তসলিমা এবং প্রভা, আপনাদের লড়াইটা জারি থাকুক

ইমতিয়াজ মাহমুদ:

তসলিমা নাসরিনের শুভ জন্মদিন ছিল আজ। তসলিমা পক্ষে থেকে ওরা প্রতিবারের মতো এই উপলক্ষে অনুষ্ঠান করেছে। যাওয়ার ইচ্ছা ছিল, ব্যক্তিগত ইয়ের জন্যে যাওয়া হয়নি। গেলে ভালো হতো। এর আগে একবছর গিয়েছিলাম ওদের অনুষ্ঠানে। খুব বড় যে অনুষ্ঠান ছিল তা নয়। কিন্তু প্রাণবন্ত ছিল। আমি, নাহিদ সুলতানা আর সুপ্রীতি ধর ছাড়া বাকি যারা ছিলেন সকলেই একদম তরুণ। টগবগে তরুণ। ছোট ছোট সব ছেলেরা মেয়েরা। আমার তো চোখে পানি আসার জোগাড়। কেন? সেইটা আগে বলে নিই, এরপর বলি একইদিনে জন্ম নেওয়া আরেকজন সংগ্রামী নারীর কথা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে একটা মেয়ে এসেছে সেদিন শুধুই তসলিমার জন্মদিনের অনুষ্ঠানে যোগ দিবে বলে। নিতান্ত মধ্যবিত্ত কিশোরী, লাজুক ধরনের খুব গুছিয়ে কথাও বলতে পারে না। ও বলছিল নারী হিসাবে তাকে যে প্রতিদিন বঞ্চনা গ্লানি আর বৈষম্যের শিকার হতে হয় তার বিরুদ্ধে লড়ার চেতনাটা সে পেয়েছে তসলিমার বই পড়ে। আমি অবাক হয়ে ওদেরকে দেখি। ওরা মার্ক্সবাদ পড়েনি, ইংরেজি বই পড়ার অভিজ্ঞতাও দৃশ্যত খুবই সীমিত। মূলত তসলিমা নাসরিনের লেখা, অথবা কে জানে সম্ভবত শুধুই তসলিমা নাসরিনের লেখা, ওদেরকে দেখিয়ে দিয়েছে পুরুষতন্ত্রের ছোটলোকি। ওরা ভাবতে শিখেছে আমি কেবল মেয়েমানুষ নই, আমি একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ।

ভাবেন তো একবার! একদিকে আমাদের হাজার বছরের পুরুষতন্ত্র, পুরুষতান্ত্রিক ধর্মগুলি, পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, রাষ্ট্র, প্রচলিত শিক্ষা, সাহিত্য, পরিবার সবকিছু। আর আরেকদিকে কেবল একজন নারী আর তার লেখা কিছু বই- গল্প কবিতা প্রবন্ধ ইত্যাদি। দুইদিকের পাল্লা তো সমান না। কিন্তু তসলিমা ঠিকই এই তরুণ নারীদের কাছে পৌঁছে গেছেন, ওদের হৃদয়ের ঠিক তন্ত্রীটায় টোকা মারতে পেরেছেন। নারীরা দুনিয়াকে দেখার নয়া চোখ পেয়েছে, নিজেকে নিজে দেখেছে আর মেরুদণ্ড সোজা করে মাটিতে পা ঠুকে স্পষ্ট কণ্ঠে বলছে, আমিও মানুষ- পুরুষের চেয়ে এক আনা বা এক কড়া বা এক পয়সা কম না- সমান পূর্ণাঙ্গ সম্পূর্ণ মানুষ।

তসলিমা নাসরিন ও মারজিয়া প্রভা

তসলিমা নাসরিন কি দুনিয়ার এক নম্বর নারীবাদী লেখক? না। ওর চেয়ে অনেক ভাল এবং বড় লেখক আছে। পূর্বসূরিদের মধ্যে তো আছেনই, কনটেম্পোরারিদের মধ্যেও আছেন। তসলিমা নাসরিন যে কোন নিজস্ব নারীবাদী রাজনৈতিক-দার্শনিক-সমাজতাত্বিক স্পষ্ট করে দাঁড় করিয়েছেন তাও না। বরং আমার মাঝে মাঝে মনে হয়েছে যে ওঁর নিজের রাজনৈতিক পথটাও খুব স্পষ্ট করে তিনি নির্ধারণ করেননি বা করতে পারেননি। কিন্তু তসলিমা মহিমাটা অন্যত্র।

তসলিমার মহিমা হচ্ছে ঐখানে- ঐ যে আগে বলেছি- বাঙালী মধ্যবিত্ত সমাজের নারীদের মধ্যে একটা বড় অংশকে তিনি স্পর্শ করতে পেরেছেন। শুধু স্পর্শই করেননি, ওদেরকে তাড়িত করেছেন, জাগ্রত করেছেন। বেগম রোকেয়া তাঁর সময়ে তাঁর সমাজকে কতোটুকু ঝাঁকুনি দিতে পেরেছিলেন জানি না, কিন্তু তসলিমা ঝাঁকুনিটা এতো প্রবলভাবে দিয়েছেন যে ওঁর এই দেশে আপনি তসলিমা-নিরপেক্ষ কোন মানুষ সম্ভবত পাবেন না।

আর ঐ যে তরুণদেরকে জাগাতে পেরেছেন এটা একটা বড় কাজ করেছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সেই ছোট মেয়েটি একটি উদাহরণ মাত্র। হাঁড়ির ফুটন্ত জলের উপরের চালটি মাত্র- যেটা দেখে আপনি জানবেন যে নারী অধিকারের চাল ফুটছে, টগবগ করছে।

