আমি সুমনের মা

0

বন্যা হোসেন:

—হ্যালো স্বপন, শিগগির বাসায় আসো, তোমার ভাইয়ের কাণ্ডকীর্তি দ্যাখো। এক পাগল ভাইকে আমার উপর লেলিয়ে দিসো।
—হোয়াট, কী বল কী তুমি? কেন ভাইয়া কী করেছে?
—তুমি জানো না, তোমার পাগল ভাই কী করতে পারে?
অসভ্য, শয়তান, জানোয়ার পাগলের ভান করে থাকে!
পাগলই যদি হয় তাহলে পাগলা গারদে রাখো না ক্যান?

আমার ইজ্জত নিয়ে টানাটানি করসে —আমি দুপুরে ঘুমায়ে ছিলাম, ও পিছন থেকে এসে আমাকে জড়ায়ে ধরসে! এত্তো বড় সাহস! তোমার বাপ- মাকে বলে তো কোন লাভই নাই। তারা তো সবকিছুতে আমার দোষই ধরে। তুমি এখনই বাসায় আসো — আর নয়তো আমি ঘরবাড়ি জ্বালায়া দিব আজকে — দেখি আমারে কে কী করে!

কণা ফোন রেখে দেয় ঠাস করে। অফিসে ছুটি নিয়ে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে পড়ে স্বপন। ইস্কাটন থেকে উত্তরা যেতে আজকে কত সময় যে লাগবে!

গাড়ি চালাতে চালাতে ভাইয়ার কথা ভাবছিল স্বপন। ওর বড় ভাই সুমন ছোটবেলা থেকেই একটু অন্যরকম। পড়ালেখায় খুব একটা ভালো ছিল না। বেশ বোকা, সহজ, সরল প্রকৃতির ছেলে। বাবা- মা ওর পাশে বসে তোতা পাখীর মতো পড়া মুখস্থ করিয়ে ওকে ম্যাট্রিক পাশ করিয়েছে। পলিটেকনিকে ভর্তি করিয়ে দিয়েছিল যদি কোনরকমে পাশ করে কিছু একটা করে খেতে পারে।

কিন্তু এর মধ্যেই অন্য ধরনের একটা সুযোগ এসে গেল। মামাতো ভাই রিয়াজ অনেকদিন ধরেই বলছিল সুমনকে মালয়েশিয়া নিয়ে যাওয়ার কথা। ওখানে একটা টেকনিক্যাল কলেজে ভর্তি করিয়ে দেয়া হলো অটোমোবাইল রিপেয়ারিং নিয়ে দুই বছরের একটা কোর্সে। পরে দেশে ফিরে নিজেই যেন অটোশপ চালাতে পারে।

সুমন মালয়েশিয়াতে যাওয়ার পর ৩/৪ মাস বেশ ভালোই ছিল। কলেজে যায়, বাজার করে, রান্না করে—সে হাসিখুশি, বন্ধুবৎসল আর পরিশ্রমী ছেলে। তার বন্ধু জুটে গেল বেশ কয়েকজন। মুরাদ নামের বাংলাদেশী এক ছেলের সাথে বেশ বন্ধুত্ব হলো সুমনের। সে ইঞ্জিনিয়ারিং শেষ বর্ষের ছাত্র। দুজনে একসাথে ড্রাইভিং শিখলো। পরে সুমন মামাতো ভাই রিয়াজের বাসায় না থেকে অন্যত্র বাসা নিল মুরাদের সংগে শেয়ারে। দেশে বসে সবাই ভাবলো, যাক ছেলেটা স্বাবলম্বী হচ্ছে। এভাবেই কাটছিল বেশ। এর মধ্যে হঠাৎ করে সুমনের ফোন আসা বন্ধ হয়ে গেল। রিয়াজও এসময়টা একটা ট্রেনিংয়ে অস্ট্রেলিয়াতে ছিল বউ-বাচ্চাসহ। ওরাও খোঁজ নিতে পারেনি।

এর মধ্যে সুমনের কলেজ থেকে বাবার কাছে ই-মেইল এলো, সে নাকি দু’সপ্তাহ ধরে কলেজ করছে না। বাড়ির সবার মাথায় আকাশ ভেংগে পড়লো। রিয়াজ তার বন্ধুকে ফোনে জানালে সেই বন্ধু পুলিশ নিয়ে গিয়ে দরজা খোলার ব্যবস্থা করে।

