মাকে নিয়ে সন্তানের নিরাপত্তাহীনতা কেন!

0

সারা বুশরা দ্যুতি:

বেশিরভাগ সন্তানদেরই খুব বড় ধরনের একটা অক্ষমতা থাকে। সেটা হলো তারা চাইলেও মা আর বাবাকে সমান দাড়িপাল্লায় রেখে বিচার করতে পারে না। বাবারা যখন কোনো অনভিপ্রেত কাজ করে তখন তারা সেটা কোনো রকমে সহ্য করে নিলেও মা’র বেলায় সেটা করতে পারে না। এ যুগে আমরা ইকুয়ালিটি নিয়ে এতো কথা বলি, তারপরও প্রসঙ্গ যখন নিজের প্যারেন্টস এর আসে, তখন ইকুয়ালিটি ব্যাপারটা মাথা থেকে চলে যায়।

অনেক ক্ষেত্রেই সন্তানরা মা’কে বলে ফেলে যে মা, বাবা না হয় খারাপই ছিল, তাই বলে তুমিও কেন পাল্লা দিয়ে একই কাজ করতে গেলে? কট্টর নারীবাদীরা এসব সন্তানদের অনেক তিরস্কার করবেন, গাল দিবেন, তাদের বিবেকহীনতায় লজ্জিতও হবেন জানি। কারণ যুক্তি দিয়ে চিন্তা করলে তাদের রাগ হওয়া এবং তিরস্কার করা, দুটোই ঠিক আছে…কিন্তু আমার সবসময় মনে হয়েছে, পৃথিবীর কোনো সন্তান এভাবে চিন্তা করে না যে মা একজন নারী, তাই তাকে শুদ্ধ থাকতে হবে!
নাহ। এই মাইন্ডসেট থেকে সন্তানদের এই কথা আসে না, আসতে পারে না। কারণটা ব্যাখ্যা করি।

বাবারা যখন কোনো অন্যায় করে, অমার্জনীয় অপরাধ করে, তখন সন্তানদের রাগ হয়, কষ্ট হয়, অভিমান হয়, কিন্তু তাদের পায়ের তলার মাটি সরে যায় না…যেটা মা করলে সরে যায়। বাবা ভালোবাসার মানুষ, জীবনের অপরিহার্য অংশ সত্যি, কিন্তু মায়ের সাথে তো নাড়ির বন্ধন, আত্মার সম্পর্ক! দুটো কি কখনো এক হতে পারে?
বাবার ভুল ত্রুটি সন্তানের জীবনে প্রভাব ফেলে, কিন্তু মার ভুল ত্রুটি মনের গহীনে ক্ষত সৃষ্টি করে…বাবাদের অনৈতিক আচরণ তিক্ততার জন্ম দেয়, ক্ষোভের সৃষ্টি করে, কিন্তু মা কিছু করলে তো পুরো পৃথিবীটাই এলোমেলো হয়ে যায়… একজন মা যে সন্তানের কত বড় আশ্রয়, তা সন্তান মাত্রই জানে। সেই আশ্রয় যদি আঘাত লেগে নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে যে সন্তানদের অস্তিত্ব নড়বড়ে হয়ে যায়। আর সেটার ভয় থেকেই সন্তানদের মুখ থেকে বের হয়, মা, তুমি কী করে এমন করলে? কেন আমাদের কথা ভাবলে না? কেন নিজের কথা ভাবলে?

এই অভিযোগ আনার সময়, নারী-পুরুষ বৈষম্যের ব্যাপারটি চিন্তা চেতনার কোথাও থাকে না। মা নারী, তার কোনো কিছু ক্ষমা করা যাবে না, আর বাবা পুরুষ বলে সে পার পেয়ে যাবে, ব্যাপারটি কখনোই এরকম নয়। নারী হয়েও কেন তুমি স্যাক্রিফাইস করলে না কথাটি তা নয়, কথাটি হলো, আমার সবচেয়ে নির্ভরতার নিশ্চিন্তের জায়গা তুমি, সেই তুমি কী করে আমাকে এতো অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিতে পারলে? কথাটি হলো, আমার সবচেয়ে বড় সহায় তুমি, সেই তুমি কী করে আমাকে এতো অসহায়ত্ব অনুভূত করাতে পারলে? মানুষ হিসেবে তোমার জীবন নিয়ে তোমার যে কোনো কিছু করার অধিকার আছে, কিন্তু সেই অধিকারের চেয়েও আমার রক্ত মাংস ও নাড়ীতে জড়িয়ে থাকা অস্তিত্বের অধিকার বেশি মা। তা কী করে তুমি ভুলে গেলে?

অধিকার যেখানে বেশি, কষ্টও সেখানে বেশি। তাই আঙ্গুলটাও সেখানেই বেশি উঠে। জানি উচিত নয়, জানি বৈষম্য হচ্ছে, তবু আমরা অপারগ, আমরা অসহায়। সন্তান হিসেবে আমাদের ইনসিকিউরিটি আমাদের দিয়ে বলিয়ে নেয় মা, বাবা গেলে যাক, তুমি কখনো দূরে যেও না। মা, বাবা খারাপ জানি, কিন্তু তুমি আমাদের ভালো মা’ই থেকো সারাজীবন। মা, বাবা নিজের কথা আগে ভেবে আমাদের যেই কষ্ট দিয়েছে, তুমি সেই কষ্ট দিও না, তুমি অন্তত আমাদের কথা নিজের আগে ভেবো। মা, প্লিজ মা।

পৃথিবী কোথা থেকে কোথায় চলে গেছে। তবু সন্তানদের এই দুর্বলতা সবলতায় পরিবর্তিত হয়নি। হয়তো আরো অনেকগুলো দিন সময় লাগবে। হয়তো একদিন সন্তানরাও নিজেদের এই অসহায়ত্ব জয় করতে শিখে ফেলবে। তখন আর কোনো মা’ কে শুনতে হবে না, কেন এমন করলে?

কিন্তু যতদিন না এমনটা হচ্ছে, ততদিন যদি আমরা সেইসব অক্ষম সন্তানদের তিরস্কার না করে তাদেরকে মায়ের প্রতি এই অকারণ অন্ধ নির্ভরশীলতা ত্যাগ করার সময় ও সুযোগ দিয়ে তাদের বোঝার চেষ্টা করি, তাহলে কেমন হয়?

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 267
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    267
    Shares

লেখাটি ১,৪১০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.