আমার কর্মজীবী মা ও আমার শৈশব

0

ফারিয়া রিশতা:

আমার জন্ম জগতের চিরায়ত নিয়ম মেনে খুব স্বাভাবিকভাবে হলেও, বোধ হওয়ার পর পরই বুঝেছিলাম, আমার জীবনটা খুব একটা স্বাভাবিক পারিবারিক প্রক্রিয়ায় কাটবে না। সেটা খুব ভালোভাবে টের পেয়েছিলাম যখন প্রথম স্কুলে গেলাম।
প্রি ক্যাডেটে ভর্তির পর যখন অন্য বাচ্চারা বাবাদের, স্পেশালি মায়েদের হাত ধরে আসতো, আমার জন্য তখন বরাদ্দ হয়েছিল স্কুলের ভ্যান। দীর্ঘদিন ভ্যানে চড়ার সুবাদে চলতি পথে দুষ্টুমির হারও ছিল তীব্র। কিন্ডার গার্ডেনের পর সরকারি স্কুলে ক্লাস থ্রিতে ভর্তি হওয়ার দ্বিতীয় দিন থেকেই আবারও একলাই রিকশাতে যাতায়াত!

প্রফেশনালি আমার বাবা-মা দুইজনেই ডাক্তার কিনা!

খুব মনে আছে, এক জন্মদিনে ঠিক কেক কাটার মুহুর্তে মা আমার ছোট্ট জন্মদিনের পার্টি ছেড়ে হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে দৌড়েছিল। জীবনে প্রথম ছোট চাচীর হাত ধরে কেক কেটেছিলাম।
ছোট্ট আমি সেই প্রথম তীব্র ভাবে মন খারাপ হওয়াটা টের পেয়েছিলাম।
কিন্তু পরের দিন যখন দেখলাম, মা এর হাতেই জাদুতে আমার প্রিয় বান্ধবীর মায়ের কোলে টুপ করে একটা কিউট বাচ্চা চলে এসেছে, সেদিন ছোট্ট রিশতার জীবন বদলে গেসিলো।
সেদিন থেকে সেই ছোট্ট রিশতার কাছে তার মা একজন জাদুকর।

বয়স যখন ৫ তখন আমার মায়ের কোল জুড়ে আমার ভাইটা এলো, বিশ্বাস হয় না নিজেরই, যে সেই ক্ষুদে হাত খুব জলদিই একটা বাচ্চার ন্যাপি বদলানো, বাচ্চাকে ঘুম পাড়ানো, যত্ন নেওয়া শিখে গেসিলো। আমার শৈশবের সব থেকে বড় দায়িত্ব ছিল আমার ছোট ভাই।

আমার জাদুকর মায়ের এসিস্ট্যান্ট হিসেবে খুব জলদিই আমার সংসারের কাজের হাতেখড়ি হয়।
চা বানানো, মেহমান এলে নাস্তা দেওয়া,বাসা গুছায়ে রাখা এসব ছোটখাটো কাজের মধ্য দিয়ে আমাদের চার জনের সংসারে ক্ষুদে ক্ষুদে অসংখ্য দায়িত্ব আমার কাধে এসে পরে।

মহা আনন্দে আমি আমার পাট চুকাতাম। আমার কাছে এসব ই স্বাভাবিক ছিল, এখনো স্বাভাবিক।
ক্লাস ফাইভে থাকতে মা হায়ার স্টাডিজ এর সুযোগ পেলো, সমাজ এবং তথাকথিত মহান কিছু আত্মীয় সেদিন মায়ের দিকে আংগুল তুলে বলেছিল – ‘ এত কিসের পড়াশোনা সংসার আর বাচ্চাকাচ্চাদের ফেলে? যাওয়ার দরকার কি ! ‘
যেদিন কেউ ছিল না আমাদের পাশে সেদিন আমি বাবা আর আমার ছোট ভাই একে অন্যকে আকড়ে ধরে মাকে বলেছিলাম – যাও মা, স্বপ্ন পূরণ করো। আমরা আছি তোমার সাথে!

