সেলফ কাউন্সিলিং কেন প্রয়োজন!

0

ফারিয়া রিশতা:

সেলফ কাউন্সিলিং এর চাইতে বেস্ট কাউন্সিলিং আর কিছুই নেই।
আমরা মানুষ প্রজাতি বড়ই হিংসুক টাইপের৷ আমাদের চাইতে কেউ দুই ইঞ্চি বেশি ভালো থাকলে আমাদের পক্ষে সেটা সহ্য করা কঠিন হয়ে যায়।
‘ও কেন পাচ্ছে, আমি কেন পাচ্ছি না’ বা ‘ওর কেন হচ্ছে, আমার কেন হচ্ছে না’ এই টাইপ প্রশ্নের সম্মুখীন আমরা নিজেরাই নিজেদের করি।
তারপর আমাদের কিঞ্চিৎ হিংসাকে আমাদের সেলফ মেড ফ্রাস্ট্রেশনের নাম দিয়ে ঢেকে ফেলি।

ফারিয়া রিশতা

অথচ আমরা ভুলে যাই যে এক একটা মানুষ এক একটা রেললাইনের মতোন, আর আমাদের জীবনগুলো হলো ভিন্ন ভিন্ন দিকে চলা রেলগাড়ি।
কারো সাথে কারও ট্র্যাক মিলবে না, কারো সাথে কারো টাইমিং মিলবে না। অথচ যথার্থ সময়ে যথার্থ দিকে ট্রেনটা ছেড়ে যাবে।
এখন আমাকে উঠায়ে যদি অন্য কারও রেললাইনে বা ট্রাকে বসায়ে দেওয়া হয়, তাহলে কি আমি চলতে পারবো? উহু, লাইনচ্যুত হয়ে পড়ে যাবো।
ঠিক একইভাবে অন্য কেউ আমার জন্য তৈরি করা ট্রাকে এসে ফিট ইন করতে পারবে না।
জীবনটা এভাবেই তৈরি৷

আসলে ছোটবেলা থেকে, বোধ হওয়ার পর থেকেই আমরা যে যার ট্র্যাকলাইন ধরে দৌড়ানো শুরু করি৷ সেখানে বেশিরভাগ মানুষের যাত্রাপথ আর সিডিউল তৈরি করে দেয় বাবা-মা বা সমাজ।
২৫-২৭ বছর পর্যন্ত আমদের জীবন নামক রেলগাড়ি দৌড়াতেই থাকে এবং তারপর একটা হার্ডব্রেক কষে।

এটা হলো আমাদের জীবনের জংশনে ইঞ্জিন বদলানোর টাইম। এসময় কারও কারও ইঞ্জিন তাড়াতাড়ি তার যাত্রাপথ নির্ধারণ করে রওনা হয়ে যায়, কারও কারও রুটপ্ল্যান আর দিকনির্দেশনাতে একটু সময় লেগে যায়।
ঠিক এই সময়টাতে সব থেকে বেশি প্রয়োজন হয় – সেলফ কাউন্সিলিং এর৷

ফেসবুক নামক এই প্ল্যাটফর্মটার কারণে আমাদের জীবনে আরেক যন্ত্রণা উদ্ভব হয়েছে। আরে ভাই, নিজের লাইফ গুছাবো, নাকি অন্যের লাইফ দেখে বেড়াবো।
অথচ খুব ইন্টারেস্টিং ভাবে, আমরা যা তার দ্বিগুণ আমরা দেখাই এই প্ল্যাটফর্ম এ এসে। এটা সবাই জানি তাও কেউ বুঝি না।

আচ্ছা, যে যা খুশি দেখাক৷ আমার টপিকে ফেরত আসি। ‘সেলফ কাউন্সিলিং’।
‘আমি কিছুই করছি না’ ‘আমাকে দিয়ে কিছুই হবে না’ এই টাইপ লুজার মার্কা চিন্তাগুলো যতদিন মাথায় গেড়ে বসে থাকবে ট্রাস্ট মি, ততদিন আপনার পক্ষে আসলেই কিছু করা স্বম্ভব হবে না।

আপনার ট্রেন জংশনে এসে থেমে আছে?

* ওকে, কাম ওন! টেক এ ব্রেক৷ লাইফ এমন ব্রেক সবাইকে দেয় না। নিজেকে নিয়ে একটু অফ ট্র্যাকে চিন্তা করুন। না পড়া বইগুলো পড়ে ফেলুন, না দেখা মুভিগুলো দেখে ফেলুন, রান্নার স্কিল বাড়ান, আরাম করে ঘুমান কিছুদিন।
লাইফের নিশ্চয়ই আপনাকে নিয়ে কোন প্ল্যান আছে, সেটা কী বোঝার চেষ্টা করুন, তারপর ইঞ্জিন ঘষে মেজে আবার লেগে পরুন।

