তেলবাজ, চাটুকারদের কবলে সাংবাদিকতা

0

গোধূলী খান:

নেপোলিয়ন বোনাপার্টকে তার সভাসদরা বলতো, ‘কমরেড নেপোলিয়ন ইজ অলওয়েজ রাইট’। কিন্তু নেপোলিয়ন বলেছিলেন, আমি নিজে বলছি, আই অ্যাম নট অলওয়েজ রাইট। আমারও ভুল হতে পারে। ক্রটি হতে পারে। আমারও সমালোচনা থাকতে পারে। আমি মনে করি, সমালোচকরা আমার বড় বন্ধু। আর যারা আমার বন্দনা করে, যারা চাটুকারি-মোসাহেবি করে, তারা হচ্ছে বড় শত্রু। চাটুকার মোসাহেবদের চেয়ে বড় শত্রু আর কেউ নেই।

ঊনিশ শতকের দুর্দান্ত লেখক ছিলেন হরপ্রসাদ শাস্ত্রী। বাংলা সাহিত্যে সে সময় আরো অনেক লেখক ছিলেন, কিন্তু শাস্ত্রী যুগে যুগে বেঁচে থাকবেন তাঁর রচিত ‘তৈল’র কারণে। “তৈল” নামের লেখায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী দৈনন্দিন জীবনে তেলের গুরুত্ব বা ভূমিকা তুলে ধরেছেন সাবলীলভাবে। জীবন বা জগতের ভারসাম্য রক্ষায় তৈলের গুরুত্ব বর্ণনার সাথে সাথে মানুষের তেল মর্দনের বিশদ বর্ণনাও দিয়েছেন। শাস্ত্রীর মতে, মানুষ সমাজে পারস্পরিক তৈল মর্দন কর্ম করে থাকে অতি উৎসাহে নিজ প্রয়োজনে ও স্বার্থে।

সমাজের দর্পণও বলা হয় সাংবাদিকদের, সমাজের যেকোনো অন্যায় অত্যাচার বা শোষণের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তাদের লেখা প্রতিবেদন মানুষকে কাঁদাতে পারে, এমনকি সামান্য পশুপাখির প্রতি সমবেদনা প্রকাশেও বাধ্য করে। সংবাদকর্মীদের রিপোর্টে অনেক বড় বড় রথি-মহারথিদের চাল উল্টেয যায়, আবার অনেক ক্ষমতাবান শাসকের শাসন ক্ষমতা কেড়ে নিতে ভূমিকা রাখে। সাধারণ জনগণ তাদের যাপিত জীবনে সংবাদ মাধ্যমকে অন্যতম শক্তি হিসেবে দেখে এসেছে এবং এখনও দেখতে চাই।

আমাদের ৫৬ হাজার বর্গমাইলের বাংলাদেশ। এদেশের স্বাধীনতা অর্জনে সে সময়ের সংবাদ মাধ্যম ও সাংবাদিকদের অবদান ছিল বলিষ্ঠ। তৎকালীন সময়ে সংবাদপত্রগুলি ছাত্র সমাজের মাঝে স্বাধীনতা আন্দোলনের আগুন ছড়িয়ে দিতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে। ৯০’র স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনেও সাংবাদিকেরা সঠিকভাবে জাতীর বিবেকের ভূমিকা পালন করেছিলো। বাংলাদেশ বিরোধীদের বা গণতান্ত্রিক ভিত্তিতে যে কোনো ষড়যন্ত্র মোকাবেলায় মিডিয়ার ভূমিকা থাকে সর্বাগ্রে।কিন্তু আমরা সাধারণ জনগণ বিষাদগ্রস্থ হয়ে যাই, যখন দেখি প্রধানমন্ত্রীর এক একটা সংবাদ সম্মেলন চাটুকারিতায় ও তৈল প্রয়োগে ভেসে যায়।

কিছু সিনিয়র-জুনিয়র সাংবাদিকদের চাটুকারিতায় সময়ক্ষেপণ হয়। সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের বাইরে অতিরিক্ত বন্দনা, সরকারি সিদ্ধান্তের গুণকীর্তন, গলা ডুবিয়ে সমর্থন জাতীয় টেলিভিশনে লাইভে প্রচারিত হয়, চাটুকার সাংবাদিকরা লজ্জা না পেলেও পেশাদার সংবাদিকরা লজ্জা পাচ্ছেন! প্রধানমন্ত্রী কি এই তেলের খুশি হচ্ছেন! না, তৈলপ্রদানের সময়ে টেলিভিশনের পর্দায় প্রধানমন্ত্রীর মুখ দেখে বোঝা যায়, উনি কৌতুকবোধ করছেন বা কখনও বিব্রত হচ্ছেন। সারা দেশের মানুষ তাদের চাটুকারিতায় হাসছে।

এই চাটুকার সাংবাদিকরা সংবাদ সম্মেলনে চাটুকারিতায় পেশাদার সাংবাদিকদের প্রশ্ন করার সময়টাও নিয়ে নেয়। প্রধানমন্ত্রীর মতো ব্যস্ত একজন মানুষের কাছ থেকে দেশের মানুষ অনেক কিছু জানতে ও শুনতে চান। প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনে সংবাদকর্মীদের মাধ্যমে জাতীয় সব ইস্যুতে মানুষের তথ্য ও সত্য জানার অধিকারের জায়গা। সাংবাদিকরা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে জেনে তা জনগণকে জানায়।

কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে, প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে জানার সময়টুকু তেলের বন্যায় ভেসে যায়। প্রধানমন্ত্রী তো আর অনিয়ন্ত্রিতকালের জন্য সংবাদ সম্মেলন করবেন না বা বসে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা একদল সাংবাদিকের চাটুকারিতা শুনে আবার প্রশ্ন-উত্তর পর্ব চালাবেন। পেশাকে ছোট করার পাশাপাশি এই সাংবাদিকদের জন্য আমরাও বঞ্চিত হচ্ছি প্রধানমন্ত্রীর মুখ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতামত থেকে।

পেশার বাইরে ব্যক্তিজীবনে প্রতিটি মানুষের অধিকার আছে যে কোন রাজনৈতিক দলের সমর্থনের। এটা তাঁর ব্যক্তিগত পছন্দ। অনেক পেশাদার সাংবাদিকরা মনে করছেন, শাসক গোষ্ঠীর রাজনৈতিক শক্তির করুণা, পদ-পদবী, সরকারি প্লট, রাষ্ট্রীয় বিদেশ সফরসঙ্গী হওয়া, টাকা সম্পদ প্রভৃতির লোভের। কেউ কেউ আবার টিভি,রেডিও ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের মালিক হচ্ছেন! এসব কারনে চক্ষু-লজ্জার মাথা খেয়ে ডিউটিকালীন সময়ে চাটুকারিতা করছেন তারা, সারাদেশের মানুষ তাদের এই নির্লজ্জ আচরণের সাক্ষী হচ্ছেন জেনেও তেলের বন্যা বইয়ে দিচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী সংবাদ সম্মেলন মূলত সংবাদকর্মীদের মাধ্যমে জাতীয় সকল ইস্যুতে মানুষের তথ্য ও সত্য জানার অধিকারের জায়গা।

পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে রাজনৈতিক দলের প্রতি আনুগত্য দেখানো সম্পূর্ণ আনইথিক্যাল। কিন্তু আমরা দুর্ভাগা জাতি আমাদের এই দৃশ্য বারে বারে দেখতে হবে। তেলবাজদের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও ওয়াকিবহাল, তিনি এক প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে বলেছেন, ‘আমি সবাইকে চিনি। কে, কোন কথা, কেন বলেন, মুখ হা করলেই টের পাই। তিনি জানেন আজ ক্ষমতা আছে তো এই চাটুকাররা আছে, ক্ষমতা না থাকলে এই সুসময়ের মাছিদের দেখাও পাওয়া যাবে না।

১৮/১৯ বছরের সাংবাদিকতা পেশায় থেকে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর দুই জনের সংবাদ সম্মেলন কভার করার সুযোগ হয়েছে। খালেদা জিয়ার সংবাদ সম্মেলনে বক্তব্য দিতেন, পরে দেখাতাম দুই একজন প্রশ্ন করতো। প্রশ্ন না বলে তেল দিত বলা ভালো। বাকিদের প্রশ্ন করার সুযোগ ছিল না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, বিরোধী দলের প্রধান থাকার সময়েও তাঁর সংবাদ সম্মেলন কাভার করেছি। এই তৈল মর্দন বিষয়টা ছিল না, ছিলো না এতো সাংবাদিকের ভীড়, বিশেষ করে সম্পাদকরা আসতেন না, বীটের সাংবাদিকরা ছাড়া। বিগত কয়েক বছর ধরে দেখতে পাচ্ছি, প্রধানমন্ত্রীর সংবাদ সম্মেলনকে একদল সাংবাদিক বন্দনা সম্মেলনে পরিণত করেছে। কে কত তেল মারতে পারেন, কে কত গুছিয়ে তেল মারতে পারেন তার প্রতিযোগিতা চলে। কেউ কেউ তো নতুন নতুন উপমা দিয়ে তেল মেরে চলেছেন।

আমরা জানি যে, বাঙ্গালিরা নিজ ভূমিতে কখনো স্বাধীন ছিল না। খৃষ্টপূর্ব থেকে যদি শুরু করি, তাহলে দেখা যায়, বাঙ্গালিদের তিব্বতীয়-বর্মীরা, তারপর ক্রমানুসারে আর্য, গুপ্ত, শশাংক, পাল, সেন, সুলতান, মোঘল শাসন চলে। তারপর ভারতীয়, ব্রিটিশ ও পাকিস্তানিরা আমাদের শাসন ও শোষণ করে।

পরাধীন ছিলাম হাজার হাজার বছর, বাঙ্গালীরা নিজ ভূমে শাসন করতে পারেনি। বরং পরাধীন থাকার সময়ে একটু ভাল থাকার আশায় বা শাসকশ্রেণির করুণা লাভের আশায় চাটুকার, মোসাহেব ও গোলাম হিসেবে নিজদের প্রতিষ্ঠা করেছি। যুগ যুগ ধরে আমাদের পূর্বপুরুষের সেই রক্ত আমাদের ধমনীতে বয়ে চলেছে। যার কারণে একবিংশ শতকের দ্বারপ্রান্তে এসেও পারসোনালিটি ও সেলফরেস্পেক্ট নামক বিষয় দুইটিতে আমাদের বিস্তর পার্থক্য রয়ে গেছে। আর তাই আমরা ক্ষমতাবানদের পদ বেশি লেহন করি।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 2.1K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    2.1K
    Shares

লেখাটি ৩,১৯০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.