বিয়ে কি চুক্তিতে ঘরে কোন কাজের মেয়ে আনা?

0

শিল্পী জলি:

আমেরিকাতে এক সুন্দরী মেয়ে নার্সিং পড়ছে আবার প্রেমেও জড়িয়েছে। ছেলে বিল্ডার- ঘর বানায়।

একদিন ছেলেটি মেয়েটিকে তার মায়ের বাসায় নিয়ে যায় পরিচয় করাতে। আমেরিকার প্রেমে প্রেমিক যদি নিজের পরিবারের সাথে প্রেমিকাকে পরিচয় করিয়ে দেয়, তাহলে বুঝতে হবে বিয়েরও পরিকল্পনা আছে মনে।

বাইশ বছরের মেয়েটি ছেলের বাসায় গিয়ে পরের দিন সকাল এগারোটা পর্যন্ত ছিল, আর ছেলেটির সাথেই বেশি সময় কাটিয়েছে। আবার হবু শাশুড়িকেও তেমন কোনো সাহায্য করেনি কাজে। আর যায় কই?

একে তার ছেলের সাথে প্রেম করে। দুই, ছেলের মাকে তেমন তোয়াজ করছে না। প্রকাশ্যেই ছেলের মা মেয়েটিকে ঘৃণা করতে শুরু করে। ওদিকে ছেলে মেয়েটির প্রেমে দিওয়ানা।
ছেলে মাকে বোঝাতে চায়, ওতো সেদিন শুধু বেড়াতে এসেছিল, থাকতে নয়, কাজ নাইবা করলো, ক্ষতি কী?
মায়ের একই কথা, আমি তো কাজ করেছিলাম আমার শাশুড়িকে দেখতে গিয়ে!

মেয়েটির সাথে ছেলেটির বিয়ে হয় এবং আঠারো বছর হতেই যেহেতু আমেরিকাতে ছেলেমেয়েদের আলাদা থাকার রীতি, তারাও আলাদাই থাকে। নিজেদের সংসার নিজেদের মতো করে গড়ে তোলে। একটি মেয়েও হয় তাদের। তারই মাঝে মেয়েটি নার্সিং শেষ করে লাইসেন্স নিয়ে নিয়েছে, কাজ করছে। ছেলেটিও ক্লায়েন্টদের ডিজাইন দেখায়, কে কেমন বাড়ি চায়? বাড়ির নক্শাপাতি করে দেয়।

আর ছেলের মা এসব প্রেমপ্রীতি দেখে রাগ কন্ট্রোলে রাখতে পারে না। অবিরত ছেলে বা ছেলের বউয়ের ফেইসবুক পেইজসহ অন্যান্য সামাজিক মাধ্যমগুলোতে গিয়ে হানা দেয়। মন্তব্য করে আসে, ‘এরা কোন কাজের না’। অকম্মা। প্রফেশনাল ক্ষতির আশঙ্কায় মায়ের এহেন আচরণে বাধ্য হয়ে ছেলে তার মাকে ব্লক করে। সমস্যা যায় না। মা বিকল্প পথ বের করেন।

এহেন পরিস্হিতিতে বিষয়টি নিয়ে কাউন্সিলিংয়ের আয়োজন করা হয়। বোঝানো হয়, মায়ের প্রতি ছেলের ভালোবাসা যেমন ১০০%, বউয়ের প্রতিও ১০০%। এই দুই ভালোবাসার প্রকৃতি আলাদা, এবং দ্বন্দ্বেরও নয়। তথাপি যদি গোলযোগ বেঁধেই থাকে, তাহলে একজনের সাথে সম্পর্ক হারাবার সম্ভাবনা থাকে এবং সেটা সম্ভবত মায়ের সাথেই, যেহেতু ছেলের প্রধান দায়িত্ব তার নিজের পরিবার এবং সন্তানকে দেখভাল করা। তাই এখন শুধু স্বভাব বদলালেই তার পক্ষে কাছাকাছি থেকে নাতনির বেড়ে ওঠা দেখা সম্ভব। নইলে রক্তের সম্পর্কও ছিন্ন হয়ে যাবে একটু একটু করে, এভাবেই।

