ফেমিনিস্ট ট্রেনিং এর ফাঁকে ফাঁকে-৬

0

মারজিয়া প্রভা:

আপনি যখন প্যাট্রিয়ার্কির খুঁটিনাটি বুঝবেন, কিংবা জানতে পারবেন কীভাবে প্যাট্রিয়ার্কির শেকড় গ্রথিত আছে আমাদের চারপাশের স্ট্রাকচার আর আইডিওলজিতে, সেদিন থেকে আপনি ইন্ডিভিজুয়াল কাউকে দোষ দিতে ভুলে যাবেন। আপনি সেদিম রহিম-করিমকে দোষ দিবেন না, আপনি দোষ দিবেন না আপনার পাশের বাসার কুটনি ভাবীকে, কিংবা সেই
শাশুড়ি আম্মাকে যে বউকে ভাত খেতে দিবে না বলে পানি ঢেলে দেয়, কিংবা সেই পরিবার বা আত্মীয়কে যে আপনার পোশাককে উগ্র বলে।

এই যেমন আমি আমার চারপাশে থাকা প্যাট্রিয়ার্ক সমাজের নারী পুরুষরে খুব একটা আজকাল দোষ দেই না। তারা এতোদিন যা শিখে এসেছে, যা প্র্যাকটিস করে আসছে, তাই তারা ‘ভালো’ বলে জেনে এসেছে! তাই “ঠিক” বলে জেনে এসেছে। প্যাট্রিয়ার্কি সোসাইটির সংগে খাপ খাইয়ে নিতে নিতে তারা সেইটার সংগে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। আজ যদি আপনি এসে তাদের সেই এতোদিনের অভ্যাসকে প্রশ্ন করেন, বা সেইটা ঝড়ের মতো ভেংগে চুরমার করে দিতে চান, তারা সেইটা করতে দিবেই বা কেন? বুক আগলে দিয়ে পুরুষতন্ত্রকে বাঁচাবে না?

তাই ইন্ডিভিজুয়াল পারসন নয়, সিস্টেমকে প্রশ্ন করেন। হ্যাঁ মানছি, ইন্ডিভিজুয়াল পারসন না বদলালে সিস্টেম একই থেকে যাবে। তাই ঝাঁকি আপনাকে মারতেই হবে। দ্যাখেন, বিশ্বের পাওয়ারফুল ব্যক্তিবর্গ প্যাট্রিয়ার্কি নিয়ে বসে আছে। ফেমিনিজম তাদেরকে ঝাঁকি দিচ্ছে। কী প্রবল ঝাঁকি! কমলাজির (কমলা ভাসিন) মতে, সবচেয়ে ডেঞ্জারাস ‘ইজম’ হচ্ছে ফেমিনিজম।

কিন্তু এই পুরুষতান্ত্রিক সিস্টেম হুট করে এলো কেমনে?

নাহ হুট করে আসেনি। এঙ্গেলসের বিখ্যাত বই The Origin of the Family, Private Property, and the State এ মানব সমাজকে তিনভাগে ভাগ করা হয়েছে। একসময় মানুষ ছিল savage। মানুষ পশুর মতো জীবনযাপন করতো। কাঁচা মাংস খেতো। এরপর এলো barbaric stage। মানুষ পশু পালনে অভ্যস্ত হলো, আগুন বানানো শিখলো। এই যুগের মাঝামাঝি সময়ে এলো প্রাইভেট প্রোপার্টির ধারণা। মানে ব্যক্তিগত মালিকানা।

এর আগ পর্যন্ত সমাজ ছিল সাম্যবাদী এবং মাতৃতান্ত্রিক। বাবার কোন পরিচয়ের দরকার ছিল না। মায়ের নামে নামে পরিচয় হতো গোত্রের। মাদারহুডকে প্রকৃতির সাথে তুলনা করা হতো। কে বাবা সেইটা জানার প্রয়োজন ছিল না! কেননা মা বাচ্চা জন্ম দিচ্ছে প্রাকৃতিকভাবে, সেইটার সাক্ষী সবাই আছে। হুদাই বাপ কে, সেইটা খুঁজতে যাবে ক্যান!

