ফেমিনিস্ট ট্রেনিং এর ফাঁকে ফাঁকে-৩

0

মারজিয়া প্রভা:

আজ নো মুভি নাইট। কমলাজীর বহু পুরাতন এবং সত্যমেভ জয়তের ভিডিও দেখলাম। ইন্ডিয়াতে জামাইকে পতি বলে, বাংলায় বলে স্বামী। পতি মানে মালিক। কোটিপতি, লাখপতি! অর্থাৎ কোটি টাকার মালিককে বলি কোটিপতি। ওদিকে বাংলায় স্বামীর অর্থও প্রভু অর্থাৎ মালিক। বিয়ের মতো একটা ভালোবাসা আদুরে যৌনতা রিলেশনে একজনকে মালিক বলে অভিহিত করা হচ্ছে। তাহলে আপনা আপনি আরেকজন দাস হয়ে যাচ্ছে না? বিয়ের রিলেশন আর ভালোবাসা থাকলো কই? মালিক দাসের রিলেশন হয়ে গেল।

তো মালিক দাসকে কী করতে চাইবে? কন্ট্রোল করবে, মেরে পিটে নিজের আয়ত্তে রাখবে! ডমেস্টিক ভায়োলেন্স করে যে পুরুষ সে নিজেও এইটা বিশ্বাস করে। তাকে জিজ্ঞাসা করুন। সে বসকে পিটাতে পারবে না কিন্তু, পারবে বউকে। কারণ সে বউকে দাস ভাবে, তুচ্ছ ভাবে, ফাউল জিনিস ভাবে।

আমরা এইখান থেকে এসব হাজবেন্ড ওয়াইফ ব্লা ব্লা কথা বাদ দিয়েছি। জেন্ডার নিউট্রাল ‘পার্টনার’ কথাটি ইউজ করা শুরু করেছি। কথায় কথায় স্বামী বা হাজবেন্ড (it comes from animal husbandry, women is not domestic animal) বাদ দিয়ে পার্টনার বলার চেষ্টা করছি। আমার অবশ্য এই প্র‍্যাকটিস লাগবে কি না জানি না! তবে ওরকম ভালবাসার কেউ এলে তাকে পার্টনারই বলবো।

গত লেখা থেকে ধরি, প্যাট্রিয়ার্কি কোথায় কোথায় কন্ট্রোল নিয়েছে? প্রোডাক্টিভ ক্ষমতা আর রিপ্রোডাক্টিভ নিয়ে অলরেডি কথা বলেছি। এবার আসি সেকজুয়ালিটি নিয়ে। এখানেই আসে ম্যাডোনা হোর কমপ্লেক্স। যদিও এই টার্ম নিয়ে কমলাজী কথা বলেনি। কিন্তু তিনি যা বলেছেন সেইটা ম্যাডোনা হোর কমপ্লেক্স রিলেটেড।

এইটি প্রচণ্ড পুরুষতান্ত্রিক মনোবিদ ফ্রয়েডের দেওয়া টার্ম৷ পুরুষ ভালোবাসে সেই পবিত্র মেয়েকে যাকে ম্যাডোনা বলা হয়, তার জন্য কামনা থাকে না পুরুষের। কিন্তু পুরুষের মধ্যে যে মেয়ের জন্য কামনা থাকে তাকে পুরুষ আবার whore (বেশ্যা) বলে অভিহিত করে। ফ্রয়েডের ভাষায়, Where such men love they have no desire and where they desire they cannot love.

সাংঘাতিক হলেও সত্য, পুরুষ যে নারীকে বেশ্যা বলে গালি দেয়, আসলে তার জন্য মনে তার কামনা জন্মায়। ঠিক এই কারণে পুরুষতান্ত্রিক সিস্টেম নারীর ভ্যাজাইনা এক পুরুষের জন্য লকড করে দিলেও, বাইরে সেই পুরুষের কামনা পুরণের জন্য রেখে দিয়েছে সেক্স ওয়ার্কার।

নারীর সেকজুয়ালিটিকে কীভাবে প্যাট্রিয়ার্কি কন্ট্রোল করছে তার বড় প্রমাণ তারা শরীর ঢাকবে কী ঢাকবে না, বা কতোটুকু ঢাকবে তা ঠিক করে দেয় প্যাট্রিয়ার্কি। এখনো ইন্ডিয়ায় অনেক মেয়েদের বিয়ের রাতে সাদা চাদরে রক্তের দাগ দিয়ে প্রমাণ দিতে হয় সে ভার্জিন। এখনো এই অঞ্চলে মেয়ে কার সাথে সারাজীবন শোবে সেইটা পুরুষতান্ত্রিক সমাজ ঠিক করে দেয় মেয়ের অনুমতি ছাড়াই!

