জামায়াতের নিবন্ধন বাতিলে রাজনৈতিক স্বার্থ কার কতটুকু?

মিজানুর রহমান: ‘আচ্ছা জামায়াতের নিবন্ধন বাতিল করেছে। তাইলে তো এবার সব ভোট বিএনপির ঘরে চলে গেলো। বিএনপিও জামায়াতের সাথে জোট করার কলঙ্ক থেকে বেঁচে গেলো। শত্রুকে ধীরে ধীরে অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে আওয়ামী লীগ। এই টাইপের কিছু কথা খুব শোনা যাচ্ছে ইদানিং আশপাশে।’

প্রথমত এই রায়ে আওয়ামী লীগের কিছুই নাই। জামায়াতের নিবন্ধনকে চ্যালেঞ্জ করে ২০০৮ এ জাকের পার্টি, তরিকত ফেডারেশান সহ মোট ২৫ জনের রিট আবেদনের রায় এটি। আর এটিতে শুধুমাত্র জামায়াতের বর্তমান নিবন্ধন বাতিল করা হয়েছে।

হ্যাঁ, এই রায়ে সুবিধা অবশ্যই আছে। জামাত নিষিদ্ধের গণদাবি, ট্রাইব্যুনালের রায়ে জামায়াতকে যুদ্ধাপরাধী সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করা আর নিবন্ধন বাতিল সব কিছু মিলেমিশে একাকার এখন। মনে হচ্ছে, জামায়াতের নিষিদ্ধের বিষয়টা এখন ‘সময়ের ব্যাপার’ মাত্র।

কথা হচ্ছে নিষিদ্ধ করলে কিভাবে নিষিদ্ধ করা হবে? আপনি কোনমতেই পারবেন না ছোট হলেও এই সংখ্যার জনগোষ্ঠিকে একদিনে ‘মানুষ’ করে ফেলতে। এটি দীর্ঘদিনের একটি সিস্টেম লসের ফল। এর দায় আমাদের সকলের উপরই খানিকটা বর্তায়। সুতরাং আরো একটি দীর্ঘ প্রসেসের ফলেই এটি শুধরানো সম্ভব।

তাহলে প্রশ্ন আসছে, শুধু কি তবে নামটাকেই নিষিদ্ধ করা হবে? আসলে এটা যখন করা হবে তখন আদালতই রায়ে বলবে। তবে নিষিদ্ধাদেশে জামায়াতের তৃণমূল পর্যন্ত নেতাদের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট আদেশ থাকতে হবে। আশংকার বিষয় হচ্ছে, শিবিরের বিষয়ে সিদ্ধান্তের ব্যপারে। বর্তমানে আমরা সকলেই জানি শিবির জামায়াতের ছাত্র সংগঠন। জামায়াতের সাথে একই রায়ে শিবিরকেও নিষিদ্ধ করা যাবে কিনা সেটিও এক প্রকারের প্রশ্নের বিষয়। যদি তা সম্ভব না হয় তাহলে কোন আইনি প্রক্রিয়ায় তাদের নিষিদ্ধ করা যায় সেটিও কিছুটা স্পর্শকাতর ইস্যু বটে। যদিও জামায়াতের হয়ে এই সংগঠনটিই সবচাইতে বেশি ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে।

এখন কথা হচ্ছে, জামায়াত নির্বাচন করতে না পারলে কার রাজনৈতিক স্বার্থ সবচাইতে বেশি? স্বভাবতই বিএনপির রাজনৈতিক স্বার্থই বেশি। যদিও তারা তা প্রকাশ করে না। জামায়াতের মূল নেতাকে দেশে এনেছে বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়া। সুতরাং জামায়াত নির্বাচন করতে না পারলে তাদের সম্পূর্ণ সাপোর্ট বিএনপির দিকেই সরে যাবে এটিই স্বভাবিক। নির্বাচন করতে পারলেও তারা বিএনপির সাথে ঐক্য করেই নির্বাচন করতো। সুতরাং ফ্রি ফ্রিতে তাদের সমর্থন পেয়ে যাওয়া দলটির জন্য এক প্রকারের ‘আশীর্বাদ’ হয়েই আসবে বলে মনে করছেন অনেকেই।

