সদরঘাট টু ইনবক্স

0

শাহরিয়া খান দিনা:

বাড়ি দক্ষিণাঞ্চলে হওয়ার কারণে ঢাকা আসা মানেই অতি অবশ্যই সদরঘাট পার হওয়া। ছোটবেলায় এই সদরঘাট পার হওয়াটা ছিল এক দুঃস্বপ্ন, এক ভয়ংকর বিভীষিকাময় জায়গা।

ভীড়ের মধ্যে পুরুষ মানুষ মেয়েদের শরীর হাতিয়ে যে চরম স্বর্গসুখ লাভ করে তা বুঝতে পারার পর থেকে ভীড় দেখলেই বুকের সামনে হাতব্যাগটা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে পেছনে পরিবারের অন্য কাউকে রেখে সামনে এগানোর পলিসি আয়ত্ব করেছিলাম। বয়স বাড়তে বাড়তে জানলাম শুধু সদরঘাট নয়, মেলার মাঠ, শপিং মল, লোকাল বাস, এমনকি হাসপাতাল! যেকোন ভীড় মানেই নারীর শরীরে অনাকাঙ্ক্ষিত হাত।

যারা এই হাত সাফাইয়ের কাজটা করে উনারা মেলা প্রতিভাবান। টের পাওয়ার মুহূর্তেই আপনি পেছনে ঘুরে তাকাবেন, দেখবেন সব ভাবলেশহীন যে যার মতো। কেউ কিছু জানে না। আপনি যদি জ্বীন ভূতে বিশ্বাসী হোন, তবে এটা তাদের কাজ ভেবে চুপ থাকতে পারেন।

কয়েকদিন আগে রিক্সা উঠেছি তো কিছুক্ষণ পরই আবিস্কার করি রিক্সাওয়ালার পশ্চাৎদেশের কিছু অংশ আমার হাঁটুর সাথে লেগে যাচ্ছে। আমি যতোই সরছি উনি কীভাবে কীভাবে যেন ঠিকই আবার কাছেই এসে যাচ্ছেন। প্রথমে ভেবেছি আমার সমস্যা৷ পা এদিক-ওদিক যেদিকেই রাখছি মনে হয় পা’টাই বেরিয়ে আসছে। বসে চিন্তা করলাম, আমি পাঁচ ফুট চার, এই দেশে পাঁচ ফুট ছয় সাতের পুরুষ তো এভেইলএবেল। উনাদের পা’তো আরো লম্বা। উনি কি তবে পুরুষদের কোলে চড়ে রিক্সা চালায়! এইবার রিক্সাওয়ালাকে বললাম, সোজা হয়ে বসেন। এতো মোচড়ামুচড়ি করলে একদম ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিব রিক্সা থেকে। পরের পথটুকু উনি সুবোধ বালকের মতোই ছিলেন।

নারী মানেই কিছু পুরুষদের চোখে একদলা মাংস। মাংস দেখলেই কুকুরের মতো জিভ লকলকে হয়ে যায়, কখনও আবার হিংস্র পশুর মতো। সেদিন শুনলাম, এক ক্লাস নাইন পড়ুয়া মেয়েকে স্কুলের যাবার পথে কনুই দিয়ে এমন জোরে বুকে ধাক্কা মেরেছে মেয়েটা অজ্ঞান হয়ে যায়।

আচ্ছা, এসব করে লাভ কী! কী আনন্দ এতে! বিকৃত মস্তিষ্কের এমন সব সাইকোতে ভরা রাস্তাঘাট। রাস্তাঘাটের এসব সাইকোর দেখা মেলে ভারচুয়াল জগতেও। এইদেশের খুব কম মেয়েই আছে যে ফেইসবুক চালায়, কিন্তু ম্যাসেঞ্জারের আদার বক্সে জঘন্য ছবি বা কুরুচিপূর্ণ কথার ম্যাসেজ পায়নি। চেনা নেই, জানা নেই, অথচ কীসব উদ্ভট অশ্লীল কথা!

