নারী, তুমিই বাংলাদেশ

0

তাফসিয়া জাহান:

ধর্ষণ হলো সমাজের একদল কু-পুরুষের বিকৃত মানসিক ব্যাধি। এইসব পুরুষের ভেতর বাস করে একজন কুৎসিত ধর্ষণকামী মানুষ। চারদিকে এখন হু-হু করে ঝড়ের গতিতে বেড়ে চলেছে নারী নির্যাতনের এই আদিম প্রতিযোগিতা। এমন নির্লজ্জতার মহা-উৎসব পৃথিবীর কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই। সেইদিন আর বেশি দূরে নয়, যেদিন পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তাদের এই পৈশাচিক আনন্দকে আইনগত বৈধতা দাবি করবে এবং আমাদের দেশের আইন এই দাবিকে সাদরে গ্রহণ করবে।

তাদের জন্মই যেন হয়েছে নারীদের গিলে খাওয়ার জন্যে। তাদের এই পৈশাচিক আনন্দের নৃশংসতা এতোটাই ভয়ংকর যে আদিমতাকেও হার মানায়। এই জঘন্য কু-কর্ম সমস্ত পুরুষজাতির চরিত্রকে আমাদের সামনে উলঙ্গ করে তুলে। মনুষ্যত্বের কতোটা বিপর্যয় ঘটলে দানবীয় পুরুষগুলো এমন অমানবিক, হিংস্র, অমার্জনীয়, নিষ্ঠুর, অকল্পনীয় এবং পশুত্বের আচরণ করতে পারে। নারীর কাছে এখন মৃত্যূর থেকেও মারাত্মক ভয়ঙ্কর এবং উদ্বেগের একমাত্র কারণ হলো দানবীয় এই পুরুষেরা।

বাতাসে এখন গোলা-বারুদ নয়, পৈশাচিক বীভৎসতায় শিশু কন্যার করুণ আর্তনাদ, বেঁচে থাকার আকুতি ভেসে বেড়ায়। নারীর প্রতি এই অমানবিক নিষ্ঠুরতা, নির্মমতা, সহিংসতার করুণ চিত্র সমাজের কাছে আজ ডাল ভাতের মতোই খুব সহজ হয়ে গেছে। তাই সমাজের সবচেয়ে উঁচুশ্রেণীর শিক্ষিত লোকজন ও কথিত সুশীল সমাজ এইসব দেখে-শুনে নিরব নির্বিকার। আধুনিকতার শিক্ষা-দীক্ষা,এবং সভ্যতার মেকি চাঁদরে নিজেদের ঢেঁকে রাখার প্রবল চেষ্টা। নব্য আধুনিকতা আমাদের সমাজে এমনভাবে ঢুকেছে যে, এখন সভ্যতা ভব্যতা বলতে আর কিছুই নেই।

নিজের বোধ–বুদ্ধিকেও গ্রাস করে ফেলেছে। শাণিত চেতনাকেও করে তুলেছে অবসাদগ্রস্থ। তাই আমাদের অনুভূতিগুলো আজ নিস্তব্ধ, আহত। মস্তিস্কে যখন পঁচন ধরে তখন ভাইরাসের মতন ছড়িয়ে পড়ে সারা গায়ে। আর সেখান থেকে দুর্গন্ধ ছড়ায় সমাজের রন্ধ্র রন্ধ্রে। আজ আমাদের মনুষ্যত্ব, মানবিকতা ধর্মীয় মূল্যবোধ, ন্যায়-নীতি সততা বিলুপ্তির পথে। তাই আমাদের মধ্যে এতো অস্তিরতা, অরাজকতা বিরাজমান। আমাদের বিবেকের গায়ে নোংরা কালিমা সেঁটিয়ে দিয়েছে ঐ সব নরপশুরা। তারা তো জানে না, একজন নারী ধর্ষিত হওয়া মানেই গোটা সমাজের বিবেক ধর্ষিত হওয়া।

