আপনার সন্তান কেমন হবে?

0

ঈশিতা বিনতে শিরিন নজরুল:

সন্তানদেরকে কিভাবে মা-বাবার কথা শোনাবো, সঠিক পথে চলা শেখাবো এগুলো নিয়ে আমরা মা-বাবারা সবসময় উৎকন্ঠার ভেতরে থাকি। আমাদের সহজ একটা পথ আছে, যখন আর পারি না, হয় মারধর করি, কিংবা বকা দেই, অথবা মারার ভয় দেখাই বা অন্য কোনো কথা বলে ভয় দেখাই যেন সে আমাদের কথা শোনে, তাই তো? ছোট ছোট সন্তানদের ভয় দেখিয়ে মা-বাবার বাধ্য করানোর জন্য এরকম অনেক কৌশল আছে আমাদের। কিন্তু কৌশল করে কতদিন চালানো সম্ভব? এই কথা ভেবেই আমার ভয় লাগে, মনে হয় যখন আর এই কৌশলগুলো কাজে দেবে না, তখন কী হবে? আবার সব কৌশল যে সব শিশুর ক্ষেত্রেই কাজে লাগে তাও কিন্তু নয়। তবে কি এতো ঘোর প্যাঁচ, কৌশলে না গিয়ে সরাসরি তাকে বোঝানো প্রয়োজন যে মা-বাবার কথা শুনতে হবে?

জার্মানিতে নিয়ম হচ্ছে, শিশুদের কিন্ডারগার্টেনের প্রথম দিন থেকে প্রায় দু’সপ্তাহের মতো মাকেও সন্তানদের সাথে থাকতে হয়। অর্থাৎ প্রথমে ছেলের সাথে তার ক্লাস রুমে, পরে ছেলেকে অন্য রুমে, তারপর ছেলেকে রেখে আসার শুরু। এই দু’সপ্তাহ আমি সব শিশু এবং তাদের মায়েদের আচরণ খুব ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করেছি। প্রতিটি শিশু একজন অন্যজনের থেকে আলাদা। কিন্তু তাদের একটি সাধারণ মিল রয়েছে। তারা ‘না’ কথাটা শুনতে পছন্দ করে না!

আমার ছেলেটাও কিন্তু সারাক্ষণ ‘না, এটা করো না’ এই কথাগুলো শুনতে পছন্দ করে না। আমি ভেবে দেখলাম, ছোট শিশুদের কথা বাদই দিলাম; কোন বড় মানুষকেও যদি কিছুতে না বলা হয়, বা ধমক দিয়ে বলা হয়, সে কিন্তু সেটা সাধারণত অপছন্দ করে। সেখানে আমার ৩/৪ বছরের ছেলেকে বোঝানো খুবই কঠিন।

আপনাকে মনে রাখতে হবে, বিশেষ করে আপনার ৩-৪ বছর বয়সী সন্তানকে সঠিক পথে পরিচালনা করার ক্ষেত্রে ভুল করা যাবে না কিছুতেই।

আপনি ভেবে দেখুন তো, আপনার সন্তান কখন অবাধ্য হয়? অবাধ্য হয় তখনই যখন কিনা অাপনি তাকে তার সহজাত বা পছন্দের কাজগুলো করতে মানা করেন। তখন তার এই অবাধ্যতা হলো তার এক ধরনের প্রতিক্রিয়া অথবা আমার করা নিষেধের বিরুদ্ধে রেজিস্ট্যান্স।

ছেলেকে কিন্ডারগার্টেনে দেয়ার পর দেখলাম এরা সরাসরি শিশুদের কমান্ড করে, কোনো জোর করে না এবং বকা দেয় না। অবাক হবার মতো বিষয় এটিই যে, সব শিশুরাই কিন্তু ঐখানে টিচারদের কথা শোনে! তাদের মন্ত্রটা কী তবে? শিশুরা যখন অবাধ্য হয় বা বেশি দুষ্টামি করে, তখন মারা তো দূরের কথা. একটা বকাও তারা দেয় না! তবে এধরনের কমান্ড তারা যথেষ্ট কর্তৃত্বপরায়ণ হিসেবে এবং দৃঢ়ভাবে দিয়ে থাকেন।

আমি ভাবি, আমি বা আমরা এটা কেন পারি না? এমনকি ঐখানে সব শিশুরাই একটি নিয়মের ভেতর চলে এবং সেটা কোনো ভয় বা বিরক্তি ছাড়াই!! আমার কাছে মনে হয়েছে, একরাশ স্বাধীনতা, অথচ নিয়ম ভাঙ্গাও নেই!! নিজের কাজ নিজে করা এখানেই শেখানো হয়ে থাকে। অথচ আমাদের দেশে মা-বাবারাই অজান্তে তার সন্তানদের অকেজো করে দিচ্ছেন, বিশেষ করে যদি সেটা হয় পুত্র সন্তান, তাহলে তো কথাই নেই। প্রতিটা বাসাতেই অাদরের সন্তানদের জন্য এইরকম বহু অাহলাদের কাহিনী আছেই। একেকটা একেক রকম। এইগুলোই এক সময় সন্তানদের মানসিক প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করে এবং অনেকদিক দিয়েই তাকে অকেজো তৈরি করে দেয়।

