সঙ্গীর ভালবাসা গ্রহণ করতে পারাটাও খুব জরুরি

কাজী তামান্না কেয়া:

অনিক আর প্রমির বিয়েটা ভালবাসা আর পারিবারিক সম্মতিতে হয়েছিল। বিয়ের পর থেকে প্রমি ক্রমশ বুঝতে পারছিল অনিক তার ভালবাসাটা ঠিক গ্রহণ করতে পারে না। রান্না ভাল হলে, একটা সুন্দর পোষাক পরলে অনিক হয় প্রশংসা করতে চায় না, বা প্রশংসা করার প্রয়োজন বোধ করে না। সম্পর্কের এইসব খুঁটিনাটি বিয়ের আগে প্রমির জানা ছিল না। সে তাই মনে প্রাণে চেষ্টা করে ঝগড়াঝাঁটি এড়িয়ে চলতে।

রাগারাগি হলে প্রমি উপরের ঘরে চলে যায় ঝগড়া ছোট করার জন্যে। রাগ পড়ে গেলে অনিক এসে স্যরি বলে কিংবা ভুলে যাবার ভান করে। আজও তেমনই এক দিন। তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে অনিক গলা উচুঁ করে। দোষটা প্রমি নিজের কাঁধে নিয়ে নেয়, আর কিছুক্ষণ পর স্বামীর কাছে যায় স্যরি বলার জন্যে। অনিক টিভি দেখছিল আর স্যুপ খাচ্ছিল। প্রমি সামনে এসে স্বামীকে জড়িয়ে ধরে স্যরি বলে। অনিক খানিকটা বিরক্তি মিশিয়ে প্রশ্ন করে, কীসের জন্যে স্যরি বলছো? তুমি কি দেখছো যে আমি খাচ্ছি? আমাকে দয়া করে খেতে দাও। প্রমি দেরি না করে এক গ্লাস পানি নিয়ে বেডরুমে চলে আসে।

জুলেখা খাতুন প্রায় ২৫ বছর ধরে সংসার করছে। সংসার জীবনের শুরুতে অভাব অনটন ছিল, ছিল ছেলে মেয়েদের লেখাপড়ার খরচ। এখন স্বামীর ব্যবসা আগের তুলনায় স্থিতিশীল। জুলেখা খাতুন না চাইতেই ফরিদ সাহেব একদিন দুই ভরির একটা হার কিনে আনেন স্ত্রীর জন্যে। জুলেখা খাতুনের সেই হারের ডিজাইন পছন্দ হয়নি। কয়েক বছর পর স্বামীকে না জানিয়ে জুয়েলারের কাছে গিয়ে হারখানি বিক্রি করে আসেন তিনি।

জীবনের নানা পর্যায়েই সঙ্গীর পছন্দের সাথে আমাদের পছন্দ মেলে না। কিন্তু তাই বলে সঙ্গীর দেখানো ভালবাসাটা মিথ্যে হয়ে যায় না। অনেকে আবার সঙ্গীর দেওয়া উপহারে দাম বা ব্র্যান্ড আগে দেখে। উপহারের দাম বা ব্র্যান্ড যাই হোক না কেন, তা গ্রহণ করার মানসিকতা থাকাটা জরুরি।

আমি বলছি না, উপহার পছন্দ না হলেও তা জোর করে পছন্দ করার ভান করতে হবে। আমি বোঝাতে চাইছি, উপহারটি ভাল না লাগলে দুজনে আলোচনা করে তা পরিবর্তন করে আনা যেতে পারে, কিংবা উপহার কেনার ক্ষেত্রে সঙ্গী যেন একা একা সিদ্ধান্ত না নেয় সে বিষয়ে কথা বলা যেতে পারে। একটা বিষয় ভুলে গেলে চলবে না, ভালবাসা গ্রহণ করতে পারাটাও একটা প্রয়োজনীয় বিদ্যা।

সঙ্গী যখন কোন একটি বিষয় শেয়ার করতে থাকেন, সেই কথাগুলি মন দিয়ে শোনাও তেমন আরেকটি দরকারি পাঠ। একপক্ষ যখন কথা বলে, তার কথার বা আচরণের ভুল না ধরে শুধু মন দিয়ে কথাগুলি শুনে যাওয়াটা সঙ্গী প্রত্যাশা করেন এবং এই প্রত্যাশাটা খুব সাধারণ একটা চাওয়া।

অনেক দম্পতির জন্যে এই সাধারণ প্রত্যাশাটা পূরণ করা সম্ভব হয় না, কারণ সঙ্গীর কথাগুলি তারা গুরুত্বহীন মনে করেন। বিয়ে করে এক ঘরে থাকার অর্থ সম্পর্কটিকে কিনে নেওয়া নয়। সম্পর্ক একটি চারাগাছের মতো। তাকে যত্ন করে, সময় দিয়ে, গুরুত্ব দিয়েই টিকিয়ে রাখতে হয়।

পিএইচডি অধ্যয়নরত গবেষক
সাউথ ক্যারোলাইনা, যুক্তরাষ্ট্র

শেয়ার করুন:
Copy Protected by Chetan's WP-Copyprotect.