ফেমিনিস্ট ট্রেনিং এর ফাঁকে ফাঁকে-৯

0

মারজিয়া প্রভা:

গত দুদিন ছিল নিবেদিতা মেননের ক্লাস। তিনি ভারতের একজন ফেমিনিস্ট রাইটার, একটিভিস্ট এবং জহরলাল নেহেরু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। তার লেখা Seeing like a Feminist বইটি এখন পড়ছি। ভারতে নির্ভয়া ঘটনার পরপরই এই বইটি প্রকাশিত হয় এবং ভীষণ ভাবে সাড়া ফেলে। অবশ্য বইটা পড়তে একটু খটমট লাগছে। একটু শক্ত শক্ত করে লেখা।

নিবেদিতা মেননের ক্লাস ও একটু শক্তপোক্ত ধরনের। অনেকখানি বুঝি আর অনেকখানি মাথার উপর দিয়ে যায়। তবে তার কথা বলার স্টাইল এর কারণে চুপচাপ শুনে যেতে হয়। তার চেহারাটা অরুন্ধতী রায়ের মতো। কাল মনে হলো।

প্রথম দিনেই নিবেদিতা আমাদেরকে The World Before Her মুভিটা দেখান। যখন মুভি দেখি, তখন তো মজায় দেখি, কিন্তু পরে আলোচনার সময় গিয়ে দেখলাম এই মুভির মতো কনফিউজিং আর কিছু নাই!!!

মুভিটাতে দুই জায়গার নারীদেরকে দেখানো হয়েছে। একটা মিস ইন্ডিয়া ২০১১ এর প্রতিযোগীদের, আর একটা ভারতের হিন্দু ন্যাশনাল পার্টির দুর্গা বাহিনী। মিস ইন্ডিয়ার অংশগ্রহণকারী নারীদের যখন বোটক্স করানো হচ্ছে, বুক উঁচু করে হাঁটা শেখানো হচ্ছে, বিকিনি পরে কীভাবে হাঁটতে হয় শেখানো হচ্ছে, মুখ ঢেকে শুধু পায়ের সৌন্দর্য দিয়ে তাদের মার্কস দেওয়া হচ্ছে, বলা হচ্ছে, মেয়েগুলো বুদ্ধিহীন সৌন্দর্যের শোপিস, তখন বুক উথলে উঠে। ঠিক তখনই দুর্গা বাহিনীদের বন্দুক ট্রেইনিং, ফিজিক্যাল শক্তির জন্য এক্সারসাইজ, বুক ডন, কারাতের কৌশল শেখানো দেখে মন ভরে উঠে, মন বলে এইখানেই তো নারী মুক্তি। কিন্তু দুই সেকেন্ডের মধ্যে সেই ভুল ভাংগে, দুর্গা বাহিনীর ক্যাম্পে আসা ছোট্ট মেয়েটার কথা শুনে। সে বলছে, “খ্রিস্টান, মুসলমান তার শত্রু। তাকে মারতেই সে এই ক্যাম্পে এসেছে। ”

কনফিউজড এখানে! দুর্গা বাহিনীর মৌলবাদী কথাবার্তা শুনে আপনি ফ্রিডম খুঁজে পাইতে চাবেন মিস ইন্ডিয়ার মেয়েদের মধ্যে। মিস ইন্ডিয়ায় নারীকে যখন সেক্স অবজেক্ট করে তোলার প্রাণান্তকার চেষ্টা করা হচ্ছে, তখন আপনার মন বলবে দুর্গা বাহিনীই তো ভালো।

আসলে কী হচ্ছে বলেন তো! একদিকে এক্সট্রিম প্যাট্রিয়ার্কি সিস্টেম ধর্ম, অন্যদিকে পুঁজিবাদ। দুইটাই আপনাকে খাচ্ছে, আবার কিছু জায়গায় স্বস্তি দিচ্ছে। আপনি ট্র্যাপে পড়ে ফাঁপর খাচ্ছেন, আবার একটু একটু দম ফেলতে পারছেন।

ক্যাপিটালিজমের একটা উদাহরণ বলি! এই হসপিটাল, এই গার্মেন্টস কত কত নারীর কর্মসংস্থান করেছে। নারী স্বাবলম্বী হয়ে উঠেছে। আবার সেই ক্যাপিটালিজম তৈরি করেছে পর্নোগ্রাফি, প্লাস্টিক সার্জারির বাজার। এক প্যাট্রিয়ার্কি আরেক প্যাট্রিয়ার্কির সংগে ওভারল্যাপ করছে। আমরা একটা লুপে আটকা পড়ে আছি।