বিকৃত মস্তিস্কের মানুষরূপী হায়েনাদের পৈশাচিক কর্ম মনে করিয়ে দেয় একাত্তরের পাক হায়েনাদের বীভৎস, ঘৃণিত, জঘন্যতম অপকর্মের কথা। এ যেনো তাদেরই অপছায়া ঘুরে বেড়ায় সমাজের আনাচে কানাচে। তবে কি এখনো এদেশে রয়ে গেছে কিছু পাক সেনাদের দুষিত রক্ত? একাত্তরের ঘাতকদের ন্যায় এই হায়নাগুলোকেও ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেয়া উচিত। এরকম পৈশাচিক কর্ম একমাত্র তার পক্ষেই সম্ভব যার মুখোশের আড়ালে পশুত্ব জেগে থাকে। এরা হলো তথাকথিত শিক্ষিত সভ্য-ভদ্র মুখোশধারী অ-মানুষ।

আমার ভাবতে খুব অবাক লাগে আমরা একুশ শতকের এই সভ্য যুগে এসেও পুরুষ জাতি তাদের আদিমতম পশুবৃত্তিকে জলাঞ্জলি দিতে পারলো না। মানুষের বিবেক কতটা নিচে নামলে মানুষের আদলে তৈরি হিংস্র পশুগুলো ধর্ষণের মতো নিকৃষ্ট ও জঘন্যতম কর্মে লিপ্ত হতে পারে।

সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হচ্ছে যখন কোন নারী পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয়, তখন সমাজের একদল শিক্ষিত বিশিষ্টজন নারীর পোশাককে দায়ী করে অমানুষগুলোর পক্ষ নেয়। তাদের হয়ে সাফাই গায়। সমাজের এইসব বিশিষ্টজনেরা তাদের অবান্তর যুক্তি দিয়ে অপরাধীর পৈশাচিক আনন্দকে সমর্থন জানায়। পর্দার আড়ালে তবে কি এইসব মুখোশধারি লোলায়িত পুরুষও ধর্ষক?
প্রশ্ন তো একটা থেকেই যায়। এই বর্বরগুলোকে আড়াল করার চেষ্টা করে তারাও তাদের মাতৃগর্ভকে কলঙ্কিত করছে। তারা পোশাকের দোহাই দিয়ে নারীর সম্মানহানির ঘৃণ্য কাজকে জায়েজ করে নিজেদের পথ খোলাসা করে নেয়।

আর একটু স্পষ্ট করে যদি বলি, চার বছরের শিশু কন্যাটি যখন তাদের লালসার শিকার হয়, সেক্ষেত্রে আমাদের সমাজপতিরা কোন যুক্তি দেখাবেন? যে শিশুকন্যাটির শরীরের ভেতর শরীরী-উত্তাপ অনুভব করার বোধই তৈরি হয়নি, সেই শিশুটি কীভাবে তাদের নারকীয় আচরণের শিকার হতে পারে? পুরুষতান্ত্রিক শক্তির অপব্যবহারে আজ আমরা কোথায় এসে দাঁড়িয়েছি। নারীর মনকে পদদলিত করে পোশাকের ভেতরে শরীরের নগ্নতা খুঁজে বেড়ায়। এই কাপুরুষেরা অন্ধকারের শিকারী! বুক-পকেটে তাদের হৃৎপিণ্ডটা চারিত্রিক বীভৎসতায় ঝলসে গেছে। কী ভয়ংকর রূপ… ধিক তাদের।

পোশাক নয়- পুরুষ জাতির চোখে ও চরিত্রে পর্দা লাগাতে হবে। নারীকে ভোগের সামগ্রী’ হিসেবে ভাবার পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গির আমূল পরিবর্তন করতে হবে। হে পুরুষজাতি….
নারীর উপর শারীরিক সহিংসতা বন্ধ করো। নারীকে মানুষ ভাবো, শ্রদ্ধা করো, ভালোবাসো…..তাহলে সামগ্রিক সুখ, সফলতা কেবল তোমারই হবে। নারীই তোমার সার্থক কারিগর, তোমার অনুপ্রেরণা। নারীর হৃদয় খুঁড়ে দেখো…. তোমার জন্য সুখের পসরা সাজিয়ে বসে আছে। নারীর শরীরে নয়! তার কোমল মনের ভেতরেই রয়েছে তোমার স্বর্গীয় সুখ। নিজের হিংস্রতাকে জলে ডুবিয়ে এবার মানুষ হও।

