রমাদি’কে নিয়ে আমার কথা

0

রিমঝিম আহমেদ:

২০০৬ সাল। পাঁচ বছর বয়েসী কিশোর প্রেমের সদ্য ব্রেকআপ হয়েছে। খুবই ভেঙে পড়েছি। রাগে ক্ষোভে আক্রোশে জীবন নিয়ে জুয়া খেলতে শুরু করেছি। ডায়েরি লিখে চলি দিনরাত। কবিতা নয়, কিন্তু কবিতার মতো কিছু। মামার বাড়ি অশান্তিময় হয়ে উঠেছে। এই ব্যক্তিগত টানাপোড়েন থেকে আগবাড়িয়ে নিজেকে ভালো রাখার চেষ্টা চলছিল।

সে সময় জমিয়ে রাখা ‘প্রথম আলো’ বন্ধুসভার পাতা আর বিভিন্ন পত্রিকার সাহিত্যপাতা জমা করতাম। তখনই একদিন বন্ধুসভার সন্তরণ নামে একটা লিটল ম্যাগের জন্য লেখা চেয়ে পাতায় বিজ্ঞাপন আর ফোন নাম্বার দেয়া হয়েছিল। সে নাম্বারে কল দিয়ে খোকনের সাথে আমার প্রথম আলাপ। তারপর, কথা, বন্ধুত্ব। আমাদের অনেক কথা হ’তো এটা বলাই বাহুল্য। আর খোকনের সব কথাকে ঘিরে থাকত একমাত্র দিদি, কদাচিৎ তাঁর বন্ধুসভার বন্ধুরা। আর ফোনে তাঁর গলা ছাপিয়ে কখনো কখনো দিদির গলাও শুনতে পেতাম। “হার লয় হতা হদ্দে?”

আমি বলতাম- দিদি কী বলছেন? খোকন বলতো। প্রেম জমে ওঠার আগেই আমাকে বাড়ি ছাড়তে হলো পরিস্থিতির কারণে। গ্রাম ছেড়ে শহরে চলে আসলাম। চকবাজার জয়নগরে একটা মেসে উঠি বন্ধু মিনা’র সাথে। সারাদিন রাঙ্গুনিয়া গিয়ে অফিস শেষে বিকেলে চেরাগী যাই। উপলক্ষ খোকন।

শহরে আসার পর খোকনের সূত্রে লুসাই ভবনে দিদির রুমে নিত্য যাওয়া-আসা। প্রথম দিন দিদিকে দেখে একটা ৫/৬ বছরের শিশুর সাথে পার্থক্য করতে পারিনি। দিদির মাথায় দেড় ইঞ্চি গর্ত। সে গর্তের ইতিহাসও জানি। সেদিন অদ্ভুত মমতায় নিজের চোখের জল আটকানো যায়নি। দিদিকে ভালোবেসে ফেলি। নিত্য যাওয়া-আসা দিদির কাছে। ফাঁকে ফাঁকে খোকনকে দেখি, বুঝি।

দিদির বাথরুমে স্নানের জল দেয়, রান্না করে, কাপড় কেঁচে দেয়, চুল আঁচড়ে পাট করে বেঁধে দেয়। আরও কত কী! দিদি অনেক কথা বলতেন। মুক্তিযুদ্ধ, সন্তান, আর স্বপ্নের কথা। বলতেন- বইগুলো পড়, অনেককিছু জানতে পারবে। একদিন দিদি বললেন- “তোমাকে আমার খুব পছন্দ। আমার ছেলে জহরকে বিয়ে করবে? তোমাকে আমি বউ করতে চাই। তোমার তো বাবা-মা নেই, মামাদের সাথে কথা বলে আমাকে জানিও। ” আমি দিদিকে কিছু বলিনি সেদিন। তবে খোকনকে জানালাম। মাঝে মাঝে মজার ছলে দিদিকে বলতাম, খোকনের বিয়ের কথা। দিদি বলতেন- খোকন কখনও বিয়ে করবে না, ও আমার আশ্রম দেখাশোনা করবে। সংসার করে আশ্রমের কাজ করা সম্ভব নয়। ভুলেও দিদি খোকনের বিয়ে নিয়ে কথা বলতে চান না।