লক্ষ্য করলেই দেখা যায়, আমাদের দেশেও ছেলেমেয়েদের দাম্পত্য জীবন বাবা-মায়ের ভূমিকা দ্বারা প্রভাবিত হয়। অধিকাংশেরই ডিভোর্সই হয় বাবা-মা অথবা যৌতুকজনিত বিষয়-আশয়ের ঝামেলায়। বিয়ের পর অনেকেই মনে করে বিয়ে যখন করেছে, বউয়ের দায়িত্ব তার বাবা-মা, পরিবারের দেখভাল করা, মায়ের বাড়ি থেকে টাকাপয়সা ধনদৌলত এনে এবং কাজ-কর্ম দিয়ে সবার মন জয় করা। যদিও মেয়েদের মনেও বিয়েতে ভোগের বাসনাই সক্রিয় থাকে, শুধুই ত্যাগ নয়। উপরন্তু ছেলেদেরও হাতপা আছে, মা-বাবাও তার নিজের, বউয়ের সাথে নিজেও কিছুটা হাত-পা নাড়িয়ে পরিবারকে সন্তুষ্ট করার চেষ্টায় ক্ষতি কী? বরং সবারই লাভ।
তথাপি ৯৫% ছেলেই ঐ পথে যায় না।

বউ নাবালক/বাচ্চা মেয়ে বা ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, জজ, ব্যারিষ্টার, অথবা রাজকন্যা যাই হোক না কেন বিয়ে হতেই রান্নাবান্না এবং সেবার দায়িত্ব কাঁধে না নিলে রক্ষা নেই। অথচ ছেলেটি চব্বিশ ঘন্টা অবসরে থাকলেও ঘরের কুটোটি নাড়াবার প্রশ্ন নেই। মাঝে মাঝে মিলন হবে সেই চুক্তিতে নিজের শৈশব-কৈশোর, বাবা-মা, পরিবারকে ছেড়ে এসে অন্যের পরিবারের সেবাযত্ন, চব্বিশ ঘন্টা ঘরের কাজের দায়িত্ব পালন কতটা সুখকর?
দশের লাঠি একের বোঝা বলেও তো একটি কথা আছে, আবার অলস মস্তিস্কও শয়তানের কারখানা।

যদিও কাজে মানুষের শারীরিক, মানসিক,আবেগিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক সব মুক্তিই মেলে, কাজ মানুষের দক্ষতা বাড়ায়, তথাপি দেশে ছেলেদেরকে ঘরের কাজ করতে ওপেনলি নিরুৎসাহিত করা হয়। এমনকি ছেলেদের ঘরের কাজ করাকে অনেকেই অসন্মানজনকও মনে করেন যদিও কাজের কোন লিঙ্গ হয় না। অথচ আমেরিকায় সব ছেলেই ছোটবেলা থেকেই ঘরের কাজ শিখে ফেলে এবং নিয়মিত করেও। শুধু গুটি কয়েক ছেলেমেয়ে যারা শারীরিক বা মানসিকভাবে অসুস্হ তারাই শুধু জানে না ঘরের কাজ কী।

ঘরের কাজও মানুষের হাতপা কোষ চালু রাখে, ব্রেইনকে সক্রিয় করে, চিন্তাশক্তি, সমস্যার সমাধান এবং দক্ষতা বাড়ায়, স্বনির্ভর করে। আমেরিকায় সাতআট মাস বয়স থেকেই শিশুদেরকে নিজের কাজ নিজে করতে শেখানো হয় । শুরু হয় নিজের খাওয়া নিজে নিজে খেতে শেখার মাধ্যমে। আর অধিকাংশ বাবামায়েরই মূল লক্ষ্য থাকে সন্তানকে যোগ্য করে তোলা এবং সময়মত জীবনের পথে ছেড়ে দেয়া। বুড়ো বয়সে সন্তান বাবামাকে দেখবে সেই স্বপ্ন তারা দেখেন না। মাতৃত্ব-পিতৃত্বের স্বাদেই তারা পরিতৃপ্ত । তাই নিজেদের ভবিষ্যত জীবনের ভাবনাটিও তারা আগেই ভেবে রাখেন, সুস্হতার দিকে মনোযোগী হন। আবার বুড়ো বয়সে হাতও যেনো খালি না হয়ে যায় সেই ব্যবস্হা রাখেন । এমন কী জীবিত থাকাকালীন সময়েই মৃত্যুর পরের সৎকারেরও ব্যবস্হাও করে রাখেন নিজেরাই।

