বাক্সবন্দী জীবন

0

শাহরিয়া খান দিনা:
মানুষ তার জন্মের পর থেকেই তার পরিবার এবং চারপাশের পরিবেশের অদৃশ্য এক বাক্সবন্দী জীবনযাপন শুরু করে।
এরপরে বইপুস্তক পড়ে চারাপাশ থেকে তথ্য নিয়ে নিজের বাক্সটা একটু একটু বড় করে। সহজলভ্য ইন্টারনেটের সুবাদে এখন যেকোনো বিষয় জানা অনেক সহজ। পুরো পৃথিবীকে এখন গ্লোবাল ভিলেজ বা একটি গ্রাম বলা হয়। যারা এর সুফল নিতে পারছেন, তাদের বাক্সটা এই পুরো পৃথিবীর সমান বড়। অর্থাৎ তারা আউট অফ বক্স তাদের চিন্তাভাবনায়।
আমরা বাঙালিরা মাশাআল্লাহ সেই লেভেলের বাক্সবন্দী!  কেউ এসি ছাড়া ঘুমাতে পারে না, নিজস্ব গাড়ি ছাড়া বের হতে পারে না শুনলেই মেজাজ খারপ করে বলি- ইশ্, কত ঢং! আবার কেউ মরিচপোড়া দিয়ে পান্তাভাত খায় শুনলে বলি, – OMG! এটা কীভাবে খায়! এটা কোনো খাবার জিনিস! অর্থাৎ আমাদের যাপিত বাক্সের বাইরে কোনকিছু দেখলে শুনলে সেটা আমাদের কাছে তাচ্ছিল্য ক্ষেত্রবিশেষ হাসির পাত্র।

শাহরিয়া খান দিনা

ভাই, তোমার সিলেবাসে নাই বলে দুনিয়ায় পড়ার মতো আর কিছু নাই, সেটা কেন ভাবো? বরং তুমি কতটা ক্ষুদ্রজ্ঞানের যে এই সিলেবাসের বাইরে চিন্তাভাবনাকে বের করতে পারছো না, সেটা ভাবো।

মানুষ যে সমাজে বাস করে সেটার পারিপার্শ্বিকতা তার দৃষ্টিভঙ্গির সীমা নির্ধারণ করে। আমি যা করলে এই সমাজে বিশৃঙ্খলা বলে বিবেচিত হয়, অন্য কেউ সেটা করে যায় অবলীলায়।
স্যরি টু সে, ইদানিং ধর্মের নামে বাড়াবাড়িগুলো বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্রেফ নোংরামি মনে হয়। নিজ ধর্মের বাইরে অন্য ধর্মের অনুসারীদের বিশেষ দিনে শুভেচ্ছা জানালেও একশ্রেণির মানুষ তাতে আপত্তি করে। কথায় কথায় যে কাউকে নাস্তিক ট্যাগ দিয়ে দেয়।
আচ্ছা, ধর্ম নিয়ে যাদের এতো অহংকার, সত্যি করে বুকে হাত দিয়ে বলেন তো, যদি এই ধর্ম আপনার জন্মসূত্রে না পেতেন, তবে আপনি কি এই ধর্মে আসতেন? উত্তরটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই না হবে। কেন জানেন? আপনার অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি এবং ধর্মান্ধতা বলে দেয় আপনি অন্য কোন ধর্মের মূলকথা পবিত্রগ্রন্থ কখনও ছুঁয়েও দেখেননি। সুতরাং আপনি অন্য ধর্মের হলেও কখনই ধর্ম পরিবর্তন করতেন না। পিকে সিনেমার মতো বলতে হয়, যখন দুনিয়ায় আসছেন আপনার ধর্ম কী হবে সেই ঠাপ্পা বা চিহ্নটা কোথায় দিয়ে দেওয়া হয়েছিল পারলে একটু দেখান তো!
ধর্ম সেটা না যা আপনি বিশ্বাস করেন, ধর্ম সেটাই যা আপনি ধারণ করেন। আপনি দাঁড়ি রেখেছেন, হিজাব পরছেন, হজ করেছেন, ফেইসবুকে ধর্মের বাণী শেয়ার দিচ্ছেন, অথচ পরের হক মেরে দিচ্ছেন, কিংবা কথায় কথায় মানুষকে আঘাত দিচ্ছেন, সুদ/ঘুষ খাচ্ছেন, তাহলে আপনি যতটা না ধার্মিক, তারও অধিক ভণ্ড।
ইদানিং এক শ্রেণীর নারীদের দেখা যায় তারা অতি ধার্মিক লেবাসে চলেন এবং ধর্মের দোহাই দিয়ে অন্যের সমালোচনা করেন। আপনি দ্বীনের দাওয়াত দিয়ে নিজ দায়িত্ব পালন করতে চাইছেন, ভালো কথা, তবে অন্যকে বিব্রত করা কতটুকু সভ্যতা, তা চিন্তা করা দরকার।
বড় কথা হচ্ছে, আপনাকে ধর্ম প্রচারের জন্য মনোনীত করা হয়নি, পালন করতে বলা হয়েছে মাত্র।  নিজেরটা ঠিকঠাক করুন, পরের ভুল ধরতে গেলেই সমালোচনা করতে হবে সেটা তো কোনো কাজের কথা হলো না। সো, অন্যে কী করলো, সেটা বাদ দিন। যার যার কবরে সে সে যাবে। যার হিসাব সেই দিবে। অহেতুক অন্যের টেনশন নিয়ে ব্লাডপ্রেশার বাড়ানোর দরকার নাই তো।
এখনকার এই ব্যস্ত জীবনে আমাদের চারপাশ দেখা তো দূর আকাশ দেখাই দায় হয়ে গেছে। কখন চাঁদ উঠে, কখন সূর্য ডুবে, আমরা তার খবর রাখি না। অফিস টু বাসা আর মাঝে মাঝে টিভি।
সুযোগ পেলে বের হওয়া দরকার, দেখা প্রয়োজন ঘাসের উপর পড়ে থাকা একফোঁটা  শিশিরজলও কতটা সুন্দর হতে পারে! উপলব্ধি করা প্রয়োজন, অতি ক্ষুদ্র পতঙ্গেরও হয়তো একটা  অপূর্ব রঙিন পৃথিবী আছে।
আকাশ, পাহাড়, সমুদ্রের মতো বড় কিছুর সামনে দাঁড়ান, উপলব্ধি করুন নিজেকে। কারো সাথে তুলনা করতে হলে এদের সাথেই  নিজের তুলনা করুন। নিজের বাক্সটা বড় করুন, পারলে আউট অফ বক্স হোন। নিজে ভালো থাকুন, আশেপাশের মানুষকে ভালো রাখুন।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 268
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    268
    Shares

লেখাটি ১,০০৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.