মানসিক রোগ এবং ভূত দর্শন

0

নাজমুন নাহার:

প্রথম যখন ভূত দেখি, তখন আমি ৬-৭ বছরের। মায়ের দাদির নির্দেশ অমান্য করে তখন দৌড়ে দৌড়ে ছাদে ওঠা শিখে গেছি মোটামুটি। ছাদের চারপাশে ছিলো ছোট রেলিং আর একপাশে হাত বাড়ালেই পাওয়া যেত বিদ্যুতের তার। তাই বড়দের ঘোর আপত্তি ছিল আমাদের একা ছাদে ওঠায়।

দাদি একদিন ছাদের উপর নিয়ে দূরের একটা উঁচু পানির ট্যাংকি দেখিয়ে বললো, ওই গোল বাক্সটার ভেতর গুটি মাইরা ভূত বইসা থাকে। লম্বা কালো রঙের ভূত, লম্বা লম্বা হাত পা। মাঝে মাঝে ওরা বাক্সর উপরে বইসা বিশ্রাম নেয়, তখন যদি কোন ছোট বাচ্চাদের ছাদে দেখে, তবে লম্বা কইরা হাত বাড়ায় তাদের ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেয়।

এরপর থেকে আমরা আর ভয়ে ছাদে উঠতাম না। ছাদে ওঠার প্রচণ্ড শৈশব কৌতুহল নিয়ে একদিন ছাদে উঠে সেই গোল বাক্সটার দিকে তাকিয়ে সত্যি সত্যি সেই ভূতটাকে দেখলাম বাক্সের উপর বসে আছে। ভয়ে সেঁটিয়ে ছুটে নিচে চলে গেলাম! ভয় বা ব্যথায় চিৎকার করা বা অজ্ঞান হবার ব্যাপারটা আমার ভেতর কখনোই ছিলো না। তবে আর কখনও একা ছাদে উঠতাম না। এমনকি মাঝে মধ্যে অন্ধকারেও সেই লম্বা হাত-পা ওয়ালা ভূতটাকে দেখতাম!

দ্বিতীয়বার ভূত দেখলাম দশ বছর বয়সে। তখন আমরা আব্বার বদলির সুবাদে খুলনা চলে গিয়েছি। কোয়ার্টারের পাশেই বিশাল এক পুকুর ছিলো, টলটলে অথচ গাঢ় সবুজ ছিলো তার জল। পুকুরে এপারে ছিল আবাসিক কোয়ার্টার আর ওইপারে ছিল বিশাল পাটকল বিল্ডিং। কারখানার পাশেই ছিলো এক বিশাল পানি হাউজ, যার মুখটা ছিলো খোলা। ওই হাউজের পানিতে পড়ে কয়েকটা বাচ্চা মারা গিয়েছিলো। ছোট বড় সবাই বলতো ওই কারখানায় ব্রিটিশদের আত্মা ভূত হয়ে থাকে। খাঁ খাঁ দুপুরে বা সন্ধ্যা কেউ গেলে তাদের টেনে হাউজের কাছে নিয়ে ডুবিয়ে মারে।

আর পুকুরের তল দেশে নাকি তিনটা বিশাল বিশাল ডেকচি থাকে। মাঝে মাঝেই তারা ঘুরতে ঘুরতে ঘর ঘর শব্দ করে মাঝরাতে উঠে আসে পুকুর থেকে। শুধু তাই-ই না, পুকুরে আবার শিকলও আছে। একা কাউকে পেলে পায়ে প্যাঁচিয়ে টেনে নিয়ে যায় পুকুরের তলে।

স্কুল থেকে ফিরতাম দুপুরবেলা হাউজের পাশের রাস্তা দিয়ে। কোনদিকে না তাকিয়ে এক দৌড়ে জায়গাটুকু পার হতাম। তবুও একদিন ভুল করে তাকিয়ে ছিলাম কারখানার দোতলায়, আর জানালা দিয়ে দেখলাম একজন ধবধবে সাদা ইংরেজ চোখ লাল করে তাকিয়ে আছে। চোখবন্ধ করে এক ছুটে বাসায়।

কতদিন যে পুকুরে গোসল করতে গিয়ে পায়ে শিকল বাঁধছে আর আমি একলাফে পুকুর থেকে উঠে দৌড়ে বাসায় চলে গেছি! কত রাত যে ঘরঘর করে ডেকচির ওঠানামার শব্দ পেয়েছি!

