ফেমিনিস্ট ট্রেনিং এর ফাঁকে ফাঁকে-৫

0

মারজিয়া প্রভা:

আজ বোল মুভিটা দেখলাম। পাকিস্তানি সুপারহিট রেভ্যুলশনারি মুভি। এই নিয়ে দ্বিতীয় বার দেখা। কিন্তু আজও খেয়াল করলাম যখন ট্রান্সজেন্ডার হওয়ার অপরাধে সাইফিকে বাবা শ্বাসরোধ করে হত্যা করছে, তখনও চোখ দিয়ে পানি বেরিয়ে এলো। যে প্যাট্রিয়ার্কি সোসাইটিতে বাস করি, সেখানে এসব দেখলে কেন চোখে পানি আসে কে জানে! কাঠখোট্টা না হলে বাঁঁচবো কী করে?

সাংগাত আমাদের ফেমিনিজমের কালেমা কিংবা বীজমন্ত্র শিখিয়েছে প্রথম দিনেই। All men are born to equal and free with dignity and rights। ফেমিনিজম সেই জেন্ডার ইকুয়ালিটি নিয়েই কাজ করার মুভমেন্ট। আমাদের এখন পর্যন্ত তিনটা প্রেজেন্টেশন হয়েছে। একটা আগেই বর্ণনা করেছি। জেন্ডারিং নিয়ে। দ্বিতীয় প্রেজেন্টেশনের গল্প আজ বলবো।

এই প্রেজেন্টেশনটা ইন্টারেস্টিং। আমাদের খুঁজে বের করতে বলা হলো। প্যাট্রিয়ার্কি পুরুষকে কী কী স্বাধীনতা দিয়েছে আর প্যাট্রিয়ার্কির ফলে পুরুষ কী কী সাফার করছে! মানে পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কী কেড়ে নিয়েছে পুরুষের কাছ থেকে!

প্রথমটার উত্তর সোজা। পুরুষতান্ত্রিক পুরুষদের অবাধ ফ্রিডম দিয়েছে, সম্পত্তির উপর অধিকার দিয়েছে, সেক্সুয়াল লাইফ নিয়ে স্বাধীনতা দিয়েছে (ঘরে বিবি, বাইরে বারবনিতা), শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কোথায় ঘুরবো, কী পরবো তা নিয়ে অবাধ স্বাধীনতা! জবাবদিহিতার জায়গা নেই। একই ক্লাস বা পড়াশুনা জানা মেয়ে বা ছেলের মধ্যে মেয়ের যে সামাজিক বাঁধা, তা কিন্তু একজন পুরুষের নেই!

কিন্তু কী কেড়ে নিয়েছে!

হিউম্যানিটি!

পুরুষতান্ত্রিক একজন পুরুষকে Dehumanized করে তুলেছে। করে তুলেছে ব্রুটাল। পুরুষকে ডমিন্যান্ট হতে হবে। রাফ এন্ড টাফ হতে হবে। লাউডলি কথা বলতে হবে। হিংস্র হতে পাবে। শক্তিশালী হতে হবে। অনেক টাকার মালিক হতে হবে। সংসার, পরিবার‍, নারী সব দেখে শুনে রাখতে হবে। পরিবারের ভরণপোষণ করতে হবে। যোদ্ধা হতে হবে। তার কোনো আবেগ থাকবে না। সে সকলের সামনে কাঁদতে পারবে না! একে বলা হয় Emotional castrations.

এই গুণের একটাও যদি মিস হয়, আমরা রায় দিয়ে দেই, সে পুরুষ না। অথচ এই জীবন যে একজন পুরুষের জন্য কতটা প্যাথেটিক তার কিছু গল্প বলি!