(২)
আর এই যে নারীর অধিকার বিষয়টা- অধিকার কল্যাণ নয়- এইটা আপনি দেখবেন এখন ঢাকা শহরের নারীদের অনেকেরই নিত্যদিনের কর্মসূচির অংশ। শুধু লেখালেখি বা একটা দুইটা কর্মসূচির ব্যাপার না- রোজকার জীবনযাত্রা সর্বস্তরে এই অধিকার সচেতনতাটা এসেছে। অধিকার সচেতন হলে নিজেদের মধ্যে বিতর্ক হবে, এদের মধ্যেও হয়। বিতর্ক হলে ঝগড়া হবে, এদের মধ্যেও হয়। দলাদলিও খানিকটা হয়েছে ইতিমধ্যে। এইগুলি সবই হচ্ছে বিকাশের প্রক্রিয়া। হোক। এই সবের মধ্যেই একেকজন একেক পথে কাজ করেন, একে অপরের সাথে বিতর্ক করেন, আবার ঐক্যবদ্ধ বোধ করেন।

লেখক: ইমতিয়াজ মাহমুদ

কখন প্রথম লক্ষ্য করেছি ভুলে গেছি, দেখি কিনা একটি মেয়ে মেয়েদের ঋতুকালীন স্বাস্থ্য সচেতনতা নিয়ে বেশ তৎপর হয়ে কাজ করছেন। কাজ করছেন মানে কি? শুধু যে লেখালেখিই করছেন বা সচেতনতা তৈরি করছেন তাই নয়- বাংলাদেশের বড় শহরগুলির বাইরে সকল কিশোরী তরুণীসহ সকল নারীর কাছে নিরাপদ স্বাস্থ্যকর স্যানিটারি প্যাড পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে মাঠে নেমেছেন তিনি। প্রথমে একটু চমকে উঠেছি। প্রথমত এই বিষয়টা নিয়ে কথা বললেই লোকে গালি দেয়। আর মেয়েটা কিনা শুধু এইসব কথা ফেসবুকে বা উইমেন চ্যাপ্টারে লিখেই ক্ষান্ত হচ্ছে না- এইগুলি কথা কিনা সে গ্রামে গঞ্জে গিয়ে গিয়ে বলছে! বলে কী?

এই পাগল মেয়েটা কে রে? গোল্লা গোল্লা চোখে আমি দেখি কিনা মারজিয়া প্রভা নামে এই মেয়েটা তখনো মাত্র ছাত্র। আকৃতিতে বেশ বড়সড় কর্মঠ দুরন্ত আর পড়ালেখা করা এই মেয়েটার সাথে আমার কখনো দেখা হয়নি, কথাও হয়নি। কিন্তু আমার সবসময়ই মনে হয়েছে এ মেয়েটি আমার খুব চেনা। কি করে? দুনিয়ার সর্বত্র আন্দোলন সংগ্রাম ও বিপ্লবের কিছু আইকনমত পেইন্টিং ও স্কাল্পচার আছে- কেন্দ্রে একজন নারী।

১৮৩০ সনের একটা পেইন্টিং আছে প্যারিসের ‘লিবার্টি অন দ্য ব্যারিকেড’ নামে। শিল্পীর নামটা ভুলে গেছি। পেইন্টিঙটার কেন্দ্রে একজন নারী আছে হাতে ব্যানার। এটা সম্ভবত এইরকম সংগ্রামী নারীর আইকন ধরনের প্রথম পেইন্টিং। বিপ্লবের পরে সোভিয়েত ইউনিয়নে অনেক ভাস্কর্য হয়েছে বিপ্লবের স্মারক হিসাবে। আমাদের এখানে আছে অপরাজেয় বাংলা। অপরাজেয় বাংলায় নারীটির কাঁধে নার্সিংএর ব্যাগ ব্যাপারটা অবশ্য একটু ইয়ে লাগে- তবুও। আমেরিকার স্ট্যাচু অব লিবার্টি তো আছেই। আমাদের তরুণটা- মারজিয়া প্রভা- এইরকম একটা আইকনই তো। ওকে তো আমরা চিনি শত বছর ধরেই।

মারজিয়া প্রভারও আজ ছিল শুভ জন্মদিন।

(৩)
আজ থেকে একশ দুইশ বা তিনশ বছর পরে আমাদের ইতিহাসের কোন পৃষ্ঠায় কতোটুকু জায়গা জুড়ে তসলিমা নাসরিনের নাম লেখা থাকবে জানিনা। অথবা তসলিমার জন্মের কয়েক দশক পরে একই দিনে জন্ম নেওয়া মারজিয়া প্রভার নাম। কিন্তু আমরা যারা ওদের সাথে একই সময়ে এই পৃথিবীতে বাস করেছি, আমরা সৌভাগ্যবান যে সংগ্রামী এই নারীদেরকে আমরা ওদের জীবদ্দশায় দেখেছি।

বলা দরকার ছিল- দিনের শেষে হলেও একবার দুজনকে সেলাম করে বলি, শুভ জন্মদিন। আমার কন্যাদের জন্যে আর ওদের যে মেয়েদের জন্যে বা ওদেরও মেয়েদের জন্যে আপনারা যে লড়াইটা করে যাচ্ছেন তাঁর জন্যে এই পিতার পক্ষে থেকে সালাম। ভালো থাকুন আপনারা। আমার মৃত্যুরও বহু বছর পরেও আপনারা বেঁচে থাকুন আর মেরুদণ্ড সোজা করে গোটা দুনিয়াকে মধ্যমা দেখিয়ে আপনাদের সংগ্রামটা জারি রাখুন।

শেয়ার করুন:
  • 634
  •  
  •  
  •  
  •  
    634
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.