পুষ্পকুন্তলা এবং ক্ষীরোদা প্রভার কথা মনে আছে?

0

প্রজ্ঞা আহম্মদ জ্যোতি:

মাস্টারদা সূর্য সেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম মহানায়ক। চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন ১৯৩০-সহ বহুবিধ বিপ্লবের অধিনায়ক। আমাদের চট্টগ্রামের বীর সন্তান। যার কারণে বিশ্বমঞ্চে চট্টগ্রাম বিশেষভাবে পরিচিত। আমাদের সেই বীর মাস্টারদা যিনি হাসতে হাসতে ফাঁসির কাষ্ঠে উঠেছিলেন। কত গান, কত কবিতা তাকে নিয়ে। খেলে হামজি জানসে এবং চিটাগং নামে তার বীরত্বের কাহিনী নিয়ে বলিউডে দুটি সিনেমাও বানানো হয়েছে।

মাস্টারদার কথার সাথে উঠে আসে চট্টগ্রামের বীর কন্যা প্রীতিলতার কথা। ভারতীয়দের অপমান করায় ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এই নারী। যিনি ব্রিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের অন্যতম নারী মুক্তিযোদ্ধা ও প্রথম বিপ্লবী নারী শহীদ ব্যক্তিত্ব।
অমর তাদের এই ত্যাগ। তাদের কারণেই আমরা বারবার স্বধীনতার জন্য লড়তে সাহস পেয়েছি এবং পাই।

আচ্ছা পুষ্পকুন্তলা এবং ক্ষীরোদা প্রভার কথা মনে আছে?

বোয়ালখালী উপজেলার কানুনগো পাড়ার নগেন্দ্রনাথ দত্তের কিশোরী মেয়ে পুষ্পকুন্তলা দত্ত। ১৬ বছর বয়সে বিয়ে হয় মাস্টারদা সূর্যসেনের সাথে। সংসারধর্ম করার কোনো মন ছিলো না সূর্যসেনের, তাঁর সমস্ত মন ছিল স্বদেশের তরে। বড়ভাই শিক্ষক চন্দ্রনাথ সেনের বিশেষ অনুরোধে পুষ্পকুন্তলাকে বিয়ে করেছিলেন তিনি। কিন্তু তিনি বিশ্বাস করতেন যে, বিবাহিত জীবন তাকে কর্তব্যভ্রষ্ট ও আদর্শচ্যুত করবে। তাই তিনি বিয়ের তৃতীয় দিন গ্রামের বাড়ি ছেড়ে শহরে চলে আসেন এবং তারপর স্ত্রীর সাথে আর কোনদিন দেখা করেননি।

কিন্তু পুষ্পকুন্তলা কথা না বলা স্বামীর দেশপ্রেমকে কখনো অবজ্ঞার সাথে দেখেননি। তিনি চাইতেন তিনিও স্বামীর সাথে দেশের জন্য লড়বেন। চিঠি লিখতেন মাস্টারদাকে। চিঠিতে মাস্টারদাকে অভিযোগ করতেন, প্রীতিলতারা পারলে তিনি কেনো পারবেন না!

সূর্যসেনের সহযোদ্ধাদের দেখলে তিনি বলতেন, মাস্টারদাকে যেন বোঝায় তাকেও যেন তাদের সাথে নেয়।
পুষ্পকুন্তলার সেই স্বপ্ন স্বপ্নই থেকে যায়। দু:শ্চিন্তা এবং টাইফয়েড জ্বরে অকালেই পৃথিবী ছেড়ে চলে যান তিনি। মাস্টারদা তখন রত্নগিরি জেলে আটক। বহু দরখাস্তের পর মাস্টারদাকে পুলিশ পাহারায় রত্নগিরি জেল থেকে আনা হয় শেষবার পুষ্পকুন্তলাকে দেখতে। স্বামীকে শেষবার দেখেই মৃত্যুকে বরণ করেন চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত গাঁয়ের এই কিশোরী বধূ। অধরা থেকে যায় তার স্বপ্নগুলো।

