মাতৃত্বের নীল সময়টাকে বুঝতে শিখুন

0

নাহিদ দীপা:

২০১৭ সালের শেষ দিকে মা হবার পর খুব তাড়াতাড়িই টেনিসের দুনিয়ায় ফিরেছিলেন সেরেনা উইলিয়ামস। খেলাধূলার দিকে যাদের একটু নজর আছে, তাদের কাছে এই নামের মানুষটিকে আসলে পরিচয় করিয়ে দেয়ার কিছু নাই। বয়সে তিনি আমার চেয়ে কিছুটা বড়। আর যেদিন আমি জানলাম, আমি মা হতে যাচ্ছি, তার কিছুদিন পর জানলাম, একই সময়ে তার সন্তানও আসবে পৃথিবীতে। কোথায় খাটের তলা আর কোথায় আগরতলার মতো এই তুলনাটা কেন করছি, সেটা বলার জন্যই কি-বোর্ডে হাত দেয়া।

টেনিসের সব টুর্নামেন্টের মধ্যে বছরজুড়ে চলে চারটা গ্র্যান্ডস্ল্যাম। শুরু হয় জানুয়ারিতে, অস্ট্রেলিয়ান ওপেন দিয়ে। মাঝে ফ্রেঞ্চ আর উইম্বল্ডন। আর শেষটা ইউএস ওপেন, হয় আগস্টের শেষে অথবা সেপ্টেম্বরের শুরুতে। এবারেরটা শেষ হলো কদিন আগে। সেখানে ফাইনালে উঠে হেরে যান সেরেনা। ২৩টা গ্র্যান্ডস্লাম জিতে রেকর্ড গড়া সেরেনার এই হার শিরোনাম হতে পারতো।
কিন্তু না, পরদিন আলোচনায় এলো ম্যাচ শেষে তার অখেলোয়াড় সুলভ আচরণ! মা সেরেনা উইলিয়ামস ২০১৮’র ফেব্রুয়ারিতে পুনরায় টেনিস কোর্টে নামার পর তার খেলোয়াড়ি খবর দিয়ে না, এমন সব খবর দিয়েই আমার চোখে ধরা পড়েছেন বেশি। কখনো তার ইনজুরি, কখনো আসর থেকে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে নাম উঠিয়ে নেয়া, কখনো তার পোশাক নিয়ে বিতর্ক, আর কখনো তার মেজাজ!

কেন? খুঁজতে গিয়ে আমার চোখে পড়েছে তার সদ্য মা হবার ছাপ। ২০১৮’র সিলিকন ভ্যালি ক্লাসিক টুর্নামেন্টের একটি ম্যচ জিতেই বিদায় নেন তিনি, যেটা তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বাজে পারফরমেন্স। এরপরেই টরন্টো টুর্নামেন্ট থেকে নামই তুলে নিলেন তিনি, ‘কারণ’ ব্যক্তিগত। পরে জানা যায়, ‘মাতৃত্বের নীল সময়’ পার করছেন তিনি। ঠিক এইখানেই নিজের মিল খুঁজে পেলাম আমি, সেরেনা উইলিয়ামসের সাথে।

আর এই কদিন আগে ইউএস ওপেনের ফাইনালে হেরে যাবার পর, তার মেজাজ হারানো, আম্পায়ারকে চোর আর প্রতারক বলে গালি দেয়া, সবকিছুই কেন যেন মিলে যাচ্ছে আমার সাথে। কখনো যেটা ঘটে না, এই সময়টায় কেন যেন অপ্রত্যাশিতভাবে ঘটে যায় একে একে। যেহেতু সেরেনা উইলিয়ামসের গুণ গাওয়ার জন্য আমি এটা লিখতে বসিনি, তাই সে প্রসংগ এখানেই ইতি। তার সাফল্য গাঁথা, উইকিপিডিয়াতে খোঁচা দিলেই পাবেন। আরো যেটা পাবেন, কিন্তু পুরুষতান্ত্রিক মন বলে মানতে চাইবেন না, সেটা হলো এই ‘মাতৃত্বের নীল সময়’।

হ্যাঁ, আমার মতো মায়েদের এই সময়টা আসে। এই সময়ে আমরা হুটহাট রেগে যাই। চিল্লাপাল্লা করি। কিছুই ভালো লাগে না। প্রচণ্ড ঘুম আসে, ঘুমাতে পারি না। খিদা পায় না, আবার কারো খুব খাবার তাগিদ বাড়ে। নিজের দিকে নজর না দিতে পেরে আজীবনের ‘ক্যাটরিনা কাইফ’ লুক ধ্বংস হয়ে যায়, কেউ হয়ে যায় ভীষণ মোটা, কেউ পাটকাঠি, বাচ্চার দেখাশোনা করতে করতে ৪/৬ মাস বিরতিতে চাকরিতে ফেরত যেয়ে কিংবা ওই সেরেনা উইলিয়ামসের মতো কোর্টে নেমে চরম খারাপ পারফরমেন্স করে মেজাজ বিগড়ে যায়।

