কুষ্টিয়া কি দেশের বাইরে কোন দেশ?

helal uddin panna
ছবি: আদর্শ মাধ্যমিন বিদ্যালয়, কুষ্টিয়া এবং সিরিজ ধর্ষক হেলাল উদ্দিন পান্না (ইনসেটে)

সুপ্রীতি ধর  (২ আগস্ট ২০১৩): অবাক হই ভেবে যে, একজন শিক্ষক দিনের পর দিন তার শিক্ষার্থীদের ওপর যৌন হয়রানি চালিয়েছে, আর সেই হয়রানির দৃশ্যসম্বলিত ভিডিওতে এখন বাজার সয়লাব হয়ে গেছে।

কিভাবে আছে তাহলে সেখানকার মানুষ? বিশেষ করে নির্যাতিত মেয়েগুলো আর তাদের পরিবার? দিনের পর দিন এতো ঘটনা ঘটলো কুষ্টিয়ার মতো একটা জেলা শহরে, অথচ কাকপক্ষিও জানলো না? কি করে সম্ভব এটা? একটি মেয়ে বা একটি পরিবারও কি সাহসী ছিল না, যে এই ঘটনার প্রতিবাদ করতে পারতো? শুধুমাত্র সামাজিক হয়রানির কথা ভেবে অভিভাবকরাও বেমালুম চেপে গেল ঘটনাটি? কী ভয়াবহ!

একজন নয়, দুজন নয়, কুষ্টিয়ার এক স্কুল শিক্ষকের যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছে প্রায় দেড়শ শিক্ষার্থী! শুধু তাই নয়, সেই ভিডিওচিত্র ছড়িয়ে পড়ার পর ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের সদস্যরা এখন হয়রানির শিকার হচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভিডিওচিত্র ছড়িয়ে দেয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার ঘটনাও ঘটছে। নিপীড়কদের হামলায় এলাকা ছাড়তে হয়েছে একটি পরিবারকে। ঘরের ভেতরে ‘বন্দি’ জীবন বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছেন অনেক ছাত্রী। অনেক মেয়ের আবার এরই মধ্যে বিয়ে হয়ে গেছে, তার এতোদিন নির্বিঘ্নেই সংসার করছিলেন। কিন্তু হঠাৎই যেন সব ওলটপালট হয়ে গেল। এখন সেইসব বিবাহিত মেয়েদের অভিভাবকরা নির্ঘুম সময় কাটাচ্ছেন মেয়ের অকল্যাণের আশংকা করে। প্রায় দেড় মাস আগে জুনের ১৫ তারিখে একটি মেয়ের শ্লীলতাহানির চেষ্টা করলে জানাজানি হয়ে যায় বিষয়টা। লোকজন এসে ওই শিক্ষক কুষ্টিয়ার আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গণিতের শিক্ষক হেলাল উদ্দিন পান্নাকে গণপিটুনি দেয় এবং তার ঘর থেকে মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ ছিনিয়ে নিয়ে যায় লোকজন। সেই ল্যাপটপ ঘেঁটেই ধরা পড়ে সেই শিক্ষকের অতীত কুকর্মের কথা।

কিন্তু হিতে-বিপরীত হয় এক্ষেত্রেও। ল্যাপটপে সন্নিবেশিত ভিডিও চিত্রগুলো একহাত-দুইহাত ঘুরতে ঘুরতে শত হাতে ছড়িয়ে পড়ে। অন্ধকার নেমে আসে বিভিন্ন পরিবারে। জানাজানি হয়, আজকেই শুধু নয়, শিক্ষক নামধারী এই হেলাল বেশ কবছর ধরেই এমন নির্যাতন চালিয়ে আসছে। কিন্তু মেয়েগুলো দুর্নামের ভয়েই হোক বা ভিডিও প্রকাশ করে দেওয়ার হুমকির কারণেই হোক, চেপে গিয়েছিল। মানুষের হাতে হাতে ভিডিওগুলো পৌঁছালেও তা এখনও জব্দ করতে পারেনি পুলিশ। বাজারে সিডির দোকানে সেগুলো অবাধে বিক্রি হচ্ছে বলেও জানান ক্ষুব্ধ অভিভাবকেরা। এ ঘটনায় পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইনে কুষ্টিয়ার আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের গণিতের শিক্ষক হেলাল উদ্দিন পান্নাসহ চার জনকে আসামি করে গত ৭ জুলাই কুষ্টিয়া মডেল থানায় একটি মামলা করে পুলিশ।

মামলার অন্য আসামিরা হলেন- প্রকৌশলী আলিমুজ্জামান ওরফে টুটুল, প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম ওরফে সজল ও প্রকৌশলী হাসানুজ্জামান হাসান। তাদের সবার বাড়ি কুষ্টিয়ার হাটশ হরিপুর ইউনিয়নের হরিপুর গ্রামে। মামলার এজাহারে বলা হয়, গত মাসে হেলাল উদ্দিন তার কাছে প্রাইভেট পড়তে আসা এক ছাত্রীর সঙ্গে জোর করে ছবি তোলার পর বিষয়টি জানাজানি হয়ে যায়। এ নিয়ে গত ১৫ জুন ওই ছাত্রীর আত্মীয়-স্বজন, এলাকাবাসী ও কয়েকজন সাংবাদিক হেলালকে মারধর করে। তারপর থেকে পলাতক রয়েছেন হেলাল। চার-পাঁচ বছর আগে থেকে শুরু করে গত ১৪ জুন পর্যন্ত গোপন ক্যামেরায় এসব দৃশ্য ধারণ করা হয়েছে বলে এজাহারে বলা হয়। ওই সব ভিডিওচিত্রে স্থানীয় প্রভাবশালী মনিরুল ইসলাম মনো ও তার ভাগ্নে দুলাল উদ্দিনকেও দেখা গেছে। আসামিদের মধ্যে আগে হাসানুজ্জামানকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার গ্রেপ্তার করা হয়েছে মনোকেও।

