শক্ত পায়ে দাঁড়ানোর নামই তসলিমা নাসরিন

ফাহমি ইলা:

সর্বপ্রথম পড়েছিলাম ‘উতল হাওয়া’। কত সাল তখন? ক্লাস সেভেন বা এইটে পড়ি। বইটা হাতে কীভাবে পেয়েছিলাম মনে নেই। মায়ের উক্তি ছিলো-‘শুধু তসলিমা নাসরিন পড়লেই হবে, নাকি ক্লাসের বইপত্রও পড়তে হবে?’ মা বাধা দেননি, দেবার কারণও ছিলো না। এরপর একে একে পড়েছি তাঁর অনেকগুলো বই।

আমার জীবনের উত্থান-পতন-উত্থান কম নয়। নিজের ত্রুটি কম নয়, নিজেকে পরিশুদ্ধ করবার ইচ্ছেও কম নয়। মানসিক শক্তিকে শতাংশে ভাগ করলে এই মানুষটির কাছ থেকে পেয়েছি অর্ধেক। পা পিছলে পড়েছি, তিনি বহুবার সামনে এসে দাঁড়িয়েছেন হাত বাড়িয়ে৷ কৈশোরের মানসিক গঠন বাকি জীবনের জন্য বেশ গুরুত্বপূর্ণ, এটা এখন টের পাই।

ফাহমি ইলা

মাঝে মাঝে অবাক হই। বেঁচে থাকার কতটা ক্ষমতা অর্জন করলে একটা মানুষ এতোকিছু সহ্য করবার পরেও হাসতে পারেন? আমি যতই শক্তি দেখাই, নিজে তো জানি নিজের খবর, আমি এখনো ভিতু দুর্বলচিত্তের মানুষ। সামনাসামনি দেখা না হলেও জানি এই শক্তমানুষটির ভেতরে একটা আবেগী ভালোবাসাপূর্ণ অতিথিপরায়ণ মানুষ বাস করেন, যিনি মানুষকে বুকে টেনে নেন অবলীলায়! একবার ছুঁয়ে দেখবার সাধ থেকে যাবে সারাজীবন।

নারী-পুরুষের বায়োলজিক্যাল পার্থক্য বাদ দিলে আদতে সবাই মানুষ। একবার একটা জেন্ডার ট্রেনিংয়ে নারী-পুরুষের জেন্ডার আইডেন্টিটি তৈরির প্রক্রিয়া বোঝাতে একজন নারী এবং একজন পুরুষকে ডাকা হলো। বলা হলো, ‘আপনি স্বাভাবিকভাবে দাঁড়ান।’ স্বাভাবিকভাবেই দাঁড়ালাম, কিন্তু ট্রেইনার নাছোড়বান্দা, তিনি বললেন, ‘সত্যি আপনি এভাবে দাঁড়ান!’ আমি বললাম-‘জ্বি! এটাই আমার স্বাভাবিক!’ এরপর তিনি আরেকজন নারীকে ডেকে নিলেন আমাকে দিয়ে হবে না বলে। মূলত নারীর দাঁড়ানোর টিপিক্যাল ভঙ্গিকে দেখিয়ে জেন্ডার আইডেন্টিটি নির্মাণের ব্যাখ্যা দেয়া হচ্ছিলো। অথচ আমি সেই কৈশোর থেকে জানি- মানুষ দাঁড়াবে, বসবে, হাসবে, খেলবে, স্বাবলম্বী হবে নিজের স্বাচ্ছন্দ্যমত, স্বাধীনতায়। সেখানে কোন বায়োলজিক্যাল পার্থক্য বাঁধা হতে পারে না।

একজন মানুষ শুধুমাত্র নারী হবার কারণে অনায়াসে হয়ে যায় দুর্বল, হয়ে যায় নষ্ট, বেশ্যা। শুধুমাত্র যৌনতাকে ট্যাগ করে নারীকে বিশেষায়িত করা হয়েছে, পণ্য বানানো হয়েছে শত শত বছর ধরে। খুব সহজেই এ সমাজব্যবস্থা নারীকে নষ্ট করেছে শুধুমাত্র তার যৌনতাকে ইঙ্গিত করে। অথচ মেয়েবেলায় কেবলই মনে হয়েছে- ‘নারীর চরিত্র কী পচনশীল দ্রব্য যা খুব সহজেই নষ্ট হয়, পচে যায়? দুটো পুরুষ ছুঁলে নষ্ট হয়, স্বাবলম্বী হলে নষ্ট হয়, জোরে হাসলে নষ্ট হয়, রাতে একা বেরুলে নষ্ট হয়, প্রতিবাদ করলে নষ্ট হয়, বুকে ওড়না না থাকলে নষ্ট হয়, বাসর রাতে বিছানায় রক্তের দাগ না থাকলে নষ্ট হয়, দু পা শক্ত করে দাঁড়ালেও নষ্ট হয়, একের অধিক পুরুষের সাথে ঘুমালেও নাকি নষ্ট হয়!

কই গন্ধ তো বেরোয় না পচলে! তাহলে সমস্যা নির্ঘাত সিস্টেমে, আমার ভেতরে না। আমি নারী এটা যেমন সত্য, আমি পচনশীল নই, এটা তার চেয়ে বড় ধ্রুব সত্য!’ এই কথাগুলোই তো এই মানুষটি বার বার বোঝাতে চেয়েছেন মানুষকে। যার ফলশ্রুতিতে তিনি হয়েছেন দেশ ছাড়া। অবশ্য তাকে দেশছাড়া করে কী লাভ হয়েছে? অনেকের ভেতরে বাস করছেন তিনি, অদম্য শক্তি হিসেবে!

জীবনে শক্ত পায়ে দাঁড়ানো একজন মানুষের অধিকার, আর শত বাধা পেরিয়ে দাঁড়াতে পারাটা তার অর্জন। শুভ জন্মদিন Taslima Nasreen

শেয়ার করুন:
  • 2.9K
  •  
  •  
  •  
  •  
    2.9K
    Shares
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.