দরজা ভেংগে সুমনকে আবিষ্কার করা হয় বাথরুম থেকে। সে বাথরুমের এক কোণায় গুটিশুটি হয়ে বসে বিড়বিড় করছিলো। দেখে মনে হচ্ছিল সে কয়েকদিন ধরে ওখানেই বসে আছে…খাওয়া-দাওয়া, গোসল কিছুই করেনি। চোখ-মুখ শুকনো, উদ্ভ্রান্ত চেহারা, চোখের দৃষ্টি শুধু ঘুরছে, কোথাও স্থিরভাবে তাকায় না।

এ অবস্থায় কয়েকদিন হাসপাতালে থাকার পর রিয়াজের বন্ধু ওকে ঢাকায় পাঠিয়ে দেয় একজন পরিচিত লোকের তত্ত্বাবধানে। বাসায় ফেরার পর দেখা গেল সে সম্পূর্ণ অপ্রকৃতিস্থ। তার গায়ের প্রতিটি রোমকূপে উকুন, মাথায় উকুন। মুখে গন্ধ, চোখের দৃষ্টি ভীষণ অস্বাভাবিক। যদিও বাড়ির সবাইকে চিনতে তার কোন অসুবিধা হয়নি।

সুমনের মা রওশন আরা যদিও ভিতরে ভিতরে ভীষণ ভেংগে পড়লেন বড় ছেলের এই অবস্থা দেখে — তারপরও বিভিন্ন মানুষের সংগে পরামর্শ করে ওকে নিয়ে গেলেন সিএমএইচ এর একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে। চিকিৎসা শুরু হলো।

কী যে ঘটেছিল, ওর প্রবাস থাকার সময়ে তা এখনও অন্ধাকারাচ্ছন্ন। তবে মুরাদ ছেলেটি উধাও হয়ে গিয়েছিল। একমাস আগেই সুমনের ব্যাংকে দশ হাজার ডলার পাঠানো হয়েছিল কলেজের টিউশন ফি আর অন্যান্য খরচ বাবদ… সেই টাকাটা ব্যাংক থেকে উধাও! কলেজের ফিসও দেয়া হয়নি। ধরে নেয়া হয়, মুরাদ ঐ অর্থ নিয়ে পালিয়েছে।
কিন্তু সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, সুমন হঠাৎ করে মানসিকভাবে এতোটা বিপর্যস্ত কী করে হলো যে সে ভয় পাচ্ছে, উল্টোপালটা বলা শুরু করেছে, সে মনে করতো সবসময় তাকে কারা যেন ফলো করে। এফবিআই আর কেজিবি এজেন্টরা নাকি একসাথে তাকে খুঁজছে!

হয়তোবা মুরাদ টাকা আত্মসাৎ করে সুমনকে প্রচণ্ড ভয় দেখিয়েছে মেরে ফেলবে বলে। ও ছোটবেলা থেকেই মানসিকভাবে দুর্বল ছিল বলে এই ঘটনাটি হয়তো ওকে অপ্রকৃতিস্থ করে দিয়েছে।

ডাক্তার শক থেরাপি দেয়া শুরু করলো। বাসায় এসে মরার মতো পড়ে পড়ে ঘুমায়। ডাক্তারের কাছে যাওয়ার কথা শুনলেই সে ভয়ে চিৎকার করে হাউমাউ করে কান্না জুড়ে দিত। তারপরও তাকে জোর করে নিয়ে যাওয়া হতো।

ধীরে ধীরে বোঝা গেল সুমন পুরোপুরিভাবে একজন স্কিজোফ্রেনিক পেশেন্ট হয়ে গেছে। কিছুদিনের মধ্যেই অবশ্য অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলো। অনেকটা স্বাভাবিক হলো তার অবস্থা। শক থেরাপি আর নিতে হয় না। দুবেলা ইঞ্জেকশন আর ওষুধ খেতে হয়।

এই সময়টাতে সে হঠাৎ করেই চাকরি করার জন্য ক্ষেপে উঠলো। বিভিন্ন আত্মীয়-স্বজনের মাধ্যমে তাকে একটি কোম্পানিতে ছোট পোস্টে চাকরি দেয়া হলো। তার একটি বড় গুণ হলো, সে খুবই বিশ্বস্ত —যা এ যুগে বিরল।

