‘ভুলতে গিয়েই পুষে রাখি তারে’

0

দিনা ফেরদৌস:

আমেরিকাতে আসার পর প্রথমদিকে কঠিন বিষন্নতায় পেয়ে বসেছিল আমাকে। নিজেকে নিঃস্ব গরিব মনে হতো। চারিদিকে শুধু নাই নাই দেখতে পেতাম, চেহারাতেও কিছু ফুটে উঠতো মনে হয়। আমার হ্যাজব্যান্ডকে একবার এক ট্যাক্সি ড্রাইভার বলেছিল, “গরিব দেশের না খাওয়া লোকেরা কুৎসিত হয়। তুমি গরিব দেশের লোকের চেহারা দেখেই বুঝতে পারবে কে ধনী আর কে গরিব। কিন্তু ধনী দেশের মানুষের চেহারা দেখে তা বোঝা সম্ভব না; কারণ এরা সবাই খেতে পায়, আর পোশাকেও খুব পার্থক্য থাকে না তেমন”। আমেরিকাতে প্রথমদিকে আমার চেহারাতেও এই রকম কোন ছাপ পড়েছে লাগতো আমার কাছে। তার মানে এই না যে আমি পয়সাওয়ালা ছিলাম কোনকালে। জন্ম থেকেই আমি নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষ।

বিয়ের পর পড়াশুনা সিলেট থেকে ঢাকায় ট্রান্সফার করতে যা সময় লেগেছিল সেই সময়টুকু সিলেটেই ছিলাম। তিনমাস পর ঢাকা আসলাম। এসেই তো দেখি পুরাই একটা মেসবাড়ি। বুয়া রান্না করতে আসে তিন বেলা, ঘরের বাজারও করে সে। রুমের দরজায় এক রঙের পর্দা তো জানলায় অন্য রঙের।

একদিকে পড়াশোনার চাপ, অন্যদিকে রান্না-বান্নাও জানি না, ভাবলাম চলুক চলছে যেমন। বুয়াও আমার মতো চিকন- চাকন পড়ার টেবিলে বসে থাকা ছাত্রীকে গৃহকর্ত্রী মানতে নারাজ। ভাবলাম ‘ল’ পরীক্ষাটা শেষ হোক, সংসারী তো চাইলেই হওয়া যায়। এক সময় আম্মাকে আমাদের কাছের লোকজন কতো কথা শোনাতেন আমাকে রান্নাতে উৎসাহ না দেয়ার জন্য। বিয়ে মানেই যাদের কাছে ছিল রান্না করে জামাইকে খাওয়ানো। আমার সামনে আম্মাকে যখন কেউ এর তার সাথে তুলনা করে এইসব বলতেন, আম্মা তাদের সামনে কিছু না বললেও পরে বলতেন রান্না-বান্না যেকোনো সময় শেখা যায়, রান্না-বান্না করে আমাকে খাওয়াবে এটা আমি কখনোই আশা করি না, পড়াশোনা করে চাকরি করে যখন কিছু দিবে, সেটাই সার্থক হবে।

