নারীর কষ্টের রঙ এক…

0

নাজনীন হাসান চুমকী:

নারী… যে সামাজিক অবস্থানেই জন্ম হোক না কেন, যতোই ভালবাসা/অবহেলা/অনাদরে থাকুক না কেন, নারী কিন্তু পরিপূর্ণ নারীর যাবতীয় শারীরিক এবং মানসিক গঠন নিয়েই বেড়ে ওঠে।

যে নারী গ্রামে জন্ম নেয়, সেই নারী যেন কচুরিপানার মতো সুন্দর। গ্রামের সহজ সরল বাবা- কাজের মানুষহীন কর্মঠ মা- নিজেদের জীবন নিয়ে ব্যস্ত পরিজনদের আনমনা মানসিকতার মাঝেও হাঁটি হাঁটি পা পা করে, এক্কা দোক্কা, ইচিং বিচিং চিচিং ছা খেলতে খেলতে, কীভাবে যেন ধীরে ধীরে একসময় সবুজ একটা রঙ ধারণ করে।

অগোছালো চুল, এলোমেলো কাপড়, মুখে রোদে পোড়া তামাটে রঙ থাকলেও একটা সময়ে পুরুষ শ্রেণীর আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। ওই সবুজ কচুরিপানা নারীতে যখন আরও সৌন্দর্য নিয়ে বেগুনি রঙের ফুল ফোঁটে, সেই ফুল ফুলদানিতে না রাখা গেলেও পানিতে নেমে, কখনও ডুব দিয়ে টগবগিয়ে ফুটে থাকা বেগুনি রঙের ফুল ছিঁড়তে মন চায় অনেকেরই।

কেউ কেউ আবার লোভ সংবরণ করতে না পেরে ডাকাত হয়ে ছিঁড়েও ফেলে সবুজ কচুরিপানার বেগুনি ফুল, সৌন্দর্য ম্লান হয় সেই কচুরিপানার, বেদনায় কালচে একটা দাগ পড়ে ফুল ছিঁড়ে নেবার ব্যথায়, সে ব্যথা এমনই ব্যথা, যা ঠোঁট নেড়ে আনমনা পরিচিত পরিমণ্ডলকেও যেন বলতে পারে না সবুজ সুন্দর সেই নারী। ধীরে ধীরে আবারও বেগুনি রঙের ফুল আসে সবুজ কচুরিপানায়। হয়তো.. আবারও..কে জানে!

যে নারী মফস্বলে জন্ম নেয়, সে যেন ঢোলকলমী লতা… সচেতন বাবা-মা-পরিবারে কিছুটা শাসনে, শিক্ষায় সে নিজের পায়ে ভর দিয়ে তরতর করে চঞ্চলতায় বেড়ে উঠতে জানে, একটু টানাপোড়েনে একহারা গড়নের সবুজ শরীরে ছাই রঙের ময়লা এসে পড়ে, তখন অতটা কারও চোখ পড়ে না ঢোলকলমী লতার উপর, কিন্তু যখন ওই ঢোলকলমী লতায় হালকা বেগুনি রঙের ছড়ানো সুন্দর ফুল ফোঁটে, মানুষের ঠিকই নজর পড়ে, কারও কারও নজর কাড়ে, রাতের ঘুম হারাম করে ঢোলকলমী লতার ফুল। সুযোগ বুঝে কেউ একজন নির্দয়ভাবে ঘ্রাণবিহীন বেগুনি ফুলটাকে টেনে ছিঁড়ে ফেলে, কষ্টে নরম সবুজ ঢোলকলমী লতা থেকে সাদা সাদা কষ গড়িয়ে পড়ে, চঞ্চল ঢোলকলমী লতা নারী কষ্টের ভারে আর সমাজের কাছে পরিবারের মুখ রক্ষার দায়ে সেই কষ্ট দমন করে একটু যেন নুয়ে পড়ে। কিন্তু আবার সময়ের ব্যবধানে ঐ একই ঢোককলমী লতায় বেগুনি রঙের ফুল ফোঁটে… হয়তো আবারও…!!

