পিরিয়ডের যন্ত্রণা কোনো ‘ব্যথাবিলাস’ নয়

0

আমেনা বেগম ছোটন:

উদ্ভট শিরোনাম, পিরিয়ড সংক্রান্ত পোস্ট। দয়া করে ভাববেন না, আমি মেয়েদেরকে ছোট করে দেখানোর চেষ্টা করছি।

আমি মাঝে মাঝেই period সংক্রান্ত পোস্ট দেখি যে, period মানে অনেক কষ্ট, সবার উচিৎ কষ্ট বুঝা, প্রচণ্ড ব্যথা, ভয়াবহ রক্তপাত ইত্যাদি ইত্যাদি। এই পোস্টগুলো আমি গ্রামের মানুষের কাছে শুনলে অবাক হতাম না, সহানুভূতিও দেখাতে পারতাম।
কিন্তু কথা হচ্ছে, এমন সব মানুষজনের ওয়ালে এসব পোস্ট দেখি, দেখি যারা আধুনিকমনস্ক, স্বনির্ভর, স্বাস্থ্য সচেতন, সংস্কারমুক্ত।
আমার ধৈর্য্য সচরাচর বেশি হলেও এসব ক্ষেত্রে আমি খুবই বিরক্ত হই। হ্যাপি টু ব্লিড পোস্টে ১৭ হাজার লাইক পড়ে ছিল। অসংখ্য শেয়ার হয়েছিল, সবচেয়ে চমৎকার ব্যাপার ছিল ছেলেরা অনেক সহানুভূতি দেখিয়েছে, তারা বুঝেছে, এটা মকারির কোন বিষয় না।

এর মধ্যে একটা গ্যাপ লক্ষ্য করবেন যে, পিরিয়ডের মতো ব্যক্তিগত ব্যাপার সামনে এনে কথা বলাটা স্মার্টনেস, অথচ এর প্রতিকার থাকা সত্ত্বেও সেগুলো সহ্য করাটা কী — আমি শব্দ খুঁজে পাচ্ছি না। যে শব্দ মাথায় আসছে সেটা বলা ঠিক হবে না।

এতো আধুনিকতার ফলাফল কী! ব্যথায় কাতরালেও দুটো painkiller খেতে না পারার সংস্কারটা কোন মাহাত্ম্য দেখায়, আমি বুঝি না। ভোকাল এনেস্থিসিয়া বলে মেডিকেল এ একটা সারকাস্টিক টার্ম আছে, ধরুন, কাটা জায়গা সেলাই দিচ্ছেন, আপনার কাছে লোকাল এনেস্থিসিয়া নাই, সেলাই করতে করতে রোগীর সাথে গল্প শুরু করেন, আরে আপনি বিরাট সাহসী, মরদ কো দরদ নেহি হোতা।

এটিও তেমন ব্যাপার, মা-দাদীদের কাছে ওষুধ ছিল না, উনারা ভোকাল মোটিভেশন দিতেন, আরে মেয়ে হইলে ব্যথা সহ্য করা লাগে, মা হইতে ইত্যাদি ইত্যাদি – সেই মন্ত্র এখনো বেশ কাজে দিচ্ছে। হিজাব মানি না, আল্লাহ মানি না, বিয়া মানি না, তয় ব্যথা মানি। ব্যথাবিলাস।

period, মাসিক, শরীর খারাপ, menstruation, যাই বলুন না কেন এই নিয়ে কথাবার্তা বলতে গেলে কয়েকটি বিষয় সামনে আসে। যতগুলি আসে, তা নিয়ে আমার কথা বলতে ইচ্ছে করছে না। সবাই বলেছে আমার আবার নতুন করে বলার কোনো কারণ দেখি না। এই পোস্ট এম্নেও ভাইরাল হবে না। মেয়েমানুষ না কোঁকাইলে সেই লেখায় বেটাবেটি কারু মন ভরে না।

পিরিয়ডের অনিয়ন্ত্রণযোগ্য কষ্ট, মানসিক অস্থিরতা, প্রচণ্ড বিরক্তিকর অবস্থা, মেজাজ খারাপ, কিছু ভালো লাগছে না, শুয়ে-বসে শান্তি নেই। মাঝেমধ্যে আছে টেম্পোরারি ব্রেস্ট লাম্প সেন্সেশন, হঠাৎ আতঙ্ক আমার কি ক্যান্সার দেখা দিল?
এদের তেমন কোনো প্রতিকার নেই, স্বাস্থ্য সচেতনতা ছাড়া। নিজস্ব স্তন পরীক্ষা (self breast examination) এবং নিজস্ব মানসিক শান্তির ব্যবস্থা করা জরুরি। তাতে পারিবারিক সদস্য বা কর্মক্ষেত্রের সহকর্মিদের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে।