আম্মাকে বললে আম্মা ধমক লাগাতো। বলতো, বানিয়ে বানিয়ে কথা বলবি না। আমি কিন্তু বানিয়ে কথা বলি নাই। বানিয়ে কথা বলার মতো বুদ্ধি আমার ছিলো না। আমি সত্যিই ভূত দেখেছিলাম।
তাহলে ভূত বলে কিছু আছে?

# দুটো জায়গাতেই যেটা ঘটেছে সেটা হলো- সবার কাছে শুনে শুনে আমার মনে একটা সূক্ষ্ম কিন্তু তীব্র ভয় ঢকে গিয়েছিল আমার অবচেতন মনে। সেখান থেকেই সে একটা ভৌতিক অবয়ব গড়ে নিয়েছিল ঠিক অন্যের বর্ণনা মতো, আর সময়মতো সেটাকে বাইরে এনে দেখেও ফেললাম।
এটা আসলে এক ধরনের হ্যালুসিনেশন।

এই ধরনের ভয়গুলো যদি মনে প্রবলভাবে ঠাঁই নিয়ে নেয়, তবে এটা হয়ে ওঠে এক ধরনের মানসিক রোগ, যার নাম স্কিজোফ্রেনিয়া। আমার ক্ষেত্রে এটা অসুখে পরিণত হয়নি, কারণ খুব ছোটবেলা থেকেই আমার বই পড়ার অভ্যাস তৈরি হওয়া মনে সৃজনশীল কল্পনা শক্তি বেড়ে গিয়েছিল, আর বিজ্ঞানমনস্ক চিন্তা তৈর হয়েছিল।

এবার আসি মূল প্রসঙ্গে:

মানসিক ডাক্তাররা বলেন, আমরা সবাই-ই কমবেশি মানসিক রোগে আক্রান্ত। এগুলো খুব সূক্ষ্ম সূক্ষ কাজে ফোবিয়া বা মেনিয়া ধরনের হয়ে থাকে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে নারীদেরই বিভিন্ন মানসিক সমস্যা দেখা যায়, কারণ সামাজিক ও পারিবারিকভাবে তারাই বিভিন্ন রকম মানসিক চাপে থাকে। তবে পুরুষের ক্ষেত্রেও এ সমস্যা কম নয়।

অতীতের কোনো তীব্র ভয়, হতাশা, তীব্র কোনো কষ্ট বা না পাওয়া, কোন প্রকার যৌন হয়রানি, বাবা,মা অথবা কোন প্রিয় মানুষের মৃত্যুজনিত কারণে সৃষ্টি হওয়া তীব্র শূন্যতা বা কষ্ট, অবচেতন মনের ভেতর থেকে যায়।

আমার এক বন্ধু একটি মেয়েকে পড়াতো, যে অষ্টম শ্রেণীতে পড়তো। মেয়েটা প্রথমদিকে ভালোই ছিল,পড়ালেখাতেও। কিন্তু মাস তিন-চার পরে ও খেয়াল করলো যে মেয়েটা পড়ার ফাঁকে প্রায়ই মিটিমিটি হাসতো। সেটাও সমস্যা না, সমস্যা হচ্ছে মেয়ে হাসতো ওর সাথে নয়, ওর পাশে দাঁড়ানো অদৃশ্য কারো সাথে।

আস্তে আস্তে সেই অদৃশ্য শক্তির সাথে মেয়েটি হাসির পরিমাণ বাড়তে থাকলো। মাঝে মাঝে সশব্দে খিলখিল করে হেসে উঠতো আর ব্যাপারটা এতো অপার্থিব মনে হতো যে আমার বন্ধুটি ভয়ে সেঁটিয়ে যেত। অনেকবার ভেবেছে যে মেয়েটির বাবা-মাকে বলবে, কিন্তু কীভাবে বলবে তা ঠিক বুঝো উঠতে পারে না।