পরীক্ষা শেষ হলো। বুয়াকে নিয়ে বাজার করতে গেলাম প্রথম দিন ‘মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটে’। বুয়া শিখিয়ে দিল পঁচা মাছ কীভাবে চিনতে হয়। হেঁটে হেঁটে অনেক বাজার করলাম। নতুন বাসনকোসনও কিনলাম। বুয়ার দাবি, পুরাতন জিনিসপত্র তাকে দিয়ে দিতে হবে। দিয়ে দিলাম। এদিকে আম্মাকে ফোন দিয়ে রান্নার তালিম নিলাম, সঙ্গে আছেন ‘সিদ্দিকা কবীর’।
আরেকদিন আমার হ্যাজব্যান্ডকে সঙ্গে নিয়ে নতুন প্লেট-গ্লাস থেকে শুরু করে ঘরের পর্দা কিনতে গেলাম। মাঝে-মধ্যে রান্না করতে শুরু করলাম। নিউমার্কেটে সস্তায় জিনিসপত্র পাওয়া যায়, কথাটি শুনে অনেককে অনেকবার রিকোয়েস্ট করেছি নিয়ে যেতে, কেউ যায়নি। ভাবটা এমন যেন, ঠেকায় পড়ছি তোমাকে সব শিখাতে। সদ্য গ্রাম থেকে উঠে আসা মানুষ যেখানে এই ঢাকা শহর চড়ে খাচ্ছে, সেখানে আমি সিলেট শহরে বেড়ে উঠা মানুষ। অনুভব করলাম পুকুর সেচে পানি কমানো যায়, কিন্তু সমুদ্র সেচা যায় না। শুধু নিউমার্কেটের কাপড়ের দোকানে দলবেঁধে গিয়ে ভালো বাজার করা পুকুরসম জ্ঞান না নিয়ে, এখানে থাকতে হলে সমুদ্রসম জ্ঞান নিয়ে একা চলা শিখতে হবে। ঠেকায় কেউ কারো কাছেই নেই প্রতিদিন, কিন্তু একদিন ঠেকায় পড়লে কারো না কারো কাছে যেতেই হয়।

একাই একদিন রিক্সা করে চলে গেলাম নিউমার্কেটে। ততদিনে সব শিখে ফেলেছি, ঢাকা শহরের কোথায় কী আছে। পুরাতন বুয়াও দেখি ডিমান্ড বাড়াতে শুরু করেছে। ভাবছে আমি পড়াশুনা নিয়ে ব্যস্ত থাকি, তাই তারে ছাড়া গতি নাই, দুইদিন পর পর বেতন বাড়াতে বলে। হ্যাজব্যান্ড’কে বলে ওরে বাদ দিয়ে দিলাম। নতুন বুয়া রাখলাম। পুরাতনটা বাইরে থেকে শুরু করে দিল ইতরামি, যাতে আর কোন বুয়া না পেয়ে তারেই রাখি। বুঝতে শিখলাম বুয়াদের ক্যামনে ম্যানেজ করে চলতে হয়। রান্না শেখার চাইতেও কঠিন কাজ হচ্ছে বুয়াকে ম্যানেজ করে চলা।

সবকিছু চলতে থাকলো একসাথে। আমার মেয়ের জন্ম হলো। ধীরে ধীরে ঘরে নতুন ফার্নিচার কিনা শুরু করলাম। একেক মাসে একেকটা নতুন ফার্নিচার কিনি। অনেক আগেই কল্যাণপুরে ফ্ল্যাট বুকিং দেয়া ছিল। সেই ফ্ল‌্যাটে ছোট্ট শোপিস থেকে শুরু করে ঝাড়বাতি পর্যন্ত কোথায় ঝুলবে সব নিজে ঠিক করেছি। ঘরের নতুন পর্দা, শোকেসের জন্য শোপিস, নতুন ডিনার সেট, সব কিনেছি নিজে পছন্দ করে ধীরে ধীরে। যার জন্য বহুদিন খুব সাধারণ জীবনযাপন করতে হয়েছে আমাদের ব্যংকের লোন টানতে টানতে। বেকার আমি শুধু বাচ্চা সামলাই এখন। ততদিনে পড়াশুনা, সংসার, বাচ্চা সব সামলে নিয়েছি। এরমধ্যে চলে গেছে বিয়ের পাঁচ বছর।