* সহনযোগ্য ব্যথা স্বাভাবিক, বিশেষ করে যখন আপনার মেন্স একটি ডিম বা ovum তৈরি করছে (ovulatory cycle)। যে period গুলিতে ডিম্বাণু তৈরি হচ্ছে না সেগুলিতে ব্যথা কম হওয়ার সম্ভাবনা। ‌স্বাভাবিক ব্যথাটুকুকে আপনাকে সহ্য করতেই হবে? এ আইন কে করেছে? আর করলেই আপনি মানছেন কেন? আপনি না আধুনিক সংস্কারমুক্ত, আপনার পিরিয়ড নিয়ে লজ্জিত নন, তাহলে?

যেই কাজটি খুব বিপদজনক, সামান্য সর্দি জ্বর হলেই পাড়ার দোকান থেকে অ্যান্টিবায়োটিক কিনে খেয়ে ফেলা, সেটি করতে বাঙালির কোনো সমস্যা নেই। এই কাজটি করে সে নিজে এবং আশে পাশে যারা এ কাজটি করে না, তাদেরও বিপদে ফেলে, অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্ট ব্যাক্টেরিয়া জন্ম দেয়, যা আকাশে বাতাসে উড়ে বাকি সব মানুষকে আক্রান্ত করে। তারপর যখন সত্যি ব্যাক্টেরিয়াল ইনফেকশন হয়, তখন আর কোন অ্যান্টিবায়োটিকে কাজ হয় না। তখন বাংলাদেশের অতি জ্ঞানীরা সিদ্ধান্তে আসেন নিশ্চয়ই কমিশন খাওয়া ডাক্তারের ভুল চিকিৎসায় তিনি সুস্থ হচ্ছেন না। এরপর যদি ডাক্তার ডাক্তার এন্টিবায়োটিক কালচার সেনসিভিটি টেস্ট দেন, তাহলে শুরু হয়ে যাবে সামান্য সর্দি জ্বরের জন্য কতগুলো টেস্ট দিয়েছে। যে ওষুধ দিয়েছে তাতে তো কাজই হয়নি এ দেশের ডাক্তারগুলো টুট টুট।

মূল প্রসঙ্গে আসি, সেফুদার মতো আরেকটাতে চলে গিয়েছিলাম। আপনার পিরিয়ডে যে স্বাভাবিক ব্যথা, সেটিতে পেইনকিলার (প্যারাসিটামল) antispasmodic ট্যাবলেট খেতে পারেন, সাধারণত দুই থেকে তিন দিনের বেশি ব্যথা থাকে না। ব্যথা নাই, এমনিতে পিরিয়ডের যেটুকু কষ্ট আছে, সেটি পার করে দিতে পারবেন। পেইনকিলার বিপজ্জনক হতে পারে কিডনি/লিভার সমস্যায় ভোগা মানুষের জন্য।

আর ফেসবুকের পোস্টে যেরকম তীব্র ব্যথার কথা শোনা যায়, যেমন তলপেট ছুরি দিয়ে ফালাফালা করা, এসব ক্ষেত্রে আপনি খুব সম্ভবত কোন জটিল রোগে ভূগছেন। দ্রুত ডাক্তারের কাছে যান, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করান, আল্ট্রাসনোগ্রাম করান, দেখুন জরায়ুর কোনো সমস্যা আছে কিনা। ফেসবুক পোস্ট দিয়ে কোন লাভ নেই, তাতে ১০ হাজার লাইক পড়লেও লাভ নেই, এর ভবিতব্য আপনাকেই ভুগতে হবে।

চিকিৎসা করানোই আপনার জন্য ভালো হবে। ফেসবুকে অনেক খবর, এই তিন বছরের বাচ্চা ধর্ষণ হয়েছে, অমুককে কুপিয়ে মেরে ফেলেছে, গুম হয়ে গেছে – এর মধ্যে আপনি পিরিওডের ব্যথায় কাতরাচ্ছেন, এই নিয়ে কার কী বলুন? আর যদি এই ব্যথা বিলাস নিয়ে বসে থাকেন ভবিষ্যত ফলাফল হবে শহীদ কাদরীর কবিতার মতো, বাচ্চা হবে না, বাচ্চা হবে না। রোগ পেলে পুষে বড় করেছেন, তাই।

