানাবুদ করতে আপনার যা যা করা প্রয়োজন তা থেকে এক চুল পরিমাণও সরে আসা যাবে না।

খুব ইচ্ছে করে দেখি যে আমাদের মেয়েরা, আমাদের মায়েরা, বোনেরা একদিন প্রতিবাদী হয়ে উঠবে, এমন প্রতিবাদী যেন সকালের পত্রিকা খুলেই আমরা অনাকাঙ্ক্ষিত খবরে অবাক হয়ে যাই। আরও দেখবো বিজয়ীর বেশে বোনটি আমার দু আঙ্গুলে জয়ের চিহ্ন এঁকে সেলফি তুলছে…!
খুব কঠিন নয়, নিজেকে, নিজেদের প্রস্তুত করুন, প্রতিটি সেকেন্ডে প্রস্তুত রাখুন নিজেদের। বিজয়ী সেলফি দেখবার স্বপ্ন দেখি।

দ্রষ্টব্য: আমাদের দেশের অভিভাবকেরা রুপালীর মা থেকে নিতে পারেন এক দারুণ শিক্ষা। অবশ্যই নিতে পারেন এবং আমার মতে নেয়াটা আবশ্যক। খুলে বলি, আমাদের দেশে কোন মেয়ে ধর্ষণের শিকার হলে সে মেয়েটি যতোটা না চুপসে যায়, তার থেকে আরও সহস্র কোটিগুণ চুপসে যায় আমাদের দেশের বাবা-মায়েরা এবং সংশ্লিষ্ট অভিভাবকেরা।
অন্তরায় একটি, দেশ জানবে, মেয়ের সম্মান যাবে, নিজেদের সম্মান যাবে, লোকে কী না কী বলবে, ছি ছা দেবে ইত্যাদি। মেয়েকে বাঘের হাত থেকে বাঁচাতে যেখানে একজন মা, একজন নারী নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে সেই বাঘের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে, লড়াই করতে পারে, সেই মা-ই, সেই নারীই কেন পশুরুপি ধর্ষক পুরুষটির বিপরীতে যেতে পারেন না, কেন রুখে দাঁড়াতে পারেন না, তবে কি সেই ধর্ষক পুরুষটি ঐ বাঘের থেকেও বেশি ভয়ঙ্কর?

হ্যাঁ ভয়ঙ্কর, কিন্তু সে বাঘ নয়, মানুষ। মনে রাখতে হবে নামমাত্র হলেও সেও মানুষ। এ গেলো ধর্ষণ পরবর্তী দুর্বলতা। পূর্ববর্তী দুর্বলতা যেন আরও প্রকট, হাজার হাজার অন্তরায়, লিখে শেষ করা যাবে না। একটি মেয়েকে এসব ক্ষেত্রে ঠিক কতখানি, কতবার একটি “না” এর মুখোমুখি হতে হয়, ওখানে যাবে না, ওর সাথে মিশবে না, জোরে কথা বলা যাবে না, মেয়েদের এতো রাগ ভালো না, এটা না, ওটা না, সেটা না, শুধু না আর না…!

ধর্ষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করবে? সেখানেও একটা বিশাল বড় প্রতিবন্ধকতা পরিবার। হ্যাঁ, বিশেষ কোন একটা ভয়ে হয়তো এমনটা হয়ে থাকে, হচ্ছে, কিন্তু আর কতো? ভয় দিয়ে পৃথিবীতে আজ অবধি কোন কিছুই জয় করা যায় নাই, যাবেও না, সুতরাং পরিবার বলুন, সমাজ বলুন কিংবা পুরো পৃথিবী, সবাইকে সবার আগে ঐ ভয়টাকেই বিসর্জন দিতে হবে রুপালির মায়ের মতো, আমাকেই আমার নিজেকে রক্ষা করতে হবে, এই আমাকেই আমার বোনকে রক্ষা করতে হবে, এই একজন আমাকেই আমার মা, আমার মেয়েকে রক্ষা করতে হবে।

সবাই যার যার বোধের জায়গাটা শক্ত করি, সদা জাগ্রত রাখি বিবেকটাকে। প্রস্তুত থাকি নিজে, অন্যদের প্রস্তুত রাখি, প্রতিরোধ গড়ে তুলি, সকাল হবেই…।

তথ্যসূত্রঃ বিবিসি, প্রথম আলো।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 253
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    253
    Shares

লেখাটি ২,৫০৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.