খোকনকে ভালোবাসছি। ওর ভেতরের মানুষটাকে জানতে গিয়ে ওর আশপাশ নিয়েও একরকম মমত্ববোধ তৈরি হচ্ছে। বলতাম- কেবল তুমি নয়, তোমার আশপাশকেও আমার দরকার। চট্টগ্রাম শহরে বাস করা ওর দুই ছোট বোনের কাছে ও খুব একটা যেতো না। দিদি আর বন্ধুসভা নিয়ে ওর জগত। আমার চাপে একদিন বোনের বাসায় নিয়ে গেল। তারাও বুঝলো তাদের বাউণ্ডুলে ভাই এবার হয়তো সংসারের মায়ায় বাঁধা পড়বে। তাই আমার শেকড় জানতে তাদের কোনো আগ্রহ দেখিনি। কোত্থেকে আসলাম, কী আর পরিচয়! কোন প্রশ্ন নয়। কিছুটা অপমান বোধ করেছিলাম যদিও। পরে মনে হলো, তাদের কাছে ভাইয়ের সংসারী হওয়াটাই ছিল মূল। তারা আমাকে বলেছিলেন, সব জেনেবুঝে সিদ্ধান্ত নাও। ওর কিন্তু সংসার চালানোর মতো সক্ষমতা নেই! ততদিনে আমার ফেরার পথ ছিল না।

একই কথা খোকন বলতো। “সন্ন্যাসীর ধ্যান ভাঙাতে পারবে? ” আমি ধ্যান ভাঙিয়েছি। বিয়ের আগে ওকে অভয় দিয়েছিলাম-বিয়ের পর আমার দায়িত্ব তোমাকে নিতে হবে না। শুধু তুমি নিজের দায়িত্বটুকু নিও। দিদি যেহেতু চান না খোকন বিয়ে করুক, তাই দিদিকে না জানিয়ে আমরা বিয়ে করলাম। অতিথি ছিল বন্ধুসভার বন্ধুরা আর খোকনের পরিবার। আমাদের বিয়ের খরচ মাত্র ৭০০০ টাকার কাছাকাছি। এগারোশ কুড়ি টাকা দামের শাড়ি আর কাঁচের চুড়ি পরে আমি সেদিন বিয়ে করি।

তার কয়েকদিন আগেই দুজনে চেরাগী পাহাড়ের আশপাশে হেঁটে হেঁটে শাহাবুদ্দীন ডেকোরেটার্সের পাশে সরু গলি দিয়ে নিচের দিকে যেতে যেতে আলোবাতাসহীন, স্যাঁতস্যাঁতে একটা একরুমের বাসা ভাড়া নিই। ভাড়া ২৩০০ টাকা। দিনের বেলায়ও আলো জ্বালানো ছাড়া রাতের মতো অন্ধকার ঘর। একটা বাথরুম কয়েক পরিবার শেয়ার করতে হয়। লাইনে দাঁড়িয়ে কাজ সারতে হয়। বাসার গলিতে একজন হাঁটতে নিলে আরেকজনের দাঁড়িয়ে পড়া লাগে। চেরাগী পাহাড় থেকে ২/৩ মিনিট হাঁটা দূরত্বে বাসা নেওয়ার একমাত্র কারণও দিদি। যাতে দিদিকে দেখা যায়। আর ঘন ঘন বাসায় আসা যায়। ঘর সাজানোর জন্য আমাদের কিছু নেই। দুজনের সম্বল কিছু বই। তাই খোকনের ছোট বোন হাঁড়ি-কলস, খাট, বিছানা, কাঁথা থেকে শুরু করে একটা ১৪” টিভিও দেয়।

বিয়ের দিন বিকেলে সদলবলে রাঙ্গুনিয়া যাই। বাড়ি বলতে আমার মামার বাড়ি। রাতে ফিরে এসে সবাই আমাদের ঘরে ঢুকিয়ে দিয়ে যে যার মতো চলে যায়। সে রাতেই ঘণ্টাখানিক থেকে বাইরে থেকে তালা দিয়ে খোকনও চলে যায় দিদির কাছে। রুমে আমি একা। সারারাত বই পড়ি আর ওর জন্য অপেক্ষা করি। ভোরবেলা সে আসে। দিদির অগোচরে। সেটুকু আনন্দের জন্য আমার অপেক্ষা চলতে থাকে প্রতিদিন।

