চাপের জীবনে সহযাত্রী হওয়া যায় না

0

শিল্পী জলি:

‘প্রেমের অধিকার’ লেখাটি লিখে নানামুখী হুমকিতে আছি–

একজন হুমকি দিয়েছেন, ঐ করে নাকি একেবারে খাল তুলে ফেলবেন। টার্গেট, বাংলাদেশে বসে আমেরিকা/অষ্ট্রেলিয়া।
মশাইয়ের হয়ত নিউটনের তৃতীয় সূত্র এখনও পড়া হয়নি– জানা নেই এতো উত্তেজনা ভালো নয়,কী করতে গিয়ে নিজের আবার কী হয়ে যায়, বলা মুশকিল।

সেদিনই এক রোগী এসেছিল, ঐ করতে যেয়ে নিজের পিনাসই উল্টে ফেলেছে। জানালো অঙ্গটি খৎনাকৃত হওয়ায় তার এই অবস্হা, কাটসহ খালই উল্টে গিয়েছে । সেদিন কত কষ্টে যে হাসি চেপেছিলাম সে আর বলার নয়। তাই উত্তেজনা এলেও রয়ে, সয়ে, বুঝে। অন্যকে হুমকি দেবার আগে নিউটন সাহেবের তৃতীয় সূত্রটি মনে রাখা ভালো। যার মূলকথা ‘প্রত্যেক ক্রিয়ারই একটি সমান ও বিপরীত প্রতিক্রিয়া আছে।’

ঐ লেখারই সূত্র ধরে এক বন্ধু জানতে চেয়েছে, সহমতে সহবাস করেও মেয়েরা কেন বলে ‘আমাকে ব্যবহার করা হয়েছে’?

আমেরিকায় ডাক্তার দেখানোর ব্যাপারে ‘ইনফর্মড কনসেন্ট’ বলে একটি কথা আছে। বিষয়টি হলো, রোগীকে চিকিৎসা দিতে গিয়ে তার ভালোমন্দ, লাভক্ষতি, ঝুঁকি, বিকল্প ব্যবস্হা, খরচপাতি যত তথ্য আছে সততার সাথে আগে বিস্তারিতভাবে রোগীকে জানাতে হবে। যেনো তার পক্ষে বুঝে-শুনে সচেতনভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া সম্ভব হয় কী চায় সে। বিষয়টি ওখানেই।

প্রেমের খাতিরে আমাদের দেশীয় মেয়েরা হয়তো কখনও কখনও সহমতে সহবাসে জড়ায় বিশ্বাস রেখে। এটাকে ভালোবাসার সমর্পণও বলা যায়। সেখানে মিথ্যে প্রেমের অভিনয়, তথ্য গোপন অথবা ফন্দিফিকির করে বা নানা বাহানায় প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে সহমতে সহবাস ঘটালেও তাকে ধোঁকাবাজিই বলে। কেননা মেয়েটি সঠিক তথ্য সময়ে বুঝলে তার সিদ্ধান্ত হয়তো ভিন্ন হতো। যেমন ঘটেছিল রুবেল-হ্যাপীর কেইসে।

যদিও এমন বিষয়গুলোতে ধোঁকা খাওয়া মেয়েরা আহত হয়, তথাপি আসল ক্ষতি ছেলেদেরই। এমন প্রাকটিসে প্রকৃতি বদলে যায় তাদের। মানুষ হলেও দিন দিন মনুষ্যত্ব হারাতে থাকে, বিবেকের মরণ ঘটে।
কেননা প্রেম মানেই কারো শরীরকে টার্গেট করা নয়, শুধুই শারীরিক সম্পর্ক নয়, আত্মীক মিলনও। যদিও কখনও কখনও সম্পর্কটি ঐ পর্যায়ে গিয়েও গড়াতে পারে। তথাপি প্রেম মানুষের স্বীকৃতি, বন্ধুত্ব, উপলব্দি, কেয়ার, রেসপেক্ট, প্রোটেকশন, ভালোবাসা, প্রতিশ্রুতি, মিসিং, মুগ্ধতা ইত্যাদির সংমিশ্রণ। এভাবে একটি নির্দিষ্ট সময় গড়িয়ে যাবার পর প্রেমে যৌনতা এলেও তখনও তার দায়িত্ব দু’জনের, দায়বদ্ধতাও, প্রেমের নামে কেউ যেনো কারও দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, শর্ত ওটাই।

