ফেমিনিস্ট ট্রেনিং এর ফাঁকে ফাঁকে-৮

0

মারজিয়া প্রভা:

এখন লাঞ্চ টাইম। খেতে ইচ্ছে করছে না। আজ এখানেও ভূমিকম্প হয়েছে। ধাম ধাম করে সবাই নিচে নেমেছে। আমি ছাদে বসে পাহাড় দেখেছি। বৃষ্টি হচ্ছে। মায়ের হাতের ঝাল ঝাল রান্না মিস করছি। আজই প্রথম। মিস ফিস না করলে আবার কীসের বৈদেশিক ভ্রমণ!

আজ তাহলে জেনিকে নিয়ে লিখেই ফেলি। এই কোর্স সাউথ এশিয়ানদের জন্য হলেও, জেনি এসেছে সিয়েরা লিওন থেকে। আফ্রিকা মহাদেশ। একটা মজার মেয়ে। আমার সঙ্গে পুট পুট করে কথা বলে। আমি ওর উচ্চারণ অর্ধেক বুঝি, অর্ধেক বুঝি না। যেমন ওরা টেবিল বা টেবলকে টেবুল বলে। ভাষার দূরত্ব যে আসলে কোন দূরত্বই না এইখানে না এলে বুঝতাম না। আমি বকবক করি, সেও বকবক করে।

জেনির সোসাইটিতে এখনো FGM প্রচলিত। FGM মানে  female genital mutilation। অনেক আগে ‘নারী’ বইতে পড়েছিলাম। মেয়েদের ক্লিটোরেসিস কেটে ফেলা হয় বয়োসন্ধিঃকালে। ক্লিটোরেসিস হচ্ছে সেই জিনিস যা নারীকে যৌন উত্তেজনা দেয়। মাস্টারবেটের সময় নারী ক্লিটোরেসিস ইউজ করে অর্গাজম লাভ করে। এবং ইন্টারকোর্সেও৷ হ্যাঁ, জি স্পটের দরুণ পেনিট্রেশনে মেয়েরা অর্গাজম পেলেও পেতে পারে৷ কিন্তু মেয়েদের সবচেয়ে বেশি যৌন উত্তেজনা আছে ক্লিটোরেসিসে। ওরাল সেক্সেও এর ভূমিকা অত্যধিক।

জেনি এবং প্রভা

কিন্তু সিয়েরা লিওনে এই ক্লিটোরেসিস কেটে ফেলা হয় যাতে মেয়েরা যৌন উত্তেজনা না অনুভব করে। তারা যাতে আনন্দ না পায়৷ বিছানায় মরার মতো পড়ে থাকে। পুরুষের হ্যাডম যাতে প্রকাশ না পায়। মেয়েদের যৌন জীবনকে পুরো বন্ধ করে দিতেই এই প্রসেস।

জেনি লড়েছিল এই নিকৃষ্টতম প্রথার বিরুদ্ধে। নিজের ক্লিটোরেসিস সে কাটতে দেয়নি। খুব ছোটবেলায় বিয়ে হয়ে যায়৷ এই বাল্যবিবাহও সিয়েরা লিওনের ঘরে ঘরে চলে।

আর একটা নিকৃষ্ট প্রথা হচ্ছে সিয়েরা লিওনে মেয়েদের ডিভোর্সের অধিকার নেই। মেয়ের যদি জামাই মরে যায়, মেয়েকে জামাইয়ের ভাই বা কাজিনের সংগে বিয়েতে আবদ্ধ হতে হবে। যাতে সে ওই পরিবারেই আবদ্ধ থাকে। জামাই বেঁচে থাকতে মেয়ে আর কোন বিয়ে করতে পারবে না। জামাই অবশ্য পারবে।

এই যে জামাইয়ের বিয়ের পর মেয়েকে ওই পরিবারের কোন পুরুষ সদস্য বিয়ে করতে হয়, এইটা আরো জঘন্য হয়ে যায় তখন, যখন জামাইয়ের ভাইয়ের বয়স যদি ১০ বছর হয়, তাহলেও তাকেই বিয়ে করতে হয়!

জেনির মা এই প্রথার বিরুদ্ধে গিয়েছে। জেনির বাবা মারা যাবার পরে সেই ওই পরিবারের কোন ছেলেকে বিয়ে করেনি। জেনির বাবার বোন অর্থাৎ জেনির ফুপুর সংসারে থেকেছে। অন্য কোনো ছেলেক তো বিয়ে করার অধিকার তার নেই! তাকে ওই পরিবারেই থাকতে হবে। তাই জেনির ফুপুকে আশ্রয় হিসেবে বেছে নিয়েছে সে।

নাহ! কালচার যে কেবল মেয়ের জন্য অতিশয় কষ্টের তাই না! সিয়েরা লিওনে পোরো সোসাইটি নামে সিক্রেট এক সোসাইটি আছে যেখানে তিন বছর ছেলেকেও যৌন সম্পর্কে গিয়ে প্রমাণ করতে হয় যে, সে পুরুষ!

জেনি ব্র‍্যাকে কাজ করে। সিয়েরা লিওনে। জেনি যখন এসব গল্প বলে তখন হাঁ হয়ে আমরা শুনি৷ এবং জানতে পারি এখনও শ্রীলংকাতে ক্লিটোরেসিস কেটে ফেলার রীতি আছে, এখনো পাঞ্জাবের অনেক জায়গায় জামাই মরে গেলে বাধ্য হয়ে জামাইয়ের পরিবারের কোনো পুরুষ সদস্যকে বিয়ে করতে হয়।

মাঝে মাঝে যখন জেনি বলে, সব কাজ সেরে যখন বাড়ি ফেরে তাকেই ঘরের কাজ করতে হয়, খাবারটা পর্যন্ত টেবিলে দিতে হয়! তখন জেনির দিকে তাকাই আমি। এই সাংগাতে এসে প্রতিদিন লাঞ্চ, ডিনার রেডিমেড পাওয়া, রেডিমেড রুম ক্লিনিং পাওয়া! জেনি কি এক মাস মুক্তি পাচ্ছে?

নারী তো সারা বিশ্বেই ভালো নাই। ক্যাপিটালিজম নারীকে বাইরে কাজ করার সুযোগ দিলেও, ঘরের কাজ পুরুষের জন্য করেনি! নারীর উপর বরং ডাবল বারডেন তৈরি করেছে।

জেনির মতো এক মাসের এই মুক্তি অনেকের! সাংগাতের এই কোর্স, এই ট্রেনিং সেন্টারে এসে অনেক মেয়েই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। কী পরছি, কী করছি, এসব নিয়ে চোখ রাংগানির কেউ নেই, খবরদারির কেউ নেই, গুজগুজ ফুসফুসের অবকাশ নেই!

আহ! যদি ফিরে গিয়েও এই মুক্তির জীবন আমরা পাই!

#Sangat
#23th_Feminist_Capacity_Building_Up_Course
#Day_8

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 159
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    159
    Shares

লেখাটি ৫৬৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.