একদিন মেয়েটি কাউকে বললো, “একটু বসো, আমি পড়াটা শেষ করে নেই। তারপর মজা হবে।” বলে প্রায় খিলখিল করে হাসলো, তবে যাকে বললো, তাকে আমার বন্ধুটি দেখতে পেলো না। ব্যাপারটা এতোটাই শিউরে ওঠার মতো ছিল যে সে সেইদিনই মেয়েটির বাবা-মাকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলে বললো, ওকে একজন মানসিক ডাক্তার দেখাতে। তবে মেয়ে বাবা-মা ওর উপর ভয়ংকর রেগে গেলেন এবং ওর টিউশনিটা হারাতে হলো।

বস্তুত: মেয়েটি ছিল স্কিজোফ্রেনিয়ার রোগী। এই ধরনের মানসিক রোগীরা নিজের চারপাশে অদৃশ্য একটা চরিত্র কল্পনা করে নেয়, যার সাথে সে হাসে কাঁদে আনন্দ করে।

সাধারণত অতীত জীবনের কোন আঘাত, ভয়, নীরব কোন কষ্ট বা একাকিত্ব, প্রতিকূল পরিবেশ, অনাকাঙ্খিত ভয় থেকে এই ধরনের মানসিক রোগের বীজ বপন হয় মানুষের অবচেতন মনের ভেতর, কখনও জেনেটিক্যাল ও গর্ভকালীন নানা জটিলতা বা শরীরবৃত্তীয় কোন পরিবর্তন বা ওই সময়কার কোন মানসিক চাপের কারণে এটা হতে পারে। পরবর্তীতে তার পাশে সে নিজের মনের মতো একটা সঙ্গী দেখতে পায় যে তার কাছে স্পষ্ট ও জীবন্ত একজন মানুষ হলেও অন্যদের চোখে অদৃশ্য।

স্কিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত রোগীরা সামাজিক কার্যকলাপে অনাগ্রহী হয়ে থাকে। এটা সামাজিক বা পারিবারিক কোন কাজে ভ্রুক্ষেপ করে না। কথা কম বলে ও লোকালয় এড়িয়ে চলে। তাই সামাজিক ভাবে অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পরে।
আমদের সামাজিকতা সাধারনত এ ধরনের লোকদের পাগল বলে। এদের মানসিক চিকিৎসা ও সহোযোগীতার পরিবর্তে এদেরকে সমাজ বিচ্ছিন্ন করে এদের নিয়ে নানা সমালোচনা ও তিরস্কার বা ঠাট্টা করে থাকি।

তবে মনে রাখা প্রয়োজন যে আমাদরে আর্থ সামাজিক পরিবেশ এবং জীবনবোধ এতোটাই কঠিন এবং অবৈজ্ঞানিক যে আমরা যে কেউ যে কোন সময় এ ধরনের রোগে আক্রান্ত হতে পারি।

তাছাড়া প্রতিটা মানুষই কোন না কোন ধরনের মানসিক রোগে আক্রান্ত। একটা খেয়াল করলেই দেখবেন আপনার ভেতরে কোন না কোন কিছু নিয়ে অকারণ ভয়ভীতি কাজ করে। আপনি নিজেও নানা সময়ে নিজেকে বুঝিয়েছেন, “এটা তেমন কিছু না, স্বাভাবিক ব্যাপার।” তবুও সে ভয় কাটাতে পারেননি।

সুতরাং আপনার চারপাশে যদি এমন কাউকে পান তবে তাকে মানসিক সেবা পেতে সহযোগিতা করুন। তাদেরকে আপনার আমার মতো করে এই সুন্দর পৃথিবী উপভোগ করার সুযোগ করে দিন।

মানসিক রোগের আর একটা দিক “মাল্টিপল পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার” যাকে আমরা জ্বীনে ধরা, ভূতে বা অনেকে কালিতে ধরা বলে থাকে। সেটা নিয়ে বলবো আগামী লেখায়।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 182
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    182
    Shares

লেখাটি ১,০৫৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.