‘স্বামী পরিত্যক্তা’ শব্দটি অপমানজনক

কাজী সালমা সুলতানা:

বাংলা ভাষায় নারীকে নানা বিশেষণে বিশেষায়িত করা হয়। ভালো মন্দের বাইরে সেই বিশেষণে কখনো দয়া দেখানোর মানসিকতাও লক্ষ্য করা যায়। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, নারী আসলে দয়ার পাত্রী এবং এজন্য দয়া প্রদর্শনকারীর একটা ধন্যবাদ প্রাপ্য। এমন মানসিকতার মানুষগুলো কথায় কথায় নারীকে যোগ্যতার মাপকাঠিতে অবমূল্যায়ন করে থাকে।
সমাজ এগিয়ে যাচ্ছে, তার সাথে পাল্লা দিয়ে নারীও এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু দু:খজনক হলেও সত্য যে নারীকে অবমূল্যায়নকারী মানসিক অসুস্থ মানুষের সংখ্যাও সমাজে জ্যামিতিক হারেই বাড়ছে।

নারীর জন্য অবমূল্যায়নকর এমনি একটি বিশেষণ হচ্ছে ‘স্বামী পরিত্যক্তা’। শব্দটা যে কতটা অসম্মানের, একটু গভীরে গেলেই তা বোঝা যাবে। যখন কোনো জিনিস মূল্যহীন হয়ে পড়ে, যখন জিনিসটির উপযোগিতা থাকে না, অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে, তখন সাধারণত তা পরিত্যাগ করা হয়, পরিত্যক্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়। স্বামী পরিত্যক্তা শব্দটা শুনলে মনে হয় যেন স্বামী নবাবজাদা বাজার থেকে স্ত্রী নামক নারী জিনিসটা কিনে এনেছিলেন। সেই স্ত্রী নামক জিনিসটির আর কোন উপযোগিতা বা প্রয়োজন নেই, তাই পরিত্যাগ করছেন। শব্দটির মধ্যে শুধু নারীকে অবমূল্যায়ন করাই নয়, নারীর প্রতি বৈষম্যের চিত্রও প্রকটভাবে ফুটে ওঠে।

স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক কিন্তু কোনভাবেই প্রভু-মালিকের সম্পর্ক নয়। বরং স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক হচ্ছে একে অপরের প্রতি সমঝোতা ও সহমর্মিতার সম্পর্ক, একে অপরের প্রতি সম্মান দেখানোর সম্পর্ক, মর্যাদা দেওয়া, মূল্যায়ন করার সম্পর্ক, একে অপরকে বিশ্বাস ও আস্থার সম্পর্ক। এমন সব সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির ভেতর দিয়ে জন্ম নেয় স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ভালবাসা, গড়ে ওঠে মধুর সম্পর্ক। তবে এমন সম্পর্ক গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে মানসিকতা, চিন্তা-চেতনার নৈকট্য বড নিয়ামক হিসেবে কাজ করে।

স্বামী কোনো দেবতা নয় যে স্ত্রীকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করার অধিকার রাখে। যারা এমন মানসিকতা পোষণ করে, তাদের মধ্যে সভ্যতার বিকাশ পরিপূর্ণভাবে ঘটেছে বলা যায় না। তাই সভ্যসমাজে ‘স্বামী পরিত্যক্তা’র মতো একটা কুরুচিপূর্ণ ও ধৃষ্টতাপূর্ণ শব্দ যাতে ব্যবহার না করা হয় সেজন্য নিষেধাজ্ঞা থাকা উচিত।

পৃথিবীতে নারী পুরুষের মাঝে মধুর সম্পর্ক তৈরি হয়। এরমধ্যে কোন সম্পর্ক অমর হয়, কোন সম্পর্ক হোঁচট খায়। কোন কোন সম্পর্ক ভালবাসাহীন অবস্থায় দীর্ঘদিন রক্ষা করে চলা হয়। এমন ক্ষেত্রে নানা উপসর্গ ভূমিকা পালন করে। আবার কেউ কেউ মনে করেন ভালবাসাহীন সম্পর্ক জোর করে জিইয়ে রাখার চেয়ে পৃথক হয়েও যাওয়াই উত্তম। তারা হয়তো পৃথক হয়েও যান, কিন্তু প্রশ্ন হলো- এখানে পরিত্যক্তের কী ঘটনা ঘটলো? ওই শব্দটিরই বা উপযোগিতা কোথায়?

যোগ্যতার মাপকাঠিতে নারীকে খাটো করে দেখার কোন কারণ নেই। সংসারে নারীর অবদানও বিশাল। মূল্যায়ন করা হলে সংসার নামক প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখতে নারীর ভূমিকা অনেক সময়েই বেশি লক্ষ্য করা যায়।

এই যেমন মিনা। আমার গৃহকর্মী। যেদিন ওর স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করেছে সেদিনই সন্তানদের নিয়ে চলে আসে। বলতেই হয় সাহসী এবং তার আত্মসম্মানবোধ প্রখর তার। সে দুই ছেলেমেয়েকে স্কুলে পড়াশোনা করাচ্ছে নিজের রোজগার করা অর্থ দিয়ে। বাড়ি ভাড়া দিচ্ছে, সংসারের অধিকাংশ চাহিদা তার আয় দিয়েই পূরণ করছে। সংসারে অবদান রাখা বা যোগ্যতার মাপকাঠিতে মিনাকে কীভাবে অবমূল্যায়ন করবেন?

সময় বদলেছে, দেশের সকল পেশায় ছেলেমেয়েরা কৃতিত্বের সাথে কাজ করছে। সংসার-সন্তান-পরিবার সামলে পেশাগত জীবনেও কৃতিত্বের স্বাক্ষর রাখছে নারীরা। তারপরও কিছু শব্দের ব্যবহারের মধ্য দিয়ে তাদের যোগ্যতাকে অসম্মানিত করা হয়, মর্যাদাহানি ঘটানো হয়। সমাজের নিম্ন থেকে উচ্চবিত্ত সব মেয়েরাই নিজেদের মতো চলার চেষ্টা করবে এটাই স্বাভাবিক।
অমর্যাদা ও অসম্মানজনক শব্দ প্রয়োগ করে নারীকে পিছিয়ে রাখা যাবে না। সেই মানসিকতা পরিত্যাগ করে নারীদের জন্য উদ্দীপনামূলক ও উৎসাহব্যঞ্জক শব্দ ব্যবহার করতে হবে। এটি করতে হবে সমাজকে এগিয়ে নেয়ার জন্য, দেশের প্রয়োজনে, দেশের জন্য। কিছু মানুষের অসভ্যতা, মূর্খতার প্রভাব যাতে সমাজকে কলুষিত করতে না পারে সেজন্য শব্দ ব্যবহারে সচেতন হতে হবে।

নারীর প্রতি মর্যাদা প্রদর্শন বা নারীকে সম্বোধন করার ক্ষেত্রে বিশেষণ ব্যবহার করার ক্ষেত্রে আমাদের সচেতন হতে হবে। এই সচেতনতা প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি সব ক্ষেত্রেই।
তাহলেই কেবল ‘স্বামী পরিত্যক্তা’র মতো অসম্মানজনক বা অপমানজনক শব্দ সমাজ থেকে, বাংলা শব্দভাণ্ডার থেকে চিরতরে নির্বাসিত হবে।

শেয়ার করুন:
  • 2.2K
  •  
  •  
  •  
  •  
    2.2K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.