* রক্তপাত – প্রচণ্ড রক্তক্ষরণে রক্তপাত বন্ধ না করার উপায় না খুঁজে রক্তশূন্যতায় ভুগে কো কো করা, আমি এনিমিক, আমি দুর্বল, আমি নারী হবার মহান ব্রত নিয়ে এসেচি গো। এমনি আধুনিক হয়েছেন নিজের শরীরের যত্ন আত্তি কিভাবে নিতে হয় সে জ্ঞান টাই নাই। আপনার মায়ের ও ছিল না, সে কম খেয়ে, আপনাকে কম খাইয়ে এক দুর্বল নারীজাতি তৈরি করে গেছে। আপনিও সেই ঐতিহ্য ধরে রাখবেন, তা দিব্যি দেখা যাচ্ছে।

কতটা রক্তপাত স্বাভাবিক? মাসে ৪ থেকে ৫ দিন এবং দিনে চারটি স্বাভাবিক সাইজের প্যাড ভরা পর্যন্ত স্বাভাবিক। আপনি যদি অপুষ্টিতে ভোগেন, বা অন্য কোন রোগ না থাকে, তাহলে এই রক্তপাতটুকু শরীর মাসের বাকি সময়ে পুষিয়ে নিতে পারবে। যদি এর বেশি রক্তপাত হয়, এর চেয়ে বেশি দিন হয় মাসে ২-৩ বার হয়, তাহলে এটি অস্বাভাবিক, কোনো একটি সমস্যা হচ্ছে।

কী সমস্যা, সেটা আমি বলবো না। ফেসবুকে প্রেসক্রিপশন জারি করা বেকুবের কাজ। আপনার আসলে কী হয়েছে এটি জানতে হলে আপনাকে ১৫ থেকে ২০ টি প্রশ্ন করতে হবে, তাদের উত্তর একটি নির্দিষ্ট ছকে ফেলে আপনার রোগ অনুমান করতে হবে, সেই রোগটি কী তা blood test, আল্ট্রাসনোগ্রাম করে নিশ্চিত হতে হবে। আমি দু’একজন গাইনি ডাক্তারকে অনুরোধ করেছিলাম এ ব্যাপারে লিখতে, তাদের অভিজ্ঞতা শুনে আর অনুরোধ করতে ইচ্ছে হয়নি, এ ধরনের স্বাস্থ্য সচেতনতামূলক লেখার ফলাফল হচ্ছে, ইনবক্সে গোটা পঞ্চাশেক মেসেজ আসা, আমার পিরিয়ড এ ব্যথা, আমার বাচ্চা হয় না, আমি স্বামীর সাথে মিলনে ব্যথা পাই, আমি অসুখী। যদি উত্তর দেন, ডাক্তারের কাছে যান, বলবে, দেশে ভালো ডাক্তার নাই।

সেই সময়টায়, সহানুভূতির কথা বলেন, সেটি জরুরি। সেই সময়টায় হরমোন ইমব্যালেন্সের কারণে প্রচণ্ড খারাপ লাগে। সামান্য কথায় চোখে পানি এসে যায়, আপনাদের সাপোর্ট অবশ্যই দরকার। অফিসের কলিগ, বাসার ভাই, স্বামী, বন্ধু সবার সহযোগিতা দরকার, তাদের বোঝাতে চেষ্টা করুন। দয়া করে সাথে এইটুকু বলুন, সমস্যাগুলির সমাধানটা কী! ফেসবুকে আপনি কাঁদলেন, আমি লাইক দিলাম, তাতে কী হয়? লাইক কমেন্ট পেলে আপনার ব্যথা বেদনা, mood swing ভালো হয়ে যাবে?

ব্যথা বিলাস কোন ভালো জিনিস না। আপনার সহ্য ক্ষমতা অনেক। সেটি হয়তো ভালো হতে পারে, সেটিও কেমন ভালো জিনিস আমার ঠিক মাথায় ধরে না। পেইন কিলার খাওয়া মেয়েদের একটি দোষ হিসেবে ধরা হয়। মেয়ে হয়েছে একটু সহ্য করতে হয় না?

আমি মেয়ে বলে আমাকে ব্যথা সহ্য করতে হবে আপনাদের এই ঢং এর কথা আমি মানি না, এবার যা খুশি করুন।‌

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 839
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    839
    Shares

লেখাটি ৩,৬১৮ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.