স্থানীয়দের বরাত দিয়ে একটি অনলাইন পত্রিকা জানায়, এক ছাত্রীর ওপর মনোর যৌন নিপীড়নের ভিডিওচিত্র ছড়িয়ে পড়ার পর দুর্বৃত্তরা ওই ছাত্রীর বাড়িতে হামলা চালায়। এরপর শহরের হাউজিং এস্টেট এলাকায় নিজেদের বাড়ি ছেড়ে অন্য স্থানে থাকতে বাধ্য হচ্ছে পরিবারটি। শহরতলীর যুগিয়া এলাকার এক অভিভাবক বলেন, “এক লোক নিজেকে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে আমার মেয়ের ভিডিওক্লিপ বাজারে ছাড়ার ভয় দেখিয়ে মোটা অংকের টাকা চেয়েছে।”

স্থানীয় প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিষয়টি জানানোর পরেও আশ্বস্ত হওয়ার মতো কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন নির্যাতিত এক ছাত্রীর মা। তিনি বলেন, পান্না গংয়ের জানোয়ারদের লালসার শিকার হয়েছে আমার মেয়ে, আবার নতুন করে নোংরা, অশ্লীল ভিডিওচিত্রগুলি বাজারে ছড়িয়ে দিয়ে আমাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে’। এই ঘটনার বিচার হবে কি না তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন তিনি। (সূত্র: বিডিনিউজ)

খবর অনুযায়ী নির্যাতনের শিকার হয়ে এক ছাত্রী লেখাপড়া ছেড়ে ঘরে বন্দি জীবন কাটাচ্ছেন। মানসিকভাবে অনেক পরিবার এখন বিপর্যস্ত। খবরটি জানাজানি হওয়ার পর বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন, নারী সংগঠন প্রতিবাদমুখর হলেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে তেমন জোরালো কোন পদক্ষেপ চোখে পড়ছে না বলেও জানান কিছু অভিভাবক। অভিযুক্ত স্কুল শিক্ষক হেলাল উদ্দিনকে এসব ঘটনায় সম্প্রতি তালাক দিয়েছেন তার স্ত্রী স্কুলশিক্ষিকা ফাতেমা আক্তার চুমকি। হেলাল ও তার সহযোগীদের বিচার দাবি করে তিনি বলেন, ‘হেলাল তার সহযোগীদের সাথে নিয়ে যে জঘন্য অপরাধ করেছে একজন নারী, মা, অভিভাবক হিসেবে আমি তার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি। আমি তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই’। পাশাপাশি ওই সব ভিডিওচিত্র যারা ছড়িয়ে দিয়েছে তাদেরও গ্রেপ্তার করার দাবি করেন তিনি।

এ ঘটনার প্রতিবাদে এবং দোষীদের গ্রেপ্তার দাবিতে এলাকাবাসীর পাশাপাশি বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার সংগঠন বিভিন্ন বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছে। সবাই পুলিশের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ এনেছেন। বলেছেন, ত্বরিৎ কোন পদক্ষেপ নেওয়া গেলে এতোগুলো ঘটনা ঘটতো না।

এ ঘটনায় স্থানীয় সাংবাদিক জহুরুল ইসলামের সাথে কথা বললে তিনি জানান, পরিস্থিতি খুবই নাজুক এখন। ঘরে ঘরে একটা ক্ষোভ, চাপা কান্না বিরাজ করছে। জিজ্ঞ্যেস করেছিলাম তাকে, আপনারা কি করলেন তাহলে এতোদিন? কিছুই বুঝতে পারেননি? তিনি বলেন, সামাজিক কলংক হবে ভেবে অভিভাবকরাই আসলে চেপে গিয়েছে পুরো ঘটনাটি। তারা আগে মুখ খুললে এতোকিছু ঘটতো না নিশ্চিত। জানি না, এর সমাধান কি? প্রশাসন তৎপর হলে বড়জোর অপরাধী ধরা পড়বে। তার বিচার আদৌ হবে কিনা, পরিবারগুলোই বা কি করে, কতদিনে এই ট্রমা কাটিয়ে উঠতে পারবে, ভাবতেই গা শিউরে উঠে।

সবশেষে একটি কথাই বলবো, একটি মেয়ে নির্যাতিত হওয়ার দায় মেয়েটির নয়, বরং সমাজের। সামাজিক বিধি-নিষেধই মেয়েটিকে ঠেলে দেয় সীমাহীন নির্যাতনের মুখে। কাজেই সামাজিক কলংকের বোঝা তার ঘাড়ে চাপবে কেন? সে তো কোন দোষ করেনি। অপমান-কলংক নামক শব্দগুলোর বিশাল বোঝা ঝেড়ে ফেলতে হবে। মুখ খুলতে হবে প্রতিটি অন্যায়ের বিরুদ্ধে। এই দায় যেমন প্রতিটি পরিবারের, তেমনি রাষ্ট্রেরও।

শেয়ার করুন:
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.