প্যাট্রিয়ার্কি সিস্টেম নারীর অবাধ বিচরণে কন্ট্রোল করছে। সে কই যাবে, কার সাথে যাবে সেই ডিসিশন নারীর হাতে নেই৷ রিসোর্সে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের একচেটিয়া অধিকার। সম্পত্তি ছেলে বেশি পাবে। শিক্ষা, খাদ্য ছেলে বেশি পাবে। তাই আমাদের পাকিস্তানি কোর্সমেট সিদরার ফ্যামিলি তাকে ক্লাস সিক্স থাকতেই বলে ‘পড়া ছেড়ে ঘরের কাজ শিখ।’ অথচ ছোট ভাইয়ের স্কুল তখনও চলছে।

পুরা সোশ্যাল ইন্সটিটিউট এখন চলছে পুরুষতন্ত্রের কন্ট্রোলে। কী পরিবার, কী ধর্ম, কী শিক্ষা, কী আইন, রাষ্ট্র, অর্থনীতি, রাজনীতি সবেতে পুরুষতন্ত্রের ছত্রছায়া। ভেবে দেখেন, ইন্দিরা গান্ধী, বেনজির ভুট্টো, শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া সব পুরুষতন্ত্রের পাওয়ার দিয়েই পাওয়ারফুল। তাদের বাবা বা জামাইয়ের জন্য কোনো ছেলে অপশন ছিল না বলেই কেবল তারা এই পাওয়ারটুকু পেয়েছে।

বাকি সোশ্যাল ইন্সটিটিউট গুলার ধরন-ধারণ নিয়ে আস্তে আস্তে লিখবো।

ধর্মটা নিয়ে আজ লিখি৷ কারণ পরিবার বলি, একদম প্রাচীন এডুকেশন বলি ( টোল, আশ্রম, মাদ্রাসা) , বা আইন বলি তার একদম প্রাইমারি সোর্স ধর্ম। ধর্ম প্রচণ্ডভাবে পুরুষতান্ত্রিক। তাই ধর্ম থেকে উদ্ভুত বাকি ইন্সটিটিউট পুরুষতান্ত্রিক তো হবেই!

ধর্মে আপনি ঈশ্বরকে কিন্তু দেখেননি! সে নিরাকার। কিন্তু ধরে নিচ্ছেন তার অদৃশ্য পেনিস আছে। তাই তিনি HE! কারণ পুরুষতান্ত্রিক ব্যবস্থা আপনাকে শিখিয়েছে, পুরুষ সুপিরিয়র, নারী ইনফেরিয়র। তাহলে সবচেয়ে সুপিরিয়র ঈশ্বর বা আল্লাহ বা ভগবান HE না হয়ে যাবে কই!

সব ধর্মেরই খুব কম নারী দেবতার উপাসনা হয়। সবচেয়ে বড় উপাসনা হয় পুরুষ গডগুলারই।

ধর্মগ্রন্থ লিখেছে পুরুষ, ধর্ম প্রচার করেছে পুরুষ! এই সিস্টেমে নারীর কথা যে আসবে না সেইটাই তো স্বাভাবিক। ধর্ম নারীর মাসিকের রক্ত কে ঘেন্না করে, মসজিদ, মন্দিরে ঢুকতে দেয় না! অথচ সেই রক্ত ছাড়া কোন ধর্ম প্রচারক, ফতোয়াবাজ, মোল্লা কেউই জন্মাতো না।

কার্ল মার্ক্সের মতে, ধর্ম প্রলেতেরিয়াতের জন্য আফিম স্বরুপ যাতে স্পারচুয়াল বেনেফিটস (জান্নাত, বেহেশত, স্বর্গ) পাওয়ার লোভে পৃথিবীর তার প্রতি হওয়া বুর্জোয়াদের এক্সপ্লয়েটেশনের বিরুদ্ধে সে দাঁড়াতে না পারে।

ধর্মকে একই উইপন হিসেবে ব্যবহার করেছে পুরুষতান্ত্রিক। খুব আধুনিক ধর্মে নারীকে সুমহান মর্যাদা দেওয়া হয়েছে বলা হলেও, আসলে নারীকে পরাগাছা ছাড়া কিছু ভাবা হয়নি। নারী যেন আলু, পটল, মাছি। তাই তাকে রক্ষা করার জন্য, দেখভালের জন্য পুরুষ লাগবে!!! মানে নারী কোন মানুষই না! তার রক্ষাকর্তা সে নিজে হতে পারবে না! তার পেনিস আলা ক্রিয়েচার লাগবে একটা! প্যাথেটিক।

এসবই ধর্মগ্রন্থ প্রচার করে এসেছে। নারীকে স্বাধীন সত্তা হিসেবে দাঁড়াতেই দেয়নি আধুনিক কোন ধর্ম। তাই ট্র‍্যাডিশনালিস্টরা চামে চামে বলা শুরু করলো, ” আরেহ ধর্মই তো ধর্মগ্রন্থের মাধ্যমে বলে দিয়েছে সমাজ পুরুষতান্ত্রিক হবে!”

যদি তাই হয় তাহলে ঈশ্বর একজন পুরুষতান্ত্রিক ফেনোমেনা নয়?

নাকি ধর্ম ঈশ্বর প্রাপ্ত নয়! মানুষের তৈরি? মানুষ একে পুরুষতান্ত্রিক করে গড়ে তুলছে!!!

#Sangat
#23th_Feminist_Capacity_Building_Up_Course
#Day_3

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 146
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    146
    Shares

লেখাটি ৫০২ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.