বিবর্ণ সায়র

0

ফাহমিদা বারী বিপু:

এক

দিলারা হাসান পাতলা টাওয়েল দিয়ে শিশুটিকে প্যাঁচিয়ে বের হয়ে এলেন লেবার রুম থেকে। একটুও সময় নষ্ট করলেন না তিনি। ডাক্তার, দুজন জুনিয়র সহকারী ডাক্তার, নার্স…সবাই বিস্মিত হয়ে তাকে দেখছে। বাধা দেওয়ার ক্ষমতাটুকুও যেন হারিয়ে ফেলেছে সবাই। দিলারা হাসান নির্বিকার। এতোকিছু লক্ষ্য করার সময় নেই এখন। ডাক্তারের কাছ থেকে বিশেষ অনুমতি নিয়েই লেবার রুমে ঢুকেছিলেন তিনি। প্রথমে রাজি হচ্ছিলেন না ডাক্তার রওশন জাহান।
বেশ কড়াভাবেই বলেছিলেন,
‘আরে, কী বলছেন এসব আপনি? আপনি কেন থাকবেন লেবার রুমে? আমাদের হসপিটালের একটা নিজস্ব নিয়ম আছে। আমরা ডাক্তার কিংবা নার্স ছাড়া অন্য কাউকে লেবার রুমে এলাউ করি না।’

দিলারা হাসান কাতর মুখে বলেছিলেন,
‘দেখুন, দয়া করে বোঝার চেষ্টা করুন। আমার মেয়েটি সাঙ্ঘাতিক ভীতু প্রকৃতির। ভয়ে শেষমেশ ওর একটা ভীষণ কিছু হয়ে যাবে। আমি থাকলে মেয়েটা একটু সাহস পেত।’
‘দেখুন, আপনিও দয়া করে বোঝার চেষ্টা করুন। সব মেয়েদেরই এইরকম সময় পার করতে হয়। ডেলিভারি পেইন সহ্য করে মা হতে হয়। পৃথিবীর সব মেয়েই কি সাহসী হয়ে জন্মায়? মা হওয়ার এই প্রক্রিয়াও তাদের সাহসী হতে সাহায্য করে। তাছাড়া আপনার মেয়ের বয়স অল্প। ডেলিভারিতে কোনরকম কমপ্লিকেসি হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। আমি কেন আপনার এই অন্যায় আবদার মেনে নেব?’

দিলারা হাসান তবুও গোঁ ধরে বসে থাকেন। কিছুতেই নিজের আবদার থেকে তাকে সরানো যায় না। শেষ পর্যন্ত নিতান্ত ইচ্ছের বিরুদ্ধে রাজি হতে বাধ্য হলেন ডাক্তার রওশন জাহান। দিলারা হাসান ডেলিভারির সময় লেবার রুমে থাকার অনুমতি পেলেন। কিন্তু ডেলিভারির পরপরই তিনি কেমন যেন অস্থিরতা শুরু করে দিলেন। তাড়াতাড়ি বাচ্চাকে কোলে নেওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠলেন।

উপস্থিত ডাক্তার, নার্স প্রত্যেকে খুব বিরক্ত হয়ে উঠলো এই আচরণে। ডেলিভারির পরে বাচ্চাকে তার মায়ের বুকে দেওয়ার কথা…কিন্তু দিলারা হাসান কেমন একরকম ছোঁ মেরেই বাচ্চাকে তুলে নিলেন। তারপরে হঠাৎ করে কাউকে কিছু বোঝার অবকাশ না দিয়েই বাচ্চাকে একটা টাওয়েল দিয়ে পেঁচিয়ে সেখান থেকে বের হয়ে এলেন। যে মেয়ের জন্য তিনি লেবার রুমে ঢোকার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন, সেই মেয়ের দিকে একবার ফিরেও দেখলেন না।
লেবার রুমে উপস্থিত সবাই অবাক হয়ে এ ওর মুখের দিকে তাকাতে লাগলো। কী ঘটে গেল তারা যেন কিছুই বুঝতে পারছে না। এভাবে বাচ্চাকে নিয়ে বেরিয়ে যাওয়ার কী মানে হয়? আর তাছাড়া ডেলিভারির পরে বাচ্চাটাকে কিছুক্ষণ অবজারভেশনেও রাখার কথা। অথচ এই ভদ্রমহিলা কাউকে কোনো সময়ই দিলেন না!