তাছাড়া বিগত সাড়ে ১১ বছরের ঐক্যে বিএনপির তৃণমূলকে যে শিবির একেবারেই খোলসে মোড়ানো শূণ্য শামুকে পরিণত করেছে তা দলটির ‘রাজকুমার’ এর মনে হয় ভালোভাবেই দৃষ্টিগোচর হয়েছে। সুতরাং উপরে উপরে বললে কি হবে, ভেতরে ভেতরে দলটি ভালোভাবেই চায় জামায়াত নির্বাচন না করতে পারুক। কিন্তু প্রকাশ্যে বলতে পারছে না হয়তো পরবর্তিতে এই অংশের ভোট না পাওয়ার আশংকায়। এখন যে ভোটের রাজনীতিই মুখ্য সেটি স্পষ্ট।

আর আওয়ামী লীগ কখনোই এই অংশের ভোট পেত না। নীতিগত কারণেই আওয়ামী লীগ আর মৌলবাদী এই গোষ্ঠীটি সবসময়েই বিপরীত মেরুর বাসিন্দা। সুতরাং আওয়ামী লীগের লাভ-ক্ষতির হিসাব মৌলবাদীদের সাথে নাই বললেই চলে।

পক্ষান্তরে জামায়াত নির্বাচন করতে না পারলে অথবা নিষিদ্ধ হলে বিএনপিই হয়ে উঠবে একটি মৌলবাদী রাজনৈতিক দল। ইতিমধ্যে তারা তা আছেই। তবে প্রকাশ্যে আরও কট্টর হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সুতরাং আগামী নির্বাচন অনেক দিক থেকেই তাৎপর্যপূর্ণ।

কিন্তু হতাশার বিষয় হচ্ছে, সাম্প্রতিককালে ধর্মের নাম দিয়ে জামায়াতের ছায়ার নিচে সবচাইতে ভয়ানক মৌলবাদী সংগঠনটির উত্থান হয়েছে সেটি হেফাজতে ইসলাম। এটিকে নিষিদ্ধ করার বিষয়ে কোন উদ্যোগ কারো পক্ষ থেকেই নেয়া হচ্ছে না। কিন্তু গত কয়েকটি নির্বাচন খেয়াল করলে দেখা যাবে এই সংগঠনটির নামেই জামাত ও শিবিরের কর্মীরা মাঠে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে।

মনে রাখতে হবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সংগ্রাম মানেই হচ্ছে ধর্মনিরপেক্ষ বাংলাদেশ বিনির্মাণের সংগ্রাম। সুতরাং মৌলবাদী গোষ্ঠীকে সাথে পাওয়া যাবে না এটিই প্রকাশ্য দিবালোকের মত সত্য। সাথে শুধু থাকবে মেহনতি মানুষ, লাখ লাখ শ্রমিক আর মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রতিটি মানুষ। পরীক্ষা যত কঠিন ফলাফল ততই তাৎপর্যপূর্ণ হয়। সুতরাং স্বপক্ষ শক্তিকে এখুনি নেমে পড়া দরকার কাজে।

জামায়াত, হেফাজত কিংবা আলাদা যতই মৌলবাদী গোষ্ঠী রয়েছে তারা কেউই আওয়ামী লীগের পক্ষে কখনোই ছিল না। থাকবেও না। পুরো বিষয়টাই এখানে স্বচ্ছ। লড়াইয়ের জায়গাটাও স্বচ্ছ। সুতরাং অংকটা কিভাবে মেলাবে আর কিভাবে আগাবে সেটি আওয়ামী লীগ আর তার স্বপক্ষের মানুষের নিজেদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে… আর হ্যাঁ বিএনপি নিজেই একটা কলঙ্ক। তাদের কলঙ্ক মেখে কলঙ্কিত হওয়ার দরকার নেই।

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.