* অলওয়েজ থিংক পজেটিভ। টেক এ ডিপ ব্রেথ এন্ড জীবন থেকে সকল নেগেটিভিটি ঝেড়ে ফেলুন। ছোট ছোট জিনিসে খুশি হোন, জীবন অনেক সহজ হয়ে যাবে।
আজ সারাদিন আমি মাথায় কোন নেগেটিভ চিন্তা আনবো না – এভাবে শুরু করে তিন দিন, সপ্তাহ, তারপর মাসের দিকে অগ্রসর হোন।
প্রথম দিকে অনেক প্যাড়া লাগবে, কিন্তু একবার অভ্যাস হয়ে গেলে অদ্ভুত একটা প্রশান্তি থাকবে মন জুড়ে।

* কে, কী করলো তাতে আমার কী! আমি আমার মতো হ্যাপি থাকবো! আমিই আমার ফেভারিট!
এই চিন্তাটা নিজের মধ্যে আনার প্র্যাকটিস করুন, ইনশর্ট স্টার্ট লাভিং ইয়োরসেলফ।
অন্যের খুশিতে খুশি হোন। আমার বন্ধু বিদেশে ভালো চাকরি করছে এটা আমার জন্য হিংসার না, এটা আমার জন্য ভালো লাগার। আমি বেকার হয়ে ঘরে বসে আছি, কিন্তু সে ডলারে কামাচ্ছে, তাতে কী?
আমি আমার মতো ভাল আছি – প্রতিটা নেগেটিভ চিন্তাকে পজেটিভ ভাবে নেওয়ার অভ্যাসটা সুখে থাকার জন্য খুব কাজে দেয়।

* মেডিটেশন মেডিটেশন এন্ড মেডিটেশন
হালকা কোনো মিউজিক ছেড়ে শুয়ে/বসে চোখ বন্ধ করে নিজের কোন হ্যাপি প্লেস এর কথা ভাবুন, ডেইলি দশ মিনিট। অন্য কোনো চিন্তা মাথায় আনা যাবে না।
ট্রাস্ট মি, অনেক রিফ্রেশিং ব্যাপারটা।

* এক এক করে নিজের বাজে অভ্যাসগুলো পরিহারের জন্য চ্যালেঞ্জ দিন নিজেকে।
আমি এবারের ঈদের দিন থেকে নিজেকে চালেঞ্জ করেছি – আমি কারো সমালোচনা করবো না।
এরকম দুই তিনটা নেগেটিভ অভ্যাস ত্যাগ করার পর পরই নিজের উপর একটা অন্যরকম কনফিডেন্স চলে আসে।

* নিজের প্রতি সৎ থাকলে অন্যের প্রতিও সৎ থাকা যায়।

* অন্যের জীবন দেখে প্রভাবিত হবেন না। দূর থেকে নদীর ওপাড়ের ঘাস সবুজ লাগবেই, এটাই হিউম্যান নেচার। বি স্যাটিসফাইড উইথ হোয়াট ইউ গট। হাতে আট আনা থাকলেও সেটা নিয়ে খুশি থাকুন, অন্যের লাখ টাকা উপার্জন দেখার চাইতে এটা ভাবুন যে অনেকের কাছে তো এই আট আনাটাও নেই!

* লিভ ইন দা মোমেন্ট। কাল কী হয়েছিল বা আগামীকাল কী হবে এটা ভেবে সময় নষ্ট না করে আজ কী করলে ভালো থাকা যাবে সেটা নিয়ে ভাবুন। কাল যা গেছে, গেছেই আর আগামীকাল যা হবে সেটা আজকে বসে আমার পক্ষে কন্ট্রোল করা সম্ভব না, তাই খামাখা টেনশন করে লাভটা কী? বরং আজ ইন্টারেস্টিং কী করা যায় সেটাই মুখ্য।

আমাকে অনেকেই জিজ্ঞাসা করে, আমার লাইফের এতো চড়াই উতরাই এর পরও আমি কিভাবে এতো হ্যাপি থাকি, বা কীভাবে আমি খুব তাড়াতাড়ি মুভ অন করতে পারি!
উত্তর খুবই সিম্পল – আমি নিজেকে প্রচণ্ড রকম ভালোবাসি, আর আমি নিজেকে দুঃখীভাবে দেখতে পারি না। আমার ভালো থাকাটা আমার কাছে সব থেকে আগে।
আর আমি জীবন নিয়ে প্রচণ্ড রকম পজেটিভ। এন্ড অফ দা ডে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে – এই কথাটা প্রবলভাবে বিশ্বাস করি আমি।

কিন্তু জীবনের প্রতি আমার আলাদা কোন এক্সপেকটেশন নাই। জীবন আমাকে যা দেয় তাতেই আমি মহাখুশি। আর এই বিনা এক্সপেকটেশন এর দৌলতে আমি যা পাই সবই সারপ্রাইজ গিফট মনে হয়।
আমার কাছে জীবনের হিসাব খুব সহজ সরল। আমি জীবনকে প্লাস মাইনাস দিয়েই হিসাব করি। বীজগণিতের সূত্র বা ত্রিকোণমিতি পরিমিতির হিসাব আমি জীবনে ঢুকাতে চাই না।

আমি জীবনে বলার মতো কিছুই করি নাই, সফলতার স পর্যন্ত আমার জীবনে নেই। তারপরও আমি আমাকে ভালোবাসি। আমার জীবনকে আমি ভালোবাসি।
কারণ আমি আমিই।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 7.6K
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    7.6K
    Shares

লেখাটি ১৫,৫২০ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.