যে নারী শহরে জন্ম নেয়, সে নারী অপরাজিতা লতার মতো বাবা-মা-পরিবারের আহ্লাদে কেমন যেন ঢঙ্গিপনায় আহ্লাদে আহ্লাদে বেড়ে উঠতে থাকে। কিন্তু পরিবারের যত্নে কারও না কারও সাহায্য নিয়ে বেড়ে ওঠে সে। ছোট ছোট সবুজ পাতা আর আহ্লাদের আতিশয্যে জড়িয়ে পড়া লতায় গাঢ় বেগুনি রঙের আভিজাত্যময় সৌন্দর্য নিয়ে ফুল ফোঁটে। নরম, সম্ভ্রান্ত অপরাজিতা ফুলেরও নেই কোনো ঘ্রাণ, আছে শুধুই সৌন্দর্য। অপরাজিতা এতোই নরম ফুল যে না পরা যায় খোঁপায়, না বানানো যায় তোড়া, না যায় রাখা ফুলদানিতে। তবুও নিজের প্রবৃত্তিকে সংযমী করতে না পেরে এতো আদর-ভালবাসা-যত্ন আর আহ্লাদের অপরাজিতা ফুলকেও নিষ্ঠুরের মতো টান দিয়ে ছিঁড়তে গিয়ে কখনও কখনও গোঁড়া থেকে গাছ তুলে ফেলা হয়, ভীষণ কষ্টে সেই গাছ মরে কালো হয়ে যায়। শুকিয়ে যাওয়া কালো অপরাজিতা লতাকে দেখলে বুকের ভেতর ব্যথা মোচড় দিয়ে ওঠে।
সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে অপরাজিতা ফুলের বীজ থেকে আবারও নতুনভাবে গাছ গজিয়ে আহ্লাদে বাড়তে থাকে। নরম, আহ্লাদী হলেও অপরাজিতা ফুলের এটাই শক্তি। ভেঙে পড়তে বা শুকিয়ে গেলেও আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে বীজ থেকে বার বার বেড়ে ওঠার সাহস রাখে।

নাজনীন হাসান চুমকী

গ্রাম-মফস্বল-শহর যেখানেই নারীর জন্ম হোক না কেন, ফুল ফুটলেই এক শ্রেণীর মানুষের চোখ পড়বেই এবং কুৎসিত মনের বা চোখের মানুষের দ্বারা এই সবুজ নারী কষ্ট পায়, বেগুনি ফুল আক্রান্ত হয়, কেউ শৈশবে, কেউ বা কৈশোরে, আবার কেউ যৌবনে।
কোন না কোনভাবে আশেপাশের পরিচিত মানুষগুলো দ্বারা নারী শারীরিক এবং মানসিকভাবে নিগৃহীত হয়ে চলেছে প্রতিনিয়ত এবং ভুলে ভরা সমাজের কথার আঘাতে, নীরবে সহ্য করে চলেছে সেই নিগ্রহ, যন্ত্রণা। পুরুষেরা ভাবে, এটাই নারীর দুর্বলতা। একবারও ভাবে না এই সহ্য ক্ষমতা নারীর কত বড় যোগ্যতা, গুণ। নারী যদি মুখ ফুটে চিৎকার করে, যন্ত্রণায় কাতর হয়ে ঐ পুরুষের নাম বলতো, তবে কত কত পুরুষ সমাজে মাথা উঁচু করে চলতে পারতো না। অক্ষম মানুষে পরিণত হতো।

কেবলমাত্র নারীই পারে সব যন্ত্রণা নীরবে সয়ে, পায়ে ভর দিয়ে, কোমর সোজা করে, মাথা তুলে, ঠোঁটে হাসি নিয়ে এগিয়ে যেতে। সময়ের নোনাজলে নারীর ক্ষত শুকায় ঠিকই, বেগুনি বা নীল রঙের ক্ষতটা টেনে নিয়ে বেড়ায় সবসময়ই, আর তাই প্রতিটি নারীর সামাজিক অবস্থান যতই আলাদা হোক, শারীরিক গঠন যতই আলাদা হোক, দৃষ্টিসীমানা বা মনের ভাবনা যতোই আলাদা হোক, শরীরের গন্ধ যতোই আলাদা হোক, কষ্টের রঙ একই।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 666
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    666
    Shares

লেখাটি ২,৯৬৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.