তবে সে কোথাও বেশিদিন টিকতে পারেনি। একেকবার একেক রকম কারণ দেখাতো। কখনও তাকে কেউ ভয় দেখায়, বা কেউ তার সাথে বাজে ব্যবহার করেছে…এসব বলে চাকরি ছেড়ে দিত। কিছুদিন পর আবার নতুন কোন কাজে ঢুকে। এভাবেই চলছিল বেশ কয়েক বছর। নিয়মিত ডাক্তার দেখানো আর ওষুধের ব্যাপারে মা রওশন আরা সদা সতর্ক ছিলেন।

বন্যা হোসেন

কণার সংগে স্বপনের বিয়েকে বেশ স্বাভাবিকভাবেই নিল — সুমনকে বোঝানো হলো, কণা হচ্ছে তার ছোট বোন। ওদের কোনো বোন নেই কাজেই তাকে অত্যন্ত স্নেহ করতো সুমন, এবং তার মা -বাবা। সুমন বাইরে যাওয়ার সময় বলে যেত কণাকে,
— কণা, তুমি কী খেতে চাও? আমি দোকানে যাচ্ছি।
— ভাইয়া, আমার জন্য সিংগারা আর জিলাপি আনবেন প্লিজ! আদুরে গলায় বলতো কণা।
— তুমি এতো জিলাপি খাও, কালকে না এক কেজি নিয়ে এলাম।
— তাতে কী ভাইয়া, আমার প্রতিদিন জিলাপি খেতে ইচ্ছে করে।
—- ওকে, ওকে নিয়ে আসবো।

সুমনের বাবা-মা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন একটা ব্যাপারে — সুমনকে তারা সাংসারিক বন্ধনে বাঁধতে চাননি। তারা বলতেন, আমাদের অপ্রকৃতিস্থ ছেলেকে বিয়ে করিয়ে আমরা একটি নিষ্পাপ মেয়ের সর্বনাশ করতে চাই না। পাড়া-প্রতিবেশী, আত্মীয়, বন্ধুরা বলতেন, বিয়ে করালে হয়তো ঠিক হয়ে যাবে। আমাদের সমাজে অন্যের পারিবারিক ব্যাপারে নাক গলাই আমরা সবাই— এ যেন যার বিয়ে তার খবর নাই, পাড়া পড়শীর ঘুম নাই। বাবা-মা দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ বলে এসব কথা আর বেশি দূর এগোয় না।

২.
স্বপনের মোবাইলে আবার ফোন এলো। ক্ণা চিৎকার করে কান্না করছে। ছোট বাচ্চাটার কান্নাও শোনা যাচ্ছে পাশ থেকে।
— তুমি কি বাসায় আসছো না কি? ক্রুদ্ধ স্বরে কণার প্রশ্ন।
— হ্যাঁ হ্যাঁ… আমি তো আসছি, রাস্তায় জ্যাম…. কী হয়েছে কী বলবে তো… ভাইয়া কী এমন করেছে যে তুমি এতো আপসেট হচ্ছো?

করুণ স্বরে বললো স্বপন। সে তার বউকে চেনে ভালো করেই, তিলকে তাল বানানো তার স্বভাব। প্রচুর মিথ্যে বলে, সব বুঝেও না বোঝার ভান করতে হয়। প্রথম মা হওয়ার পর থেকেই কণা তার রঙ পাল্টাতে শুরু করেছে। একই বাড়িতে বাবা – মার সাথে থেকেও আলাদা সংসার, আলাদা ফ্ল্যাট। বাবা- মা অবশ্য স্বাভাবিকভাবেই নিয়েছেন ব্যাপারটাকে। তাদের এছাড়া কোনো উপায়ও ছিল না। কণা হচ্ছে একেবারে ড্রামা কুইন। অভিনয় করে তুচ্ছ ব্যাপারকে অতিরঞ্জিত করা তার খুব প্রিয় বিষয়। স্বপন মাঝখান থেকে অপরাধবোধে ভোগে। কিন্তু কণার কথার উপর কথা বলার মতো বুকের পাটা তার নেই। সে যখন এসব ভাবছে, কণা একনাগাড়ে চিৎকার করে যাচ্ছে।

— হারামজাদা, তুই আমার কথা বিশ্বাস করিস না! তোর বেজন্মা, পাগল ভাইয়ের উপর এতো বিশ্বাস… জানিস, সে আজকে আমারে জড়ায়ে ধরসিল… আমি ঘুমায়ে ছিলাম…. তোর উন্মাদ ভাই ক্যান আমারে জড়ায়া ধরবে?
এতো বড় সাহস! আজকে যদি আমি ওরে বাড়িছাড়া না করসি তো আমার নাম বদলায়া রাখবো!