একটা এনজিওতে পার্টটাইম চাকরি নিলাম। ২৩০০ টাকা বেতনের। মাস গেলে আমি বাসা ভাড়া মেটাই, আর খোকন দৈনন্দিন খরচ। মাস শেষে হিসেবে বসে দেখি আমাদের খাওয়া-দাওয়া সব মিলিয়ে চার হাজারও লাগে না। খোকন দিদিকে নিয়ে বই বিক্রি করতে যায়, আমি অফিসে। কাজ সেরে আমরা সারাশহর ঘুরে বেড়াই। এটুকুই আনন্দ।
পরের মাসেই অনাকাঙ্ক্ষিত প্রেগন্যান্সির কারণে অসুস্থ হয়ে পড়ি। অসুস্থতা বহাল থাকে টানা নয় মাস। খোকন সময় দিতে পারে না। ছোটবোনকে নিয়ে আসি গ্রাম থেকে।

ইন্টারমিডিয়েটে পড়া আমি একটা ঘোরের মধ্যে আগপিছ না ভেবে বিয়ের পিঁড়িতে বসি। লেখাপড়া কম, দেখতে কুৎসিত, শহুরে কালচার জানি না। অনেকেই উপেক্ষা করে। মানুষ বলে ভাবেইনি। করুণাভরা মুখে আহা-উহু করে। দেখতাম, ভেতরে ভেতরে কষ্ট পেতাম। তারপর, মাস্টার্স করলাম, এলএলবি করলাম। চাকরি বদলালাম বার বার। সে সময়টা পেরিয়ে এসে আজকাল অনেকেই বলে শুনি- আমার ভাব হয়েছে, অহংকারী হয়েছি। হ্যাঁ, জীবন আমাকে নিজের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে শিখিয়েছে। আমি শুধু পাশ করার জন্য পড়িনি। পড়েছি নিজেকে ভেঙেচুরে গড়ার জন্য।

খোকন আর দিদির সম্পর্ক নিয়ে অনেকেই আমার কাছে এসে রঙিন গল্প বলেছে। সবারটা শুনেছি। কিন্তু আস্থা রেখেছি নিজের উপর। নিজের বিশ্বাস আর দৃষ্টিভঙ্গির উপর। আর যার সাথে এতোগুলো বছর কাটিয়েছি, তার উপর তো বটেই।

দুই পক্ষের আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে সামাজিক অনুষ্ঠানগুলোতে নিমন্ত্রণ করলে রক্ষা করতেই হয়। কিন্তু খোকনের পক্ষে দিদিকে একা রেখে কোথাও যাওয়া সম্ভব নয়। আবার আমিও একা কোথাও যাই, সেটাতে ওর মন খারাপ হয়। তখন বাধ্য হয়ে কখনও গেলেও দিদিকে খাইয়ে-দাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে মাঝরাতে পৌঁছালেও ভোরবেলা ঘুম ভেঙে দেখি ও আমার পাশে নেই। আমাকে একা রেখে ও শহরে হাজির, দিদির কাছে। এভাবেই চলেছে। আমার কাছে এই একই দিনরাত একঘেঁয়ে হয়ে ওঠে।

বিয়ের পরপরই নিষিদ্ধ হয়ে যায় আমার দিদির কাছে যাওয়া। আমাদের বিয়ে নিয়ে যারা জানে তাদের কেউ কেউ দিদিকে উদ্দেশ্যমূলক বা উদ্দেশ্যহীন কথাচ্ছলে বলে দিতেন। আর দিদির মানসিকভাবে ভেঙে পড়া খোকন এড়াতে চাইতো। ফলে দিদি যখন যে রাস্তা ধরে হাঁটতেন, আমাকে তা থেকে ১০০ হাত দূরে থাকতে হয়েছে। দীর্ঘ বারো বছরের আমার আর দিদির লুকোচুরি খেলার পরিসমাপ্তি ঘটেছে দিদির মৃত্যুর মধ্য দিয়ে।

