“তোমাতে বিশ্বময়ীর, তোমাতে বিশ্ব মায়ের আঁচল পাতা”

0

ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী:

মায়ের অসুস্থতার সময় আমি তাঁর কাছে কোনো মন খারাপের খবর পৌঁছাতাম না। আসলে ভালো-মন্দ কোনো খবর নেয়ার মতো অবস্থা তাঁর ছিলো না। কেবিনে থাকার সময় মাকে স্বাভাবিক পরিবেশ দেবার জন্য ধীরে ধীরে টেলিভিশন চালানো শুরু করি। তিনি তেমন আগ্রহ বোধ করতেন না।
তারপরেও জীবনের শেষ কয়েকটি দিন আমার মা প্রিয়ভাষিণী হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে বারবার উদ্বিগ্ন হয়ে আমার কাছে জানতে চেয়েছিলেন, “আনিসুল হক এখন কেমন আছেন?… জাফর ইকবাল স্যার কেমন আছেন? রমা চৌধুরী কেমন আছেন?”

জাফর ইকবাল স্যারের ওপর চাপাতি হামলার পর, সার্জারি থেকে ফিরে স্যারের হাস্যোজ্জ্বল, হার না মানা মুখটি দেখে মায়ের কথা মনে পড়ছিলো। সেসময় পর্যন্ত মা থাকতে পারেননি।

নগরপিতা আনিসুল হকের মৃত্যুতে শোকস্তব্ধ হয়েছিলেন মা। মা নিজেও তখন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।
প্রতিটি মৃত্যুই বেদনার। কিন্তু একটি জাতির অগ্রযাত্রায় যাঁরা পথিকৃৎ, সেই আলোর পথযাত্রীদের জীবনাবসান
অপূরণীয় ক্ষতি আর গভীর শূন্যতা রেখে চলে যায় আমাদের জীবনে।

ছবির কৃতজ্ঞতা – নারীপক্ষ।

স্বাধীনতার মাস মার্চে প্রিয় দেশের মাটিতে সমাহিত হলেন প্রিয়ভাষিণী।
এরপর শতবর্ষী মুক্তিযোদ্ধা কাঁকন বিবির প্রয়াণ অনেকটা নিভৃতে।
হাসপাতালের বিছানায় বছর খানেক লড়াইয়ের পর গতকাল একাত্তরের জননী রমা চৌধুরীও সঙ্গী হলেন তাঁদের। আমরা বুঝতে পারছিলাম এই মানুষগুলো জীবনের অন্তিমকালে দাঁড়িয়ে।

বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের একেকটি কিংবদন্তি অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটে গেল।
পুরো একটা জীবন তাঁরা নিবেদন করে গেলেন দেশকে ভালোবেসে। নতুন প্রজন্মের হাতে আলোর মশাল অর্পণ করবার লক্ষ্যে দীর্ঘ ৫৫,৯৭৭ বর্গমাইল পথ হেঁটে গেলেন তাঁরা অবিরাম, অক্লান্ত।

“হায়! এ কী সমাপন!”
আমরা শ্রদ্ধায় নতজানু হলাম। ফুলে ফুলে ছেয়ে গেল জাতীয় পতাকায় মোড়ানো কফিন, একাত্তরের জননীদের। ঋণ শোধ হলো কি!

লেখক: ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী

বলবো না বিদায়, মাগো! তবু এ চরম সত্য যে,
ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী আর নিন্দিত নন্দনের জড়বিষাদ ভুলতে ডুবে থাকবেন না তাঁর নন্দিত শিল্পকর্মের ভুবনে। জীবনযুদ্ধের কঠিন বাস্তবতা আর সংসারের প্রয়োজনকে আড়ালে রেখে, দেশের প্রয়োজনে ছুটে যাবেন না অবশ পা দুটো নিয়ে।
কাঁকন বিবির জীর্ণ কুটির নিভৃতেই রয়ে যাবে অভিমানে, অবহেলায়।
চট্টগ্রামের পথে পথে একাত্তরের জননী রমা চৌধুরীকে আর দেখা যাবে না খালি পায়ে সাবধানে মাটিতে পা ফেলে পথ চলতে।
তাঁদের পায়ের কাছে বসে আর শোনার সুযোগ হবে না কালের সাক্ষ্য।
বীর মুক্তিযোদ্ধা, বীরমাতা, বঙ্গ জননীত্রয় জীবন মরণের সীমানা ছাড়িয়ে দাঁড়ায়ে রইলেন, একে অপরের সহযোদ্ধা হয়ে। বাংলার মাটি, বাংলার জল পূণ্য হয়ে রবে তোমাদের পদধূলিতে।

দেশপ্রেমিকের মরদেহে লাল সবুজ পতাকার রাষ্ট্রীয় সম্মান আমাকে তুমুল আন্দোলিত করে, সেই সাথে শিখিয়ে যায়, কেবল মরণে ফুল দিয়ে যেন দায় না সারি, দেশের জন্য আত্মত্যাগী বীর মুক্তিযোদ্ধাদের জীবনযুদ্ধে, জীবন সায়াহ্নে যেন পাশে গিয়ে হাতটা ধরি। এখনো যাঁরা বেঁচে আছেন, যাঁরা পরম মমতায় আমাদের হাতে তুলে দিয়েছেন একটি স্বাধীন মানচিত্র, লাল সবুজ পতাকা আর একটি নতুন অরুণোদয়ের ইতিহাস – জীবদ্দশায় তাঁদের প্রাপ্য সম্মানটুকু করে সার্থক হোক এ জন্ম।

“আমরা ঘুচাবো মা তোর কালিমা
মানুষ আমরা, নহি তো মেষ
দেবী আমার, সাধনা আমার
স্বর্গ আমার, আমার দেশ।
বঙ্গ আমার জননী আমার
ধাত্রী আমার, আমার দেশ “

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 634
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    634
    Shares

লেখাটি ৮৩৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.