আসুন, বৃদ্ধ নই, ক্লাসিক হই!

0

ঈহিতা জলিল:

আমার বয়স ৩৫। মানুষের গড় আয়ু যদি ৭০ হয় তাহলে আমি বলতেই পারি আমি আমার জীবনের অর্ধেকটা পার করে ফেলেছি। আহারে জীবন! আহা জীবন!

তারাশঙ্করের কবি’র মতো বলতে ইচ্ছা করে, “জীবন এত ছোট কেনে”? মরতে আমার একটুও ইচ্ছা করে না। বাঁচবার ভীষণ লোভ। মনে হয়, মরে গেলে তো মরেই গেলাম। কী সুন্দর এই পৃথিবী! কী সুন্দর সব সম্পর্ক! তাছাড়া এখনও কত কিছু করা বাকি! কত বই পড়া বাকি! কত সিনেমা দেখা বাকি! কত কিছু লেখা বাকি!

একটা সময় ছিলো বিশেষত টিন এজ বয়সে কিছু হলেই মরে যেতে ইচ্ছা করতো! কতবার যে বলেছি, ধুর! কী হবে এই জীবন রেখে! তার চেয়ে মরেই যাই! মরে যেয়ে বেঁচে যাই! এখন ওসব ভাবলে হাসি পায়! কী বোকাই না ছিলাম! হয়তো ঐ বয়সে সবাই বোকা থাকে। আমি না হয় একটু বেশিই বোকা ছিলাম! অবশ্য এখনও যে আমার খুব বুদ্ধি, তা নয়!

সে যাক! আজকে আমি যে বিষয়ে বলবো সেটি হলো অবসর জীবনের প্রস্তুতি সম্পর্কে। এই যে এখন আমাদের কত কত কাজ! দম ফেলার সময় নেই। নিজের জন্য একটু অবসর পেতে একটু একা হতে বুকের ভিতরটা হাহাকার করে ওঠে। কিন্তু একদিন তো আসবে যেদিন বুকের মধ্যে এই একই হাহাকার উঠবে কোন কাজ নেই বলে! সেদিন কী করবো? সেদিনের জন্য আমি এখন থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছি!

আসলে আমি শুরু করেছি আরও দুই বছর আগে থেকে। আমারগুলো আমি শেয়ার করছি। যাদের ভালো লাগবে না, বিনয়ের সাথে বলছি, আক্রমণাত্মক কথা বলবেন না। আমি তাদের জন্য শেয়ার করছি, যারা আমার মতো করে ভাবে। যাই হোক। প্রথমত আমি একটু একটু সেভিংস করছি। আমরা বুড়োবুড়ি যখন অনেকটা অসুস্থ হয়ে যাবো সেই সময়ের জন্য। যেহেতু আমার খুব ইচ্ছা আমার সন্তানেরা দেশের বাইরে সেটেল হবে, ওদের জীবন আমাদের জীবনের চেয়ে অনেক ব্যস্ত হবে। তাই যাতে যেকোনো আপদকালিন মুহূর্তে এটি কাজে লাগে!

অবশ্য আরেকটা ইচ্ছা আছে, তবে ওটার জন্য অনেক টাকা লাগবে। আমার অত টাকা নেই। আমি একটা আনন্দ আশ্রম করতে চাই। যেখানে আমরা সমমনা সমবয়সীরা থাকবো। জীবনযুদ্ধ করতে যেয়ে যে সময়টা হারিয়ে যাচ্ছে, আমরা আবার সময়টাকে ফিরিয়ে আনবো। একে অন্যের লেগ পুল করবো, কখনও তুমুল ঝগড়া বাঁধাবো, আবার একসাথে গান গেয়ে উঠবো। সেখানে সবাই নিজের জন্য বাঁচবে। যাদের অনেক অর্থ আছে আইডিয়াটা কাজে লাগাতে পারেন। আমি প্রচুর বই কিনি, কিন্তু পড়ার সময় পাই না। তাও কিনি। কারণ অনেক বয়স হয়ে গেলে এতো বই ক্যারি করতে পারবো না। তাই এখন থেকেই জমাচ্ছি। তখনকার অখণ্ড অবসরে শুধু বই পড়বো। চোখে না দেখলে লোক রাখবো সকাল বিকাল আমাকে বই পড়ে শুনিয়ে যাবে।

ঈহিতা জলিল

অনেক শখ ছিলো বিভিন্ন মিউজিক্যাল ইনস্ট্রুমেন্ট বাজানো শিখবো, হয়নি। তখন শিখে নিবো। সৃষ্টিকর্তাকে এখন নিয়ম করে ডাকা হয় না, তখন ঠিকঠাক হাজিরা দিবো। সব্জি বাগান করবো। হাঁস-মুরগি-গরু পালবো। আমার উঠানের জাংলায় লাউ ঝুলবে। ঘুম ভাঙবে মুরগির কককক আর গরুর হাম্বা ডাকে! তারপর টুপ করে একদিন চলে যাবো।

আপনারা যারা আমার মতো ভাবেন, তাঁরাও নিজেদের মতো পরিকল্পনা শুরু করে দিন। যার যা শখ অপূর্ণ আছে লিস্ট করে ফেলুন। দেখবেন অবসর সময়টা কেমন আনন্দের হয়ে যায়। “অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা”—যখন দেখবেন কাজ করছেন, আর সেই কাজটা যখন হয় আপনার শখ, তখন সেটির আনন্দ দ্বিগুণ হয়ে যাবে। তখন কোনো হতাশা আপনাকে ধরতে পারবে না।

যার যেমন আয়, সেটুকু থেকেই একটু একটু করে নিজের জন্য সেভিংস করুন। সন্তানদের জন্য উজার করে দিন, তবে নিজেদের জন্য একটুখানি রেখে। নিজেকে ভালো রাখার দায়িত্ব কিন্তু নিজেরই। কারণ নিজে ভালো থাকলেই অন্যকে ভালো রাখা যায়। আর সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ভালোর জন্য যে পরিবর্তন তাকে যেন গ্রহণ করি। এতে সো কল্ড জেনারেশন গ্যাপও অনেকটা কমে আসবে। এখন পর্যন্ত তো এই আমার পরিকল্পনা।

রবি ঠাকুর তো বলেইছেন, “যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে”। এ বিষয়ে ইংরেজি একটা উক্তিও আমার পছন্দ তাই জুড়ে দিলাম, “Those who fly solo have the strongest wings”.

১৬.০৯.১৮
রবিবার
বেলা-১১.২৩ মিনিট

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.2K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.2K
    Shares

লেখাটি ৩,১০৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.