হ্যাঁ ’ আমাদের বিয়েটা দিদি কখনওই মানতে পারেননি। দিদি চেয়েছিলেন খোকন সংসারের বন্ধনমুক্ত থাকুক, আর দিদির একক ছায়াসঙ্গী হয়ে স্বপ্ন পূরণে ব্রতী হোক খোকন। খোকন দিদির বইয়ের প্রকাশক। পথচলার ছড়ি, ছাতাধরা হাত আর ঝোলাভর্তি বইয়ের বাহক। এটা খুবই দৃশ্যমান চিত্র এ শহরে। কিন্তু যেটা দেখা যায় না, যেটা শুধু অনুভবের, তার বেলা? খুব কাছে থেকে নিজের জীবন দিয়ে খোকনের সংসারে থেকে এটুকু অনুভব করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে।

দৃশ্যমান কোনো সম্পর্কে মানুষ এতোটা নির্ভযোগ্য হয় না পরস্পরের প্রতি। দিদি আর খোকনের সম্পর্ক কখনও মা-ছেলের, কখনও ভাই-বোনের, কখনও দুজন বন্ধুর আবার কখনও বা গুরু আর শিষ্যের। এ এক বিচিত্র সম্পর্ক। একটা মানুষের সাথে আরেকটা মানুষের মানবিক মোহাচ্ছন্ন সম্পর্ক। একজন আরেকজনের মনের আন্দাজ বোঝে, বিষন্নতা বোঝে, ভালো লাগা বোঝে, অভিমান বোঝে। দুটি শরীরে বয়সের অধিক দূরত্বে থেকে তারা এতোটাই সন্ধিবদ্ধ ছিল যে এটার ঠিকঠাক ব্যাখ্যা করা আমার পক্ষে মূলত কঠিন থেকে কঠিনতর। খোকন খাবার নিয়ে যেতে দেরি হলে না খেয়ে বসে থাকতেন। দিদির রাজ্যের অভিমান খোকনের উপর। একমাত্র এবং এককভাবে। ভালোবাসায় দখলদারিত্ব হয়তো গুরুতর নয়। তাই মেনেছি, মানতে হয়েছে।

আমাকে কি খোকন এতোটা বুঝতে চেয়েছে? নাকি বুঝতে পেরেছে? অভিমান আমাকেও নির্লিপ্ত করে দিয়েছে এ দীর্ঘ সময়ে। তবে এটুকু বুঝেছি, দিদিকে ঘিরে খোকনের জীবনের এ অধ্যায়ে দিদিই মুখ্য। আমার আগে দিদি। দুটো দুরকম সম্পর্ক। তুলনা চলে না। তারপরও সে দুদিক ম্যানেজ করতে চেয়েছে প্রাণপণ। কোনটাই ছাড়তে চায়নি। এ না চাওয়ার মধ্যে ভালোবাসা ছিল। মমতা ছিল। প্রযোজ্যতা ছিল।

সংসারের প্রয়োজন হয় অর্থ। দীর্ঘ আড়াই বছর একটা অচেনা শহরে চাকরির প্রয়োজনে একা ছিলাম সন্তান ছাড়া। সে এক দুর্বিষহ সময় ছিল। প্রতিটি বৃহস্পতিবারের অপেক্ষা। চট্টগ্রামে ফেরার। চাইতাম, তিনবার আমি এলে অন্তত একবার যেন ও কক্সবাজার যায় আমার কাছে। পারেনি। আড়াই বছরে হাতে গুনে দুইবার সে গিয়েছিল। একবার একরাত আর আরেকবার যাওয়া-আসা কেবল। নিশ্চয় এই না পারা ওকে কষ্ট দিয়েছে!

শুধু দায়িত্ব কর্তব্যের সম্পর্ক হলে কোন মানুষের কি এতোটা আত্মনিবেদন থাকে? থাকে না হয়তো। এ তারও অধিক কিছু, আমরা সাধারণ মানুষেরা জানি না। সক্ষম নই।

দুটো ঘটনা বলি। দিদি দীর্ঘদিন মেডিকেলে থাকার পর অনেকটা সুস্থ হয়ে বাড়ি যাওয়ার বায়না ধরলো। খোকন পোপাদিয়া দিয়ে আসলো দিদিকে। ছেলের কাছে। তারপর সন্ধ্যায় বললো-” আমি কক্সবাজার আসছি।” অবাক হলাম, আপ্লুত হলাম। সারা সন্ধ্যা বসে রান্না করলাম। খোকন গাড়িতে উঠলো সন্ধ্যার পর। আমি সব গুছিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। বাবুর্চি থেকে গেটের চাবি নিয়ে গেট খোলা রাখলাম। রাত এগারোটায় খোকন আমার অফিসের গেটের সামনে নামলো। আমাকে কল দিয়ে বললো- ” আমার এক্ষুণি ফিরতে হবে। দিদি অসুস্থ। বাড়ি থেকে মেডিকেল নিয়ে আসবে। ”
সে আর গেটে ঢুকলো না, আমার সাথে দেখা করলো না, দশ মিনিট সময় ব্যয় করে রান্না করা খাবারটা খেলো না। ফিরতি বাসে উঠে পড়লো। সে রাতে আমারও আর খাওয়া হয়নি।