বাইরে বেরিয়ে দিলারা হাসান নির্দ্দিষ্ট জায়গায় অপেক্ষা করতে লাগলেন। বাচ্চাটা কাঁদছিল। তিনি মুখে একটা দুধের ফিডার ধরে দিলেন। কিছুক্ষণ টেনে তার কান্না বন্ধ হয়েছে। ড্রাইভার আর কাজের মেয়ে কমলাকে আগে থেকেই সবকিছু বলা ছিল।
নরমাল ডেলিভারি হয়েছে। অল্প সময়েই রোগীকে ওয়ার্ডে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকেই একটা হুইল চেয়ারে বসিয়ে তাকে ওঠানো হয়েছে গাড়িতে। ওয়ার্ডের এসিস্টেন্ট নার্স অনেক বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছে। সুবিধা করতে পারেনি। নার্স কিছু একটা সন্দেহ করে ডাক্তারকে ডেকে আনার জন্য পা-ও বাড়িয়েছিল। তখনই তার হাতে বেশ কিছু নোট গুঁজে দেয় ড্রাইভার লিয়াকত।
রোগীকে গাড়িতে উঠিয়ে তারা দু’জন দিলারা হাসানকে চোখের ইশারা করে। সেটা দেখেই আর দেরি করেন না দিলারা হাসান। তাড়াতাড়ি চলে আসেন রিসেপশনে।

ক্লিনিকটা তেমন পুরনো নয়। মোটামুটি নতুনই বলা চলে। স্টাফ সংখ্যাও খুব একটা বেশি নয়। ওয়ার্ডগুলো বেশ ফাঁকা ফাঁকা। চিকন করিডোরটা পার হতে হতে এদিক সেদিক দেখছিলেন দিলারা হাসান। নাঃ! তেমন কেউ নেই আশেপাশে।
রিসেপশনে এসেই থমকে দাঁড়িয়ে গেলেন তিনি। রিসেপশনিস্ট মেয়েটি চোখ গোল গোল করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। দিলারা হাসান কিছুক্ষণের জন্য থতমত খেয়ে গেলেন। কিন্তু খুব তাড়াতাড়িই সুনিপুণ দক্ষতায় নিজেকে সামলে নিলেন তিনি।
করুণ মুখে বললেন,
‘আমার মেয়ের বাচ্চাটা মনে হয় বদল হয়েছে। আমি কাউকে পেলাম না কথাটা বলার জন্য। আপনি…তুমি কি একটু দেখবে দয়া করে মা?’
মেয়েটা ফোন করার জন্য রিসিভার কানে তুলতে যাচ্ছিলো দেখেই তিনি তাড়াতাড়ি আবার বলে ওঠেন,
‘না না…তুমি একটু বাচ্চাটাকে সাথে করে নিয়ে যাও। আমি এখানেই আছি। একটু কিছুক্ষণের জন্য…নিজে গিয়ে একটু দেখো না মা!’

রিসেপশনিস্ট মেয়েটি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকলো দিলারা হাসানের দিকে। তার রিসেপশন থেকে উঠে যাওয়ার অনুমতি নেই। আবার ভদ্রমহিলার কথাগুলোও সে ঠেলতে পারছে না। বয়ষ্ক একজন মানুষ মা মা বলে তাকে অনুরোধ করছে। এটা ঠেলে ফেলার মতো মনের জোর এখনো হয়ে ওঠেনি মেয়েটার।
সে কোলে তুলে নিলো বাচ্চাটিকে। বাচ্চাটি ঠিক সেই মুহূর্তেই কেমন যেন একটা শব্দ করে উঠলো। দিলারা হাসান আবার তাড়া দিলেন তাকে। মেয়েটি কিছুটা অনিচ্ছা সহকারেই এগিয়ে গেল সামনের দিকে।

আর দাঁড়ালেন না দিলারা হাসান। তাড়াতাড়ি গাড়িতে উঠে সশব্দে বন্ধ করে দিলেন দরজা। মেয়ের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন নিশ্চল চোখে। ব্যথায় কুঁকড়ে যাওয়া মুখে স্বগতোক্তি করে চলেছে তার মেয়ে ঈষিতা,
‘একটিবার দেখতেও দিলে না আমাকে? একটিবারের জন্য ওকে কোলে নিতে দিলে না! মাত্র একবার….’