সাতানব্বই বছরের এক মহিলাকে দেখলাম, এখনও তার ব্রেইন চড়কির মত সচল। আবার নিজের কাজও নিজেই করছেন। ওষধপত্ওর নিজে নিজে খান। আবার তাকে দেখতেও সওর/পঁচাওর মনে হয়। মানুষের শরীর চালু থাকে কাজে আর কয়েকমাস টানা শুয়ে থাকলেই নতুন করে হাঁটাও শিখতে হয়।

আমাদের দেশের অনেক বাবামাই ভাবেন এত কষ্ট করে ছেলেকে বড় করলাম, সেই আমার বুড়ো বয়সের অবলম্বন। তাই ছেলের বিয়ে হতেই ভয় ঢুকে যায় মনে এই বুঝি ছেলে হাতছাড়া হয়ে গেল।ছেলের বউকে তখন মনে হয় যত নষ্টের মূল, সে না এলে, বিয়ে না হলে, এমন হতো না, ছেলে আমার নিজেরই থাকতো। ভাবনাতেই রাগে গজ গজ করতে থাকে শরীর। তখন আচরণেও প্রকাশিত হয়ে যায় মনোভাব। আর যদি শাশুড়ির বয়স তুলনামূলকভাবে কম হয় তাহলেতো কথাই নেই। ছেলের ঘরের দরজা আঁটকালেই তার দম আঁটকে আসতে চায় । আর ওদিকে বয়সের তাড়ণায় ছেলেও বার বার দরজা আঁটকায়।

মানুষ ছেলের বউকে নিজের মেয়ের মত দেখতে পারে এমন ঘটনা বিরল। তেমন আশাও করা অযৌক্তিক। কেননা একজন নিজের পেট থেকে আসে শতভাগ নির্ভর হয়ে,আর আরেকজন আসে অন্য পরিবার থেকে, পরিণত হয়ে।

বাচ্চা থাকা সও্বেও দুইপক্ষের মায়েদের টানাটানিতে দেশীয় এক মেয়ের ডিভোর্স হয়ে গেল। শাশুড়ি যেমন বিয়ে হতে না হতেই কাজের লোক ছাটাই করে দিয়েছেন, ডাক্তারি পড়া বউকে দিয়েই দুণিয়ার কাজ করান, তেমনি মেয়ের মায়েরও আর সহ্য হয়নি, এত আদরের মেয়েকে দিয়ে দিনরাত বাড়ির হাড়িপাতিল মাজানো ? রান্নাবান্না, ঘরদুয়ার পরিস্কার, কাপড় কাঁচানো?
মেয়ের জীবন, যৌবন, প্রতিষ্ঠা সব জলে যাবার আশঙ্কায় তিনিও মাঠে নামেন কী করা যায়! প্রাপ্তবয়স্ক দু’জন স্বামীস্ত্রীর জীবন যাপনের কন্ট্রোল নিয়ে নেন তাদের বাবামা, তারা কখন খাবে,কখন কাজ করবে, কখন ঘুমাবে, কতটা ভালোবাসবে, কখন দরজা আটকাবে সবকিছুরই।

অধিকাংশ বাবামাই সন্তানদের বিয়ে দিলেও মেনে নিতে পারেন না তারা পরিণত হয়েছে। তারা নিজের মত করে চলবে, জীবন গড়বে, সেক্স করবে,পরস্পরের আন্তরিক হবে। সম্পর্কের এই দিকগুলোকে তখনও তাদের চোখে বদমাইশিই মনে হয়। আর সব দোষ গিয়ে পরে অন্য বাড়ি থেকে আসা মেয়েটির ঘাড়ে, সেই সব নষ্টের মূল, ইচড়ে পাঁকা। তারা ভাবেন তারা বিয়ে দেবেন, ডিভোর্স করাবেন, সব কিছুই আজীবন তাদের ঈশারা মাফিক হবে। আবার তাদের খুশীতে ডিভোর্স হবার পরও সময়মত ব্যর্থতার খোঁটা দিতেও অঙ্গুলি নির্দেশ করেন অনেকে।