যাওয়ার আগে ক্লাস ফাইভের আমাকে মা বসে থেকে খুব স্বাভাবিকভাবে বুঝিয়েছিলেন, প্রিয়ড এর ব্যাপারে, স্যানিটারি ন্যাপকিন এর ব্যাপারে, নারী পুরুষের সম্পর্কের ব্যাপারে , কিভাবে নিজেকে নোংরা হাত থেকে দূরে রাখতে হবে সে ব্যাপারে। সোজা ভাষায় সেক্স এডুকেশন!
সেদিন আমার মা শুধু আমার মা ছিলেন না, আমার বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে গেসিলেন।

প্রায় দুইটা বছর মাকে পড়তে পাঠানোর পর কেমন জানি সাহসী হয়ে উঠেছিলাম। খুব অল্প বয়সে স্ট্রং একটা ব্যাপার বিল্ড আপ শুরু হয়ে গেসিলো আমার মাঝে, যার কারনে একলা পথ চলতে বা দায়িত্ব নিতে আমি কখনো ভয় পাইনাই।
ফিরে এসে মা ব্যাস্ত হলেন তার ক্যারিয়ার নিয়ে আর শুধু মেয়ে হিসেবে নয়, বন্ধু হয়েও যতটা সম্ভব সাপোর্ট দিয়েছি।
যে বয়সে আমার বান্ধবীরা চা বানানো শিখছে তখন আমি অবলীলায় পোলাও রান্না করে মায়ের বন্ধুদের খাওয়ায়েছি।

বড়াই করছি?? না আফসোস??
আসলে কোনটাই না।
এসবের আড়ালে রান্নাবান্নাটা আমার প্যাশনে পরিণত হয়েছিল খুব সহজেই। আর মা ও আমার উপর ভরসা করতো অবলীলায়। এখনও করেন।

হ্যাঁ, আমার মা হয়তো আমাকে মুখে তুলে খাওয়ানোর সুযোগ পান নাই, চুলে কোনদিন তেল দিয়ে দেন নাই, কিন্তু আমার মা এর মত সেরা বন্ধু এই পৃথিবীতে আর একটাও পাইনি আমি। জীবনে কখনো কোন কথা বলতে আমার যেমন সংকোচ হয়নি তেমনি সংসার বা নানাবিধ ব্যাপারে আমার সাজেশন নিতেও মায়ের কখনো সংকোচ হয় নাই।

ছোটবেলা থেকে ছোটখাটো দায়িত্ব গুলা আমাকে যেমন রেসপনসিবিলিটি শিখিয়েছে, তেমনি একলা চলার সাহস জুগিয়েছে, কনফিডেন্স জিনিস টাকে অস্থিমজ্জায় ঢুকিয়ে দিয়েছে, কম্প্রমাইজ আর স্যাক্রিফাইস জিনিস গুলা অনেক ছোটবেলা থেকেই শিখে নিয়েছিলাম। মানুষের সাথে সহজে মিশতে পারার গুণটাও এসব থেকেই এসেছে আমার সাথে।

হ্যাঁ, আমার মা আমাকে নিয়ে টিচারদের বাসায় যান নাই, পরীক্ষার পর নিতে আসেন নাই কিন্তু দিনশেষে মায়ের সাথে সারাদিনের গল্প খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে বলে এমন অভ্যাস হয়ে গেছে যে এখনো মাকে ফোন দিলে বা মায়ের সাথে আড্ডা দিতে বসলে সময়জ্ঞান থাকে না। এই হলো আমাদের মা আর মেয়ের সম্পর্ক।

এতো কথা আজ কেন বলছি??
আজ সকালে যশোর এয়ারপোর্টে মায়েদের ঢাকায় হওয়া কনফারেন্সের দৌলতে অনেক গাইনি কন্সালটেন্ট এর সাথে দেখা হয়েছে। তাদের মধ্যে একজন আন্টির ঘটনা আমাকে বড্ড নাড়া দিয়েছে, অতীতের অনেক কথা মনে করিয়ে দিয়েছে।
আন্টির ছোট বাচ্চাকে তার ক্লাস টিচার বাকি সব বাচ্চাদের সামনে তাচ্ছিল্য করে শুনিয়েছেন যে ‘তার মা মানুষের পেট কেটে বেড়ান!’

একবার ভাবুন তো, ওয়ান টু এ পড়া একটা বাচ্চা, কতই বা তার বয়স? সেই বয়সের একটা বাচ্চাকে একজন শিক্ষিত টিচার যদি তার মায়ের এরকম নোবেল একটা প্রফেশন সম্পর্কে এমন ধারণা ঢুকিয়ে দেয় তাহলে তার কেমন লাগে? বলা বাহুল্য, টিচার ব্যক্তিটি একজন পুরুষ ছিলেন। আর মায়েদের চাকরি করাটা এই সমাজের এক শ্রেণীর মানুষের চক্ষুশূল।

একবার না বহুবার এমন ঘটনা আমার সাথেও ঘটেছে।
আমার মা গাইনী কনসালটেন্ট, উনি পেট কাটা ডাক্তার।
আমার বাবা এনেস্থেসিস্ট, উনি অজ্ঞান করা ডাক্তার বা অজ্ঞান পার্টি, আর দুইজনেই কসাই। এগুলা শুনেই আমার বড় হওয়া। এগুলাও আমার শৈশবের অংশ। এবং কথাগুলা কাছের মানুষদের মুখেই আমি সবথেকে বেশিবার শুনেছি।

আচ্ছা একটা কথা বলুন তো!