দিলারা জামান ঠাণ্ডা গলায় ড্রাইভারকে নির্দেশ দিলেন,
‘লিয়াকত, গাড়ি চালাও।’

দুই

আঠারো বছর পরের কথা…
লতিফা বেগম আচারের বয়াম রোদে শুকাতে দিয়ে মোড়ায় বসে উলকাঁটা বুনছেন। শীতের সকালের মিঠেকড়া রোদ। এমন আরামদায়ক রোদে পিঠে রোদের হাল্কা আঁচ এসে লাগলে শরীরটা চনমনে হয়ে ওঠে। বাতের ব্যথারও বড় উপশম হয়। তিনি শীতের সকালের এই রোদটা উপভোগ করার জন্য সব কাজকর্ম ফেলে রাখতে রাজি আছেন।
ছোট বউমা আচার বানিয়েছে। লতিফা বেগম বসে বসে সেই আচার পাহারা দিচ্ছেন। এই অযুহাতেই তিনি দীর্ঘসময় রোদে বসে থাকেন। কারণ বেশিক্ষণ আরাম করে রোদ পোহানোর জো নেই। বড় বৌ সোহানা তার এই বেশিক্ষণ রোদ পোহানোর ওপরেও কড়াকড়ি জারি করে দিয়েছে। শক্ত নির্দেশ দিয়ে বলেছে,

‘মা, আপনি কিন্তু অনেক বেশি সময় রোদে বসে থাকেন। বেলা বারোটার পরে সূর্যের আলো সরাসরি গায়ে না লাগানোই ভালো। সকাল আটটা থেকে নয়টা…বড়জোর দশটা, ব্যস! তারবেশি দরকার নেই। এক ঝামেলা মিটাতে গিয়ে আরেক ঝামেলা বাঁধিয়ে বসবেন দেখছি!’

সোহানা ডাক্তার। কাজেই তার কথা না শুনে উপায় নেই। তবু রোদ থেকে উঠে আসতে মন চায় না লতিফা বেগমের। বসে বসে কত কী ভাবনায় জড়িয়ে যান তিনি! রোদের ওম গায়ে লাগিয়ে ব্যথা বেদনাকে সাময়িক ছুটি দিয়ে সংসারের হাজার বেদনায় ইচ্ছেমতন ডুব মারা যায়।

মনোকষ্টের কি আর শেষ আছে? আপাতত ছোট ছেলের বৌকে নিয়েই যত চিন্তা তার। বিয়ের প্রায় পনেরো বছর হতে চললো। এখন অব্দি মা হওয়ার নাম নেই! সারাদিন রান্নাবান্না, সেলাই ফোঁড়াই নিয়ে তুমুল ব্যস্ত সময় কাটায়। কীইবা করবে বেচারী! একটা কিছু না করলে তার সময়টাই বা কীভাবে কাটবে?

লক্ষ্মীগোছের চুপচাপ মেয়ে দেখে ঘরে এনেছিলেন। দেখতে শুনতে একেবারে এক নাম্বার। মাস্টার্স করছিল। বড় বৌ ডাক্তার। কাজেই ছোটজন লেখাপড়াতে বেশি পিছিয়ে থাকলে বিয়ের পরে দুই বৌয়ের মধ্যে ঝামেলা বাঁধতে পারে। ব্যক্তিত্বের ঝামেলা। সেজন্যই মাস্টার্স পাশ মেয়ে দেখে খুঁজে এনেছিলেন। কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে সেটাই কাল হয়েছে। আরেকটু কম বয়সী মেয়ে নিয়ে এলে হয়তো বাচ্চা হতে এই সমস্যাটা পোহাতে হতো না। আজকাল মেয়েদের একটু বাড়তির দিকে বয়স চলে গেলেই বিপদ। বাচ্চা হওয়া বন্ধ হয়ে যায়।

ছোটছেলের যদি কোনো উত্তরাধিকার না থাকে, তাহলে কীভাবে সয়সম্পত্তির ভাগ বাটোয়ারা করবেন, সেই চিন্তাতেই রাতে ঘুম আসে না তার। স্বামী তো তার ঘাড়ে সব দায় চাপিয়ে দিয়ে নিশ্চিন্তে ওপারে বসে আছে। বড়জনের দুই ছেলে। বিপুল অধিকার তার। অথচ আদরের ছোট ছেলের ঘর শূণ্য। মা হয়ে এই ব্যবধান তিনি সহ্য করতে পারছেন না। সোহানার বাছাই করে দেওয়া গাইনোকলজিস্টকেই দেখিয়ে আসছে ছোট বৌমা। কিন্তু সুফল তো আজও এলো না! তিনি চোখ বুঁজলেই যদি সম্পত্তি নিয়ে ভাইয়ে ভাইয়ে ঝগড়া বাঁধবে!