আক্ষেপের বিষয় এই সব ঘৃণ্য অপরাধীরা ধরা ছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায়। তাদের কোন বিচার হয় না। এই সব নরপশুরা ক্ষমতার দাম্ভিকে বুক ফুলিয়ে সমাজে ঘুরে বেড়ায়। আর নির্যাতিত নিপীড়িত নারীটি লজ্জায় ঘৃণায় আত্মহত্যার পথ বেঁচে নেয়। আর বর্বর পুরুষটির গায়ে কলঙ্কের ছিঁটেফোটাও লাগে না। কারণ শরীরী শুদ্ধতা শুধুমাত্র নারীদের জন্যে, আর পুরুষ চিরকালই উলঙ্গ চরিত্রের। তাইতো সমাজের অলি- গলিতে ক্ষত বিক্ষত বিকৃত বিবস্ত্র নারীর লাশ পড়ে থাকে পুরুষের লালসার শিকার হয়ে।

একদিন এই দেশের তেজোদীপ্ত সোনার ছেলেরা বুকের তাজা রক্ত ঢেলে আমাদের মুখের ভাষা এনে দিয়েছে, প্রিয় স্বাধীনতা এনে দিয়েছে…বোনদের নির্যাতনের বিনিময়ে কিনেছে প্রিয় বাংলাদেশকে। আজ একই মায়ের ছেলে কী নোংরা, নারকীয় সহিংসতা করছে, নারীর রক্তপান করছে। মাকে অপমান করছে, বোনের সম্মান কেড়ে নিচ্ছে। এই লজ্জা কোথায় রাখি!

আমি তাদেরকে বলছি…সমাজের উঁচুস্তরের একদল জ্ঞানপাপী, যারা আইন তৈরি করে, আবার ভক্ষণও করে নিজেদের স্বার্থে। যারা আইনের নামে প্রহসন করে, ক্ষমতার মোহে সাদাকে কালো আবার কালোকে সাদা বলে। তারা ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্যে রক্তের হোলি খেলায় মেতে উঠে। যদি তাই-ই না হবে তবে কেন মানুষরূপী নরপিশাচগুলোর বিচার হয় না? যদি আইনের যথার্থ প্রয়োগই হতো তাহলে একের পর এক ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যার মতো জঘন্য কাজের পুনরাবৃত্তি ঘটতো না। বিচারের পরিণতি দেখে ভয়ে শিউড়ে উঠতো। আইনের সঠিক প্রয়োগ নেই বলেই এই বর্বরগুলো দোর্দণ্ড প্রতাপে চালিয়ে যাচ্ছে তাদের অপকর্ম।

সামাজিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার অবক্ষয়ের কারণেই এইসব নারী খেকোদের দৌরাত্ম্য বেড়েই চলেছে। সমাজের এই নৈতিক পঁচন এখনই রোধ করতে হবে। সমাজের বুক থেকে ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধকে চিরতরে সমূলে উগড়ে ফেলতে হবে। এইসব অপরাধীদের একটাই বিচার হবে- জনসম্মুখে জ্যান্ত পুড়িয়ে ফেলা।

নারী তুমি জেগে উঠো স্বমহিমায়…সময় এসেছে অন্যায়, অত্যাচার নিপীড়নের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার। তোমার মুক্তি, তোমার স্বাধীনতা, ও সমাজে তোমার মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করতে হলে নারী তোমার জাগরণ সর্বাগ্রে প্রয়োজন। চেয়ে দেখো, আমাদের লাল সবুজের পতাকায় এখনও লেগে আছে তোমার রক্তের দাগ…তুমিই তো প্রিয় বাংলাদেশ।

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 62
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    62
    Shares

লেখাটি ৩০৭ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.