আমলারা কোন ক্ষমতাবলে ছেলেমেয়েদের জীবনে হস্তক্ষেপ করে?

0

ইমতিয়াজ মাহমুদ:

খবরটা জানার পর থেকে মাথার চান্দি গরম হয়ে আছে। নানারকম কিছু কল্পনা করছি। বগুড়ার জেলা প্রশাসক বিভিন্ন হোটেল রেস্টুরেন্ট ফাস্ট ফুড জয়েন্ট থেকে ৪০ জন ছেলেমেয়েকে আটক করেছে। পরে এইসব ছেলেমেয়ের অভিভাবককে ডেকে ওদেরকে মুক্তি দেওয়া হয়। বগুড়ার জেলা প্রশাসককে কে এই ক্ষমতা দিয়েছে ছেলেমেয়েদেরকে এইভাবে হেনস্থা করার?

বগুড়া নিউজ ডট কম নামে একটা ওয়েব পোর্টালে ছবি দিয়েছে বাচ্চা বাচ্চা ছেলেমেয়েগুলিকে আর্মড পুলিশের লোকেরা ঘিরে রেখেছে। জেলা প্রশাসনের এই কুকর্মে নাকি নেতৃত্ব দিয়েছেন মমতাজ মহল নামে একজন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট।

আমি ভাবছি, আমি যদি সেইসব অভিভাবকদের একজন হতাম তাহলে কী করতাম! না, আমি ঠাণ্ডা মাথার মানুষ, আমি হয়তো সেরকম কিছু করতাম না। কিন্তু আমার ঠিকই ইচ্ছা হতো ঐসব ডিসি ফিসি আর ম্যাজিস্ট্রেট ফেজিস্ট্রেটকে জুতাপেটা করার। বদমাইশির একটা সীমা থাকা দরকার। দুইটা ছেলেমেয়ে যদি একটা রেস্টুরেন্টে যায় বা ফাস্ট ফুড জয়েন্টে যায় খাবার খেতে, আড্ডা দিতে, বা ধরে নিলাম প্রেম করতেই গেল, তাতে ওদের বাবার কী আসে যায়! ছেলেমেয়েরা একসাথে খাবার খাবে না? আড্ডা দেবে না? প্রেম করবে না? কোন দেশে কোন সমাজে বাস করছি?

ধরলাম একটা কলেজে পড়া ছেলে আর একটা কলেজে পড়া মেয়ে একসাথে আইসক্রিম খেতে গেছে, বা চাইনিজ খেতে গেছে বা ফাস্ট ফুড মারতে গেছে। তাতে কোন আইনটা ভঙ্গ হয়েছে আমাকে বলেন। বলেন আমাকে, আমাদের দণ্ডবিধির কোন ধারায় ওরা কী অপরাধ করেছে? আরে, দণ্ডবিধির কোনো ধারায় যদি বলা থাকে যে ছেলেমেয়েরা প্রেম করতে পারবে না, বা একসাথে রেস্টুরেন্টে বসে আড্ডা দিতে পারবে না, তাইলে সেই বিধানটাই অবৈধ হবে।

আপনারা কেউ ঐসব ডিসি এসপি ম্যাজিস্ট্রেট ফেজিস্ট্রেটকে বলে দেন, আমি ইমতিয়াজ মাহমুদ, বয়স পঞ্চান্ন, কৈশোরে যৌবনে আমিও বান্ধবীকে সাথে নিয়ে হোটেল রেস্টুরেন্টে গেছি প্রেম করতে। হাত ধরাধরি করে আমি ও আমার প্রেমিকা, এখন তিনি আমার স্ত্রী, আমরা একসাথে সড়কে পার্কে হেঁটে বেরিয়েছি। রিক্সায় করে, ওয়েল, বিস্তারিত বললাম না, ঘুরে বেড়িয়েছি। বৃষ্টিতে ভিজেছি। সেইসব আমাদের সুবর্ণ দিন ছিল। আমার দুইটি কন্যা আছে, ভাই বোনের বাচ্চারা আছে। আমার মেয়েরা বা আমার বোনের মেয়েরা বা ভাইয়ের মেয়েরা যদি কোনো হোটেল রেস্টুরেন্টে বা ক্যাফেতে যায় ছেলে বন্ধু বা মেয়ে বন্ধুদের সাথে, তাতে কার বাপের কী? ফাজিলের দল!

ইমতিয়াজ মাহমুদ

কারও যদি ছেলেমেয়েদের একত্রে মেলামেশা করাটা পছন্দ না হয়, সে নিজে করবে না। কেউ যদি মনে করে প্রেম করাটা অন্যায়, সে করবে না। বা সে তার বাচ্চাদেরকে বলতে পারে, এইসব করো না। বাচ্চারা সেটা শুনবে কী শুনবে না সে ওদের ইচ্ছা। কিন্তু আপনার পছন্দ-অপছন্দ আপনি অপরের ওপর চাপাতে চাইবেন কেন? জেলা প্রশাসক হয়েছেন বা ম্যাজিস্ট্রেট হয়েছেন, আইনে আপনাকে কিছু ক্ষমতা দেওয়া আছে, ভালো কথা। কিন্তু নাগরিকদের ব্যক্তিগত জীবনে হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা তো আপনাকে দেওয়া হয়নি। আপনার ভ্যালুজ অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়ার ক্ষমতা আপনাকে কে দিয়েছে?

না, আপনি মনে করতেই পারেন যে ছেলেমেয়েদের প্রকাশ্যে একসাথে ঘুরে বেড়ানো ঠিক না। সে আপনার মূল্যবোধ। সেটা ভালো কী মন্দ, কী বিকৃত সেকথা আমি বলবো না। আপনার মূল্যবোধ আপনি চাঙে তুলে রাখেন আপনার নিজের জন্যে। আমার মেয়ের উপর আপনি কেন আপনার মতামত চাপাতে চাইবেন? এটা তো অন্যায়।

শোনেন, এইসব ছেলেমেয়েরা আমাদের ভবিষ্যৎ। ওদেরকে বেড়ে উঠতে দেন। পরিপূর্ণ মানুষ হতে দেন। এই যে ছেলেবেলায় একটু প্রেম ফ্রেম করে, এটাও এই বেড়ে ওঠার প্রক্রিয়ারই একটা অংশ। ছেলেমেয়েরা প্রেম করবে, কখনও কখনও ভুল করবে, ভুল মানুষের হাত ধরবে, ভুল থেকে শিক্ষা নেবে। এক জায়গায় আছাড় খাবে, আবার সেখান থেকেই উঠে দাঁড়াবে। এইভাবেই তো মানুষ হবে, এইভাবেই না জীবন থেকেই জীবনের শিক্ষা নেবে। আপনি ঘরের কোনায় আটকে রেখে ছেলেমেয়েদেরকে বড় করবেন? ওরা সুস্থ মানুষ হবে না।

এইসব করবেন না। এই যে ছেলেমেয়েগুলিকে ধরে হেনস্থা করলেন, ওদের মনে এর কীরকম প্রভাব পড়বে ভেবেছেন? ওদের স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার পথে এইসব ভয়াবহ অভিজ্ঞতা ছাপ ফেলবে না? এই অন্যায়টা কেন করলেন ওদের সাথে?

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 297
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    297
    Shares

লেখাটি ৭৯২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.