এক লোক প্রচণ্ড জ্বর নিয়ে বাড়ি এসেছে। সে চাচ্ছে বাচ্চারা এসে মাথায় হাত বুলাক। একটু ঠাণ্ডা হাতের স্পর্শে সে মরীয়া হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কেউ আসেনি তার কাছে। দীর্ঘদিন পৌরুষ দেখাতে গিয়ে সে বাচ্চাদের সাথে জোরে কথা ছাড়া কথা বলেনি। সে রাফ এন্ড টাফ, কঠিন এটিটিউড দেখিয়েছে। বাচ্চারা দূরে সরে গেছে। একটা এইজের পর পুরুষেরা একা হয়ে যায়। ভরা পরিবার থেকেও সে কোনো পাত্তা পায় না, এর মূল কারণ দীর্ঘদিন পরিবারের সাথে দূরত্ব তৈরি হওয়ার ফলে পরিবার তাকে আর কেয়ার করে না৷

অথচ এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজই কিন্তু শিখিয়েছে, “তুমি দূরে থাকো, তুমি আবেগ দেখিও না, তুমি হিংস্র হও, রাফ এন্ড টাফ হও, নাইলে তুমি পুরুষ না। ”

কিংবা যে লোকটা কারণ ছাড়াই মেয়ে দেখলে মাস্টারবেট করা শুরু করে, কিংবা মেয়েদের শরীর হাতানো শুরু করে, ভাবুন তো, সে কতোটা নির্লজ্জ আর আনহিউম্যান হয়েছে বলেই সে এসব করতে পারে! সে তো এরকম জঘন্য অভ্যাস নিয়ে জন্মায়নি! ধীরে ধীরে এই প্যাট্রিয়াটিক সমাজ তাকে এই জঘন্য কাজ করতে শিখিয়েছে। বলেছে “তোমাকে নির্লজ্জ, শয়তান হতে হবে! নাইলে কীসের পুরুষ তুমি!”

কিংবা বোল সিনেমার বাবাটা, যে সন্তানকে মেরে ফেলে, মেয়েকে বেশ্যা বলে গালিগালাজ করে, কতটা নোংরা তার মন হলে সে এসব করে! এই যে এতোটা অমানবিক হওয়া, এইটা একজন পুরুষের জীবনের জন্য কি প্যাথেটিক না?

আজ উইমেন চ্যাপ্টারে আমার এক লেখার নিচে কমেন্ট করেছে, ফেমিনিস্ট ট্রেইনিং এর পর আমরা লিটন ফ্ল্যাটে যাবো, আর বাচ্চা কয়দিন পর ডাস্টবিনে পাওয়া যাবে!

আমি ওই মদনাকে উত্তর দিয়েছি যে লিটনের ফ্ল্যাটে মেয়ে একা যাবে না! বাচ্চা একা পয়দা করবে না! যদি মেয়ের জন্য এটি শেমফুল কাজ হয়, তাহলে ছেলের জন্য একইভাবে শেমফুল! অথচ সেইটা নিয়া তাদের বিকার নাই! তারা গর্ববোধ করে এইটা!

আপনি চারপাশে তাকিয়ে দ্যাখেন, রাস্তায় হিস্যু করে ছেলেরা গর্ববোধ করে, বউ পিটায় গর্ব করে, রেপ করে গর্ব করে, মেয়েদের পোশাক নিয়ে বাজে কমেন্ট করে গর্ব করে, গালি দিয়ে গর্ব করে, মেয়েদের সেকসুয়াল হ্যারাজ করে গর্ব করে, এসিড মেরে গর্ব করে!

পুরুষতান্ত্রিক সমাজ পুরুষকে নির্লজ্জ ক্রিয়েচার বানিয়েছে! বানিয়েছে ডিহিউম্যানাইজড আর ব্রুটাল। এতোটাই অমানবিক হয়ে গেছে পুরুষ, যে সে তার অপরাধ নিয়ে লজ্জা করবার বদলে, গর্ব করে!

দুঃখের বিষয়, প্যাট্রিয়ার্কি তাদের বোধবুদ্ধি এতোটাই নষ্ট করে দিয়েছে! তারা জানেই না কী এক অমানবিক, ইমোশনাললেস, ভারবাহী গাধার মতো তারা জীবন চালাচ্ছে! তারা কেবল হয়ে উঠেছে টাকার মেশিন আর নির্লজ্জতা এবং হিংস্রতার একটা বস্তা!

#Sangat
#23th_Feminist_Capacity_Building_Up_Course
#Day_5

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 101
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    101
    Shares

লেখাটি ৩৬৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.