মেয়ে মানেই কি কাজ করার মেশিন?

0

ফারজানা আকসা জহুরা:

আমাদের সমাজে একটি মেয়ের কাছ থেকে তার স্বামী আর শ্বশুরবাড়ির লোকেদের চাওয়া এতোটাই বেশি, যা দেখলে এবং শুনলে মনে হয় বাংলাদেশের মেয়েদের বিয়েই করা উচিৎ না।
১) প্রথমেই তারা চায় মেয়েটি হবে সুন্দরী এবং শিক্ষিত, সাথে ধার্মিক । ( খুব ভালো কথা। তা এমন মেয়ে বিয়ে করার জন্য ছেলের কী কী যোগ্যতা আছে? )
২) মেয়েটিকে হতে হবে খুব ভালো রাঁধুনি , সাতপদ সে একা হাতে রান্না করবে , তাও সংসারের সব কাজ ঠিকমতো করে এবং বাচ্চা-কাচ্চা সামলাতে সামলাতে ! ( বুঝতে পারলাম না , সে কি দশ হাতের মা দুর্গা ? না কি অলৌকিক ক্ষমতার অধিকারিনী? এতো কাজ কি ছেলেরা কখনো করেছে? তাহলে মেয়েদের কেন করতে হবে?)
৩) মেয়েটির রান্না এতোটাই ভালো হবে যে ,তরকারিতে কখনই লবণ কম বা বেশি হবে না , সবসময় পারফেক্ট। ( এমন মেয়ের কথা শুনে কিন্তু রাঁধুনি রাঁধুনি মনে হচ্ছে ! নিশ্চয় রান্না ছাড়া মেয়েটির জীবনে আর কোনো কাজ নেই? আর আপনার ছেলে কি রান্না জানে? নাকি শুধু খেতেই পারে? )
৫) মেয়েটি শিক্ষিত হয়েও কোনো আয় রোজগার করবে না। বাইরে কাজের কথা কল্পনা করবে না। আবার তার কোনো চাহিদাও থাকবে না।
( মানে মেয়েদের খাওয়া, ঘুম, গোসল, তেল, সাবান কিছুই দরকার নেই?)
৬) যদি মেয়ে চাকরি করে ,তাহলে তার টাকা শুধু স্বামী ও তাদের সংসারের পিছনে খরচ করবে। মানে স্বামীর বাবা-মায়ের জন্য খরচ করবে। ( আচ্ছা , মেয়ের কি বাবা মা , ভাই বোন কেউ নেই ? মেয়ে কি তার টাকা দিয়ে তার বাবা মায়ের জন্য  কিছু করতে পারবে না? মেয়েরা কি সব এতিম নাকি?)

আসলে ছেলের বাবা মায়ের  চাহিদা অনুযায়ী ”একটি মেয়ে বাড়ির সব কাজ করে, সাত পদের তরকারি রান্না করে , চাকরি বা আয়-রোজগার করতে যাবে। এরপরে বাসায় এসে সে শ্বশুর শাশুড়ির পা টিপে দিবে। তার পরে বাচ্চাকে সামলাতে সামলাতে সংসার গোছাবে। তারপর সবার পাতে ভাত বেড়ে বেড়ে, তরকারি বেড়ে বেড়ে খাওয়াবে। তারপর হাঁড়ি-পাতিল মেজে ঘঁষে চকচকে করে, রান্নাঘর ঝকঝকে রেখে যাবে স্বামীর সেবা করতে! তারপরে স্বামীর পা হাত টিপে দিবে, বডি ম্যাসাজ করে দিবে! সব কাজ শেষে মধ্যরাতে ঘুম দিয়ে, ভোর রাতে উঠে, ফরজ গোসল দিয়ে, পূজাপাঠ করে, শ্বশুর-শাশুড়ির পা ধরে সালাম করে, রুটি চা বানিয়ে খাওয়াবে ! তারপর বাচ্চাকে স্কুল দিয়ে বাজার করতে যাবে ! এরপর সেই বাজারের ছোট মাছ , শাকপাতা সব পরিষ্কার করে রান্না করে অফিসে যাবে!“

( ওরে …বাবা …রে …বাবা ! এতো কাজ যে মেয়ে করবে, সে কি মানুষ? নাকি কোনো দেবী? তার কি কোনো জীবন আছে? সেকি কাজ করার মেশিন?)

ধরুন মেয়েটা ঘরে থাকে, চাকরি বাকরি কিছু করে না , তাহলে? তাহলে কি তার রক্ষে আছে?
শাশুড়ি-শ্বশুর বলবে, “তুমি তো কিছুই করো না, আমার ছেলের ঘাড়ে বসে বসে খাও !”
স্বামী বলবে ; “ সারাদিন বাসায় বসে বসে কী করো? শুধু খাও আর ঘুমাও? “
পাড়া প্রতিবেশী, সুশীল সমাজ, এমনকি নারীবাদীরা উঠতে বসতে ঐ মেয়েটিকে বলবে, “তুমি তো কিছুই করো না! পা দুটা ফাঁক করে স্বামীর ঘাড়ে বসে বসে খাও!”

এতোসব মানুষের নীতি বাক্য শুনলে মনে হয় যে , আমাদের সমাজে নারীকে হতে হবে দশ-বিশ হাতের “মা দুর্গা “ , নয়তো তার জন্ম বৃথা। সবাই তার বদনাম গাইতে থাকবে।

তাদের কথা মতে , নারীদের কোনো বাবা মা থাকতে নেই! যদি থাকে, তাদের কোনো প্রয়োজন থাকবে না! তারা কখনও কোনো অসুখ-বিসুখ পড়বে না! তাদের কোনো সেবাযত্নের দরকার হবে না! তাদের কোনো খোঁজ খবর না রাখলেও চলবে!
এর মানে মেয়েরা আকাশ থেকে পড়ে বাতাস খেয়ে এমনে এমনেই মানুষ হয়। তাদের আবার বাবা মা কীসের? কী, তাই না?

সমাজের কাছে , মেয়ের শ্বশুর বাড়ি মানেই রাজা-বাদশা ! আর মেয়ের জামাই মানে লাটবাহাদুর ! শুধু ছেলের বৌ মানে দাসীবান্দি কখনো বা ডাইনি শাকচুন্নি!

লেখাটি ভাল লাগলে শেয়ার করুন:
  • 174
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
    174
    Shares

লেখাটি ৫১৪ বার পড়া হয়েছে


উইমেন চ্যাপ্টারে প্রকাশিত সব লেখা লেখকের নিজস্ব মতামত। এই সংক্রান্ত কোনো ধরনের দায় উইমেন চ্যাপ্টার বহন করবে না। উইমেন চ্যাপ্টার এর কোনো লেখা কেউ বিনা অনুমতিতে ব্যবহার করতে পারবেন না।

Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.