জাবি’র এক ইয়ার মেইটের প্রেমের কাহিনী জানতাম। যার সাথে তার বিয়ে হলেও সহবাস করার উপায় হতো না অপারেশন ছাড়া। আবার মেয়েটির পরিবারে বাবা বা ভাইও ছিল না। ছেলেটিই বিয়ে করে মেয়েটিকে ভারতে নিয়ে গিয়ে অপারেশন করিয়ে এনেছিল। কয়েক বছরের প্রেম ছিল তাদের। তাই সবই তারা খোলাখুলিভাবে আলোচনা করতে পেরেছে। একজন আরেকজনকে সাপোর্ট করেছে।

আমার একটি ক্রোয়েশিয়ান বান্ধবী আছে আমেরিকায়। তার বয়স তখন মাত্র বিশ বছর। বিয়াল্লিশ বছরের এক লোকের সাথে তার প্রেম হয়। দুর্ঘটনায় ছেলেটির পা খোঁয়া যেতেই তার বউ তাকে ছেড়ে দিয়ে চলে গিয়েছিল। আর এই মেয়েটির সাথে প্রেম করে বিয়ে হওয়ায় আবার জীবনের আনন্দ ফিরে আসে। আজও তারা একই সাথে বসবাস করছে।

আমাদের এলাকায়ই এক ইঞ্জিনিয়ারের ছেলে ভালোবেসে বিয়ে করে কেয়ারটেকারের মেয়েকে। মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও তার ভালোবাসায় ঘাটতি পড়েনি। প্রেম যদি প্রেমের মতো হয় তার মাধুর্যই আলাদা।

প্রেম দু’জন মানুষকে কাছাকাছি নিয়ে আসে, জানাজানির সুযোগ করে দেয়। অতঃপর সিদ্ধান্ত নিজেদের। শুধু যৌনতা তো যখন তখনই কিনতে পাওয়া যায় বাজারে, যত্রতত্র, কোন প্রেমেরও দরকার হয় না এসবে– ছেলেরা চাইলেও ক’জন মেয়ে আর তেমন সম্পর্ক খোঁজে?

তবে প্রেমকে যদি ধান্দা বাজির উপায় হিসেবে ব্যবহার করা হয় তাহলে তার রূপ ভিন্ন, ফলাফলও। এমন ধোঁকা বিয়ের মাধ্যমেও ঘটতে পারে। তাইতো সময় নিয়ে জানাজানির দরকার মানুষটিকে। সাবধানতা অবলম্বনেরও। ঠিকঠাকের এমনই এক বিয়ের খবর জানি যেখানে বিয়ের পর অহরহ উঁচু করে ছুড়ে ফেলা হতো বউকে। এমন বিয়েতে যৌতুক, আত্মীয়স্বজনদের নানামুখী চাপ, এবং বরকনের মাঝে পরিচয়ের স্বল্পতাও কম ঝুঁকির নয়।

মানব শিশু ভূমিষ্ট হয়েই দৌঁড়াতে শেখে না। বাবা-মায়ের হাতে অনেকটা সময় থাকে তাকে মানুষ করে গড়ে তোলার, মোটিভেট করার, জীবন শেখানো। জীবনবোধ এবং জীবন যাপনের জন্যে প্রয়োজনীয় দক্ষতা প্রদানের। অতঃপর একটু একটু করে জীবনের পথে ছেড়ে দেয়া, মৌলিক অধিকার খর্ব না করা। আর প্রেমের স্বাধীনতা মানুষের মৌলিক অধিকার। দরকার শুধু মানুষটিকেে চিনে নেয়া।