বিয়ে হলেই যে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে বন্ডিং তৈরি হয়ে যায় তা নয়। সেক্স জীবনেও আশাপ্রত্যাশায় অমিল থাকতে পারে। ত্যাগ-তিতিক্ষা কম্প্রোমাইজ থাকে, বিয়ের সনদপত্রই বিয়ের সবটুকু নয়। আবার, সম্পর্কে মায়াও আসে ধীরে ধীরে পারস্পরিক রেসপেক্ট, কেয়ার, নির্ভরতা, শ্রদ্ধা, ত্যাগ, ভালোবাসা অনুভবের দ্বারা। সেখানে বিয়ে হতেই যদি পরিবারের লোকজন উঠতে বসতে পিছে লেগে থাকে, রক্তের সম্পর্ক মেইনটেইন করতেই যদি তোয়াজে ব্যস্ত থাকতে হয় সর্বক্ষণ, তাহলে বিনিসুতার সম্পর্কেরই ভীত নড়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে।এমনকি বিচ্ছেদ পর্যন্তও পৌঁছুতে পারে ঘটনাটি । কেননা বিয়ে হলেও ভিত্ পোক্ত হতে সময় লাগে।
বিয়ে হতেই দেশীয় পারিবারিক সম্পর্ক রক্ষার চাপে ক্ষতিগ্রস্ত হয় পাত্রপাত্রী যদিও ডিভোর্সের দায় বাবামায়ের নয়, পাত্রপাত্রীরই।

বিয়েতে কোনো কাজের মেয়ে আনা হয় না। তাই বউয়ের উপর যাবতীয় কাজ না চাপিয়ে প্রত্যেকেই যার যার কাজ যতটা সম্ভব করা কর্তব্য। তাছাড়া কাজে কাজের প্রতি যেমন শ্রদ্ধা বাড়ে, তেমনি পরস্পরের প্রতি সহমর্মিতাও বাড়ায়। কাজ কাজের কষ্ট উপলব্ধি করতে শেখায়, দায়িত্বশীল করে।

আর বাবা-মায়েরও ভবিষ্যতের আশঙ্কায় বর্তমানকে নষ্ট করার কোন যৌক্তিকতা নেই, কেননা ভবিষ্যত অনিশ্চিত। কে কার আগে পরপারে পাড়ি জমাবে, বলা যায় কী? দাদির একমাত্র ছেলে আমার বাবা মারা গিয়েছেন দাদির আগে। আবার আমার এক ভাইও মায়ের আগেই…। কারও জন্যেই কী কারও জীবন থেমে থাকে না?

সন্তান বাবা-মায়ের মাধ্যমে পৃথিবীতে এলেও আলাদা সত্ত্বা– তাদের আগমন, বসবাস, অবস্হান, প্রস্হান, জীবন, যৌবনের কন্ট্রোল যেখানে তাদেরই হাতে থাকে না সব সময়, সেখানে আরেকজন মানুষ আর কতটা কী করতে পারে? সন্তানকে স্বনির্ভর করা এবং নিজেও স্বনির্ভর থাকার চেষ্টা করাই উত্তম পন্থা। জীবন কঠিন। জীবনে আরেকজনের নির্ভরতায় নির্ভর করার নিশ্চয়তা থাকে না তেমন।

দেশীয় এক বিজ্ঞ কবি লিখেছেন ভালোবাসায় কিছুই চান না তিনি, শুধু একটি শুকনা মরিচ ভাজা। আমার প্রশ্ন, শুকনো মরিচ ভাজা কী একজন পুরুষের জন্যে এতই কঠিন যে আরেকজনকে ভেজে দিতে হবে? চুলায় একটি প্যান চাপিয়ে নিজে কী শিখে নেয়া যায় না?

ভালোবাসলেই কেন মেয়েদেরকে পরিবারের সকল কাজের ভার বইতে হয়? একেই কী স্বার্থপরতা বলে?
সম্পর্কে স্বার্থপরতায় আন্তরিকতার সম্পর্ক আর থাকে কী?
সহমর্মিতা ?
বিয়ে কি চুক্তিতে ঘরে কোন কাজের মেয়ে আনা?

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 7.8K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    7.8K
    Shares

লেখাটি ১৯,৮০৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.