স্বপন মরিয়া হয়ে বলতে যায়,
— কণা.. কণা.. প্লিজ শান্ত হও, কেন এতো ক্ষেপসো? ভাইয়া নিশ্চয়ই ইচ্ছে করে এমন করেনি। সে হয়তো ভেবেছিল আমি শুয়ে আছি। আমি শুয়ে থাকলে ও অনেক সময় আমার পাশে এসে শুয়ে পড়ে। আচ্ছা, তুমি তারপরে কী করেছো যখন দেখলে সে তোমার পাশে?
—- আরে বেকুব, আমি এতো জোরে চিৎকার দিসি যে সে ভয়ে আমাকে জড়ায়ে ধরসে… পাশের ঘর থেকে অদিত দৌড়ে আসচে… নিচে থেকে তোমার বেয়াদ্দপ বাপ- মা দৌড়ে আসচে… তারপর ঐ পাগলটারে এখান থেকে নিয়া গেসে!

ঝাঁঝালো ভাষায় কথাগুলো বলে একটু দম নিল কণা, তারপর আবার শুরু করলো,
—- দ্যাখো, স্বপন একটা কথা স্পষ্ট বলতেসি, যদি আমার সাথে সংসার করতে চাও — তোমার ঐ বেজন্মা পাগল ভাইটারে বাড়ি থেকে সরাতে হবে…. আমি চাই না কোনো পাগল আমার আত্মীয় হোক, বন্ধুবান্ধবের কাছে আমার মুখ থাকে না… তোমার মা তো আবার তার পাগল ছেলে ছাড়া কিছু বুঝে না… ঢং! ঐটারে যদি না তাড়াও, তাইলে আমি কিন্তু তোমারে ডিভোর্স দিয়া বাচ্চাদের নিয়ে চইলা যাবো!

স্বপন স্তব্ধ হয়ে বসে থাকে। কণা বোধহয় আঁটঘাঁট বেঁধেই তৈরি হচ্ছিল — ওর কথা শুনে এমনই মনে হচ্ছে… কণা তার বাবার মতোই অত্যন্ত বৈষয়িক আর ধুরন্ধর… স্বপনের শ্বশুর প্রায়ই ইংগিত করেন যে, সে বাবা মায়ের সম্পত্তির একমাত্র উত্তরাধিকারী — যেহেতু সুমন মানসিক রোগী , তাই তার সমস্ত কিছুই স্বপনের। কিন্তু স্বপন এখানে অসহায়।
সে জানে, বউয়ের সামনে সে মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়াতে পারে না… কণার কথার এতোই ঝাঁঝ… কয়েকবার বাচ্চাদের গলায় ছুরি ধরেছে, একবার নিজের গায়ে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল… ওর কথা না মানলে সে এই অস্ত্রগুলি ব্যবহার করে স্বপনকে কাবু করে ফেলে!

রওশন আরা বড় ছেলেকে নিয়ে একটি মানসিক চিকিৎসা কেন্দ্রে ভর্তি করেছেন। তিনি কাঁদতে কাঁদতে বের হয়ে এসেছেন আজ ঘর থেকে। আজকাল তার মনে হয়, একটু বিষ কিনে মা- ছেলেতে মিলে খেয়ে নিলেই সব ঝামেলা মিটে যায়। খোদা কেন তাকে এতো শাস্তি দিচ্ছেন!! বড় ছেলেটার এই অসুস্থতা তাকে ভিতরে ভিতরে শেষ করে দিচ্ছে। সারা জীবনের সংগী শওকত সাহেবও আজ কঠিন কথা শুনিয়েছেন যেন সব দায় তারই। ও যে মানসিক রোগী এই কথাটা ভুলে গেছে এসব সো-কলড শিক্ষিত লোকেরা। আজ সুমনকে কেউ ক্ষমা করতে রাজী নয়। স্বপন বাড়ি এসে উপরে গিয়ে বউয়ের অভিযোগ শুনে নিচে এসে কড়া গলায় বাবা-মাকে বলে দেয়— সুমনকে বাড়ি থেকে না সরালে ওর বউ বাচ্চা- কাচ্চা নিয়ে চলে যাবে।