তবে প্রেমে পড়লেই যে মানুষ চেনা হয় তাও নয়। জগতে নানা লোক নানা ধান্দায় থাকে। কারও টার্গেট থাকে যেমন করে হোক মেয়েদেরকে বিছানায় তোলা আর কাজ শেষে নিজের আসল রূপ দেখানো। কেউবা বিয়ে করেও আজীবন মায়ের ছেলেই থেকে যায়, দায়িত্বশীল হতে শেখে না তারা, মায়ের যাবতীয় কথা শোনে, আর বউয়ের বদনাম গিয়ে মায়ের কানে ঢালে। এমনকি বন্ধুবান্ধবদের কাছে গিয়েও হয়তো সব গোপন তথ্য ফাঁস করে দেয়। কেউবা আবার সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে।

তাই ধনদৌলত, রূপ, প্রতিষ্ঠা সবকিছু সরিয়ে রেখে সঠিক মানুষটিকে খুঁজে পাওয়াই প্রেমের সার্থকতা– যে নারীদের শ্রদ্ধা করতে জানে, প্রতিষ্ঠার পথে সহায়তা করে, আবার দায়িত্বশীল, পরিশ্রমী, এবং মানবিকও। ভালোবাসায় যে স্বাধীনতা দিতে জানে। সর্বোপরি, পারস্পরিক সন্মানবোধ, যা যুগলদেরকে আত্মবিশ্বাসী করে।

দেশীয় অনেকেই আছেন প্রেমের বিপক্ষে, বিশেষ করে মেয়েদের ক্ষেত্রে। দেশীয় মেয়েরা যদি আর প্রেমে না জড়ায় সেক্ষেত্রে অনেক সময়ই ছেলেদের সময়ে বিয়ের কপালে, ছাই। কেননা অধিকাংশ বাবা-মাই সহসা ছেলেদের বিয়ের নাম করেন না। বাবা-মা বিয়ে দেবেন সেই ভরসায় আমার চেনা এক লোকের পঁয়তাল্লিশ বছর বয়স হয়ে গিয়েছিল, তবুও বিয়ের কোন খোঁজখবর নেই। বিয়ের কথা তুললেই তার মা বলতেন, আগে বউ পালার মতো টাকা আয় করো, তারপর বিয়ের কথা মুখে এনো। সময়ে প্রেম না হলে অনেক ছেলেরই বাবা-মায়ের দেয়া বিয়ে হতে হতে মরার বয়স হয়ে যায়, তবুও বাবা-মা তাকে খোকাবাবুই মনে করেন।

আর মেয়েদের ক্ষেত্রেও ঠিকঠাকের বিয়ে কম ঝামেলার নয় — তাদের রঙ-রূপ-গুণ এবং চরিত্রের নানামুখী বিশ্লেষণসহ বাপ-দাদার টাকার হিসাব-নিকেষ কষতে কষতে ছাতু করে ফেলা হয়। ঐশ্বরিয়াও কাতর হয়ে যাবেন ঐ চাপে। উপরন্তু, আজকাল আর ঘটকও বাড়ি বাড়ি গিয়ে পাত্রের সন্ধ্যান দেয় না। তাই সেলফ হেল্পই বেস্ট হেল্প, সময় থাকতে– পার্টনার ভালো হলে বিষয়টি খারাপ নয়।

প্রেমের মূল সুবিধা পাত্রপাত্রীকে সময় নিয়ে জানার সুযোগ। অতঃপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ। তবে বেশী কম বয়সে জীবন গড়ার চাপ থাকায় মূল ফোকাস ওখানে রাখলেই উপকার। প্রেম/বিয়েতে শত ভালোলাগা ভালোবাসা থাকলেও পরস্পরের প্রতি টান, নির্ভরতার স্হায়িত্বের নিশ্চয়তা নেই।
মেয়েদের স্বনির্ভরতা সম্পর্কে যেমন গভীরতা আনে তেমনি পারস্পরিক শ্রদ্ধা সহকারে পথ চলায়।
যৌথ সম্পর্কে চাপে থেকে সহযাত্রী হওয়া যায় না।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 478
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    478
    Shares

লেখাটি ২,৬১১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.