ঈশিতা ছাদে উঠে এসে দেখে, গালে হাত দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে তার শাশুড়ি। হাতের উলকাঁটা মেঝেতে গড়াগড়ি খাচ্ছে। আচারের বোতলের কাছে দু’তিনটি কাক ঘুরঘুর করছে। একজন একটু বেশি সাহসী হয়ে মুখ প্রায় লাগিয়েই ফেলেছে আর কী! ঈশিতা দৌঁড়ে গিয়ে সেটাকে তাড়িয়ে দিয়ে শাশুড়ির দিকে মুখ ফিরিয়ে বলে,
‘মা, কী করছেন? নিচে চলেন। ভাবী একবার ফোন করে খবর নিয়েছে আপনি ছাদ থেকে ফিরেছেন কীনা!’
লতিফা বেগম ঈশিতার আওয়াজ পেয়ে নড়েচড়ে বসেন। ওঠার আয়োজন করতে করতে বলেন,
‘বড় বৌমার জ্বালায় একটু আরাম করে রোদ পোহাতে পারি না!’
ঈশিতা মুখ টিপে হাসে। আচারের বয়ামগুলোর মুখ আটকাতে আটকাতে ক্ষীণসুরে বলে,
‘মা, আজ বিকেলে একটু মোহাম্মদপুরে যাবো।’

মোহাম্মদপুর ঈশিতার বাবার বাড়ি। সে মাসে বড়জোর এক দু’বার বাবার বাড়িতে যায়। ইচ্ছে করলে প্রতি সপ্তাহেই যেতে পারে। কারো কোনো আপত্তি নেই তাতে। কিন্তু ঈশিতা নিজে থেকেই তেমন একটা উৎসাহ দেখায় না। লতিফা বেগম জোরাজুরি করেন না। মেয়ে যদি নিজে থেকে বাবার বাড়িতে যেতে আগ্রহ না দেখায়, তাহলে তার কী করার আছে?

অবশ্য ঈশিতার মাকে তিনি মনে মনে একটু ভয় পান। এমন কাঠখোট্টা স্বভাবের মহিলা! কেমন যেন চাঁছাছোলা ভাবভঙ্গি! মাধুর্য শব্দটা তার ভেতরে খুঁজেই পাওয়া যায় না। অথচ ঈশিতার আচার আচরণ ভারী নম্র। এমন মায়ের এরকম মেয়ে কীভাবে হয়, তা এক বিস্ময়েরই ব্যাপার বটে!

বয়ামগুলোর মুখ আটকে কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে ঈশিতা। শাশুড়ি নিচে নেমে গেছেন ইতিমধ্যে।
বিয়ের পরে এই বাড়িটাতেই শিকড় বিছিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে গেছে ঈশিতা। খুব ডাকাডাকি না করলে মায়ের কাছে যেতেও ইচ্ছে করে না ওর। কেন যেন মনে হয়, আঠারো বছর আগের সেই ঘটনাটি না ঘটলে ওর জীবনটা অন্যরকম হতে পারতো।

যদিও মাকেও দোষ দেওয়া যায় না কিছুতেই। মেয়ের ভবিষ্যত সাচ্ছন্দ্যের দিকটা তো বাবা-মাকেই দেখতে হয়! অবশ্য ওর জীবনে বাবার ভূমিকা প্রায় নেই বললেই চলে। ছোটবেলা থেকেই ওদের পরিবারে মা’র কথাই শেষ কথা। বাবাকে নীরব দর্শকের ভূমিকায় দেখতে দেখতে সেই বাড়ির প্রতি কেমন যেন অভক্তি জন্মে গিয়েছিল ঈশিতার। তাইতো মোমেনের হাত ধরে পালিয়ে গিয়েছিল একদিন। পালিয়েই বাঁচতে চেয়েছিল।

মোমেনকে বিয়ে করে সন্তানের মাও হতে পেরেছিল সে। কিন্তু ওর নিজের মা-ই তাকে সেই সংসার করতে দেয়নি। ছিনিয়ে নিয়েছে সবকিছু। মা’র পছন্দেই আবার নতুন সংসার পাততে হয়েছে তাকে। সব অতীতকে নিপুণ দক্ষতায় ধামাচাপা দিয়ে ঈশিতার মা তাকে আবার বিয়ে দিয়েছে। আজ্ঞাকারী ভক্তের মতো চুপচাপ সবকিছু মেনে নিয়েছিল ঈশিতা। এই নতুন সংসারেই সে ডালপালা ছড়িয়ে বাঁচতে চেয়েছিল আবার।
কিন্তু ভাগ্যের ফের কার জানা আছে? সে তো শিকড় ছড়িয়েছে ঠিকই…কিন্তু ডালপালা আর ছাড়তে পারলো কই?