একথা শুনেই শওকত সাহেব আতংকিত হয়ে পড়েন। অনেক আজেবাজে গালমন্দ করেন তিনি ৪০ বছরের পুরাতন সহধর্মিণীকে। একমাত্র সুস্থ ছেলে নাতি- নাতনি, বউ নিয়ে যদি বাড়ি ছেড়ে চলে যায়, তাহলে নাকি তিনি বাঁচবেন না — মানসিক প্রতিবন্ধী ছেলেকে সরিয়ে দিতে তার আপত্তি নেই।
—তোমার ছেলেকে হাসপাতালে রেখে আসো… এখানে স্বপনের সংসারে সমস্যা হচ্ছে, আমি এগুলো বরদাস্ত করবো না।

রওশন চুপ করে থাকেননি, তিনিও উত্তর দিয়েছেন,
— আজকে যখন ও অসুস্থ, এখন সে আমার ছেলে হয়ে গেল? কেন এতোদিন ধরে এই ভালমানুষের মুখোশ পরে ছিলে? আমি তো ওকে ছাড়া বাঁঁচবো না, আমার কথাটা ভেবে দেখেছো?
— তোমার ওকে ছাড়তে হবে। ও পাগল, উন্মাদ… ওকে বাসায় রাখলে স্বপনের বাচ্চাদের ক্ষতি হতে পারে।
— কী ক্ষতি সে করেছে এতোদিন ধরে? আজ কী ঘটনা ঘটেছে তা-ই আমরা ভালো করে বুঝলাম না, কণা উঠে লম্ফঝম্প করা শুরু করলো… আর তুমিও তার কথায় নাচা শুরু করলে? ও সবসময় ওষুধ খায়, আমি নিজে খেয়াল করি, স্বাভাবিক মানুষের মতো চলাফেরা করে, প্রতি মাসে ডাক্তার দেখাই… তারপরও তোমরা সবাই মিলে ওকে পর করে দিতে চাচ্ছো?

সুমনের বাবা একটু আপোষের সুরে বলেন,
— দ্যাখো, বোঝার চেষ্টা করো, আমারও বয়স হয়েছে, এতো স্ট্রেস নিতে ভালো লাগে না। আমি শুধু জানি, নাতি- নাতনিগুলোর মুখ না দেখলে আমার ভালো লাগে না। ওরা প্রতিদিন একবার আসে, তাতেই আমার জীবন সার্থক মনে হয়। ওরা না থাকলে আমি আর বাঁচবো না।
— আর আমি? আমার কথা ভুলে গেছো? নাতিদের জন্য আমি আমার প্রথম সন্তানকে ফেলে দিব?
— আহা, আমি কি ফেলে দিতে বলেছি নাকি? তুমি একটু ওভার রিঅ্যাক্ট করো! মাথা ঠাণ্ডা করে ভাবো, তোমারও বয়স হচ্ছে…কতদিন এই দায়িত্ব পালন করবে? ওকে ক্লিনিকে বা হাসপাতালে দিয়ে দাও। মাসে মাসে টাকা পাঠিয়ে দিব, তুমিও গিয়ে দেখে আসতে পারবে।

রওশন আরা কথা বলতে পারেন না। দুচোখের অশ্রুতে মুখ মাখামাখি। আঁচলে মুখ চেপে কাঁদেন। এই হচ্ছে বাবা? কেমন পিতা যে কিনা অসুস্থ ছেলেকে পরিত্যাগ করতে চায় তার সুস্থ সবল ছেলের সংসার রক্ষার জন্য।
ঠিক সে মূহুর্তে উপরতলা থেকে ঝনঝন করে শব্দ হলো প্লেট- বাটি ভাংগার। কণার কাজ নিশ্চয়ই! এই তো করে আসছে এতো বছর ধরে। আব্দার আর ইচ্ছে পূরণের জন্য কিছু মেয়ে এগুলো হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে। প্রথমে কাঁচের বাসনপত্র ভাংগে, পরের পদক্ষেপ হলো সন্তানের গলায় ছুরি ধরা, সন্তান ধারে কাছে না থাকলে নিজের গায়ে আগুন লাগানোর হুমকি দেয়া, বাড়ি ঘরে আগুন লাগানোর হুমকি দেয়া, আজ এর সংগে যোগ হয়েছে ডিভোর্স।

শওকত সাহেব অসহায় মুখে চোখ ছলছল করে তাকিয়ে আছেন। তার চোখের করুণ বিনীত আর্তি বুঝতে অসুবিধে হয় না তার স্ত্রীর।