চলে আসলাম আমেরিকায়। না আছে নিজের ঘর, না আছে সংসার আর ততদিনে আমি হয়ে গেছি কঠিন সংসারি। নতুন শহরে আবারও নতুন মানুষ আমি। এখানেও এক শহর থেকে অন্য শহরে। সিলেটে থাকতে যারা বলতেন, রান্না-বান্না না শিখে শুধু পড়াশোনা করে লাভ নেই, বিদেশে যেতে ভাগ্য লাগে, সাদা চামড়া লাগে; তারা এখন আর কিছু বলেন না। আমার ভাগ্য দেখে তারা নির্বাক হয়ে গেছেন, কারণ তাদের বিদেশ সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই। সেই ধারণা থাকলে আজ আম্মাকে আরো কতো কী শুনতে হতো, এখন ভাবতে পারছি না।

কিন্তু আমি জানি, আমার যা ছিল তার থেকে অনেক নেমে গেছি। গরিবেরও গরিব হয়ে গেছি। এখন আরও বেশি হিসাব করে চলতে হয়। এখানে কেউ কিছু না শোনালেও আমার নিজের হাতে গোছানো দরজার ডোরবেলের শব্দ শুনতে পাই আনমনে। এখানে আমার নিজের কোনো ঘর নেই। সিলেটে হোক, আর ঢাকায় হোক, বড় হোক বা ছোট হোক আমার নিজের ঘর ছিল। এইসব যখন আমাকে আউলা বানিয়ে দেয়, তখন আমার হ্যাজব্যান্ড জোর করে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে পাঠান।
সাইক্রিয়াটিস্ট আমার অতীত, বর্তমান জানতে চান। অনেক কিছু আলাপ হয় তার সাথে। অবশেষে তিনি জানতে চাইলেন, আমি এখন কী চাই? বললাম সব ভুলতে চাই। বললো, তোমার সমস্যা এখানেই। তুমি ভুলতে চাচ্ছো কেন? তুমি কি ভুলতে পেরেছো?
বললাম, না।
তার কারণ কি জানো? আমি তার মুখের দিকে তাকালাম। বললেন, তুমি যতোবার যা কিছু ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করছো, ভুলে যাওয়ার জন্য তুমি ততোবারই ওই স্মৃতিগুলো মনে করছো। যারা তোমার সাথে অন্যায় করেছে, যা যা পিছনে ফেলে আসছো, যা কিছু তোমার জন্য বিরক্তির কারণ ছিল, সব ফেলে এসেছো, আর কোন কিছু ফিরে আসবে না। নতুন দেশে আসছো নতুন করে সব শুরু করো। সজ্ঞানে জোর করে ভুলতে চাও বলেই অবচেতনে কোন না কোনভাবে তুমি তাই মনে করো।

আমি ধীরে ধীরে সবকিছু এখন সহজভাবেই ভাবতে চেষ্টা করি, জোর করে কোন কিছু ভুলতে চাই না, মানাতেও যাই না। কিন্তু আশপাশে যখন তাকাই, তখন দেখি সেই একি বিষয় হচ্ছে চারদিকে। সবাই যা অপছন্দ করে, যা এড়িয়ে যেতে চায়, যা মানে না, তাই দেখি এতো বেশি বেশি করে বলে যে, তখন মনে হয় গুরুত্বপূর্ণ ঘৃণার জায়গা হিসেবে সেইসব বিষয় তাদের ভীতরে একটি জায়গা দিয়ে রেখেছে।

কথা হচ্ছে যা আমরা পছন্দ করি না, তাকে যত্ন করে ঘৃণা করে গিয়ে মূলত আরো জাগিয়ে রাখি ভিতরে। পছন্দের জায়গায় না হলেও অপছন্দের জায়গায় তারে স্থান দেই। কোন বিষয় নিয়ে দেখা যায় দশজন জন প্রশংসা করছে, বিশজন গালি দিচ্ছে, ফলে সেই বিষয়টি কোন না কোনভাবে ত্রিশবার করে চোখের সামনে চলে আসছে। আর যা আমাদের স্পর্শ করে না, তার ভাল-খারাপ কোনটাতেই কিছু যায় আসে না। বলিও না, মনেও রাখি না কেউ।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 362
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    362
    Shares

লেখাটি ২,০৪৬ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.