তিন

ঈশিতা আগে একবার মা হয়েছিল। তার কেসটা প্রাইমারি ইনফার্টিলিটির নয়।
গাইনোকলোজিস্ট রেহানা খানম সোহানার টিচার ছিলেন। ঈশিতার ইনফার্টিলির বিষয়টা দেখার জন্য তার চেয়ে বেশি কাউকে পারদর্শী মনে করেনি সোহানা। সেই রেহানা খানমই একদিন ফোনে জানিয়েছিলেন বিষয়টা। সোহানা একেবারে হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল শুনে। সহজ সরল বোকা ধরনের একটা মেয়ে ঈশিতা। কে জানতো, ওর জীবনে এমন বিষয় লুকিয়ে আছে! অবশ্য সে জানে, আলাভোলা মেয়েরাই জীবনে বিপদে পড়ে বেশি। ঈশিতাও নিশ্চয়ই কোনো বোকামির খেসারত দিতে গিয়েই মা হয়ে গিয়েছিল। আর সেই মাতৃত্বকে লুকিয়ে ছাপিয়েই তাকে বিয়ে দেওয়া হয়েছে।
কথাটা ঈশিতাকে জিজ্ঞেস করবে কী করবে না অনেকদিন ভেবেছে সোহানা। করলে যদি কোনো সমস্যা হয়? ঈশিতা যদি আর কখনোই ওর সাথে সহজ হতে না পারে! সাত-পাঁচ বহু কিছু ভেবে একদিন জিজ্ঞেস করেই ফেলেছিল কথাটা। ঈশিতার দু’চোখ ভরে উঠেছিল টলটলে অশ্রুতে। কাতর কণ্ঠে বলেছিল,
‘আমার সংসারটা ভেঙে দিও না ভাবী!’

সোহানা ব্যাকুল হয়ে বলেছিল,
‘না না এমন কথা বলো না ঈশিতা। আমি তোমাকে আমার ছোটবোনের মতোই দেখি। এসব কথা কাউকে কি বলা যায়?’
সেদিন কাঁদতে কাঁদতে অনেক কথাই বলেছিল ঈশিতা। বাবার অফিসের ছোটখাটো এক কর্মচারি প্রায়ই আসতো ওদের বাসায়… এটা সেটা অফিসের কাজে। মা’র কড়া শাসনে বন্দী জীবনে হাঁপিয়ে উঠেছিল সে। অল্প বয়সী ভদ্র গোছের সেই কর্মচারিকে কেন যেন খুব আপন লাগতো ঈশিতার। অল্প বয়সের ভুলে পালিয়ে গিয়েছিল তার সাথে। বিয়েও করেছিল ওরা। তারপরে লুকিয়ে সংসার…বাচ্চা। আর তখনই মায়ের হস্তক্ষেপ। বাচ্চাটাকে চোখের দেখাও দেখতে পারেনি সে। আর সেই কর্মচারিকে কোথায় যে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল, তাও জানা হয়নি ঈশিতার।

সোহানা অবাক হয়েছিল এমন গল্প শুনে। নিখাঁদ বিস্ময়েই বলেছিল,
‘আবির জানে এসব কথা?’
‘নাহ ভাবী। ও কিছু জানে না!’
সোহানা হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল সেই কথায়। মনে মনে ভেবেছিল,
‘ভাগ্যিস, আবিরটা চিরদিনের বোকা!’

ঈশিতার মা হতে চাওয়ার এই দুরন্ত সংগ্রামে তার মাকে সে কিছুতেই সামিল করতে চায়নি। নিজের মা একদিন ওর মাতৃত্ব ছিনিয়ে নিয়েছিল। তাকে সে কিছুতেই নিজের কষ্টের কথা বলবে না।
কিন্তু না বললেই বা কী আসে যায়! মায়ের দায় কি এতো সহজে মেটে? আঠারো বছর আগে যা করেছিলেন, তার জন্য এখনো অনুতপ্ত হতে পারেননি দিলারা হাসান। একমাত্র মেয়েকে সারাজীবনের জন্য সামান্য এক অফিস কর্মচারির কাছে সঁপে দিতে পারেননি তিনি। বাচ্চাটাকে যদি রেখে দিতেন, তাহলে ঈশিতা কোনদিনই তার নতুন জীবনে মানিয়ে নিতে পারতো না। আর তাছাড়া বিয়েই বা দিতেন কীভাবে?