সর্বোচ্চ ডিগ্রিধারী, ক্যারিয়ারে সফল অথবা পড়ালেখা করছে, ভদ্র গোছানো টাইমলাইন। মোটামুটি বা হাই প্রোফাইল ব্যক্তিত্ব। এড করার পরই শুরু হয় ইনবক্স তৎপরতা। গুড মর্নিং ম্যাসেজ দিয়ে দিন শুরু, এরপর ক্ষণে ক্ষণে কী করো? ব্রেকফাস্ট/লাঞ্চ/ডিনার টাইমে ‘খাইছো?’ জিজ্ঞেস করা। এমন না যে আপনি খুব উৎসাহ নিয়ে রিপ্লাই দিচ্ছেন, কিন্তু তাতে আবার এমন না যে তার উৎসাহে ভাটা পড়ছে! সে চলতেই থাকে। অত:পর ব্লকেই মুক্তি।

অথচ সে যদি তার বউকে লিখতো গুড মর্নিং! বউয়ের সকালটা নিশ্চিত মিষ্টি হতো। সে যদি মা’কে জিজ্ঞেস করতো, মা খাইছো? মা কতো খুশি হতো। কিংবা একসাথে শৈশব কাটানো মায়ের পেটের বোনকে একটাবার ফোন দিয়ে ‘কী করো’ জিজ্ঞেস করে, বোনটার নিশ্চয়ই ভালো লাগবে। কিন্তু সেসবের জন্য সময় নাই। অপাত্রে অনাকাঙ্ক্ষিত জায়গায় ব্যয় করার সময়ের অভাব নাই। যে আমার আশায় থাকে তার দিকে না ফিরে, যে আমাতে বিরক্ত হয় তার দিকে তাকিয়ে থাকি। কী বিচিত্র!

তো যা বলছিলাম, কারো শরীর তোমার কাছে হয়তো মাংসের দলা, কিন্তু তার কাছে মসজিদ/মন্দিরের মতোই পবিত্র। আত্মার ঘর। এইসব অপবিত্র কনুইয়ে আঘাত, হাতের চাপ, কতোটা ঘৃণা হয় যদি জানতে! কতোটা দীর্ঘশ্বাস আর অভিশাপ পাও যদি শুনতে!

এই সমাজে এমন অনেক ব্যক্তিত্বসম্পন্ন পুরুষ আছে, যারা জানে টাকায় শরীর মেলে, কিন্তু মন না গেলে মনের কাছে শরীর অর্থহীন লাগে। ভীড়ে অপরিচিত নারীর শরীর ছোঁয়ার ধান্দা নয়, বরং প্রাচীর হয়ে আগলে রাখে।

আজকাল উচ্চ শিক্ষিত বাবা-মা নিজ দায়িত্বে সন্তানদের শেখাচ্ছেন গুড টাচ/ব্যাড টাচ পার্থক্য করতে। কিন্তু এই সংখ্যা খুব অল্প। বেশিরভাগ বাবা-মা এখনো বাচ্চাদের সাথে এসব নিয়ে কথা বলতে কমফোর্ট ফিল করে না। ফলে বাচ্চারা ঠেকে গিয়ে শিখে হয়তোবা ভুলটাই শিখে।

আমাদের দেশে নৈতিক শিক্ষার তেমন ব্যবস্থা নেই। পাঠ্যপুস্তকে গুরুজনে মান্য করো আর ধর্মের ভয় বা লোভ দেখিয়ে কতটুকু নীতি- নৈতিকতার শিক্ষা হয়! উন্নত দেশগুলোতে ক্লাস থ্রি পর্যন্ত নাকি কোনো পড়ালেখাই নেই, শুধু ম্যানার শেখানো হয়। দয়া-মায়া, ভদ্রতা-বিনয়, সভ্য অথবা অসভ্য বিহেইভিয়ার এগুলো অবশ্যই শিক্ষার ব্যাপার। ছেলে-মেয়ে, পুরুষ-নারী এইসব পরিচয়ের চাইতে বড় পরিচয় আমরা সাবাই মানুষ। তুমিও মানুষ, আমিও মানুষ।

বছর বছর শুধু ফ্রিতে ভিটামিন এ ক্যাপসুল আর পোলিও টিকা দিলেই সভ্য-ভদ্র জাতি পাওয়া যায় না।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 1.1K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    1.1K
    Shares

লেখাটি ৪,০৯১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.