নিবেদিতা মেননের সংগে একটা জোশ ডিবেট হলো কাল! সেক্স ওয়ার্কার প্যাট্রিয়ার্কির তৈরি পেশা কিনা। আমি বললাম, ম্যারেজ ইনস্টিটিউশন না থাকলে প্রস্টিটিউশনের দরকার ছিল না। আর বিয়ের ধারণা আসছে প্রাইভেট প্রপার্টির থেকে। তার মানে দাঁড়ায় সেক্স ওয়ার্কার প্যাট্রিয়ার্কির তৈরি। উনি এই ইতিহাস মানতে নারাজ। বললেন, এমন কোন কথা নাই যে, প্যাট্রিয়ার্কির আগে এই পেশা ছিল না!

আমি এইটা এভাবে বলতে পারি না। উনি বরং আমাকে কয়টা কাহিনী বললেন। প্রায় ৩০০০ সেক্স ওয়ার্কারের উপর জরিপ করা হয়েছিল ভারতে। তারা জানায়, তারা সেই পেশায় যথেষ্ট ভালো আছে। তারা অন্তত সেক্স পার্টনার চুজ করতে পারে, ডমেস্টিক ওয়ার্কার হয়ে মানুষের গু-মুত পরিস্কারের চাইতে নিজের বডি পার্টস সেল করা অনেক ভালো কাজ। কেউ যদি নিজের জ্ঞান (knowledge) বা শক্তি (labour) বিক্রি করে টাকা ইনকাম করতে পারে, তাহলে সেক্স বিক্রি করে কেন টাকা অর্জন করা যাবে না!

আবার নেপালের সাংবাদিক সারালা আপু বললো, সে একজন সেক্স ওয়ার্কারের ইন্টারভিউ নিয়েছিল। মেয়েটা বলেছিল, তার জামাই তাকে মারধর করতো, জোর করে ইন্টারকোর্স করতো, খেতে দিত না, সারাদিন বাড়ির কাজ করাতো! সে এখন খেতে পারে, বাড়ির কাজকর্ম নিজের ইচ্ছামতো করে, যার সাথে ইচ্ছা তার সাথে ইন্টারকোর্সও করতে পারে এবং তার বিনিময়ে আবার টাকাও পায়! সে তো আগের জীবনের চাইতে অনেক ভালো আছে!

আবার এও সত্য, বিশ্বের ৯০% সেক্স ওয়ার্কারই মেয়ে এখন। সুইডেনে প্রস্টিটিউশন ইলিগ্যাল। সেক্স ওয়ার্কারকে ওখানে কিছু বলা হয় না, বরং ক্রিমিনাল হিসেবে কাস্টমারকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয়। কারণ তাদের বিশ্বাস, ডিমান্ড অফ তো সাপ্লাই অফ!

আসলেই কি তাই! নাকি সাপ্লাই দিয়ে ডিমান্ড ক্রিয়েট করা হয়। ২০০৫ এ তো আইফোনের ডিমান্ড ছিল না! আজ কেন? কারণ আইফোন সেই মার্কেট দখল করে ডিমান্ড সৃষ্টি করেছে!

তবে নিবেদিতা মেননের একটা কথা দিয়ে শেষ করছি, সেক্সকে আমরা mystified (আশ্চর্যকর কোন বিষয়, ভালো বাংলা কী বলবো বুঝছি না, মানে সেক্সকে মহান কিছু ভাবি) করি বলেই সেক্স ওয়ার্কার বিষয়টা আমাদের মেনে নিতে কষ্ট হয়। আমরা একে কাজ মনে করতে পারি না।

তবে এই ডিবেট শেষ হবার নয়! নিবেদিতা মেননের যে সব কথা কনভিন্স করেছে আমাকে, তাও না। তবে ভাবনার দরজা খুলে দিয়েছে।

এই ভাবনার জন্যই তো এই কোর্স। কমলাজীর ভাষায়, ফেমিনিজম এখনও একটা জার্নি। কোন পারফেক্ট ফেমিনিস্ট এখনও গড়ে উঠেনি। তাই যুক্তি তর্ক চলবে ততদিন, যতদিন এই জার্নি শেষ না হয়!

#Sangat
#23th_Feminist_Capacity_Building_Up_Course
#Day_9

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 69
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    69
    Shares

লেখাটি ৩৬১ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.