মোমেন ছেলেটা অবশ্য খুব ঝামেলা করেছিল। যতটা না ঈশিতার জন্য, তার চেয়ে বেশি বাচ্চাটার জন্য। মৃত বাচ্চা প্রসবের গল্প শুনিয়ে আর মোটা অঙ্কের খেসারত চুকিয়ে তাকে অন্য জায়গায় বদলির ব্যবস্থা করিয়ে দিয়েছেন। তার স্বামী তো বিপদ দেখলেই গর্তে গিয়ে লুকায়। তাকেই এসব অপ্রিয় কাজগুলো করতে হয় সবসময়। আর তার ফল হিসেবে সকলের কাছে তিনিই খারাপ হিসেবে চিহ্নিত হোন। আর কেউ না জানুক, তিনি নিজে তো জানেন…যা কিছু করেছেন মেয়ের সুখের কথা ভেবেই করেছেন।

কিন্তু তার মেয়েটা নতুন যে কষ্টের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে, সেটা থেকেও মুখ ফিরিয়ে থাকতে পারছেন না তিনি। কারণ তিনি তো মা! আর মা হওয়াই যে সবচেয়ে বড় বিপদ!
গতকাল রাত থেকেই মেয়েকে ক্রমাগত ফোন দিয়ে চলেছেন দিলারা হাসান।
একটা ভালো সন্ধান পেয়েছেন। নবজাতক শিশুকে দত্তক হিসেবে নেওয়ার এক দারুণ সুযোগ। ড্রাইভার লিয়াকতই খবরটা এনে দিয়েছে। লিয়াকত তার পুরনো বিশ্বস্ত লোক। এই পরিবারের সবকিছুই আগাগোড়া জানে সে। সরকারি হাসপাতালের এই বাচ্চা কেনাবেচার খবরটা সে কোথা থেকে যেন সংগ্রহ করেছে। দরিদ্র অনেক পিতামাতাই অর্থের অভাবে বাচ্চাকে বিক্রি করে দেয়। ঈশিতাকে এমন একটা বাচ্চা কিনে দেওয়ার ব্যবস্থা করা গেলেই সব দুঃখ দূর হয়ে যাবে। একটা বাচ্চা সবকিছু বদলে দিতে পারে।

ঈশিতাকে রাতে অনেক অনুনয়-বিনয় করে আসতে বলেছেন দিলারা হাসান। মেয়েটা কেন যেন তাকে আর দেখতেই পারে না। মাকে শত্রু মনে করে সে। অনেক অনুরোধের কারণে শেষমেষ আসতে রাজি হয়েছে বটে, কিন্তু বাসায় পা দিয়েই বলেছে,
‘মা, আমার বাচ্চার ব্যাপারে তুমি দয়া করে আর কিছু করতে যেও না। বাচ্চা যদি আমার ভাগ্যে না থাকে, আমি সেটা মেনে নিতে রাজি আছি।’

দিলারা হাসান জানেন, এসব মেয়ের ক্ষোভের কথা। একটা বাচ্চাকে বুকে জড়িয়ে ধরতে পারলেই এসব ক্ষোভ কই হাওয়া হয়ে যাবে! তিনি ধৈর্য হারান না। আস্তে ধীরে মেয়েকে বোঝান।
‘মারে, তুই না হয় মেনে নিবি। তোর শ্বশুরবাড়িও কি মেনে নিবে? তাদের বাচ্চা চাওয়ার আবদার মেটাবি কীভাবে?’
‘সেই আবদার মেটানোর জন্য আরেকজনের বাচ্চাকে কিনে আনতে বলছো! সেটা আমার শ্বশুরবাড়ি মেনে নিবে তাই বা কীভাবে ভাবছো মা?’
‘মেনে না নাওয়ার কিছু নেই। এমন হরহামেশাই হচ্ছে। তুই দয়া করে আর ঝামেলা করিস না। আবিরকে বোঝানোর ভার আমার।’

ঈশিতা বুঝতে পারে, তার মা আঁটঘাট বেঁধেই নেমেছে। এবারও নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করে যাওয়া ছাড়া আর কিছুই করার নাই তার।

