দীপনপুরে একদিন ভালবাসায় ও কান্নায়

0

লুতফুন নাহার লতা:

ওর সাথে দেখা হয়েছিল ড.নীলিমা ইব্রাহীমের বাসায় বেশ আগে। ও হলো ফয়সল আরেফিন দীপন। যখন দেখা, তারও বেশ কিছু পরে সেই তরুণ দীপনের প্রকাশনায় জাগৃতি প্রকাশনী থেকে বেরিয়েছিল “আমি বীরাংগনা বলছি।”

১৯৯৯তে আমার চাওয়া সেই বই সারা ঢাকা শহর চষে পুরান ঢাকার বইপাড়া থেকে একটি কপি উদ্ধার করে বোন মিতু যখন পাঠিয়েছিল, তখনি উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন শহরের মঞ্চে দাঁড়িয়ে পাঠ করার ইচ্ছেতে তা এডিট করতে বসেছিলাম।


তারপরে বহুদিন পেরিয়ে গেছে। আমেরিকার বহু শহরে চোখের জলে ভেসে “আমি বীরাংগনা বলছি” পাঠ করে করে বেড়িয়েছি। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চেয়ে চেয়ে মানুষের কাছে দু’হাত পেতেছি। এবছর মার্চের শেষে শেষ শো করেছি আমেরিকার মিশিগান শহরে কথামালার অনুষ্ঠানে।

একদিন সেই অভাগা সময়ে যখন কেউ বংগবন্ধু, মুক্তিযুদ্ধ আর বীরাংগনাদের আত্ম ত্যাগের কথা বলতে পারতো না, এইসব বই প্রকাশনা একরকম নিষিদ্ধ ছিল, সেই সময়ে এই নবীন তরুণ দীপনের আকাশ ছোঁয়া সাহসী পদক্ষেপে বেরিয়েছিল এই বেদনার গাঁথা, “আমি বীরাংগনা বলছি”।

দিন কয়েক আগে থেকেই জলির সাথে কথা বলে ঠিক করে নিয়েছিলাম দীপনুরে আসবো। সিঁড়ি দিয়ে উঠেই দেখি থমথমে মুখে কান্না আগলে রেখে দাঁড়িয়ে আছে ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী আপার ছোট কন্যা ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী। ইতোমধ্যেই আমরা হারিয়েছি ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী আপাকে। আমি দু’হাত বাড়িয়ে দিতেই সে এবার বন্যার মতো ছুটে এসে আমাকে ছাপিয়ে ডুকরে উঠলো। আমাও অনেক দিনের জমানো কান্না ছিল অপেক্ষায়।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

ফুলেশ্বরীর হাত ধরেই এগিয়ে গেলাম যখন, তখন সবাই আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়েছে ভালোবাসায়, আবেগে, নিস্তব্ধতায়। অনেকেই। কেবল একটি নীল পদ্মের মতো জলি ফুটে আছে আমার বুকের ভেতর, চোখের ভেতর, শান্ত, সৌম্য। রাজিয়া রহমান জলি। প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনের স্ত্রী। মৌলবাদীদের নিষ্ঠুর চাপাতির আঘাতে নিজের প্রকাশনা দপ্তরে বইয়ের প্রুফ দেখতে দেখতে পাঁচ মিনিটের ভেতর জীবন হারিয়েছে যে দীপন। বিচার পায়নি যে দীপন! একা হয়ে যাওয়া জলির সারা জীবনের সাথী দীপন! কিশোর বয়সি দু’টি সন্তানের পিতা দীপন! অগনিত লেখক, কবি সাহিত্যিক, মুক্তমন আর মুক্ত চিন্তক যারা তাদের ভালোবাসার দীপন!


তবুও জীবন স্রোতের মতো সব অর্গল খুলে এগিয়ে যায়। থেমে থাকেনি জলি। দীপন নামের দীপশিখাটি হাতে নিয়ে এগিয়ে গেছে। প্রতিষ্ঠা করেছে দীপনপুর। কী সুন্দর করে সাজিয়েছে সব। বই বই আর বই চারিদিকে। তারই মাঝে মাঝে দীপন চেয়ে আছে সবার দিকে।

দীপনের বাবা এসে সামনে দাঁড়ালেন। সন্তান হারানোর বেদনা বুকের ভেতর অগুন হয়ে জ্বলছে যার,কী কথা বলার আছে তাকে! আমার যেন শ্বাসকষ্ট শুরু হলো! কিছুই বলার নেই আমার, এমনকি তাঁরও। বিচারহীনতার পরাজয় বুকে বাজে।

দীপনকে কেড়ে নিয়ে গেছে ওরা! ওরা! নখ যাদের তীক্ষ্ণ, নেকড়ের চেয়ে। চোখ যাদের অন্ধ, সূর্য হারা অরণ্যের চেয়ে। সভ্যতার ললাটে কলংকের কালি লেপে দিয়ে ওরা দীপনের জীবনকে কেড়ে নিয়ে গেছে! কিন্তু ওরা জানে না দীপন চিরদিন শিখা অনির্বাণ হয়ে জ্বলে থাকবে বাংলার মানুষের বুকে। বাংলার ইতিহাসে।


নীপা লায়লাকে পেয়ে, প্রিয় ছোট বোন ফারিসা মাহমুদকে পেয়ে খুব ভালো লেগেছে। ফারিসা হয়তো আমার নাটকের ভক্ত হলেও হতে পারে, কিন্তু আমি ওর ভেতরকার সত্যনিষ্ঠা, সহজ সুন্দর শিল্পী সত্ত্বার অনুরক্ত। হাসি-খুশি প্রিয় মুখ। লেখােখিতে, ছবি আঁকায় সে সমান উৎসাহী।

অন্য যারা ছিলেন সবাইকে আমার ভালোবাসা। সেদিন সবাই মিলে দীপনপুরে গান গেয়েছিলাম- আনন্দলোকে মংগলালোকে বিরাজ সত্য সুন্দর—–।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 622
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    622
    Shares

লেখাটি ২,৩৭৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.