অামার একটাই পয়েন্ট, নিজের কাজ নিজে করা শিখতে হবে। বাজার করে আসার পরে আমার ছেলে সব আমাকে একটা একটা করে এনে দেয় গুছিয়ে রাখার জন্য! ভাবুন তো…. প্রথমে আমিও বলতাম, অাব্বু তুমি যাও, খবরদার এইসবে হাত দিবে না। এখন বলি না। রান্নার সময় সে পাশে থেকে সাহায্য করতে চায়, সেটাতেও এখন আমি সম্মতি দিয়েছি। সেও মসলাপাতি ফ্রাইপ্যানে দিতে চায়, আমিও নিরাপদ দূরত্বে থেকে তাকে কাজটা করতে দিই। আমি যখন বাথরুম পরিস্কার করি, তখন সেও করতে চায়, আমি মানা করি না। করতে করতেই তো অভ্যস্ততায় অাসবে, ভাবনার অভ্যস্তায় আর কাজের অভ্যস্ততায়।

আসলে বিষয়টি খুবই সরল। আমাদেরকে একটু ধৈর্য্যশীল হতে হবে। আমাদের প্রি-স্কুলার সন্তানদেরকে আমাদের প্রতিদিনের ব্যবহার, আচরণ দিয়ে বোঝাতে হবে যে, সব জায়গাতেই নিয়ম থাকে এবং সেই নিয়ম রক্ষার দায়িত্বে স্কুলে যেমন শিক্ষক, তেমনি বাসায় মা-বাবা। আর সন্তানকে সেই নিয়ম অনুসরণ বা পালন করতে হবে। বিষয়টা এরকম যে, ধরুন আপনি সন্তানকে বকা দিলেন কেন সে সারা বাসা ঘুরে ব্রাশ করছে; অথচ আপনি নিজেই সেই কাজটি করেন। কাজেই আপনাকেও কিন্তু নিয়মের ভেতরে এসে তারপরে তাকে শেখাতে হবে। অথবা ধরুন মা-বাবা কেউ ধুমপান করেন, কাজেই ধুমপান না করার উপদেশ সন্তানকে দিয়ে বেশিদিন জবাবদিহিতার থেকে বাঁচতে পারবেন না, কারণ সন্তান তখন আপনাকে বলবে, তুমি/তোমরা তো খাও, আমাকে কেন মানা করো? কী জবাব দেবেন? যখন থেকে একজন শিশুর শেখার সময়, সেই সময়টা কিন্তু সে আপনাকেই সবসময় দেখে এবং শেখে।

সাধারণত ৩-৪ বছরের শিশুদের মধ্যে নিয়মের ধারণা ইতোমধ্যেই চলে এসেছে। তাই আপনার সন্তানকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায় এবং কেন সেগুলি গুরুত্বপূর্ণ তা ব্যাখ্যা করার জন্য সময় নিন। এমনকি তাদেরকে এও ব্যাখ্যা করুন যে, যদি সে নিয়ম না মানে, বা দুষ্টামি করে বা এধরনের কিছুতে নিজেকে জড়ায়, তবে তার কী কী ধরনের ক্ষতি/বিপদ হতে পারে।

পাশাপাশি এটিও তাকে বোঝানো দরকার যে, যদি সে নিষেধ না শোনে, তবে কী ধরনের শাস্তি দেয়া হবে। যেমন যদি তাকে বাড়ির সীমানার ভেতরে খেলতে বলা সত্ত্বেও না খেলে বাইরে চলে যায়, বা যাওয়ার জন্য জেদ করে, তবে তাকে সারাদিন বাইরে নিয়ে যাওয়াই হবে না এবং বাড়ির মধ্যেই খেলতে হবে দিনের বাকি সময়টা, এমনকি বারান্দাতেও যেতে দেয়া হবে না।

অপরদিকে সে কথা মেনে চললে তার তারিফ করতে ভুললেও কিন্তু আপনার চলবে না। এমনকি তাকে ভালো কাজের জন্য বা বড়দের কথা মেনে চলার জন্য নানাভাবে পুরস্কৃত করুন; সে আগ্রহ পাবে। তার সাথে সবসময় ভালো আচরণ করার চেষ্টা করুন।
আমি জানি এটি বাবা-মায়েদের জন্য,বিশেষ করে মায়েদের জন্য আদৌ সবসময় সহজ নয়। তারপরেও সন্তানদের ভালোর জন্যই আমাদেরকে এর চর্চাটি করতে হবে। কারণ আপনি যে ব্যবহারটি করবেন, সেও কিন্তু সেটিই শিখবে, যা কিনা তার ভবিষ্যতের জন্য ভালো নাও হতে পারে। সবসময় তাকে দোষী সাব্যস্ত করার প্রবণতা বাদ দিতে হবে।

আপনার সন্তানকে একজন ভালো এবং আত্মনির্ভরশীল মানুষ হিসেবে দেখতে চান? তবে আমি বিশ্বাস করি, মা-বাবাকে সচেতন হতে হবে। আপনি নিজের সন্তানকে যেটা প্র্যাকটিস করাতে চাচ্ছেন, সেটি আপনি নিজে করেন কিনা সেটি আগে নিশ্চিত করুন। আপনারা সারাদিন যদি ঝগড়া করেন এবং সন্তানকে মৌখিকভাবে শেখান, ঝগড়া করা খুবই খারাপ, অন্যায়; অথবা সারাদিন স্টার জলসায় সিরিয়াল দেখে সন্তানকে ন্যাশনাল ডিসকভারি চানেল দেখার উপদেশ দেবেন, তাহলে তো হবে না।
নিজেদের আচরণ (মা-বাবা/পরিবারের অন্যান্য সদস্য) ইতিবাচক করুন এবং ভালবাসাপূর্ণ পরিবেশ নিশ্চিত করুন। সন্তান নিজে থেকেই মানুষকে ভালবাসতে শিখবে, হাসতে শিখবে, মানুষের ভাল করতে শিখবে, পরিবারকে ভালবাসবে, কাজকে ভালবাসবে এবং সর্বোপরি নিজেকে ভালবাসবে।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 617
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    617
    Shares

লেখাটি ২,৪৮৩ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.