মেয়ের জন্মদিন। খোকন দিদিকে নিয়ে মেডিকেলে। ট্রান্সফার হয়ে চট্টগ্রাম ফিরেছি তখন। খোকনকে বললাম- মেয়ের জন্য একটা জামা কিনব, একটু সময় দাও। আমি অফিস থেকে ফেরার পথে প্রবর্তক নামলাম। দুজনে দেশীদশে গেলাম। জামা কিনলাম। সবমিলে মিনিট বিশেক লাগল। অথবা আরেকটু বেশি। প্রবর্তকের ব্যস্ত রাস্তা পার হবো। ব্যস্ত রাস্তায় আমার ফোবিয়া আছে। পার হতে গিয়ে ভয়ে অন্ধ হয়ে যাই। হঠাৎ ওর ফোন এলো। কোনো কথা না বলে মাঝ রাস্তায় আমাকে ফেলে হনহন করে হাঁটা দিল। আমি তাকিয়ে দেখলাম। রাগ-অভিমান কিছুই হলো না।

অনেক কষ্টে রাস্তা পার হয়ে বাসায় ফিরে তাকে কল করলাম। শুধু একটাই প্রশ্ন করেছি- আমি রাস্তা পার হতে পারলাম কিনা একটুও জানার ইচ্ছে হয়নি?

এভাবেই জীবনের সোনালী সময়টা পার হয়ে গেল ওর। বাইরে যাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করল। বাবার ব্যবসা হারাল, বাবাকে হারালো। বাসা ভাড়া, আর দৈনন্দিন চাহিদা মেটানোর পর তলানিতে কিছুই জমা পড়ে না। ভাড়াটে জীবনের উত্তরণ নেই। সে তো জীবনে নিজের জন্য কিছুই করলো না, সন্তানের জন্যও না।

বাবার মৃত্যুটা ওর জীবনের একটা বড়রকমের ট্রাজেডি। পোপাদিয়ায় দিদির কাছে থাকতো খোকন। খবরের পর খবরে যায় না। চিঠি লেখেন, তাও যায় না। বরিশাল থেকে চট্টগ্রাম আসেন একমাত্র ছেলে সন্তানকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। খোকন যাবে তো দূর, দেখাও করেনি। সে দুঃখে চট্টগ্রামে তিনি হার্ট এটাক করেন। হাসপাতালে নয়দিন ছেলের পথ চেয়ে থেকে মারা যান।

মানুষ হিসেবে আমারও ক্লান্তি আসে, বিশ্রামের ফুসরত নেই। কোন নির্ভরতা নেই। নিজের উপর আস্থা রেখেছি। ক্লান্তি আসলে প্রিয়সঙ্গ খুঁজেছি। নিজের ছায়ায় থাকা শিখেছি। এরকম একটা জীবন আমাকে কেবল আত্মমর্যাদাবোধ শেখায়নি, শিখিয়েছে নিজের অর্জনে আনন্দ পেতেও। ছোট আমাকে এসব জীবনঘটিত অভিজ্ঞতাই রাতারাতি বড় করে দিয়েছে।
মানুষ হিসেবে খোকন শ্রদ্ধেয়। স্বামী হিসেবে কেমন তার হিসেবে না যাই। জীবনে যেহেতু মানুষই চেয়েছি, একজন মানুষের সাথে এরকম হাজারটা জীবন কাটিয়ে দেয়া যায় দুঃখবোধে, তুমুল আনন্দে আর প্ররোচনায়।

লেখক: কবি রিমঝিম আহমেদ,
আলাউদ্দিন খোকনের সহধর্মিণী।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 181
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    181
    Shares

লেখাটি ৮৮৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.