চার

আবির আর ঈশিতাকে নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছে যান দিলারা হাসান। লিয়াকত তাদেরকে একটা ওয়ার্ডের সামনে দাঁড় করিয়ে রেখে কাকে যেন ডেকে আনতে যায়। কিছুক্ষণ বাদেই মোটাসোটা গড়নের এক আয়াকে নিয়ে হাজির হয় সে। মহিলার নাম নূরজাহান। বয়স পঞ্চাশ আর পঞ্চান্নের আশেপাশে। প্রথম থেকেই বিভিন্ন ক্লিনিক আর হাসপাতালে আয়ার কাজ করে আসছে সে।
বিশাল শরীরে থপথপ করে হেঁটে এসে হাঁপাতে থাকে সেই নুরজাহান আয়া। নির্বিকার মুখে দেওয়ালের গায়ে পানের পিক ফেলে খসখসে গলায় বলে,
‘বাচ্চা কেডা নিব?’
দিলারা হাসান মেয়ে আর জামাইকে দেখিয়ে দিয়ে বলে,
‘এরা নিবে বাচ্চা।’
‘বিয়া কদ্দিনের? বাচ্চা হয়নি?’
লিয়াকত অধৈর্য গলায় বলে,
‘সেই খবরে তুমার কী খালা? বাচ্চা কনে পাইবো? ক্যামনে পাইবো…খোঁজ দাও। নিয়া বিদায় হই। তুমিও কামে যাও।’

লিয়াকতের মুখের দিকে গনগনে চোখে তাকিয়ে আরেকবার পিচ করে পানের পিক ফেলে দশাসই নূরজাহান খালা। তারপরে টেনে টেনে বলে,
‘গরীব মাইনষের বাচ্চারে নিয়ে যাইবো বইলা ডিটেল হুনুম না কী কও মিয়া? গরীব বইলা কি হ্যারা বানের পানিত ভাইসা আইছে নাকি? হ্যারাও আল্লাহর বান্দা! বৈধ বাচ্চা। আল্লাহ্‌র ফেরেশতা। এমনি এমনি যার তার হাতে তুইলা দিমু?’

লিয়াকত শান্ত হয়। সে জানে, এই খালাকে চেতিয়ে দেওয়া ঠিক হবে না। ইনি অনেকটা মিডিয়ার কাজ করে থাকে। দরিদ্র পিতামাতা যারা সন্তান লালনপালনে অক্ষম, তারা এই খালার সাথে যোগাযোগ করে। আর খালা যোগাযোগ করে কোনো নিঃসন্তান দম্পত্তি এমন বাচ্চা কিনে নেবে কীনা! টাকা পয়সা যা পায়, সেই দরিদ্র পিতামাতাকেই দিয়ে দেয় সে। এই লেনদেনে সে নিজে তেমন একটা লাভবান হয় না।
অথবা অন্য কথায় বলা যায়, লাভবান হতে চায় না। এই কাজ পরষ্পরের সম্মতির ভিত্তিতেই করে থাকে সে। তবু নিজের বাচ্চাকে যখন অসহায় দুটি মানুষ অন্য একজনের হাতে নিতান্ত বাধ্য হয়ে তুলে দেয়, তখন সেই দরিদ্র পিতামাতার চোখের পানিতে সে এখনও কাতর হয়ে ওঠে। সেই শিশুটিকে বুকে নিয়ে নিঃসন্তান দুজন মানুষ যখন আকুল হয়ে কেঁদে ওঠে, সেই দৃশ্যও চোখের সামনে থেকে সরে না। এ যেন দুঃখ আর সুখের মিলিত ধারা!

লিয়াকত আবার জিজ্ঞেস করে। তবে এবার বেশ শান্ত গলায়।
‘তাইলে কই যামু খালা?’
‘৩ নাম্বার ওয়ার্ডের পাশে একডা ছোট ঘর আছে। হেইখানে আমার মাইয়া সুফিয়া আছে। হ্যায় বাচ্চা দেখাইবো। আইজ আমার ডিউটি নাই। বাড়িত যামু। হেইখানে গিয়া আমার নাম কইলেই হইবো। সুফিয়ারে কওন আছে!’

এতোক্ষণ পাথরের মুখে দাঁড়িয়ে এই কথোপকথন শুনছিল আবির আর ঈশিতা। ঈশিতার দু’চোখের কোল বেয়ে অশ্রু ঝরে পড়ছে। আবিরও চুপচাপ শান্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছে। ঈশিতার বুকের ভেতরটা অজানা যন্ত্রণায় জ্বলেপুড়ে খাক হচ্ছে। আঠারও বছরের আগুন এতো সহজে তো শান্ত হবার নয়! এই বুক যে শিশুকে স্তন্যপান করাতে পারেনি, তা আজও যেন দুধের ভারে টনটন করে ওঠে। তবু সেই বুকে আর কোনো শিশুকে সে ঠাঁই দিতে পারলো না! আর কেউ এই দুধের ভার থেকে তাকে মুক্তি দিলো না!

