ফেমিনিস্ট ট্রেনিং এর ফাঁকে ফাঁকে-৭

0

মারজিয়া প্রভা:

কাল ছিল প্রথম ফ্রি ডে। ফ্রি ডে মানে হচ্ছে কাল কোনো ট্রেইনিং ছিল না। আমরা কাল নেপাল ঘুরেছি। এতো ঘুরে পা ব্যথা করে ফেলেছি। কাল আমাদের রুমমেট চেঞ্জ হয়েছে। সাত দিন পর পর আমাদের রুমমেট চেঞ্জ হবে। যে কয়টা দেশ অংশগ্রহণ করছে, প্রায় সব দেশের রুমমেট আমরা পাবো। তাদের দেশ সম্পর্কে জানবো, কালচার সম্পর্কে জানবো। আর এক্সট্রা খাতির করবো যেন তাদের দেশে গেলে কম টাকায় বাজেট ধরায় দেয়।

এবার আমার রুমমেট আয়েশা। মালদ্বীপের ও। ওরা উচ্চারণ করে ‘মলদিভস’। সারাদিন ট্রেইনিং এ ওরে বোরকা পরা দেখতাম। কাল আমার পাশে শার্ট পরে ঘুমাইছে। মালদ্বীপ এখন পুরা ইসলামিক ফান্ডামেন্ডালিস্টদের আখড়া হয়ে গেছে। মুসলমান ছাড়া অন্য কোন ধর্মের লোক সেই দেশের অধিবাসীই হতে পারবে না! অথচ দশ বছর আগেও এই দেশের এই অবস্থা ছিল না।

আমাদের একটা প্রেজেন্টেশন ছিল নিজ দেশের এন্টি ওমেন কালচার নিয়ে কথা বলতে। সে কত কালচার! নেপালে প্রথম মাসিকের সময় মেয়েকে অন্ধকার ঘরে সাতদিন আটকে রাখা হয়। সেইসময় কোন পুরুষের দেখা তারা পায় না। বাবা, ভাই যে কেউ হোক। ওই সাতদিন নো দেখাদেখি। এই প্রক্রিয়ার নাম ঝাউপানি। আমাদের সব পার্টিসিপেন্টের এডলসেন্ট জীবনে এই ভয়ংকর সময়ের মধ্য দিয়ে গেছে। এর মধ্যে উষাদি ২১ দিন অন্ধকার ঘরে ছিল তার প্রথম মাসিকের সময়। উষাদি আমাদের চাইতে অনেক বড়। এখনকার মেয়ে ৭-১১ দিন থাকে!

নেপালে আরেকটা কালচার আছে ঋষি নাগপঞ্চমী। এই দিনে ৩৬৫ বার মাটি দিয়ে মেয়েদের ভ্যাজাইনা ধুতে হয়। এই সেপ্টেম্বরেই এইটা হয়। কমলাজি বলে, আমরা সাংগাতে সবাই মিলে এই উৎসব করবো। হি হি!

নেপালে আরেকটা প্রথা আছে দেউকি। হিমালয়ের দিকে এই প্রথা আছে। মাসিক না হওয়া কুমারী কচি মেয়েকে নিয়ে আসা হয় মন্দিরে। ৩২ টা কোয়ালিফিকেশন মিলতে হয় সম্ভবত। কী কী গুণ, অত জানি না। তারপর সে মন্দিরেই থাকা সারাজীবন। মন্দির থেকে কিছু দূরে একটা বাড়িতে থাকে। যারা মন্দিরে দেবতার ভোগ নিতে আসে, তারা ইচ্ছেমতো দেউকিকে ভোগ করে। শী ইজ এভেইলেবল ফর অল। ২০০৫ সালে এই প্রথা ব্যান করা হয়েছে। তবুও চুপিসারে চলছে এই কাজ।

কাল প্রথমেই গেলাম নেপালের এক “কুমারী দেবী”কে দেখতে। যাওয়ার পথের দরজায় লেখা ‘লিভিং গডডেস’! আমি তো ডেঞ্জারাস ব্যাপার ভাবলাম। হাত ধুয়ে দেবীর ঘরে ঢুকতে হলো। জানলাম এখানেও মাসিক হবার আগে ছোট মেয়ে যে ওই ৩২ কোয়ালিফিকেশন সম্পন্ন হয়, তাকে সিলেক্ট করা হয়। এই কোয়ালিফিকেশনের একটা জানলাম পূজাদির কাছে। কুমারী মেয়েকে সবাই মিলে ভয় দেখায়, মেয়ে যদি ভয় না পায়। সে দেবীর পরীক্ষায় পাশ।

কিন্তু দেবী যখন এলো ঘরে। বুক উথলে কান্না পেল। ৫ বছরের পুঁচকে মেয়ে লাল জামা পরে লাল সিঁদুর মেখে দেবী সেজে বসে আছে৷ লোকে যাচ্ছে, সেই সিঁদুর পরে আশীর্বাদ করছে, লোকে টাকা দিচ্ছে। কী বিজনেস!

এই ৫ বছর বয়সী মেয়ের জীবনে কোন খেলনা নাই, বন্ধু নাই, কোন শৈশব নাই। সে দেবী। আগে প্রথা ছিল এই দেবী মাসিকের পরেও স্বাভাবিক জীবনে আর আসতে পারতো না। জীবনে সে বিয়ে, যৌনতা কিছুই করতে পারতো না। তাকে সর্বদা “কুমারী” (ভার্জিন) এর ট্যাগ লাগায় রাখতে হতো।

এখন অবশ্য মাসিক হলেই এই লিভিং গডডেস মানুষের জীবন পাবে।

আমার মন্দিরের রক্ষাকর্তাদের থাপড়াইতে মন চাচ্ছিলো, শালারা কাজ শিখস না। সোজা পথে আয় করবি বলে এই ধর্মের ব্যবসা টিকায় রাখছস। মরতেও পারস না তোরা!

মারজিয়া প্রভা

ভারতের পার্টিসিপেন্টদের প্রেজেন্টেশন দেওয়া সাবিত্রী ব্রত, কনকাঞ্জলি, পাকিস্তানের হিল্লা বিয়ে, অনার কিলিং, আফগানিস্তানের বউ বেচাকেনা এইসব কালচার শুনে সেদিন আমরা খুব ট্রমাটাইজড হয়ে গেলাম। আর কাল এই কুমারী দেবীকে দেখে আরেকবার।

কী এন্টি উইমেন কালচার জনপ্রিয় আকারে চলছে দেশে দেশে, বহাল তবিয়তে। ভাবতে পারি না আর! সিয়েরা লিওনের জেনির কথা লিখতে আরেকটা পোস্ট লেখা লাগবে। সময় করতে পারছি না তার কথা লেখার।

আজ নতুন মেন্টর নিবেদিতা মেননের ক্লাস। আমি উনাকে কমলাজির বোন ভেবেছিলাম। প্রায় একই চেহারা দুজনার! কাল ডিনারে দেখা। আজ ক্লাসে দেখা হবে।

তো যাই।

#Sangat
#23th_Feminist_Capacity_Building_Up_Course
#Day_7

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 105
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    105
    Shares

লেখাটি ৪৪৫ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.