এরপরই তিনি ছেলেকে নিয়ে চলে যান ক্লিনিকে। পুরো ঘটনা খুলে বলাতে ডাক্তার তাকে আশ্বস্ত করেন। আপাতত সুমনকে একমাসের জন্য ভর্তি করা হয়। দুদিন পর পর দেখতে যান। প্রথম এক সপ্তাহ ভালো মনে হলেও পরে যতবারই যান, তাকে অন্যমনস্ক মনে হয়। চোখের নিচে কালি — মাকে দেখে খুশি হয়… খাবার খোঁজে… স্বপনকে, বাবাকে দেখতে চায়। স্বপন একদিন এসেছিল, ওর বাবা একদিনও আসেনি। জিজ্ঞেসও করে না তার কথা। রান্নার কাজ করে মতিনের মা, আর তার ছেলে মতিন খোঁজ নেয় বড় ভাইয়ার — এরা এখনও মনুষ্যত্ব বিসর্জন দিতে পারেনি।

এভাবে আর পারছেন না রওশন আরা। বিছানায় শুয়ে থাকেন শুধু, ঘুম পালিয়েছে চোখ থেকে। বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে আছেন, রাতের কালিমা শেষ হতে যাচ্ছে। উঠে ফজরের নামাজ পড়েন, কোরান তেলওয়াত করেন। জানালার কাছে এসে সূর্যোদয় দেখতে দেখতে ভাবেন, এই তো আবারও একটি নতুন দিনের সূচনা হচ্ছে — দিনের আলোয় নতুন শপথে তিনি প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন।

নিচে গেট খোলার শব্দ পান শওকত সাহেব। ব্যালকনিতে গিয়ে দেখলেন তার স্ত্রী গেট দিয়ে খুব দ্রুত বের হয়ে যাচ্ছেন। ইদানিং স্বামী – স্ত্রীর মধ্যে কথা প্রায় হয় না বলা চলে। এতো সকালে কোথায় যাচ্ছে কে জানে? স্ত্রীর জন্য তার খারাপ লাগে, কিন্তু সুমনের সমস্যার কোনো সমাধান তো কেউ করতে পারলো না… স্বপনের সংসারের শান্তির কথাও তার চিন্তা করতে হয়।

ঘন্টাখানেক পর রওশন আরা সুমনকে নিয়ে ঘরে ঢুকেন। শওকত সাহেব বিরক্ত হয়ে প্রশ্ন করেন, কী ব্যাপার, ওকে নিয়ে এলে যে?
তার স্ত্রী কোনো উত্তর না দিয়ে মতিনকে বলেন উপরতলা থেকে স্বপনকে ডেকে আনতে।
— কী হলো, কথার উত্তর দিচ্ছ না কেন? তোমার কি অশান্তি না করলে ভালো লাগে না?
স্বপন তাড়াতাড়ি নেমে এলো নিচে।
— কী মা, ডেকেছো আমাকে? বড় ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে দেখে নির্লিপ্তভাবে।
সুমন এতোদিন পর ছোট ভাইকে দেখে খুশিতে জড়িয়ে ধরে। স্বপন ভাইকে হালকা ধাক্কা দিয়ে নিজেকে ছাড়িয়ে নেয়।
— হ্যাঁ ডেকেছি। আমি সুমনকে নিয়ে এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছি, ঐ হাসপাতালে ওকে রাখা যাবে না, ওরা শুধু টাকা নিয়েছে, যত্ন করে না, মনে হয় ঠিকমতো খাবারও দেয় না, ওষুধ দেয় না ডোজ অনুযায়ী, ওর অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে। স্টাফরা প্রচুর চুরি করে। আর এ বাড়িতে তো ওর জায়গা হবে না তোরা জানিয়ে দিয়েছিস, আমি আপাতত কিছুদিন গ্রামের বাড়িতে থাকবো ওকে নিয়ে, রামপুরায় তোর নানার দেয়া ফ্ল্যাটের ভাড়াটে সামনের মাসে চলে গেলে, ওখানে উঠবো। দুজনের খরচ আমি চালিয়ে নিতে পারবো আমার পেনশনের টাকা দিয়ে।

স্বপন বলে ওঠে, মা তুমি এসব কী বলছো?