খালার কথামতো ৩ নাম্বার ওয়ার্ডের পাশের ছোটঘরটিতে হাজির হয়ে যায় তারা। ঘরটিতে ছোটছোট কয়েকটা বেড সাজিয়ে রাখা। দুইটি বেডে দুজন শিশুকে রাখা আছে। মলিন শাড়ি কাপড়ের দুটি নারী আকুল চোখে সেই শিশুদুটির দিকে ঝুঁকে বসে আছে। সালোয়ার কামিজ পরা একটি সুশ্রী মেয়ে তাদের পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে।
ওদের ঢুকতে দেখেই নারী দুজনের চোখে মুখে কীসের যেন এক ছায়া সরে গেল। ঈশিতার চোখ এড়ালো না সেই অব্যক্ত ছায়ার আড়ালের কথা। চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সবকিছু মনোযোগ দিয়ে দেখতে লাগলো সে। সুফিয়া মেয়েটিকে দেখে তার বুকের মধ্যে কেমন এক শীতল স্রোত বয়ে গেল। মেয়েটার বয়স সতেরো আঠারোর বেশি হবে না। আয়াটি বলছিল, সুফিয়া তার মেয়ে। অথচ এই মেয়ের সমগ্র অবয়বের কোথাও সেই আয়াটির সাথে বিন্দুমাত্র মিল নেই। এ যেন অনেকটা…অনেকটা…তার মতোই দেখতে!

নিজেকে শাসন করলো ঈশিতা। জীবন জীবনের মতোই। এই জীবনে কাকতালীয় কোনোকিছু এতো সহজে ঘটে না। হয়তো এই মেয়েটি সত্যি সত্যিই সেই আয়াটিরই মেয়ে। অথবা এমনো হতে পারে, একেও সে কোথাও থেকে কিনেই নিয়েছে। যদিও সে নিজেও দরিদ্র…কিন্তু তারও তো অপূর্ণ মাতৃত্বের কষ্ট থাকতে পারে! অথবা এটাও সম্ভব… কারো ফেলে যাওয়া সন্তানকেই সে নিজের করে নিয়েছে!

বুকটা কেঁপে ওঠে ঈশিতার। তার অনেক চাপাচাপিতে কাজের মেয়ে কমলা বলেছিল, তার সন্তানকে সেই ক্লিনিকেই ফেলে এসেছিল তার মা। সেখানে তার ভাগ্যে কী ঘটেছিল সেই খবর কেউ জানে না। কাজেই… এমন কি হতে পারে না?

অবরুদ্ধ অশ্রুকে বহুকষ্টে সংবরণ করে বাইরে বেরিয়ে আসে ঈশিতা। এক মুহূর্তের জন্য ওর মনে হয়, দরিদ্র নারী দুটির চোখেমুখে কীসের এক চাপা আনন্দ যেন ছিটকে পড়ছে। ঈশিতা তাদের শিশুদের কাউকে নেবে না, আরও কিছুদিন তারা তাদের শিশুদের বুকের সাথে জড়িয়ে রাখতে পারবে… এই আনন্দ পৌঁছে গেছে তাদের কানে।

এদিকে ঘরে ফিরতে ফিরতে নূরজাহান আয়া তখন ভাবছিল, ঐ বয়ষ্কা মহিলাটিকে কোথায় যেন দেখেছে সে। অনেকদিন আগে ডাক্তার রওশন জাহানের ক্লিনিকে সে আয়ার কাজ করতো। সুফিয়াকে সে যেখানে পেয়েছিল। সেখানেই কি দেখেছে এই মহিলাটিকে?

ভাবনাটা বেশিদূর এগোয় না নূরজাহানের। বয়স হয়ে গেছে। এখন কেন যেন কোনো কিছুই খুব বেশিক্ষণ ভাবতে ভালো লাগে না তার। জীবন সায়রে অনেক তো অবগাহন করা হলো! বিবর্ণ আঁচড়ে মলিন হয়ে গিয়েছে সেই সায়রের জল।
আর কী হবে অতশত ভেবে?

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 328
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    328
    Shares

লেখাটি ৩,৩০৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.