সাধারণ থেকে সেলিব্রিটি- দোষারোপের সংস্কৃতি

0

শাহরিয়া খান দিনা:

কিছুদিন আগে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল ‘আনন্দ টিভি’র পাবনা প্রতিনিধি সুবর্ণা নদীকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। অভিযোগের তীর প্রাক্তন স্বামী এবং শ্বশুরের দিকে। পত্রিকা ঘাঁটলে এমন আরও ঘটনার দেখা মিলে। সম্পর্ক শেষ হওয়ার জের ধরে হত্যার ঘটনা হয়তো কম, কিন্তু একে অন্যের চরিত্র হননের ঘটনা খুব সাধারণ বিষয় যেন।

আমদের ক্রিকেটাররা এখন দেশের বড় সেলিব্রিটি। তারা যেমন আমাদের গর্ব, তেমনি কিছু ক্রিকেটার ব্যক্তিগত প্রেম-রোমান্সের কারণে হচ্ছেন সমালোচিত। চরিত্র হননের দিক থেকে এগিয়ে দেশের ক্রিকেটাররা এবং তাদের প্রেমিকারা। হ্যাপি-রুবেল হোসেন থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক নাসির-সুভা। মাঝখানে আরাফাত সানি, মোহাম্মদ শহীদ, সাব্বির রহমান রুম্মন, আল আমিন হোসেন, ও মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতও ছিল। এদের ব্যাপারগুলো আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। ইউটিউব, ফেইসবুক, পর্নো সাইট কোথায় নেই এই তাদের নাম!

এইসব ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ায় আমরা যা দেখি, প্রথম কয়েকদিন বেশ হৈ চৈ, লাইক, শেয়ার ছেলেটাকে দুই/একজন ‘চরিত্রহীন’ বলে গালি দিয়েই শেষ। কিন্তু মেয়েটা মারাত্মক রকম সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়। দিনশেষে মেয়েটাই খারাপ। মেয়েটাই নষ্টা। মেয়েটাই লোভী। হ্যাঁ, আমি বলছি না মেয়েরা সব দুধে ধোয়া তুলসীপাতা। যখন কেউ অভিযোগ করে, তাকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে ধর্ষণ করা হয়েছে সেক্ষেত্রে প্রলোভনে যে পা দেয় তাকে আপনি লোভী বলতেই পারেন। কিন্তু যে প্রলুব্ধ করছে, তার দায় নিশ্চয়ই কম নয়!

একটা সম্পর্ক যখন গড়ে উঠে তখনকার সময়টুকু খুবই মধুর। একে অপরকে একটু একটু করে চিনছে, জানছে, তার মতো করে মানিয়ে নিতে চাইছে। তাকে ভাবনায় রেখে, তার ভাবনার সাথে মিল রেখেই কল্পনায় সাজায় দুজনের পৃথিবী। এই পৃথিবীতে কেউ পুরোপুরি আমাদের মনের মতো হয় না। যাকে ভালো লাগে, আমরাই বরং মনটা তার মতো করে নিতে চেষ্টা করি। কখনো এই চেষ্টাটা বুঝেই করি, কখনো বা টেরই পাই না।

সম্পর্কের মধুরেণ সমাপয়েৎ সবারই কাম্য। রূপকথার গল্পের মতো, ‘অবশেষে তারা সুখে শান্তিতে বসবাস করিতে লাগিল’ এমন উপসংহার প্রত্যেকেরই লালিত। তবুও সব সম্পর্কের শেষটা এমন হয় না। মাঝপথেই থেমে যায়। থামিয়ে দিতে হয়। যখন মনে হয় এই সম্পর্কের সূতাটা ছিঁড়ে গেছে, একে ধরে রাখার আর কোনো উপায় নেই, তখন বেরিয়ে আসা ছাড়া আর বিকল্পও থাকে না হয়তো।

ক্ষত-বিক্ষত সম্পর্কটা শেষ করা ভালো সিদ্ধান্ত, কিন্তু একে অন্যের প্রতি দোষারোপের কাদা ছোঁড়াছুড়িটা বাজে ব্যাপার। যেটা শেষ হয়ে গেছে সেটাকে পাওয়ার জন্য একতরফা মরিয়া হয়ে নিঃস্ব হওয়া আর আত্মসম্মান বিসর্জন দেয়া ছাড়া প্রাপ্তির খাতা শূন্য। জোর করে কারও সংসারে ঠাঁই পেলেও বা বেঁধে রাখা গেলেও আদতে তাতে সুখ বা স্বস্তির দেখা মেলে কি!

কিছুদিন আগে চিত্র নায়িকা অপু বিশ্বাসকে দেখেছি তিনি সম্পর্ক রক্ষায় প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছিলেন। এই ভাঙনটা সহ্য করা অবশ্যই কঠিন, তবে নিজের সম্মানের জন্যই এই ব্যথা সহ্য করার ক্ষমতা রাখতে হবে। শারীরিক কোনো যন্ত্রণা যেমন আমরা সহ্য করি, ডাক্তারের পরামর্শ নেই, মানসিক যন্ত্রণাতেও তেমনি নিজেকে সময় দিতে হবে। ধৈর্য ধরতে হবে।

সব সম্পর্কই দীর্ঘস্থায়ী হয় না। তাই বলে অবহেলা, প্রতারণা বা হেঁয়ালি করে কখনও নিজ থেকে ভেঙে দিতে নেই।

ইদানিং দেখা যায় কারও ব্রেকাপ হলো তো স্ক্রিনশট, ছবি, ভিডিও অন্তর্জালে ছড়িয়ে দিচ্ছে। সামাজিকভাবে হেনস্থা করার উদ্দেশ্যে। অন্যকে অপদস্থ করে নিজেকে সম্মানিত তালিকায় রাখা যায় না। প্রতিহিংসার প্রাপ্তিও কখনোই ভালো হয় না। যার প্রতি একসময় তীব্র ভালোবাসা ছিল তার নামেই আসে তীব্র ঘৃণা।

ছোট্ট জীবনে আমাদের অনেক অপ্রাপ্তিই যখন আমরা মেনে নিই, তখন শুধু একজনের ঘৃণা কুড়িয়ে লাভ কী! নিজে বাঁচি অন্যকেও বাঁচতে দেই।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 82
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    82
    Shares

লেখাটি ৭৩৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.