প্রাইভেট প্রোপার্টির সময়ই পুরুষের হুট করে টনক নড়লো, সে মারা গেলে তার সম্পত্তি পাবে কে? তার উত্তরসুরি দরকার। কিন্তু কে তার উত্তরসুরি? কেউ তো বাপের নাম জানে না। তখনই প্রয়োজন পড়লো নারীকে লক করার। যে তোমার জরায়ুতে খালি আমার বাচ্চা জন্মাবে। এই লকড প্রসেসে পুরুষ কিন্তু ঢুকে নাই। সে শুধু নারীকে লক করে দিছে। কিন্তু বাইরে তার কামনা-বাসনা চরিতার্থের জন্য রেখে দিল প্রস্টিটিউশন।

প্রাইভেট প্রোপার্টির সময় থেকে শুরু হয় প্যাট্রিয়ার্কি সমাজ ব্যবস্থা। এবং মার্ক্সিস্ট ফেমিনিস্টরা কিন্তু বিশ্বাস করে প্রাইভেট প্রোপার্টি অর্থাৎ ব্যক্তিগত সম্পদের ধারণা চলে গেলে এমনিতেই প্যাট্রিয়ার্কি উবে যাবে।

কিন্তু এইখানে এসে সবার মনে একটা প্রশ্ন আসবে, কেন সেদিন নারীরা প্রাইভেট প্রোপার্টির দখলটা নিজেরা করেনি! তাহলে তাদের উত্তরসুরিরাই তো প্রোপার্টি পেত।

মারিয়া মাইস সুন্দর করে এই বিষয়টা বর্ণনা করছে তার Patriarchy and Accumulation on a World Scale বইতে। পুরুষ এবং মেয়েরা শিকারের কাজ করতো। কিন্তু লেবার ডিভিশনে পুরুষরা শিকারের কাজ বেশি ইনভলভড হয়ে গিয়েছিল। মেয়েরা বাচ্চা জন্ম দেওয়া, দুধ খাওয়ানো, বাচ্চা পালার জন্য বেশি সময় ধরে শিকারে দিতে পারতো না। প্রাইভেট প্রোপার্টির মূল বিষয় হচ্ছে তোমার বেশি প্রপার্টি থাকতে হবে, সেই জায়গায় পুরুষ বেশি সময় ধরে কাজ করতো, আলটিমেটলি সে বেশি প্রোপার্টি সংগ্রহ করতে পেরেছিল। তার পাশাপাশি তারা উইপন বানাতো নিত্যনতুন। একদিকে প্রচুর সম্পদ (মাংস, শস্য) কালেক্ট করলো, অন্যদিকে উইপন দিয়ে নারীকে কন্ট্রোল করলো।

ব্যাপারটা এরকমভাবে ভিজুয়ালাইজ করেন! আপনি বেশি টাকা যোগাড় করলেন। কিন্তু পরিবার এ সময় দিয়ে গিয়ে এক মেয়ে বেশি টাকা রোজগার করতে পারলো না। এখন আপনি বন্দুক দিয়ে আপনার টাকা প্রোটেক্ট করছেন এবং মেয়ের টাকাও ছিনিয়ে নিচ্ছেন, সংগে মেয়েকেও বন্দী করে ফেলছেন।

উইপন আপনার হাতে, সম্পদ আপনার হাতে, নারীকেও আপনি কন্ট্রোল করে বন্দী করে ফেললেন!

শাসনটা তাইলে করবে কে? অবশ্যই আপনি! ব্যস! এভাবেই শুরু হয়ে গেল প্যাট্রিয়ার্কির ব্যবস্থা।

আমি ভাবছি, যেই ব্যবস্থার শুরুতেই উইপন দিয়ে ভায়োলেন্স, সম্পদ একার করে নেবো বলে আরেকজনকে অপদস্থ করা, কন্ট্রোল করা, শোষণ করা, সেই ব্যবস্থা আর কতো ভালো হবে!

#Sangat
#23th_Feminist_Capacity_Building_Up_Course
#Day_6

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 106
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    106
    Shares

লেখাটি ৩৯২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.