পুষ্পকুন্তলাকে নিয়ে ছোটবেলায় একটা বই পড়েছিলাম। ঐখান থেকেই তাঁর নাম জানতে পারি। কেন জানি ইতিহাস থেকে যেন পুষ্পকুন্তলারা অনেক দূরে। বাংলার একেকজন সহজ সরল গ্রাম্য বধূর মুখের প্রতিচ্ছবিতে এবং না পাওয়ার আশায় আমরা পুষ্পকুন্তলাকে খুঁজে পাই।

আমাদের পাশের গ্রাম গৈড়লা। সেই গ্রামের বিশ্বাস বাড়ির বধূ ছিলেন ‘ক্ষিরোদা প্রভা’। বিধবা ক্ষীরোদা প্রভার সংসারে ১১ বছরের ছেলে মনোরঞ্জন বিশ্বাস ছাড়া কেউ ছিলো না।

ক্ষীরোদা প্রভা ছিলেন সূর্য সেনের আশ্রয়দাতা সহযোদ্ধা। তার বাড়িতেই বসতো সূর্যসেনদের গোপন বৈঠক। ক্ষীরোদা প্রভা তার বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিলেন সূর্যসেন, মনি দত্ত, সুশীল দাশগুপ্ত,কল্পনা দত্ত ও শান্তি চক্রবর্তীদের মতো প্রমুখ বিপ্লবীদের।
কোনোভাবে ইংরেজদের কানে পৌঁছে যায় বিপ্লবীদের এই গোপন আস্তানার কথা। ১৯৩৩ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি রাত প্রায় নয়টায় ব্রিটিশরা ক্ষীরোদা প্রভার বাড়ি ঘেরাও করে ফেলে। ব্রিটিশরা ক্ষীরদা প্রভার বাড়িতে আক্রমণের সময় কয়েকজন বিপ্লবী নিরাপদে চলে যাওয়ার পর মাস্টারদা সূর্য সেন পালানোর সময় ঝোঁপে শব্দ পায় ব্রিটিশরা। ধরা পড়েন মাস্টারদা ও তার সহযোগী বিপ্লবী ব্রজন্য সেন। সেদিন ভোর রাতেই গ্রেপ্তার হোন বিপ্লবী ক্ষীরদা প্রভা ও তার ১১ বছর বয়সী ছেলে মনোরঞ্জন বিশ্বাস।

এরপর ব্রিটিশ সরকার তার বাড়িটি তছনছ করে দেয়। সাত বছর পর মুক্তি পায় মনোরঞ্জন বিশ্বাস। ১২ বছর পর মুক্তি পান ক্ষীরদা প্রভা।

শুধু ব্রিটিশ আমলেই নয় পাকিস্তান আমলেও জেল জুলুম ভোগ করে পরে ভারতে চলে যেতে বাধ্য হন এই বিপ্লবী নারী।
পাকিস্তান আমলে রাষ্ট্রদ্রোহীতার মামলায় ফের গ্রেপ্তার হোন মনোরঞ্জন। ১৯৬০ থেকে ১৯৬৭ পর্যন্ত কারাগারে বন্দি থাকেন।
বাংলাদেশে ক্ষীরদা প্রভার দুই নাতি দিপক বিশ্বাস ও অশোক বিশ্বাস এই ভিটে আঁকড়ে আছেন।

ক্ষীরোদা প্রভাদের বাড়িতে আমাদের পরিবারের যাওয়া আসা আছে বলেই হয়তো জানতে পেরেছি তাঁর কথা। ইতিহাসের অনেকটা অগোচরেই রয়ে গেছেন এই বিপ্লবী নারী। তার বাড়িতে একটি স্মৃতিফলকও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু অনেকে আশ্বাস দিলেও সংস্কার হইনি ওই স্মৃতিফলকটির।

ক্ষীরোদা প্রভারা ইতিহাসের আড়ালে থাকলেও তারা বেঁচে থাকে আমাদের স্বাধীনতার গন্ধে। বেঁচে থাকে প্রতিটি সাহসী নারীর মাঝে।

প্রজ্ঞা আহম্মদ জ্যোতি
নাট্যকলা বিভাগ(তৃতীয় বর্ষ)
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 155
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    155
    Shares

লেখাটি ৪৫৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.