আজ যদি আমাদের মায়েরা ডাক্তার না হতেন তাহলে আপনার মা বোনেদের উলংগ করে পুরুষ ডাক্তারদের সামনে উন্মুখ করতে পারতেন? আমাদের মায়েরা যদি শিক্ষিকা না হতেন তবে পুরা জাতির সুশিক্ষার ভার নিতে পারতেন ? আমাদের মায়েরা রাত জেগে খাতা দেখে আপনার সন্তান কে পাশ করায় তার কোন মূল্য নাই? আমাদের মায়েরা ব্যাংকে বসে আপনার অর্থের হিসকাব রাখে, ক্যামেরা হাতে ছুটে ছুটে খবর সংগ্রহ করেন। এগুলার কোন মূল্য নেই?

সমাজের প্রতিটা স্তরে আমাদের কর্মজীবী মায়েরা তাদের জীবনের অর্ধেক সময় পার করে, মাথার ঘাম পায়ে ফেলে যে ভূমিকা রাখেন তার দায় এই সমাজ এতো সহজে অস্বীকার করে ফেলে কোন সাহসে?

এখনো এদেশে বেশিরভাগ মানুষের ধারণা- কর্মজীবী মায়েদের সন্তানেরা মানুষ হয় না!
তা ভাই, আমাদের কে কি আপনার মানুষ মনে হয় না? আমরা যারা কর্মজীবী মায়ের সন্তান তারা কি এলিয়েন নাকি কীট পতংগ? আমাদের কি আপনাদের মতো দুই হাত, দুই পা, দুই চোখ নেই? আমরা কি শিক্ষিত হই না? সমাজে প্রতিষ্ঠিত হই না?
তাহলে?

দুই চারটা বাচ্চা বিপথে গেলে তার দায়ভার শুধু মাকে কেন দেওয়া হবে? মা তো মা-ই! সে গৃহিণী হোক বা কর্মজীবী, সন্তানের জন্য সর্বোস্ব ঢেলে দেওয়া মানুষটাই তো মা! তাই কোন সন্তান বিপথে গেলে সেটা সেই সন্তানের দোষ, শুধুমাত্র মাকে সন্তানের জন্য দোষারোপ করা এই সমাজের কাপুরুষতা, দায়িত্ব জ্ঞানহীনতা।

আমার মা একজন ডাক্তার, একজন সরকারী কর্মচারি, একজন কর্মজীবী মহিলা এবং তাকে নিয়ে আমি গর্বিত।
আমি তাকে দেখে সাহস নিই, আমি তাকে দেখে সাহসী হতে শিখি, আমি তার কাছ থেকে আত্মসম্মান এর শিক্ষা নিই, নারী হওয়ার মর্ম বুঝি, মাথা না নুইয়ে সম্মানের সাথে বাঁচা শিখি।

আমার মা একজন কর্মজীবী নারী এবং মা হিসেবে উনি অতুলনীয়।
আমার মা একজন কর্মজীবী নারী, যিনি একা হাতে সংসার, ক্যারিয়ার সব সুনিপুণভাবে সামলাতে পারে। স্বামী সন্তানের পাশাপাশি উনি উনার ক্যারিয়ারের প্রতিও সচেতন।
আমার মা একজন কর্মজীবী নারী, যাকে কোনদিন কার কাছে হাত না পেতে, আত্মসম্মানের সাথে বাচতে দেখেছি আমি। দেশের জন্য সমাজের জন্য তার অবদান অনস্বীকার্য।

আমার মা একজন কর্মজীবী নারী, যিনি একজন মানুষ ও মা হিসেবে শ্রেষ্ঠ। আমি আমার মাকে নিয়ে সব থেকে বেশি গর্বিত।

আমার মা একজন মা, আর উনি মা হিসেবে কেমন সেটা জাজ করার রাইট এই সমাজ, দেশ এবং পৃথিবীর কারো নেই! কারো নেই!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 4.3K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    4.3K
    Shares

লেখাটি ১০,৫৪৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.