বাচ্চা পেটে আসার পর থেকে টানা দেড়/দুই বছর আধো ঘুমে রাত কাটিয়ে, সারাদিনে এতোটুকু বিশ্রাম না পেয়ে, মাথার ঠিক থাকে না আমাদের, আমার মতো মায়েদের। যখন অস্থির লাগে, সামনে কে আছে, তার সাথে আমার আচরণ কী হতে পারে-অনেক সময় ঠাহর থাকে না। কেউ হয়তো গ্লাসে পানি দিয়েছে, সেটা কেন একটু বেশি ঠাণ্ডা-সেটা নিয়ে বাসা মাথায় তোলা যায়।

হ্যাঁ, সে মেজাজ খারাপ, মন খারাপ, রাগারাগির কোনো অর্থ সাদা চোখে আপনি খুঁজে পাবেন না। কিন্তু আপনি যদি আমার মতো এই সময়টা পার করতেন, করতে পারতেন, তাহলে এতো বুঝিয়ে বলার দরকারই পড়তো না। আমার মতো যাদের বাচ্চার বয়স ১/১.৫, কিংবা তার একটু কম/বেশি, তারা কেমন আছে আমি বেশ অনুমান করতে পারি। এই সময়টা কতোটা কঠিন, সে ভুক্তভোগী মাত্রই জানে। অনেকে এই সময় ১/১.৫ বছরের বাচ্চার গায়ে হাত তোলে, তাকে মেরে ফেলে, স্বামীর সাথে ঝগড়া হয় লাগাতার, সেটা গড়ায় তালাক পর্যন্ত। কারও হয় পরকিয়া। কেউ সংসার ছেড়ে পালায়…আরো কত কত কী!

মানছি, সবার হয় না। তবে কারও কারও তো হয় বৈকি! এই সময়ে আমরা একটু সাহায্য চাই সবার। একটু ধৈর্য্য আশা করি সবার কাছ থেকে। কিন্তু, পাই কি? বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই পাই না। আমারও এই সময়টা গেছে। কিংবা কী করে বলি যে গেছে? নিজের জীবনসংগীর উপর প্রায়ই মেজাজ হারাই, নিজের মা, যে কিনা আমার এই ‘মা’ হবার প্রতিটা পর্যায়ে ছিল, আর এখনও আমার সন্তানের ছায়া হয়ে আছে, তার এতোটুকু কথা আমি নিতে পারি না, আমার বাবার সাথে অকারণে যাচ্ছেতাই বলে ঝগড়া করি, কীভাবে বলি-সেই নীল সময়কে পার হয়ে এসেছি আমি?

অনুরোধ রইলো আমাদের এই সময়টাকে একটু বুঝতে চেষ্টা করুন। আমাদের সাথে থাকুন। সেরেনা উইলিয়ামসকে তার আচরণের জন্য ১৭ হাজার ডলার জরিমানা করা হয়েছে, খেলার রাজকীয় আসরের রাজকীয় আইন অমান্যের নিয়মানুযায়ী। কিন্তু তার মন পড়ে কেউ কি আছে তাকে ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবে? আমাদের এই সাময়িক অস্থিরতাকে কাটিয়ে তোলার জন্য সাহায্য করতে হবে, এমন নিয়ম কি আছে? কেউ? নেই।

সেজন্যই খুব কাছের মানুষের কাছ থেকে শুনতে হয়, ‘মাতৃত্বের নীল সময়?’ সেটা নাকি অজুহাত। সেজন্যই বাবার সাথে ঝগড়ায় ছোট মানুষের মতো কথা না বলে থাকা, উল্টো রাগ করে পরিস্থিতি আরো গুমোট করা। খুব কাছের আত্মীয়ের কাছে শোনা-‘ওর মানসিক সমস্যা আছে’। এসব করে/বলে দূরে ঠেলে না দিয়ে, আর কটা দিন না হয় থাকুন পাশে! প্লিজ! যে মেয়েটা মা হয়েছে, তার জন্য মাতৃত্বকে বোঝা না বানিয়ে, উপভোগ্য করে তুলুন!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 3.3K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    3.3K
    Shares

লেখাটি ৯,৮৫৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.