শান্ত কন্ঠে মা আবার বলে,
— চিন্তা করিস না স্বপন… ভালো থাকিস, ছেলেপুলে নিয়ে। আমার আদর দিস দাদুভাইদের। আর কণাকে বলিস, ও যেন সুমনকে আর আমাকে মাফ করে দেয়। আমি এক বেজন্মা, অপদার্থ, উন্মাদের মা, অনেক অপমান হয়েছে কণার, ক্ষমা করে দিস বাবা আমাকে।

বেডরুম থেকে গুছিয়ে রাখা সুটকেস নিয়ে সুমনের হাত ধরে বেরুতে উদ্যত হোন। ঘরের বাকিরা তখনও বোবা হয়ে বোঝার চেষ্টা করছে!!

শওকত সাহেব সম্বিত ফিরে পেয়ে ছুটে যান পিছন পিছন।
—- কী হচ্ছে কী সুমনের মা!! কী বলছো তুমি? আমার অনুমতি নেয়ার দরকার মনে করলে না? আর নিজের ছেলের কথাই ভাবলে, আর আমি? আমার কথা একবারও ভেবেছো??

রওশন আরা থমকে দাঁড়ান। তারপর ঘাড় ঘুরিয়ে ধীর স্বরে বলেন,
— তোমার কথাই সবার আগে ভেবেছি। তুমি আমাকে খুব স্পষ্ট করে বলেছো, এ সংসারে সুমনের কোনো স্থান নেই। আমাদের প্রথম সন্তান সে, কিন্তু অসুস্থ বলে নিজের পিতাই যদি পিতৃত্ব অস্বীকার করে, সেখানে আমি কী করে থাকবো! তোমরা চাচ্ছো আমি যেন ওকে ফেলে দেই রাস্তায়, তারপর ভালমানুষের মতো আবার সংসার করি। আমার পক্ষে তা সম্ভব নয় বলেই চলে যাচ্ছি।

শওকত সাহেব এবার রেগে গেলেন,
— তুমি অবুঝের মতো কথা বলছো রওশন। ঐ ক্লিনিকে না রাখা গেলে অন্য কোথাও চেষ্টা করবো, পাবনায় পাঠানো যায়। তুমি কেন চলে যাবে? এটা তোমার সংসার। তুমি এই চলে যাওয়ার অর্থ বোঝ মূর্খ মেয়েমানুষ?

রওশন আরা ম্লান হাসি দিয়ে বলেন,
— সারা জীবন শিক্ষকতা করেও আমি মূর্খই রয়ে গেলাম। কী করবো, তোমাদের মতো শিক্ষা আমার নেই, আমি ভালো করে বুঝেই ডিসিশন নিয়েছি। তুমি যদি চাও ডিভোর্স পেপার পাঠিয়ে দিও, সই করে দিব! তোমার ইচ্ছে। সুমন, চল বাবা!!!

স্বপন আর তার বাবা দাঁড়িয়ে দেখলো কী দৃপ্ত পদক্ষেপে রওশন আরা সুমনের হাত ধরে বেরিয়ে যাচ্ছেন গেটের বাইরে। তাঁর স্নিগ্ধ মুখে প্রশান্তির ছায়া। সুমনের অসুখের পর থেকে সংসারে কাঁটা হয়ে থাকতেন। আজ সব বন্ধন ছিন্ন করে চলে যাচ্ছেন। সুখের চেয়ে স্বস্তি ভাল। ভরা সংসারের চেয়ে নির্জনতা ভালো।

সবসময় প্রার্থনা তার একটাই, তার মৃত্যুর আগেই যেন সুমনকে নিয়ে যান মাবুদ তার কাছে। তাঁর মৃত্যু হলে সুমনকে দেখার কেউ থাকবে না। বাবা- ভাই থাকা সত্ত্বেও মা ছাড়া আর কেউ নেই ওর এই পৃথিবীতে।

মানসিক বিকৃতি কি সুমনের? না কি কণার, স্বপনের? শওকত সাহেবের? এ সমাজের? এ সংসারের? যেখানে অসুস্থ মানুষকে আমরা বেজন্মা বলে গালি দেই, রাস্তার কুকুর বেড়ালের মতো ছুঁড়ে ফেলি, অপাংক্তেয় বলে মনে করি তাদের।

বন্যা হোসেন
অটোয়া
সেপ্টেম্বর, ২০১৮

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 963
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    963
    Shares

লেখাটি ৪,৪৪১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.